এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে এবং আইসিইউ খুঁজতে খুঁজতে শিশুর প্রাণপাখি উড়ে যায়। একদিকে শিশুরা ছটফট করছে মৃত্যু যন্ত্রণায়, অপরদিকে হামের নমুনা পরীক্ষার অপেক্ষায় দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষমান আপনজনরা। তাই, যে বা যাদের কারণে হামের টিকা দেওয়া বন্ধ হয়েছিল তাদের ঠাণ্ডা মাথায় শত শত শিশু হত্যার দায়ে বিচার হওয়া প্রয়োজন বলে ভুক্তভোগীরা মনে করেন।...
চার বছর তিন মাস বয়সী শিশু আকিরা হায়দার আরশির বাবা আল আমিনের কাছে ১ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে ডা. এম আর খান শিশু হসপিটাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (পিআইসিইউ) হাত দুটো বাঁধা (যাতে হামের স্থানে চুলকাতে না পারে, সে জন্য হাত বাঁধা ছিল) অবস্থায় বলতে ছিল, ‘বাবা আমাকে বুকে নাও। আমাকে পানি দাও’ (প্রথম আলো, ১০ এপ্রিল, ২০২৬)। অভাগা বাবা আল আমিন শিশুকে পানি দিতে যেমন পারলেন না, তেমনি কোলেও নিতে পারলেন না! শিশুর বাবার বক্তব্য, মিরপুরে এ হাসপাতাল ছাড়াও ডেলটা হাসপাতাল ও গ্লোবাল স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিউমোনিয়া, হামসহ নানা জটিলতায় পাঁচ দফায় ২৭ দিন ভর্তি ছিল তার মেয়ে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাম, সঙ্গে শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ এবং সারা শরীরে জীবাণু সংক্রমণের কথা বলেছে। তার সঙ্গে হৃদযন্ত্রে জন্মগত সম্ভাব্য ক্রটির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মোটা দাগে আমরা হাম রোগকেই শিশুটির মৃত্যুর অন্যতম কারণ বলতে পারি।
বরগুনায় দুটি যমজ সন্তান জন্ম দেওয়ার সময়েই মা সুমাইয়া মারা যান। কখনো ফুপুর কাছে আবার কখনো নানির কাছে থাকত হাসান ও হোসেন। দেশজুড়ে চলমান হামের প্রভাবে তারা আক্রান্ত হয় এবং গত ২৭ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হাসান মারা যায়। মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাম সন্দেহ করা হচ্ছে আর আর্থিক অসচ্ছলতার কারণ হিসেবে হোসেনের চিকিৎসা চলছে বাড়িতেই (প্রথম আলো, ৮ এপ্রিল, ২০২৬)।
মাদারীপুর সদরের খোয়াজপুর ইউনিয়নের পখিরা গ্রামের শিশু সোহা মণির ১০ এপ্রিল, ২০২৬ গোলাপি রঙের নকশিকাঁথায় মুখসহ সারা শরীর মোড়ানো নিথর দেহ বের হলো হাসপাতাল থেকে। শিশুর মা লিমা বলেছেন, ‘মেয়ের শুধু হামের টিকা দিতে পারিনি।’ পরিবারের বক্তব্য মতে, ৩ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। শিশুর চাচা জানান, জমানো কিছু টাকা, দুটো গরু ও সোহা মণির মায়ের অলংকার বিক্রি করে বহন করা হয়েছে চিকিৎসার ব্যয়ভার।
গত ২৫ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হামবিষয়ক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হামের উপসর্গে ১৫ মার্চ থেকে দেশে মোট ২০৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৩০ হাজার ৬০৭ শিশুর। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২০ হাজার ৪৭৫ শিশু। এসব শিশুর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৭ হাজার ৮১ শিশু। এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, মানুষ আছে; রোগবালাই থাকবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চলবে। জীবন আছে, মৃত্যুও অবধারিত। এটাই প্রকৃতির চিরন্তন মানবকুলের প্রবাহধারা। বিষয়টি উপেক্ষা করা যায়নি, যাচ্ছে না, যাবে না কখনো।
তার পরও যে বিষয়টি আদৌ উপেক্ষা করা যায় না, তা হলো একবিংশ শতাব্দীতে বহু রোগের প্রতিরোধ ব্যবস্থা আছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকার যেসব রোগের প্রতিরোধ ব্যবস্থা আছে সেগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় যথার্থ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে- এটাও স্বাভাবিক। আর এ বাস্তবতার আলোকে বাংলাদেশে চলমান হাম রোগের বিষয়ে কিছু প্রশ্ন উপস্থাপন করা খুব একটা অযৌক্তিক হবে না যে, কোন সালের কত তারিখে হামের টিকাদান বন্ধ করা হলো? কোন সরকারি আদেশে কোন কর্তৃপক্ষ এবং হামের টিকাদানের নিষেধাজ্ঞা আদেশের নথি কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা অনুমোদন দিলেন তা বাংলাদেশের তথ্য আইন মোতাবেক জনগণ জানার অধিকার সংরক্ষণ করে। আর সেই আলোকে আমরা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই যে, হামের টিকা বন্ধ হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে জানতে চাই। এটা আমাদের জানার অধিকার আছে এবং সে অধিকার ন্যায়সংগত। কারণ, হামের টিকা বন্ধবিষয়ক সিদ্ধান্তকালে অবশ্যই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী কিংবা উপদেষ্টা দায়িত্বে ছিলেন, মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন, অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছিলেন, ছিলেন সংশ্লিষ্ট পরিচালক ও উপ-পরিচালক। হাজার হাজার শিশু, উল্লেখযোগ্য বিষয়ক মানুষের ভোগান্তি, শত শত শিশুর অকাল মৃত্যু আর পরিবার-পরিজনের আহাজারি সাগর বা নদীর ফেনিলের মতো বিলীন হয়ে যেতে পারে না। যদি জনগণ মূল সত্য ঘটনা না জানতে পারে তাহলে রাষ্ট্রব্যবস্থায় আস্থার ঘাটতি দেখা দিলে তা কি অযৌক্তিক হবে? আর জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থাপনায় জনগণের দেওয়া ট্যাক্স নিয়েও তো প্রশ্ন উঠবে। তাই, অত্যন্ত বাস্তবতার আলোকেই হামের টিকা বন্ধের বিষয়টির জবাবদিহি নিশ্চিত করা কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের একান্ত করণীয় কাজ। এটাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারের বিবেচনা করা দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে জনগণ মনে করে।
কারণ, বর্তমানেও এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে এবং আইসিইউ খুঁজতে খুঁজতে শিশুর প্রাণপাখি উড়ে যায়। তাই, যে বা যাদের কারণে হামের টিকা দেওয়া বন্ধ হয়েছিল তাদের ঠাণ্ডা মাথায় শত শত শিশু হত্যার দায়ে বিচার হওয়া প্রয়োজন বলে ভুক্তভোগীরা মনে করেন।
তার সঙ্গে আর একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারলাম, কোনো বিভাগীয় শহরের হাসপাতালেই হামের নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। সব নমুনা পাঠাতে হয় ঢাকায় পরীক্ষার জন্য। হাজার হাজার নমুনা ঢাকায় আসে। একদিকে শিশুরা ছটফট করছে মৃত্যু যন্ত্রণায়, অপরদিকে হামের নমুনা পরীক্ষার অপেক্ষায় দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষমান আপনজনরা।
এখানে কি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে না যে, কোভিড থেকে কী শিখলাম আমরা? আমরা কি আদৌ কিছুই শিখেছি কোভিড থেকে। যদি সরাসরি উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে না বলি তাহলে বোধ হয় খুব একটা অযৌক্তিক হবে না। আমরা দেখছি, যখনই কোনো সমস্যা সমাধান না হয়ে সংকটে পরিণত হয় তখনই শুরু হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরের লম্বঝম্ফ।
স্বাস্থ্যসেবা নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজনের অন্যতম বিষয়। অথচ এ খাতে বারবার বেহাল দশা আমরা দেখছি। শত শত প্রাণ উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন- এমন অবস্থা চলতে পারে কি না?
প্রসঙ্গত, আমরা আমাদের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বিষয়ে একটু ভেবে দেখতে পারি। পর্যবেক্ষণ এররকম তথ্য দিচ্ছে যে, টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বাড়লেও এক দশক ধরে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশ ৫ শতাংশের আশপাশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ এখনো দেশের মোট জিডিপির ১ শতাংশের নিচে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বনিম্ন। মোট বরাদ্দের বড় একটি অংশ বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক কাজে ব্যয় হয়। ফলে প্রকৃত উন্নয়নকাজে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দ অর্থ পুরোপুরি ব্যয় না হওয়ার কারণে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ কমিয়ে আনা হয়। উল্লিখিত তথ্যে এটাই প্রমাণিত হয় যে, বৈশ্বিক মানদণ্ডে আমাদের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বিষয়টি উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে আছে।
যাই হোক, হাম পরিস্থিতি এখন যে পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছিয়েছে এবং কোভিড নিয়ে যে অবস্থা হয়ে গেল, এর পরও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ঘুম কি ভাঙবে না? উনারা কি ভাবছেন যে, জাতীয়ভাবে স্বাস্থ্য খাতের বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের জরুরি ভাবনা প্রয়োজন। প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ। স্বাস্থ্য খাতের জরুরি বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশক।
উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর বিদ্যমান পরিবেশ, জনবল এবং স্বাস্থ্যসেবার উপকরণগুলোর বিষয়ে যথার্থ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আসলে স্বাস্থ্যসেবার নামে রাষ্ট্রের নাগরিকদের সঙ্গে এক ধরনের তামাশা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিকের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। বিভাগীয় শহরে অবস্থিত হাসপাতালগুলোয় হামের মতো সংক্রামক ব্যাধিগুলোর পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য আর রাজনৈতিক সদিচ্ছা। জাতীয় ঐক্যের কথা বললাম এ কারণে যে, কোনো সমস্যা বা সংকটই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সবকিছুই নির্ভর করে জাতীয় অর্থনীতির শক্তিময়তার ওপর আর তা নির্ভর করে জাতীয় ঐক্য এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
অনেক সময় গড়িছে গেছে। আর কালক্ষেপণ না করে স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ খাতের সমস্যাগুলো যেন আর সংকটে পরিণত না হয়; সে লক্ষ্যে কাজ করার জন্য জোর আহ্বান জনতার।
লেখক: অধ্যাপক ও উপ-উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত)
প্রাইম ইউনিভার্সিটি। অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট


