জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব থেকে ধরিত্রীকে বাঁচতে সামাজিক বনায়নে জোর দিতে হবে। বনভূমি উজাড় করা থেকে জনগণকে সচেতন করতে হবে। সর্বত্র প্রচুর গাছ লাগাতে হবে। অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস করতে হবে। কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন বন্ধ করতে হবে।...

বর্তমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তন একটা চলমান প্রক্রিয়া। পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকেই জলবায়ুর এ পরিবর্তন হচ্ছে। অতীতে অনেক লম্বা সময় পরপর জলবায়ু পরিবর্তন হতো। তবে ইদানীং খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এর জন্য মানুষই দায়ী। পরিবেশদূষণ, পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, বনভূমি উজাড় ইত্যাদি কারণে সাইক্লোন, অতি বৃষ্টি, বন্যা এবং গরমের তীব্রতা বাড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ দিন দিন পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি অর্থাৎ ১৭৬০ সালে ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লব শুরু হয়ে ১৮৪০ সালের মধ্যে তা সমগ্র ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। এ সময়ে প্রচুর কলকারখানা গড়ে ওঠে। আর এসব কারখানায় বিপুল পরিমাণ জ্বালানির ব্যবহার শুরু হয়, যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। শিল্পবিপ্লবের আগে পৃথিবীর তাপমাত্রা একটা সহনশীল পর্যায়ে ছিল। গত দেড় শ থেকে পৌনে ২০০ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বেড়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জলবায়ু পরিবর্তনে। অসময়ে বন্যা কিংবা তীব্র খরার কারণে কৃষিতে বিরূপ প্রভাব লক্ষ করা গেছে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে উপকূলীয় বা দ্বীপাঞ্চলগুলো প্লাবিত হচ্ছে। ফলে অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। পৃথিবীর একদিকে ঘন তুষারপাত আবার অন্যদিকে বৃষ্টিহীনতার করণে জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশে দাবানলে বনভূমি উজাড় হচ্ছে। এসব দাবানলের কারণেও বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়ছে। সম্প্রতি পৃথিবীর মানুষ ২৬০ কিলোমিটার গতিসম্পন্ন সাইক্লোনও ধেয়ে আসতে দেখেছে।
আমাদের দেশে এখন ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে বজ্রপাত। এই যে বজ্রপাত, এগুলো কিন্তু একেবারে চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছে। আমরা যদি গত ৩০-৪০ বছরের বজ্রপাতের পরিসংখ্যান দেখি, তাহলে দেখব দিন দিন বজ্রপাতে মৃত্যুর হার বাড়ছে। চলতি বছরের গত চার মাসে অনেক লোক বজ্রপাতে মারা গেছে, বিশেষ করে আমাদের হাওড়াঞ্চলগুলোয় বজ্রপাতে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক বেড়েছে। এই বজ্রপাত সাধারণত এপ্রিলে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে গিয়ে শেষ হয়। মাঝখানে বর্ষাকালে কিছুটা কম হয়। এই যে বজ্রবৃষ্টি, এগুলো কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে তাপমাত্রা সহনশীল পর্যায়ে রাখতে হবে। আমরা কীভাবে তাপমাত্রা বাড়াচ্ছি- গাছপালা কেটে বনভূমি উজাড় করছি, ভোগবিলাসী জীবনযাত্রার জন্য বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রকিস বিলাসদ্রব্য ব্যবহার করছি। যেমন- ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশন, জেনারেটর ইত্যাদি।
উন্নত দেশগুলো বাতাসে অধিক পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন করছে। কারণ তাদের কলকারখানা বেশি। অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশ বিশেষ করে ভারত, চায়না, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া- এদের জনসংখ্যা অধিক। এসব দেশে প্রচুর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এরাও প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপাদন করছে। এই কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে মিশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে মেরু অঞ্চলের বরফগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে সাগরে যাচ্ছে। ফলে সাগরের পানির উচ্চতা বেড়ে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো তলিয়ে যাচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাবের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো। ভূমিস্বল্পতা এবং দারিদ্রতার কারণে জলবায়ুর প্রভাবে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে অন্যত্র পুনর্বাসন করা দুরূহ। অন্যদিকে আমাদের যে কৃষি জমি, যেখানে আমরা খাদ্য উৎপাদন করি, এই কৃষি জমি যদি লবণাক্ত হয়ে যায়, তাহলে কৃষি উৎপাদন কমে যাবে। ইতোমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খাদ্যনিরাপত্তা একটা বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিশ্বব্যাপী খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। এজন্য জলবায়ু নিয়ে এখনই আমাদের সচেতন হতে হবে। ৫০ বছর পর কী হবে, তা নিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। যতটুকু জানি, ইতোমধ্যে সরকার কিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবমুখী হতে হবে। না হলে আমরা এটা সামাল দিতে পারব না। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত শুধু খাদ্যের ওপরই পড়ছে না, জনস্বাস্থ্যের ওপরও এর আঘাত হানছে। যেমন ডেঙ্গু রোগ। জলবায়ু পরিবর্তন এডিস মশার বংশবিস্তারে ভূমিকা রাখছে। এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েনি। এজন্য সরকারও এ বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বল্পোন্নত দেশগুলা কার্বন ডাই-অক্সাইড কম উৎপাদন করে থাকে। কারণ তাদের কলকারখানা ও যানবাহনের সংখ্যা অল্প। দরিদ্র দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশও খুব কম কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপাদন করে। কিন্তু সমস্যা হলো আন্তর্জাতিক। কারণ কার্বন ডাই-অক্সাইডের ৮০ শতাংশই উৎপাদন হয় উন্নত দেশগুলোয়। তাদের কারণে আমাদের ক্ষতি হয়। এজন্য তাদের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশ বা গরিব দেশগুলো উন্নত দেশগুলোর কাছে বিভিন্ন সভা-সমিতির মাধ্যমে জোরালোভাবে তারা তাদের দাবি তুলে ধরতে পারে।
জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব থেকে ধরিত্রীকে বাঁচতে সামাজিক বনায়নে জোর দিতে হবে। বনভূমি উজাড় করা থেকে জনগণকে সচেতন করতে হবে। সর্বত্র প্রচুর গাছ লাগাতে হবে। অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস করতে হবে। কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন বন্ধ করতে হবে। শহরাঞ্চলে আকাশচুম্বী ভবনগুলো এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে। একই সঙ্গে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে ভবনগুলোকে কাচে মোড়ানো বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি দেশের জনগণকে বিরূপ পরিবেশে মানিয়ে চলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। আমাদের দক্ষিণাঞ্চল সমুদ্র সমতলের কাছাকাছি। সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোয় বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস বা বন্যায় বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। বাস্তুচ্যুত হয়। আমরা অনুধাবন করছি, আগামী ১০০ বছর পর পৃথিবী কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। এই ধরিত্রীর প্রাণিকুল কীভাবে বেঁচে থাকবে? জলবায়ুর প্রভাবে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। মানব সন্তান ও ধরিত্রীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই আমাদের সচেতন হতে হবে।
সামাজিক বা ব্যক্তিগত পর্যায়েও আমাদের সচেতন হতে হবে। গৃহস্থালির অনেক কাজে আমাদের সাশ্রয়ী ভূমিকা রাখতে হবে। দৈনন্দিনের ব্যবহার্য পণ্য, যেমন- পানির ব্যবহারে আমাদের সচেতন হতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে আমরা যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি অপচয় না করি। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে আমাদের সাশ্রয়ী হতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া লাইট, ফ্যান বা এসি চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে এগুলো রাষ্ট্রীয় সম্পদ।
ছোটবেলায় আমরা দেখেছি, আমাদের দেশে জুন থেকে আগস্ট মাসে প্রচুর বৃষ্টিপাত হতো। কিন্তু সম্প্রতি ঋতুচক্রের চিরাচরিত এ নিয়মে ব্যাঘাত ঘটছে। অসময়ে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে একটানা খরার প্রভাবে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। এটা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। বিশ্বব্যাপী এ প্রভাব লক্ষ করা গেছে। এটা প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের জন্য হুমকি। প্রকৃতির এ বিরূপ প্রভাবে অনেক প্রজাতির প্রাণী পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। অনেক প্রাণী বিলুপ্তপ্রায়। এর পাশাপাশি অনেক উদ্ভিদকেও আমরা হারিয়ে যেতে দেখেছি। সুতরাং, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং তা থেকে ধরিত্রীকে বাঁচাতে সবাইকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


