ঢাকা ৩ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
নারী থাকুক নিরাপদে... মৌলভীবাজারে তারেক রহমানের জনসভায় চিরচেনা বিলবোর্ড-ব্যানারের অনুপস্থিতি টুকটুক ও চিকু পাঠ থেকে ২টি অনুশীলনীর প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, পঞ্চম শ্রেণির বাংলা মেসির হ্যাটট্রি গোলে আর্জেন্টিনার জয়, হিলিতে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ‘আমরা সবচেয়ে বিখ্যাত জুটি’, মোদিকে জর্জিয়া মেলোনি সিলেটে একদিনে হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু নাটোরে বলাৎকার মামলায় ২ জন কারাগারে ডলার স্থিতিশীল, বেড়েছে ইউরো ও পাউন্ডের দাম চাঁদপুরে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস রাসুল (সা.)-এর চুল সাদা হলেও যেমন দেখাত ১৯৭৮ সালে এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট বাবা, ৪৮ বছর পর একই মাঠে প্রধানমন্ত্রী ছেলে লক্ষ্মীপুরে স্কুলছাত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয় ভাঙচুর সিলেটে বৃষ্টিতে ভিজে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানালেন চা শ্রমিকরা ‘সমর্থকরা আর্জেন্টিনার এই দলকে নিয়ে পাগল’, ইতিহাস গড়ার পর মেসি সিলেট পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী ইরানি কৌশলেই উপসাগর থেকে গোপনে তেল সরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে ইতিহাস বদলানোর হুঙ্কার টমাস টুখেলের ঘণ্টায় ১০ লাখ ডলার খরচ করলেও ১১৪ বছরে শেষ হবে না মাস্কের সম্পদ প্রধানমন্ত্রীকে বরণে প্রস্তুত মৌলভীবাজারবাসী রংপুরে আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান ভুট্টু গ্রেপ্তার আজকের আবহাওয়ার পূর্বাভাস কচুয়া উপজেলা বিএনপি সভাপতির হুমকি, ‘সাংবাদিকতা ছুটিয়ে দেব’ ৬০ বছরের অপেক্ষা বনাম ক্রোয়াট ধারাবাহিকতা নওগাঁ সীমান্তে স্থানীয়দের হাতে আটক সন্দেহভাজন ব্যক্তি সিলেট নগরীর ৪টি পয়েন্টে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবে বিএনপি জাহাঙ্গীরনগরে অভিযুক্ত শিক্ষকদের দায়মুক্তির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, পুনঃতদন্তের দাবি লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিকে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয় প্রকল্পের অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা শাহরাস্তিতে নারীর পেট থেকে ৩ কেজি ওজনের টিউমার অপসারণ সিরাজগঞ্জে ট্রাকচাপায় ট্রাফিক পুলিশ নিহত
Nagad desktop

সেনাবাহিনীকে নয়, অপরাধীকে দায়ী করুন

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:০৮ পিএম
সেনাবাহিনীকে নয়, অপরাধীকে দায়ী করুন
ড. মো. মিজানুর রহমান

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেবল একটি সামরিক সংগঠন নয়, এটি জাতির অস্তিত্ব, মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। স্বাধীনতার রক্তাক্ত সংগ্রাম থেকে জন্ম নেওয়া এই বাহিনী আজ দেশের সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ, জাতীয় ঐক্যের প্রতিচ্ছবি এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গর্বের পতাকা বহনকারী শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের সময় এক দল তরুণ মুক্তিকামী বাঙালি যখন অস্ত্র হাতে নিয়েছিল, তখন থেকেই সেনাবাহিনীর জন্ম হয়েছিল এক অনন্য আদর্শ-দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও নৈতিকতার মিশ্রণে। তাদের এই মর্যাদা কেবল সামরিক দক্ষতা বা অস্ত্রশক্তির কারণে নয়, বরং তা এসেছে নৈতিকতার দৃঢ় মেরুদণ্ড থেকে। 

আজ পাঁচ দশক পরেও সেই চেতনা অম্লান। রাষ্ট্র যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত, তখন প্রথম এগিয়ে আসেন সেনাসদস্যরা। যখন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ে, তখনও এই বাহিনীরই বীর সন্তানরা বিশ্বে শান্তি স্থাপনে আত্মনিয়োগ করে। আর যখন দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দেখা দেয়, তখন জনগণের আস্থা ফিরে আসে এই বাহিনীর দিকেই। 

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ, রাজনীতি ও প্রযুক্তির পরিবর্তনে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। গুজব, বিভ্রান্তি, ব্যক্তিগত স্বার্থ বা অল্পসংখ্যক সদস্যের অনৈতিক কর্মকাণ্ড- এগুলো যদি প্রশ্রয় পায়, তাহলে পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে সেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে আরও দৃঢ়ভাবে পুনর্জাগরিত করা- যেখানে প্রত্যেক সদস্য বলবে, ‘অপরাধীকে দায়ী করুন, সেনাবাহিনীকে নয়।’

ইতিহাসে দেখা গেছে, যখন কোনো বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নৈতিক দুর্বলতা প্রবেশ করে, তখন বাহ্যিক শক্তি যতই থাকুক না কেন, সেই প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক বাহিনীর মধ্যে দুর্নীতি, দলবাজি বা স্বজনপ্রীতির কারণে কত মহৎ প্রতিষ্ঠানও ধ্বংস হয়েছে-এমন উদাহরণ অজস্র। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য এই শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা শুধু একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং দেশের জনগণের সর্বোচ্চ আস্থার প্রতীক। এই আস্থা শুধু অস্ত্রের জোরে নয়, এটি জন্ম নিয়েছে শৃঙ্খলা, সততা ও নিঃস্বার্থ সেবার ঐতিহ্য থেকে। 

অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, যখন সামরিক বাহিনী জনগণের সঙ্গে সংযোগ হারায়, তখন সেই বাহিনী ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত সেই ভুল পথে যায়নি- তারা দুর্যোগে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে, দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে, অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করেছে। কিন্তু এই ধারাবাহিক ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের মাঝেও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা সামাজিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সামনে তাই আজ দুটি কাজ সমানভাবে জরুরি- একদিকে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসের বন্ধন আরও দৃঢ় করা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণভাবে শৃঙ্খলা ও নৈতিক মূল্যবোধের কঠোর অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া। এই দুই দিক সমানভাবে শক্তিশালী থাকলে কোনো প্রোপাগান্ডা বা গুজবই তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারবে না। কারণ, জনগণের ভালোবাসাই সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা। এই ভালোবাসা একদিনে অর্জিত হয়নি- এটি এসেছে দীর্ঘ ত্যাগ, সততা ও নিঃস্বার্থ সেবার মাধ্যমে। এখন দায়িত্ব সেই আস্থাকে অটুট রাখা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও একইভাবে গর্ব করে বলতে পারে- বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, তারা অপরাধকে না বলে, তারা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়।

সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিচারব্যবস্থা, যা সামরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি জরিমানা, পদহ্রাস, সাময়িক বহিষ্কার বা গুরুতর ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বহিষ্কার বা কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। কোর্ট মার্শাল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও নিয়মনীতি বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। তবে নৈতিকতা কেবল শাস্তির ভয় দিয়ে টিকিয়ে রাখা যায় না। এটি গড়ে তুলতে হয় শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং উদাহরণের মাধ্যমে। এজন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ, চরিত্র গঠন ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। একজন অফিসার বা সৈনিককে শেখানো হয়, ‘অস্ত্র তোমাকে শক্তি দেয়, কিন্তু নৈতিকতা তোমাকে সম্মান দেয়।’

এ কারণে সেনাবাহিনীতে নৈতিকতা কেবল ব্যক্তিগত মূল্যবোধ নয়, এটি প্রাতিষ্ঠানিক বেঁচে থাকার শর্ত। বাহিনীর সুনাম, কার্যকারিতা, এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি- সবকিছুই এর সঙ্গে সম্পর্কিত। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীর্ঘকালীন সফলতা এসেছে এই নৈতিক সংস্কৃতি থেকেই। যেখানে অনেক দেশের সৈন্য দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা অসদাচরণের অভিযোগে বিতর্কে জড়িয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের সেনারা সব সময় পেশাদারত্ব ও সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

বিশ্বের ইতিহাসে দেখা গেছে, যেসব দেশে সেনাবাহিনী রাজনীতিতে অতিমাত্রায় জড়িয়ে পড়েছে, সেখানে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও বাহিনীর ভাবমূর্তি- দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাকিস্তান, মায়ানমার কিংবা আফ্রিকার কিছু রাষ্ট্র এর উদাহরণ। সেখানে রাজনীতি সেনাবাহিনীর মধ্যে দলীয় বিভাজন এনেছে, আর সেনাবাহিনী রাজনীতির খেলায় জড়িয়ে পড়েছে নিজের অজান্তেই। ফলাফল- প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার অবক্ষয় ও জনগণের আস্থাহানি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত এই বিপজ্জনক পথ থেকে দূরে থেকেছে, যা একটি বড় সাফল্য। 

আজকের যুগে রাজনীতি ও প্রশাসনের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা বেড়েছে। সেনাবাহিনীর অনেক অবসরপ্রাপ্ত সদস্য এখন বেসামরিক প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য বা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, যা এক অর্থে স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার, কিন্তু অপরদিকে এটি সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তিতে সূক্ষ্ম প্রভাব ফেলতে পারে। জনগণ প্রায়ই সক্রিয় বা অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যদের বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডকে বাহিনীর অফিশিয়াল অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। এই বিভ্রান্তি দূর করতে সেনাবাহিনীর উচিত আরও স্পষ্ট যোগাযোগ নীতি গ্রহণ করা- যেখানে বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত মতের মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য থাকবে।
এ ছাড়া, দেশের রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতি ঝুঁকে পড়া- যদি বাহিনীর কিছু সদস্যের মধ্যেও দেখা দেয়, তাহলে সেটি বাহিনীর পেশাদারত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি। একইভাবে, অর্থনৈতিক প্রভাব ও করপোরেট অংশগ্রহণের বিষয়টিও এখন আলোচনায় আসে। একজন পেশাদার সৈনিক রাজনীতির দিকে তাকায় না, সে তাকায় তার দায়িত্ব, কর্তব্য এবং জাতির সম্মানের দিকে। রাজনীতি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু দেশপ্রেম ও পেশাদারত্ব স্থায়ী। এই নীতি অনুসরণ করেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা কুড়িয়েছে, বিশেষ করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে, যেখানে নিরপেক্ষতা ও নৈতিকতা হলো মূল মাপকাঠি।

রাজনীতি ও ক্ষমতার প্রলোভন প্রতিটি সমাজেই থাকে। কিন্তু যে বাহিনী এই প্রলোভনকে অগ্রাহ্য করে, সেই বাহিনীই টিকে থাকে ইতিহাসে সম্মানের সঙ্গে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী আজ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা এসেছে দীর্ঘদিনের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক প্রশিক্ষণের ফলে। এই অবস্থান অটুট রাখতে হলে বাহিনীর ভেতরে ‘রাজনীতির প্রতি নিরপেক্ষতা’কে একটি সাংস্কৃতিক নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ শুধু দেশের সীমান্তরক্ষী নয়, তারা পৃথিবীর শান্তিরক্ষী। জাতিসংঘের নীল পতাকার নিচে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈন্যরা যে সম্মান অর্জন করেছে, তা কেবল সামরিক সাফল্য নয়, এটি এক অনন্য মানবিক ইতিহাস। ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা অভিযানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রথম অংশ নেওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাহিনীটি ৪০টিরও বেশি দেশে ৫৫টিরও বেশি শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিভিন্ন দেশে কর্মরত, যার মধ্যে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্য ছাড়াও নারী শান্তিরক্ষীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় বিশ্বের শীর্ষ তিন অবদানকারী দেশের একটি, যা একদিকে জাতির জন্য গর্ব, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর পেশাদারত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর পেশাদারত্ব ও শৃঙ্খলা, মানবিক সংবেদনশীলতা এবং নৈতিক নিরপেক্ষতা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডে বিশেষভাবে প্রশংসিত। কিন্তু এই গৌরব অর্জনের পথ একেবারে সহজ ছিল না। ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বহু বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী জীবন উৎসর্গ করেছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৮০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ দিয়েছেন। তারা রক্ত দিয়ে লিখেছেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদার ইতিহাস। এই আত্মত্যাগ শুধু সংখ্যায় পরিমাপযোগ্য নয়। শান্তিরক্ষীরা বিদেশে কর্মরত থেকে পরিবার ও দেশের অর্থনীতিতে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে, যা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব একাধিকবার বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন, বিশেষত নারী শান্তিরক্ষীদের ভূমিকার জন্য। ২০২৩ সালে জাতিসংঘের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ নারী শান্তিরক্ষায় বৈশ্বিক নেতৃত্বের উদাহরণ।’

এক কথায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ যে মর্যাদা ও বিশ্বাসের অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, তার মূল কারণ তাদের অভ্যন্তরীণ নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা। অপরাধ ও দুর্নীতিকে ‘না’ বলা কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি সেনাবাহিনীর আত্মপরিচয়ের অংশ। এই চেতনাই বাহিনীকে অনন্য করে তুলেছে দেশের ভেতরেও, আন্তর্জাতিক পরিসরেও। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতীয় নিরাপত্তা ও নৈতিকতা, ভাবমূর্তির আন্তর্জাতিক প্রতিফলন, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ এবং প্রযুক্তি ও তথ্যযুদ্ধ, প্রতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও তথ্য নিরপেক্ষতার ভারসাম্য বজায় রেখেছে সামরিক শক্তি ও নৈতিক শক্তির মধ্যকার সঠিক সমন্বয়ে।

কোনো পেশাদার বাহিনীর ভেতরে যদি কিছু সদস্য লোভ, ক্ষমতা বা প্রভাবের প্রলোভনে নীতিভ্রষ্ট হয়, তবে তা শুধু একটি ব্যক্তির নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত করে। গণমাধ্যম বা সামাজিক প্ল্যাটফর্মে একটি অপরাধের খবর, সেটি যত ক্ষুদ্রই হোক, বহুগুণে ছড়িয়ে পড়ে। তখন সাধারণ মানুষ বাহিনীর নৈতিকতার ওপর প্রশ্ন তোলে- যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য সৎ ও নিষ্ঠাবান। তবে এর দায় কেবল বাহিনীর নয়; নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়িত্বশীল অংশকেও সমানভাবে সচেতন হতে হবে। গুজব ও প্রোপাগান্ডার যুগে তথ্য যাচাই না করে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মন্তব্য করা কেবল একটি বাহিনী নয়, পুরো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোকেই দুর্বল করে।

বাংলাদেশে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের শাসনামলে এবং সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে উচ্চপদস্থ কিছু সেনা কর্মকর্তাদের নামে যে “‘আয়নাঘর, গুম-খুন’ বা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট” ইত্যাদি ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো নিয়ে প্রায়ই সেনাবাহিনীকে সরাসরি যুক্ত করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। তবে বাস্তবতা হলো, এই ধরনের কার্যক্রমে যারা জড়িত, তারা মূলত ব্যক্তিগত লোভ, লালসা বা সরকারের চাপে বাধ্য হয়ে এমন কাজ করেছে। এটি কোনোভাবেই পুরো সেনাবাহিনী বা তার নীতি ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

সেনাবাহিনী দেশের আইন ও সংবিধানের প্রতি অঙ্গীভূত এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে অনিয়ম বা অপরাধমূলক কার্যক্রমে যুক্ত হয় না। তাই এই ধরনের ঘটনাগুলোকে পুরো সেনাবাহিনীর নামে প্রচার করা তথ্যবহুল নয় এবং বিভ্রান্তিকর। বাস্তবধর্মী মূল্যায়ন নির্দেশ করে যে, এ ধরনের অপরাধ মূলত ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও নৈতিক পতনের ফল, যা রাষ্ট্রীয় আইন এবং বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কঠোর শৃঙ্খলা, সংবিধানমুক্ত কার্যক্রম এবং দেশপ্রেমের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তিগত কর্মকর্তা বা সাবেক কর্মকর্তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পুরো সেনাবাহিনীর সঙ্গে মেলানো ভিত্তিহীন এবং প্রকৃত সত্যের বিপরীত।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেবল একটি সামরিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি জাতির নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার প্রতীক। ‘সেনাবাহিনীকে নয়, বরং অপরাধীকে দায়ী করুন’ নীতি এই প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি। এই প্রবাদবাক্য কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি সেনাবাহিনীর নৈতিক চেতনা, শৃঙ্খলা এবং পেশাদারত্বের প্রতিফলন। প্রতিটি সদস্যের হৃদয়ে এই নীতি বাস্তবায়নই বাহিনীর শক্তি, জনগণের আস্থা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

কুষ্টিয়াতে স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী আব্দুল জলিল

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম
কুষ্টিয়াতে স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী আব্দুল জলিল
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল

দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের স্মৃতিকে গৌরবোজ্জ্বলভাবে ধারণ করে আছে বাংলা ভূখণ্ড। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমল হয়ে আজকের বাংলাদেশ। শাসক বদলেছে, মানচিত্র বদলেছে, পতাকা বদলেছে, বদলে গেছে দেশের নামও। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের কাঙ্ক্ষিত মুক্তি আসেনি। মুক্তির লড়াইয়ের বাঁকে বাঁকে স্বল্পসংখ্যক মানুষ তাদের মেধা, শ্রম, প্রজ্ঞা ও সংগ্রাম দিয়ে একটি পথরেখা আঁকতে পেরেছেন। তাদের মধ্যে এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান অ্যাডভোকেট আব্দুল জলিল একজন। ৬০ দশকের ঐতিহাসিক শিক্ষা আন্দোলন, স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা সংগঠন নিউক্লিয়াস, ৬ দফা-১১ দফা, গণ-অভ্যুত্থান, স্বাধীন বাংলার পতাকা ও মুক্তিযুদ্ধ–প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে রয়েছে ছাত্রলীগের অগ্রসর অংশের নেতা যারা ছিলেন নিউক্লিয়াসপন্থি তাদেরই একজন কুষ্টিয়ার স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী আব্দুল জলিল। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে গণআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দেশ চলতে আবারও প্রতিরোধ লড়াইয়ে আমরা দেখতে পায় আব্দুল জলিল, শহীদ মারফত আলী ও শামসুল হাদীকে। সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদবিরোধী লড়াই, সর্বোপরি সমাজ প্রগতি তথা সমাজতন্ত্রের লড়াইয়ে আমরা পেয়েছি তাকে। এই মহান নেতার দ্বিতীয়তম মৃত্যুবার্ষিকতে গভীর শ্রদ্ধা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল

বৃহত্তর কুষ্টিয়ার মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল। বীর মুক্তিযুদ্ধা আব্দুল জলিল ১৯৪৬ সালের ১৩ এপ্রিল কুষ্টিয়া শহরের কুঠিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন, পিতা-মৃত শেখ কলিমউদ্দিন, মাতা-মৃত নুরুন নাহার বেগম। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কুষ্টিয়া হাটসহরিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, মাধ্যমিক পড়াশোনা কুষ্টিয়া ইউনাইটেড মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১৯৬৬ সালে ম্যাট্রিক পাস করে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হন। স্কুলজীবন থেকেই তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন, ১৯৬৭ সালে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন তিনি প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলে তিনি সভাপতি ও শামসুল হাদী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর ভেতরে ১৯৬৬ সালে ৬ দফার পক্ষে আন্দোলন, ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা, ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যহার ও বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবসহ সব নেতার মুক্তি লাভ। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে বৃহত্তর কুষ্টিয়ার সব আসনে ছাত্রলীগের অগ্র সৈনিক হিসেবে মাঠে-ময়দানে কাজ করেন আব্দুল জলিল, শামসুল হাদী ও মারফত আলীর নেতৃত্বে মুল দল আওয়ামী লীগ পিছিয়ে থাকলেও ছাত্রলীগ ছিল অগ্রগামী। সারা দেশের ন্যায় কুষ্টিয়ার সব কটি আসনে আওয়ামী লীগ ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে বিজয় লাভ করে। ১৯৭১ সালে মার্চের আন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ের দোলায় দুলতে থাকে সারা দেশ, ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বটতলায় ডাকসুর ভিপি আ স ম আবদুর রব স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশ্তেহার পাঠ করেন তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ, একই ম সারা দেশে পতাকা উত্তোলন করা হয়। সে অনুযায়ী কুষ্টিয়া ইউনাইটেড মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল জলিল, দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন সাধারণ সম্পাদক শামসুল হাদী ও মার্চ পাস করে পতাকাকে স্যালুট দেন মারফত আলী। সে দিন জাতীয় সংগীত বাজানো হয় ‘আমার সোনার বাংলা’, ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে স্বাধীনতাকামী অগ্রগামী একটি গ্রুফ ১৯৬২ সাল থেকে তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদের নেতৃত্বে গোপনে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। তার সঙ্গে যুক্ত ছিল আব্দুল জলিল, মারফত আলী, আবদুল মোমেন ও শামসুল হাদী। গোপনে তারা সামরিক টেনিং নিয়েছিলেন।

 

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজ মাঠে কুষ্টিয়ায় স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল জলিল ছবিঋণ. আলোকচিত্রী আব্দুল হামিদ রায়হান
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজ মাঠে
কুষ্টিয়ায় স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল জলিল
ছবিঋণ. আলোকচিত্রী আব্দুল হামিদ রায়হান


১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে অন্ধকারে ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে গণহত্যা শুরু হলে তিনিসহ সহযোদ্ধাদের নিয়ে হেঁটে দর্শনা দিয়ে পার হয়ে ভারতে মজিব বাহিনি বা নিউক্লিয়াসের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভারতের চাকুলিয়া ক্যাম্পে প্রথম ব্যাচে টেনিং নিয়ে দেশের ভেতর প্রবেশ করেন। তিনি ও শামসুল হাদী এফএফ-এর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কুষ্টিয়ার বিএলএফ-এর কমান্ডার জিয়াউল বারী নোমান ও উপ-প্রধান মারফত আলী সঙ্গে সমন্বয় করেন যেন নিজেদের ভেতর ভুল বোঝাবুঝি না হয় এবং প্রতিরোধযুদ্ধ তীব্রভাবে চালিয়ে দুর্বার আক্রমণ শুরু করেন। তিনি ভারতের ট্রেনিং শেষে বাংলাদেশ প্রবেশের সঙ্গেই পাকিস্তান আর্মির সঙ্গে দর্শনা দামুড়হুদা মাঠে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। এখানে অনেক আর্মি মারা যান। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও শহিদ হন। তিনি কুষ্টিয়ার বংশীতলা যুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে লড়াই করেন। মিরপুর কাকিলাদহ যুদ্ধ, নওদাপাড়া যুদ্ধ, কুষ্টিয়া চৌড়হাঁস যুদ্ধ, আলমডাঙা যুদ্ধসহ অসংখ্য যুদ্ধে সবাইকে নিয়ে সম্মুখসারীতে যুদ্ধ করেন এবং প্রতিটি যুদ্ধে বিজয় লাভ করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সদ্য জন্মানো দেশের শাসনব্যবস্থা ও আইন কাঠামোর পরিবর্তন না হওয়ায় মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু তরুণ-তরুণীর অস্ত্রহাতে বিজয়ীর বেশে সমাজ পরিবর্তন ও লক্ষ্য পূরণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেদিনের মুক্তিযুদ্ধাদের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে মুক্তিযোদ্ধারা আবারও চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য লড়াকু তরুণ-তরুণীরা নতুন স্বপ্ন দেখেন এবং নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ গঠিত হয়। বীর মুক্তিযুদ্ধা আব্দুল জলিল, মারফত আলী ও শামসুল হাদীসহ বৃহত্তর কুষ্টিয়ার প্রথম সারির প্রায় সব মুক্তিযোদ্ধাই জাসদ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তিনি ৮০-এর দশক পর্যন্ত জাসদ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আইন পেশায় নিজেকে মনোনিবেশ করেন এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন। ২০২৪ সালে মৃত্যু পর্যন্ত নিজ পেশায় তিনি সুনামের সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করেছেন।

দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের স্মৃতিকে গৌরবোজ্জ্বলভাবে ধারণ করে আছে বাংলা ভূখণ্ড। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমল হয়ে আজকের বাংলাদেশ। শাসক বদলেছে, মানচিত্র বদলেছে, পতাকা বদলেছে, বদলে গেছে দেশের নামও। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের কাঙ্ক্ষিত মুক্তি আসেনি। মুক্তির লড়াইয়ের বাঁকে বাঁকে স্বল্পসংখ্যক মানুষ তাদের মেধা, শ্রম, প্রজ্ঞা ও সংগ্রাম দিয়ে একটি পথরেখা আঁকতে পেরেছেন। তাদের মধ্যে এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান অ্যাডভোকেট আব্দুল জলিল একজন। ৬০ দশকের ঐতিহাসিক শিক্ষা আন্দোলন, স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা সংগঠন নিউক্লিয়াস, ৬ দফা-১১ দফা, গণ-অভ্যুত্থান, স্বাধীন বাংলার পতাকা ও মুক্তিযুদ্ধ–প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে রয়েছে ছাত্রলীগের অগ্রসর অংশের নেতা যারা ছিলেন নিউক্লিয়াসপন্থি তাদেরই একজন কুষ্টিয়ার স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী আব্দুল জলিল। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে গণআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দেশ চলতে আবারও প্রতিরোধ লড়াইয়ে আমরা দেখতে পায় আব্দুল জলিল, শহীদ মারফত আলী ও শামসুল হাদীকে। সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদবিরোধী লড়াই, সর্বোপরি সমাজ প্রগতি তথা সমাজতন্ত্রের লড়াইয়ে আমরা পেয়েছি তাকে। এই মহান নেতার দ্বিতীয়তম মৃত্যুবার্ষিকতে গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক: রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক ব্যক্তিত্ব

কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনই হোক অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তি

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম
কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনই হোক অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তি
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশের (Demographic dividend) সবচেয়ে সুবিধাজনক সময় প্রায় শেষের দিকে। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিকরণ’ শীর্ষক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ উদ্যোগ তাই শুধু একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী করার বড় রাজনৈতিক ও নীতিগত বার্তা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোতে স্নাতক পর্যায়ে আইসিটি কোর্স পড়ানোর জন্য ১২ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও দক্ষতা-ভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার কথা বলেছে। স্নাতক পর্যায়ে আইসিটি কোর্স বাধ্যতামূলক করা, তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি এবং কর্মমুখী শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এগুলো সময়োপযোগী উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বড় ব্যবস্থায় এ উদ্যোগ কত দ্রুত, কত গভীরভাবে এবং কতটা ফলপ্রসূভাবে পৌঁছাবে?

বাংলাদেশ এখন জনমিতিক লভ্যাংশের শেষ বা পরিণত পর্যায়ে আছে। সুযোগ এখনো শেষ হয়নি। তবে সেটি দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ কর্মশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারলে এই সুবিধা বেকারত্ব, হতাশা ও সামাজিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এ উদ্যোগকে শুধু পাঠ্যক্রম সংশোধনের বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না। একে উচ্চশিক্ষা সংস্কার, কর্মসংস্থান কৌশল এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

সমস্যাটি গভীর। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-অধিভুক্ত কলেজগুলোর পাঠ্যক্রমকে শ্রমবাজারের চাহিদা থেকে অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন বলা হয়েছে। পাঠ্যক্রম অনেকাংশে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত। স্থানীয় শ্রমবাজার, নিয়োগদাতা, শিল্প খাত ও পেশাজীবী সংগঠনের মতামত নিয়মিতভাবে পাঠ্যক্রমে প্রতিফলিত হয় না। অনেক বিষয় এখনো পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও তত্ত্বনির্ভর। ব্যবহারিক কাজ, ল্যাব, প্রজেক্ট, ইন্টার্নশিপ, সমস্যা সমাধান, দলীয় কাজ এবং পেশাগত যোগাযোগের সুযোগ সীমিত। ফলে শিক্ষার্থী ডিগ্রি পেলেও কাজের পরিবেশে নিজেকে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে না।

এই দুর্বলতার সঙ্গে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও যুক্ত। বহু কলেজে আইসিটি ল্যাব, বিজ্ঞান ল্যাব, লাইব্রেরি, জার্নাল, অডিও-ভিজ্যুয়াল সুবিধা ও ডিজিটাল শেখার পরিবেশ পর্যাপ্ত নয়। যেখানে কিছু সুবিধা আছে, সেখানেও তা শিক্ষণ-পদ্ধতির সঙ্গে সব সময় যুক্ত হয় না। ২০১৭ সালের কলেজ গ্র্যাজুয়েট ট্রেসার স্টাডি দেখায়, গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার তিন থেকে চার বছর পরও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-অধিভুক্ত কলেজের গ্র্যাজুয়েটদের মাত্র ১৯ শতাংশ কর্মরত ছিল। ৪৬ শতাংশ ছিল বেকার। ৩৪ শতাংশ আরও পড়াশোনায় ছিল। অর্থাৎ ডিগ্রি আছে, কিন্তু কাজের বাজারে প্রবেশ কঠিন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কৌশলগত দুর্বলতাও বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের বড় অংশ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাধারণ কলেজ থেকে আসে। অনেকের ইংরেজি, যোগাযোগ দক্ষতা, ডিজিটাল দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, নেটওয়ার্কিং এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনা দুর্বল। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি প্রক্রিয়া, ক্যাম্পাস-ভিত্তিক একাডেমিক পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী যোগাযোগ, অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুবিধা পায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে চাকরির পরীক্ষা, সাক্ষাৎকার, কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ এবং পেশাগত আত্মপ্রকাশে তারা পিছিয়ে পড়ে।

তবে এ দুর্বলতার ভেতরেই বড় সম্ভাবনা আছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় এর শিক্ষার্থী আছে। এই নেটওয়ার্ককে দক্ষতা উন্নয়ন, স্থানীয় অর্থনীতি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, ডিজিটাল কাজ এবং সরকারি-বেসরকারি সেবার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে বড় পরিবর্তন সম্ভব। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পাঠ্যক্রম পরিবর্তন লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কার নয়; এটি জাতীয় উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রকল্প।

সংস্কারের শুরু হতে হবে সাধারণ অনার্স ও ডিগ্রি কোর্সের ভেতর থেকে। আইসিটি কোর্স বাধ্যতামূলক করা ভালো উদ্যোগ। তবে শুধু একটি আলাদা কোর্স যোগ করলেই হবে না। বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, সব বিষয়ের সঙ্গে কাজের দক্ষতা যুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীকে ডেটা ব্যবহার, যোগাযোগ, ইংরেজি, সমস্যা সমাধান, রিপোর্ট লেখা, ডিজিটাল টুল, উপস্থাপনা এবং নৈতিকতার চর্চা শেখাতে হবে। দক্ষতা যেন সিলেবাসের প্রান্তে না থাকে; মূল শিক্ষার ভেতরেই ঢুকে পড়ে।

শ্রেণিকক্ষকে কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করাও জরুরি। প্রতিটি অনার্স শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত তিন মাসের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালু করা যেতে পারে। সরকারি অফিস, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, এনজিও, গণমাধ্যম, আইটি প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্রশিল্প, কৃষি উদ্যোগ বা স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সবই হতে পারে শিক্ষার্থীর শেখার ক্ষেত্র। ইন্টার্নশিপকে নম্বর ও ক্রেডিটের সঙ্গে যুক্ত করলে কলেজ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, তিন পক্ষই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবে।

শিক্ষার্থীদের কৌশলগত দুর্বলতা কাটাতে আলাদা ‘ফাউন্ডেশন স্কিল প্যাকেজ’ দরকার। প্রথম বর্ষ থেকেই ইংরেজি যোগাযোগ, বাংলা ও ইংরেজি রিপোর্ট লেখা, কম্পিউটার ব্যবহার, ডেটা বিশ্লেষণ, প্রেজেন্টেশন, চাকরির প্রস্তুতি এবং পেশাগত আচরণ শেখাতে হবে। শেষ বর্ষে থাকতে পারে ‘জব রেডিনেস সেমিস্টার’। সেখানে সিভি লেখা, সাক্ষাৎকার, গ্রুপ ডিসকাশন, সরকারি ও বেসরকারি চাকরির প্রস্তুতি এবং ফ্রিল্যান্সিং বা অনলাইন কাজের বাস্তব প্রশিক্ষণ থাকবে।

কলেজগুলোকে শুধু পরীক্ষা নেওয়ার কেন্দ্র হিসেবে রাখলে চলবে না। প্রতিটি কলেজে কার্যকর ক্যারিয়ার সেল থাকতে হবে। সেখানে চাকরির তথ্য, সিভি লেখা, সাক্ষাৎকার প্রস্তুতি, উদ্যোক্তা সহায়তা, অনলাইন কাজের প্রশিক্ষণ এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং থাকবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ডিজিটাল জব-ম্যাচিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে। শিক্ষার্থীর দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, ভাষা জ্ঞান ও কাজের আগ্রহের তথ্য সেখানে থাকবে। নিয়োগদাতারাও সেখান থেকে প্রার্থী খুঁজে নিতে পারবেন।

এ পরিবর্তনের প্রাণ হবেন শিক্ষকরা। ১২ হাজার শিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশিক্ষণের লক্ষ্য হতে হবে শ্রেণিকক্ষ বদলে দেওয়া। শিক্ষককে কেস স্টাডি, প্রজেক্ট, দলীয় কাজ, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং সমস্যাভিত্তিক শিক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষক কীভাবে পাঠদান বদলালেন, সেটিও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।

সংস্কারের সাফল্য মাপার জন্য তথ্য দরকার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতি বছর গ্র্যাজুয়েট ট্রেসার স্টাডি করতে হবে। কোন বিষয়ের কত শতাংশ শিক্ষার্থী চাকরি পেয়েছে, কতজন বেকার, কতজন উদ্যোক্তা হয়েছে, কতজন সরকারি চাকরিতে গেছে, কতজন বিদেশে কাজ পেয়েছে, এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনও নির্বাচিত প্রার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করলে উচ্চশিক্ষার বাস্তব ফলাফল বোঝা সহজ হবে।

নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার পূর্ণতা পাবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক নারী শিক্ষার্থী সামাজিক বাধা, নিরাপত্তা, যাতায়াত এবং পারিবারিক সীমাবদ্ধতার কারণে শ্রমবাজারে ঢুকতে পারেন না। তাদের জন্য নিরাপদ ইন্টার্নশিপ, অনলাইন কাজের সুযোগ, স্থানীয় উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ এবং কর্মক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশ দরকার।

উদ্যোক্তা তৈরির কথাও বাস্তব সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শুধু তরুণদের উদ্যোক্তা হতে বলা যথেষ্ট নয়। কলেজভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্ভাবন তহবিল, স্থানীয় ব্যবসা পরামর্শক, হিসাবরক্ষণ সহায়তা, ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণ এবং ব্যাংক ঋণের সঙ্গে সংযোগ দরকার। এতে চাকরিপ্রার্থী তৈরির পাশাপাশি চাকরিদাতাও তৈরি হবে।

বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে, যেখানে ডিগ্রির সংখ্যা নয়, দক্ষ মানুষের সংখ্যা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার তাই শুধু শিক্ষা সংস্কার নয়; এটি কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক স্থিতির প্রশ্ন। জনমিতিক লভ্যাংশের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিন্তু দরজাটি ধীরে ধীরে সরু হচ্ছে। দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও কর্মমুখী সংস্কার করলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ই হতে পারে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রধান শক্তি।

লেখক: সিনিয়র ফ্রীল্যান্স সাংবাদিক

শ্রমিকদের ‘চাকরি’ স্থায়ী করুন

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৯:২৪ পিএম
শ্রমিকদের ‘চাকরি’ স্থায়ী করুন
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখতে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মাস্টারোল ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক কর্মচারীরা। প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে যারা শ্রম দিচ্ছেন সেই শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবন অনিশ্চিত।  রাষ্ট্রের সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার পরও এই বিশাল কর্মজীবী জনগোষ্ঠী আজও চাকরির স্থায়িত্ব, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মৌলিক শ্রম অধিকার থেকে বঞ্চিত।

সম্প্রতি প্রণীত ‘দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিক নিয়োজিতকরণ নীতিমালা, ২০২৫’ এবং আউটসোর্সিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এ কর্মীদের ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান এবং মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থি। এটা বঞ্চিত মানুষদের অধিকারকে আরও বেশি সংকুচিত করে ফেলেছে। একে আর যাই বলা হোক, কোনো কল্যাণকামী রাষ্ট্রের নীতি বলা চলে না। এটি আসলে নীতিমালার মোড়কে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈধ শোষণ। যা ‘নো-ওয়ার্ক, নো-পে’র নামে তাদের শোষণ করা হচ্ছে।

লম্বা সময় ধরে একটা মানুষ রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কাজ করছেন, টেবিলটা একই আছে, তার খাটুনিও কমেনি। অথচ দুই দশক পরেও খাতাকলমে তার পরিচয় তিনি স্রেফ একজন ‘অস্থায়ী’ দিনমজুর। একই দপ্তরে, পাশাপাশি দুটো টেবিলে বসে দুজন মানুষ বছরের পর বছর প্রায় একই কাজ করে যাচ্ছেন। মাসের শেষে একজন পাচ্ছেন সুনির্দিষ্ট বেতন, উৎসব ভাতা, চিকিৎসার নিশ্চয়তা এবং অবসরের পর পেনশনের সুরক্ষাজাল। আর অন্যজন? তিনি প্রতিদিন সকালে ডেস্কে বসেন এক বুক অনিশ্চয়তা নিয়ে–আজ কাজ শেষে হাজিরা খাতাটা সই হবে তো? মাস শেষে কি ঠিকমতো দিনমজুরিটা মিলবে? এই দ্বিতীয় মানুষটি কোনো বেসরকারি কারখানার শ্রমিক নন; তিনি আমাদের ডাক বিভাগ, রেলওয়ে, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন কিংবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানেরই একজন ‘মাস্টাররোল’ বা ‘দৈনিক মজুরিভিত্তিক’ কর্মচারী-শ্রমিক।

আজ কাজ আছে তো টাকা আছে, কাল শরীর খারাপ হলে ঘরে চুলা জ্বলবে না। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের আনাচে-কানাচে প্রতিদিন এমন হাজার হাজার মানুষের নীরব দীর্ঘশ্বাস জমা হচ্ছে। ডাক বিভাগ, রেলওয়ে, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন কিংবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়-সবখানেই নিচের সারির এই কর্মীরাই আসল চাকা, অথচ তাদের জীবনটাই আটকে আছে এক অন্তহীন অনিশ্চয়তার বৃত্তে।

১০, ১৫ বা ২০ বছর ধরে রাষ্ট্রের চাকা সচল রেখেও যারা নিজেদের ‘অস্থায়ী’ পরিচয়ের বৃত্ত থেকে বের করতে পারলেন না, তাদের এই যাপন কেবল একটুকরো প্রশাসনিক ফাইল আটকে থাকা নয়। এটি আসলে একটি নীরব মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রের এক সুগভীর কাঠামোগত ফাঁদের গল্প।

আমলাতন্ত্র প্রায়ই একটা চেনা অজুহাত দেখায়–‘বাজেটসংকট’ কিংবা ‘রাজস্ব খাতে পদের অভাব’। কিন্তু এই নতুন নীতিমালার আড়ালে আসল খেলাটা কেমন নিষ্ঠুর, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে খোদ সরকারেরই অফিশিয়াল নথিতে। গত ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের প্রবিধি অনুবিভাগ থেকে জারিকৃত একটি পরিপত্রের (স্মারক নম্বর: ০৭.০০.০০০০.১৭৬.৬৬.০৫৯.১৫-অংশ-৭-২৬) দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। ওই চিঠিতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) বিভিন্ন অফিসে মোট ১৯৭৩ জন সাময়িক শ্রমিক নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর পেছনে যে শর্তগুলো জুড়ে দেওয়া হয়েছে, তা ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ নীতিকে আরও ক্রূর করে তুলেছে।

সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই ১৯৭৩ জন শ্রমিক কাজ পাবেন ‘মাসিক ২২ দিন ভিত্তিতে’। এর আসল মানে কী? মাস ৩০ দিনে হলেও রাষ্ট্র শুরুতেই একজন শ্রমিকের জীবন থেকে ৮ দিনের কাজ ও মজুরি আইনিভাবে কেটে রাখছে। বাকি ৮ দিন শ্রমিক কাজ করতে চাইলেও রাষ্ট্র তাকে কাজ দেবে না, আর ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ নিয়মের দোহাই দিয়ে ওই দিনগুলোর মজুরিও দেবে না। উপরন্তু, এই শ্রমিকদের মেয়াদ বেঁধে দেওয়া হয়েছে আগামী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত। সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো, পরিপত্রের ‘ক’ শর্তে স্পষ্ট লিখে দেওয়া হয়েছে ‘আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছর থেকে আর কোনো দৈনিক ভিত্তিতে সাময়িক শ্রমিক নিয়োজিতকরণের সম্মতি প্রদান করা হবে না।’ এর সহজ অর্থ দাঁড়ায়, রাষ্ট্র এই শ্রমিকদের ধাপে ধাপে স্থায়ী করার পরিবর্তে পুরো প্রথাটিকেই বিলুপ্ত করে দিতে চায়, যাতে পেনশন, ভবিষ্যৎ তহবিল বা গ্র্যাচুইটির দীর্ঘমেয়াদি কোনো আর্থিক দায় রাষ্ট্রের ঘাড়ে না চাপে। কিন্তু যে মানুষগুলো এক-দেড় দশক ধরে এই দপ্তরে ঘাম ঝরিয়েছেন, তাদের পুনর্বাসন বা স্থায়ীকরণের কোনো রূপরেখা না রেখে এই আইনি চাতুরী স্রেফ অমানবিক।

যদিও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় শূন্য পদের বিপরীতে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়া এই বিশাল মাস্টাররোল ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের স্থায়ী করার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। অথচ বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে রাষ্ট্রকে সেবা দেওয়ার পর, তারা আইনি সুরক্ষা ও মানবিক অধিকারটুকুও পাচ্ছে না। ছুটি নেই, উৎসব ভাতা নেই, চিকিৎসা সুবিধা নেই, অবসরের কোনো নিশ্চয়তা নেই। শুধু আছে প্রতিদিনের হাজিরা এবং প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা।

আইএলও কনভেনশন নম্বর ৯৮ এবং ১৫৮ অনুযায়ী, কোনো শ্রমিককে যদি একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করানো হয়, তাহলে তাকে কর্মসংস্থানের স্থায়িত্ব ও সুরক্ষা দিতে হবে। নিয়মিত পদে যে কাজ হচ্ছে, সেই কাজে নিরন্তর অস্থায়ী শ্রমিক ব্যবহার করা মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের নীতির বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ আইএলওর সদস্য রাষ্ট্র এবং বেশ কিছু সনদে স্বাক্ষরকারী। কিন্তু স্বাক্ষর আর বাস্তবায়নের মাঝখানে যে দূরত্ব, সেটাই এই অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের জীবনের মূল সংকট।

শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ৪ এবং ২ অনুযায়ী, কোনো শ্রমিক একই প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্নভাবে এক বছর বা তার বেশি সময় কাজ করলে তিনি স্থায়ী কর্মচারীর মর্যাদা পাওয়ার আইনি অধিকারী। কিন্তু ‘মাস্টাররোল’ বা ‘দৈনিক ভিত্তিক সাময়িক শ্রমিক’ এবং ‘আউটসোর্সিং’ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই আইনি বাধ্যবাধকতাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছে। কাগজে-কলমে চুক্তি ভাঙলেও সেবার ধারাবাহিকতা থাকে, মানুষটাও একই থাকেন, কিন্তু আইনের চোখে তিনি বারবার ‘নতুন নিয়োগ’ পান। এই কৌশলটিই এই ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি।

দেশের বিভিন্ন সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত দৈনিক মজুরিভিত্তিক ও মাস্টাররোল কর্মচারীরা আউটসোর্সিং বা ঠিকাদারি প্রথার নামে আধুনিক দাসপ্রথা বাতিল, চাকরি স্থায়ীকরণসহ ছয় দফা দাবিতে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছে। এই লড়াই শুধু ৫০ হাজার কর্মচারীর নয়, এটি দেশের প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার লড়াই। তাই বৈষম্যমুক্ত মর্যাদাপূর্ণ জীবনধারণের অধিকার ও শ্রমিকের চাকরির নিশ্চয়তা রক্ষায় তাদের চাকরি স্থায়ী করুন।

লেখক: উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী (শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননাপ্রাপ্ত)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস); সভাপতি, ভঙ্গী নৃত্য শিল্পালয়
[email protected] 

রাজনীতিকে সরল সমীকরণে দেখা যায় না

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৯:২০ পিএম
রাজনীতিকে সরল সমীকরণে দেখা যায় না
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

সম্প্রতি রাজনৈতিক আলোচনায় একটি বক্তব্য ঘুরে বেড়াচ্ছে–আওয়ামী লীগ যদি আবার উঠে দাঁড়াতে পারে, তাহলে রাজনৈতিক পড়াশোনাই নাকি ব্যর্থ বলে ধরে নিতে হবে। বক্তব্যটি চিন্তার খোরাক দেয়, সন্দেহ নেই। তবে আমার সীমিত বোঝাপড়া অনুযায়ী, এমন সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে অতিসরলীকৃত।

রাজনীতি কখনো গণিতের সরল সমীকরণ নয়। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে ১+১ সাধারণত ২ হয়; কিন্তু সমাজবিজ্ঞানে একই সমীকরণের ফল সবসময় একরকম হয় না। এখানে মানুষ আছে, ইতিহাস আছে, ক্ষমতার সম্পর্ক আছে, স্মৃতি আছে, ভয় আছে, আশা আছে, স্বার্থ আছে এবং পরিচয়ের রাজনীতি আছে। তাই রাজনীতিকে কেবল তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বা ব্যক্তিগত প্রত্যাশার ভিত্তিতে বিচার করলে বাস্তবতার বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।

অ্যারিস্টটল বহু আগেই মানুষকে ‘রাজনৈতিক প্রাণী’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। অর্থাৎ রাজনীতি মানুষের সামাজিক অস্তিত্বের গভীরে প্রোথিত। মানুষ শুধু যুক্তির দ্বারা পরিচালিত হয় না; আবেগ, স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তাবোধ, পরিচয় এবং ঐতিহাসিক সম্পর্কও তার রাজনৈতিক অবস্থান গঠনে ভূমিকা রাখে। সে কারণেই কোনো রাজনৈতিক শক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না শুধু বর্তমান সংকট বা ক্ষমতার অবস্থান দেখে।

বাস্তব রাজনীতিতে দুই পক্ষকে পাশাপাশি রাখলেই কোনো সরল যোগফল তৈরি হয় না। ওবামা ও ওসামা–দুই নাম পাশাপাশি থাকলেও তা কোনো মিলনের সমীকরণ নয়; বরং সংঘাতের প্রতীক। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবস্থানও বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মেরুকরণের প্রতীক। আবার ট্রাম্প ও খামেনির রাজনৈতিক বাস্তবতাও কোনো সরল সমীকরণে ব্যাখ্যা করা যায় না। অর্থাৎ রাজনীতিতে যোগ, বিয়োগ, সংঘাত, মেরুকরণ, পুনর্গঠন–সবকিছুই একসঙ্গে কাজ করে।

সুতরাং, কোনো রাজনৈতিক দল একবার বিপর্যয়ে পড়লেই তা চিরতরে শেষ হয়ে যাবে–এমন ধারণা রাজনৈতিক বিজ্ঞানের শিক্ষা নয়। বরং রাজনৈতিক বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, একটি দলের সামাজিক ভিত্তি, ঐতিহাসিক ভূমিকা, সাংগঠনিক কাঠামো, রাজনৈতিক প্রতীকী শক্তি এবং জনগণের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক থাকলে তাকে সহজে মুছে ফেলা যায় না।

প্রখ্যাত জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবারের বহুল উদ্ধৃত ধারণা অনুযায়ী, রাজনীতি হলো শক্ত কাঠে ধীরে ধীরে ছিদ্র করার মতো কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদি কাজ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনীতি হলো ধৈর্য, সংগঠন, সময়, কৌশল এবং সামাজিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কোনো দল সংকটে পড়তে পারে, ভুল করতে পারে, ক্ষমতায় থেকে বিতর্কিত হতে পারে, জনবিচ্ছিন্নতার মুখেও পড়তে পারে–কিন্তু এগুলো কোনো ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তির স্বয়ংক্রিয় মৃত্যু নির্দেশ করে না।

আওয়ামী লীগকে বোঝার ক্ষেত্রেও শুধু বর্তমান পরিস্থিতি দেখা যথেষ্ট নয়। দলটির ঐতিহাসিক ভিত্তি, সাংগঠনিক শিকড়, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্ক, গ্রাম-শহরে বিস্তৃত সামাজিক উপস্থিতি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ কেবল একটি নির্বাচনি দল নয়; এটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং বহু মানুষের আবেগ ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি রাজনৈতিক শক্তি।

আমার পর্যবেক্ষণে, আওয়ামী লীগ, ১৪ দল এবং সমমনা রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে দেশের প্রায় ৫০ ভাগ মানুষের মধ্যে এ ধারার প্রতি কোনো না কোনো মাত্রায় সমর্থন, আবেগ, ঐতিহাসিক সংযোগ বা রাজনৈতিক আস্থা রয়েছে বলে বলা যায়। এ ধরনের বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তিকে কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিকসংকট দিয়ে বিচার করা যায় না। তাই আওয়ামী লীগ, ১৪ দল ও সমমনা রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত সামাজিক ভিত্তিকে কোনো সাময়িক বিপর্যয়, প্রশাসনিক চাপ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মাধ্যমে সহজে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

ইতিহাস বলছে, আওয়ামী লীগ বহুবার চাপ, দমন, সংকট ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে; কিন্তু বারবার নতুনভাবে রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনি বিজয় এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ–প্রতিটি পর্যায়েই আওয়ামী লীগ নিজেকে নতুন রাজনৈতিক ভাষায় সংগঠিত করেছে এবং জনসমর্থনের ভেতর দিয়ে প্রাসঙ্গিক রেখেছে।

১৯৭৫ সালের পর আওয়ামী লীগ ভয়াবহ রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। কিন্তু সেখান থেকেও দলটি হারিয়ে যায়নি। শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এরপর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯০-এর গণতান্ত্রিক উত্তরণ, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনি বিজয়–এসব ঘটনা দেখায় যে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থানের ইতিহাস একবারের নয়, বহুবারের।

অবশ্যই কোনো রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও আত্মসমালোচনা, রাজনৈতিক পুনর্গঠন, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ এবং নতুন সময়ের উপযোগী রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করা জরুরি। কিন্তু এই প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, দলটি শেষ হয়ে গেছে। বরং সংকট অনেক সময় রাজনৈতিক শক্তিকে নতুনভাবে চিন্তা করতে, নিজেকে সংশোধন করতে এবং পুনর্গঠিত হতে বাধ্য করে।

ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামসি রাজনৈতিকসংকট নিয়ে বলেছিলেন, পুরোনোটি মরে যাচ্ছে, কিন্তু নতুনটি জন্ম নিতে পারছে না–এই মধ্যবর্তী সময়েই নানা অস্থিরতা তৈরি হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিও আজ তেমন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সংকট মানেই কোনো ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তির মৃত্যু নয়; অনেক সময় সংকটই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দেয়।

অতএব, আওয়ামী লীগ আবার উঠে দাঁড়ালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বই ফেলে দিতে হবে, কিংবা রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা ব্যর্থ হয়ে যাবে–যেটা সম্প্রতি সলিমুল্লাহ খানসহ আরও কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেছেন–এই ধারণা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বরং আওয়ামী লীগ যদি আবার সংগঠিত হয়, তা রাজনৈতিক বিজ্ঞানের পাঠকেই আরও স্পষ্ট করবে। কারণ রাজনৈতিক বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, যে দলের সামাজিক ভিত্তি আছে, ঐতিহাসিক স্মৃতি আছে, সাংগঠনিক কাঠামো আছে এবং রাজনৈতিক প্রতীকী শক্তি আছে, তাকে কেবল প্রশাসনিক চাপ, সাময়িক বিপর্যয় বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে মুছে ফেলা যায় না।

কোনো দল ভুল করতে পারে, বিতর্কিত হতে পারে, জনসমর্থনের ওঠানামার মধ্যদিয়ে যেতে পারে–এসবই রাজনীতির স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলকে ‘শেষ’ ঘোষণা করা অনেক সময় বিশ্লেষণের চেয়ে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ বেশি।

আমার মূল্যায়নে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছিল, আছে এবং থাকবে। তবে সেই থাকা কতটা শক্তিশালী, কতটা সংগঠিত এবং কতটা জনসম্পৃক্ত হবে–তা নির্ভর করবে দলটির আত্মসমালোচনা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর।

রাজনীতিতে শেষ কথা কোনো একক ব্যক্তি, কোনো একক বক্তব্য কিংবা কোনো তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বলে না। শেষ কথা বলে ইতিহাস, সংগঠন, জনগণ এবং সময়।

লেখক: নির্বাহী চেয়ারম্যান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান-গ্রোয়িং টুগেদার ওপিসি
গবেষক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বিশ শতকের শেষভাগে উত্তর-উপনিবেশবাদী তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যখন প্রশ্ন তুলেছিলেন–‘সাবঅল্টার্ন কি কথা বলতে পারে?’ তখন অনুন্নত বা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রান্তিক মানুষের ‘প্রতিনিধিত্ব’ বা রিপ্রেজেন্টেশনের সংকটটি বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। দীর্ঘকাল ধরে দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষত বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ, জলবায়ু শরণার্থী কিংবা শ্রমজীবীশ্রেণি পশ্চিমা আলোকচিত্রী বা নৃবিজ্ঞানীদের ক্যামেরায় কেবলই ‘দুর্দশার উপাত্ত’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশের চারুকলার জগতে এই ঔপনিবেশিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে। নৃবিজ্ঞানের মাঠপর্যায়ের পদ্ধতি ‘ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি’ (Visual Ethnography) এবং বাস্তবতার দলিল ‘ডকুমেন্টারি চর্চা’ (Documentary Practice)–এ দুইয়ের সীমানা ভেঙে দিয়ে সমকালীন বাংলাদেশি শিল্পীরা ক্যানভাস, ভিডিও আর্ট ও স্থাপনাশিল্পকে (Installation) করে তুলেছেন ঔপনিবেশিক বয়ান প্রতিরোধের এক একটি অ্যাকাডেমিক ও নান্দনিক হাতিয়ার।

একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যদিয়ে যদি আমরা এ রূপান্তরকে ব্যবচ্ছেদ করি, তবে এর তাত্ত্বিক গভীরতা অনুধাবন করা সহজ হবে:

নৃবিজ্ঞানগত ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফির চিরাচরিত উদ্দেশ্য হলো কোনো নির্দিষ্ট সমাজ বা আদিবাসী গোষ্ঠীর আচার-অনুষ্ঠান, ভাষা ও জীবনযাত্রাকে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণের স্বার্থে ‘পদ্ধতিগত নথিকরণ’ বা ট্যাক্সোনমিক ডকুমেন্টেশন করা। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ওপর প্রথাগত নৃবিজ্ঞানীরা যে ভিজ্যুয়াল কাজ করেন, তার মূল লক্ষ্য থাকে সাংস্কৃতিক অবলুপ্তি ঠেকানো বা অ্যাকাডেমিক জ্ঞান উৎপাদন করা।

কিন্তু যখন ই এথনোগ্রাফি চারুকলার প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডিতে প্রবেশ করে, তখন তার উদ্দেশ্য আর কেবল তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধ থাকে না। হ্যাল ফস্টার (Hal Foster) তার বিখ্যাত ‘দ্য আর্টিস্ট এজ এথনোগ্রাফার’ (১৯৯৫) প্রবন্ধে দেখিয়েছিলেন কীভাবে সমকালীন শিল্পীরা নিজেরা নৃবিজ্ঞানী হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের শিল্পীরা–যেমন কামরুজ্জামান স্বাধীন বা জিহান করিম–মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে স্রেফ তুলে ধরেন না; বরং তারা সেই বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে ‘ধারণাগত সমালোচনা’ (Conceptual Critique) তৈরি করেন। জলবায়ু পরিবর্তন বা পুঁজিবাদের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি কীভাবে ধ্বংস হচ্ছে, চারুকলার ডকুমেন্টারি চর্চায় তার এক একটি ‘কাঠামোগত ব্যবচ্ছেদ’ ঘটে। এখানে নথিকরণ রূপান্তরিত হয় রাজনৈতিক ও নান্দনিক প্রতিবাদে।

পদ্ধতিগত নৃবিজ্ঞানে তথ্যের ‘নৈর্ব্যক্তিকতা’ বা অবজেকটিভিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে উপস্থাপনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় টেক্সট-ভিত্তিক নৃবিজ্ঞানধর্মী চলচ্চিত্র বা অপরিবর্তিত মূল আর্কাইভ (Raw Archive)। সেখানে দৃশ্যের নান্দনিক কাটছাঁটের চেয়ে তথ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা বেশি জরুরি।

অথচ, চারুকলার প্রেক্ষাপটে এই মাধ্যমগুলো এক একটি জাদুকরী ও রূপক রূপ ধারণ করে। শিল্পীরা মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত অডিও রেকর্ডিং, পুরোনো চিঠি, বা আলোকচিত্রকে সরাসরি প্রদর্শন না করে সেগুলোকে ‘পরিমার্জিত আর্কাইভ’ হিসেবে ব্যবহার করেন। যেমন–বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলায় ব্রেট আর্টস ট্রাস্ট বা ঢাকা আর্ট সামিটের প্রদর্শনীগুলোতে দেখা যায়, যমুনার ভাঙনে ঘরহারা মানুষের জীবনের প্রামাণ্যচিত্রটি কেবল স্ক্রিনে আটকে নেই; তা রূপান্তরিত হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ইনস্টলেশন, ভিডিও আর্ট কিংবা স্থানীয় মাটি ও পোড়াকাঠ দিয়ে তৈরি মিশ্র-মাধ্যমের ভাস্কর্যে (Mixed-media sculpture)। লুইজি মারিন (Louis Marin) আর্ট থিওরিতে যাকে ‘স্পেশাল প্র্যাকটিস’ বা স্থানিক চর্চা বলেছেন–শিল্পী এখানে দর্শককে কেবল ছবি দেখান না, বরং গ্যালারির ত্রিমাত্রিক পরিমণ্ডলে সে যন্ত্রণার একটি বাস্তব ও স্থানিক অনুভূতি তৈরি করেন।

সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ও নৈতিক রূপান্তরটি ঘটে কাজের ‘বিষয়’ (Subject) বা মানুষের অবস্থানের ক্ষেত্রে। চিরাচরিত ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফিতে প্রান্তিক মানুষটি কেবলই একজন ‘ইনফরম্যান্ট’ বা তথ্যদাতা। গবেষক ক্যামেরা হাতে তার সামনে দাঁড়ান, তিনি অবজেক্ট বা লক্ষ্যবস্তু মাত্র।

কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান চারুকলা আন্দোলনের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিল্পীরা এই ক্ষমতার ভারসাম্যকে বদলে দিয়েছেন। এখানে বিষয়ের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্কটি সহভাগিতার। উদাহরণস্বরূপ, তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) নারী শ্রমিকদের জীবন নিয়ে যখন কোনো সমকালীন ভিজ্যুয়াল প্রজেক্ট তৈরি হয়, তখন সেই নারী শ্রমিকরা কেবল ক্যামেরার সামনে পোজ দেন না; অনেক সময় তাদের নিজেদের হাতে ক্যামেরা তুলে দেওয়া হয় কিংবা তাদের ব্যবহৃত কাপড়ের টুকরো দিয়েই তৈরি হয় স্থাপনাশিল্প। ফলে, তথাকথিত ‘সাবঅল্টার্ন’ বা প্রান্তিক মানুষটি এখানে স্রেফ গবেষণার উপাদান থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন শিল্পের একজন ‘সহ-স্রষ্টা’ (Co-creator)।
আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে এই অ্যাকাডেমিক আলোচনার বাস্তব প্রতিফলন আমরা রাজপথে ও গ্যালারিতে দেখতে পাই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকার দেয়ালগুলোতে যে গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রের বিপ্লব ঘটে গেল, তা কিন্তু এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত ‘স্ট্রিট এথনোগ্রাফি’। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, আকাঙ্ক্ষা এবং ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিলগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সাদা গ্যালারি থেকে বেরিয়ে এসে রাজপথের ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে।

তবে এ মেলবন্ধনের উল্টো পিঠে কিছু সংকটও রয়েছে, যা সংবাদপত্রের পাতায় আলোচনা হওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর অর্থায়নে যখন অনেক ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি বা ডকুমেন্টারি প্রজেক্ট তৈরি হয়, তখন অনেক সময় ‘এনজিও নান্দনিকতা’র (NGO Aesthetics) চাপে পড়ে শিল্পের নিজস্ব স্বাধীনতা বা স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়। পশ্চিমা ফান্ডিং এজেন্সির মনঃপূত করার জন্য বাংলাদেশের দারিদ্র্য বা দুর্যোগকে এক ধরনের ‘শৈল্পিক পণ্য’ হিসেবে বিক্রির প্রবণতাও সমকালীন শিল্পসমালোচকদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে চারুকলার ভেতরে ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি এবং ডকুমেন্টারি চর্চার এই অনুপ্রবেশ কেবল দুটি মাধ্যমের মিলন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। জয়নুল আবেদিনের ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের স্কেচ থেকে শুরু করে আজকের তরুণ ভিডিও শিল্পীদের কাজ–এই দীর্ঘ যাত্রায় স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের শিল্পকলা সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো বিনোদন নয়। সমাজ ও সংস্কৃতির বাস্তব উপাত্তকে নান্দনিকতার ছাঁচে ফেলে যেভাবে এ দেশের শিল্পীরা ইতিহাস বিকৃতি ও প্রান্তিককরণের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন, তা চারুকলার সীমানাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। ক্যানভাস এখানে কেবল রঙের খেলা নয়, ক্যানভাস এখানে সমাজ ও ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

লেখক: চারুকলা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ-ইউওডা, ঢাকা
[email protected]