এমন একজন কালজয়ী প্রতিভা লালনকন্যাখ্যাত লোকসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীন আপাদমস্তক ছিলেন বিনয়, বদান্যতা আর সৃজনশীল আবেদনময়ী কণ্ঠশিল্পী। ‘চলে যাব সবাই একে একে/ কেউ আগে কেউ পরে’ এটি তার খুবই প্রিয় একটি গান। ভীষণ অনুভূতিপ্রবণ একজন একাকী মানুষ ছিলেন তিনি। তার মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিকতা, সৌজন্য বোধ ও আধ্যাত্মিক সাধনার সম্মিলন ঘটেছিল। তিনি শুধু একজন সংগীতশিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন এক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথিকৃৎ। তার গানে ছিল মাটির গন্ধ, নদীর সুর, মানুষের প্রাণ। লালন শাহর গানকে জীবনের মতো বুকে ধারণ করে তিনি গেয়ে গেছেন বছরের পর বছর, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিয়েছেন বাংলার লোকসংগীতের গভীর সৌন্দর্য। কী গভীর নিমগ্নতায়, উপলব্ধিতে তিনি লালন শাহর গানগুলো গাইতেন, কীভাবে টেনে টেনে কথা বলতেন, খুনসুঁটি করতেন, হাসতেন। বাংলাদেশের আপামর সাধারণের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই লালনগীতি ও ফরিদা পারভীন পরস্পর পরিপূরক এবং অবিচ্ছিন্ন দুটি নাম।…
‘ও পাখিরে আয় দেখে যা কেমন আছি। একবার আয় দেখে যা কেমন আছি, এখানে শাল পিয়াল আর আমলকী বন এখানে দীঘির জলে শাপলা ফোটে। এখানে মনের সুখে বাই তরণি উজান ভাটি’। আত্মোৎসর্গকারী মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি জাগানিয়া এই গানটির বহুমাত্রিক আহ্বান আবেদনে আমাদের চিন্তাচেতনায় আলোড়ন ও আবেগ সৃষ্টি করে। স্বামী গীতি কবি আবু জাফরের সুর করা গানটি দ্বৈতকণ্ঠে গেয়েছিলেন সদ্য প্রয়াত মরমি শিল্পী ফরিদা পারভীন। ‘লাভ ইন সিঙ্গাপুর’ ছবিতে গানটি এক প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী দম্পতির দেশে ফেরার সময় নেপথ্য সংগীত হিসেবে সংযোজিত হয়েছিল। সেই সময় থেকে গানটির আবেগ, দেশপ্রেম, চিত্রকল্প, সুর সবকিছুতেই বিশেষভাবে বিমুগ্ধ হই। সুদূর আমেরিকার ব্যাটন রুজে বসবাসকারী আমার সহপাঠীকে তার মায়ের মৃত্যুর পর মা তাকে দেশে ফিরে দেখতে আসার জন্য আকুতি জানাচ্ছে এমনভাবে আপ্লুত করতে আমি ইউটিউবে তাকে শোনার জন্য গানটি পাঠাই। গত কয়েকদিন অশ্রুসজল চোখে আমার মনে আলোড়ন সৃষ্টি করছে এই গান কুষ্টিয়ায় সমাহিত ফরিদা পারভীন যেন স্মৃতিকাতর থেকে আমাদের তাকে দেখে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।
সবচেয়ে জনপ্রিয় লালন শাহর গান ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’। আজ সেই খাঁচা থেকে চিরতরে চলে গেলেন লালনকন্যাখ্যাত লোকসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীন। তিনি এমন একজন কালজয়ী প্রতিভা যিনি আপাদমস্তক ছিলেন বিনয়, বদান্যতা আর সৃজনশীল আবেদনময়ী কণ্ঠশিল্পী। ‘চলে যাব সবাই একে একে/ কেউ আগে কেউ পরে’ এটি তার খুবই প্রিয় একটি গান। ভীষণ অনুভূতিপ্রবণ একজন একাকী মানুষ ছিলেন তিনি। তার মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিকতা, সৌজন্য বোধ ও আধ্যাত্মিক সাধনার সম্মিলন ঘটেছিল। তিনি শুধু একজন সংগীতশিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন এক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথিকৃৎ। তার গানে ছিল মাটির গন্ধ, নদীর সুর, মানুষের প্রাণ। লালন শাহর গানকে জীবনের মতো বুকে ধারণ করে তিনি গেয়ে গেছেন বছরের পর বছর, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিয়েছেন বাংলার লোকসংগীতের গভীর সৌন্দর্য। কী গভীর নিমগ্নতায়, উপলব্ধিতে তিনি লালন শাহর গানগুলো গাইতেন, কীভাবে টেনে টেনে কথা বলতেন, খুনসুঁটি করতেন, হাসতেন। বাংলাদেশের আপামর সাধারণের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই লালনগীতি ও ফরিদা পারভীন পরস্পর পরিপূরক এবং অবিচ্ছিন্ন দুটি নাম। লালন শাহর গানের প্রসঙ্গ উঠলেই বাঙালির মন-কানে প্রথমেই যার কণ্ঠস্বর ও সুর বেজে ওঠে, তা নিশ্চিতভাবেই ফরিদা পারভীনের। দীর্ঘদিন তিনি দূর কুষ্টিয়া শহরে বসে লালনগীতির চর্চা করেছেন এবং সেখান থেকেই তার প্রতিষ্ঠা। দূর মফস্বল শহরে বাস করে লালনগীতির মতো একটি বিশেষ সংগীতের ক্ষেত্রে একক গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত আমাদের দেশে ফরিদা পারভীন ব্যতীত আর কারও নেই। কুষ্টিয়ায় অবস্থানকালেই ১৯৮৭ সালে তিনি লালনগীতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক এবং ‘অনন্ত প্রেম’ ছবিতে ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটি গেয়ে ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।
তিনি শুধু তার গানে অনন্য সাধারণ গায়কির জন্য চিত্তহরণকারী ছিলেন না, বাংলাদেশে অসাধারণ ও সৃজনশীলতার প্রতি সমর্পিত আলাদা একটি ঘরানা তৈরির জন্য প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বাউল গীতি, লালন সংগীতকে তিনি দেশের সীমানার বাইরে নিয়ে গেছেন। লালনগীতি নিয়ে ফরিদা পারভীন জাপান, সুইডেন, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ডসহ আরও বহু দেশে গেছেন। তার হৃদয়ে উজ্জ্বল হয়েছিল একটি স্মৃতি। ১৯৮৪ সালে বরেণ্য নাট্যকার ও শিল্প ব্যক্তিত্ব সাঈদ আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকারের একটি ডেলিগেটস গিয়েছিল সুইডেনে। সুইডেনের রানি গ্রামে থাকেন, তার গ্রামের বাড়িতেই ফরিদা পারভীন গেয়েছিলেন ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’। গানটি শুনে রানি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। রানি তো কথা বুঝতে পারছেন না। তিনি শুধু একটা কথাই বললেন, ‘ওর গায়কি, ওর সুরের যে ডেপথনেস, তাতে আমার মনে হলো, ওর কণ্ঠের মধ্যে ঈশ্বর বাস করছে। ...ওর কথা বোঝার আমার দরকার নেই। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, ওর সুরের ভেতর একটা কষ্ট লুকিয়ে আছে, সেই কষ্টটা আমার কষ্টের সঙ্গে মিলে গেছে।’
আমার চাচা ডাক্তার মুরীদ আলী ১৯৭৩ সালে কুষ্টিয়ায় সিভিল সার্জন ছিলেন। তার দাপ্তরিক সহকর্মী ছিলেন ফরিদা পারভীনের বাবা দেলোয়ার হোসেন। (ডাক্তার সাহেব) আমাদের কুষ্টিয়ার হাসপাতালের বাসায় এসে বলতেন আমার আব্বাকে ‘লালনের আখড়ায় দোলপূর্ণিমায় মহাসমাবেশ হবে, মেয়েটা যদি একটা-দুটো গান করত, তাহলে তো ভালো হতো। পূর্ণদাস বাউল আসবে।’ কিশোরী ফরিদা পারভীন সে সুবাদে আমাদের পরিবারের পারিবারিক পরিচিতির বলয়ে ঢুকে পড়েন সেই থেকে এই সেদিন (১৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা ১২ মিনিট) পর্যন্ত তিনি আমাদের অন্তরঙ্গ সুহৃদ ছিলেন। নানা পর্যায়ে নানাভাবে আমরা পরস্পর প্রযুক্ত ছিলাম নানা কাজে ও কর্মে। লালন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন লালন করতেন, কিছুদূর অগ্রসর হতে সময় লাগছিল, কিন্তু বিগত দেড় দুই বছর অতি অসুস্থতার জন্য তার এ ধরনের অনেক স্বপ্ন মুকুলেই ঝরে যাচ্ছিল। গানের স্কুল ‘অচিন পাখি’র জন্য ডোনার বা স্থায়ী অর্থায়নের উৎস জোগাড়ে নানা জনের কাছে নানাভাবে অ্যাপ্রোচ করছিলাম। সাড়া মিলত, মিলত না। এসব হতাশার কথা ভাগাভাগি করতেন। বিত্তবানদের চিত্ত প্রসারের কাছে আবেদন আহ্বান জানিয়েই যাচ্ছিলাম। হাসপাতাল থেকে মাঝে মাঝেই ছাড়া পেয়ে টেলিফোন করতেন, নানা কর্ম পরিকল্পনা আটার ব্যাপারে আইডিয়া শেয়ার করতেন। যখন যেখানে একটু আশার আলো দেখা যেত সচকিত হয়ে উঠতেন। কিন্তু জরাগ্রস্ততা তাকে বারবার পিছিয়ে দিত। তিনি নিজের মনে নিজের দুঃখ চেপে রাখতেন আবার গানের মাধ্যমে তা প্রকাশও করতেন (তির বেঁধা পাখিটার, বুকের পাথরটা সরানো গেল না, কী হবে জেনে ইত্যাদি)। লালন গীতির পাশাপাশি তার দেশাত্মবোধক গান (এই পদ্মা এই মেঘনা), নিজের স্মৃতি জাগানিয়া তোমরা ভুলে গেছো মল্লিকাদের নাম) গানগুলো দেশের মাটির গন্ধ পাওয়া যেত। মাটি ও মানুষের বাংলার প্রকৃতি ও নৈসর্গের সুনিপুণ চিত্র তার গানে ছিল সর্বত্র প্রাণবন্ত। নিজের জীবন সাধনাকে তার শিল্পী সত্তার সঙ্গে একাত্ম করে উজাড় করে দিয়েই তিনি চলে গেলেন।
আমি জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত ছিলাম। যদিও ২০০০ সালে দেশে ফিরে আসি, তার আগে জাপান সরকারের সঙ্গে যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, সে সুবাদে ২০০১ সালের আগস্টজুড়ে ‘ফরিদা পারভীন প্রজেক্ট কমিটি’র আওতায় তিনি জাপানের বিভিন্ন শহরে, বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে লালন শাহর গানকে পরিচয় করিয়েছেন। ২০০৮ সালে তিনি সেরা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে জাপানে ১৯তম ‘আর্টস অ্যান্ড কালচার প্রাইজ’-এ ভূষিত হয়েছিলেন। সাইটেশনে উল্লেখ করা হয়েছিল Mrs. Farida Parveen is one of the most prestigious singers in Bangladesh. With a solid foundation in Indian classical music, she has rendered remarkable services to raise the artistic status of traditional Bangladeshi religious music, Baul song and to have it listed as one of UNESCO’s Masterpieces of the Oral and Intangible Heritage of Humanity. Her contribution to raising the standing of Baul song and to promoting it internationally has been immense. Her contribution to raising the status of Baul song and to its international promotion has been immense and therefore, she is truly worthy of the Arts and Culture Prize of the Fukuoka Prize.
কুষ্টিয়া থেকে তিনি আমাদের ডাকছেন ও পাখিরে ...
লেখক: স্মৃতিকাতর কলাম