ঢাকা ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বরগুনায় চিরকুট লিখে পুলিশ সদস্যের আত্মহত্যা নরসিংদীবাসীর জন্য সুখবর, অনুমোদন পেল সরকারি মেডিকেল কলেজ বেরোবিতে শিবিরের বিরুদ্ধে ‘গুমের নাটক’ অভিযোগে ছাত্রদলের বিক্ষোভ বিশ্বকাপের শুরুতেই জয়ের হাসি বাংলাদেশের মেয়েদের নওগাঁয় মাকে নির্যাতনের অভিযোগে দুই ছেলে গ্রেপ্তার যে ডাকের ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর ভালোবাসা বিশ্বজুড়ে সংকটে রবীন্দ্র-নজরুল আরও প্রাসঙ্গিক: মোস্তফা কামাল কচুয়ায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ধর্ষক গ্রেপ্তার ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজন প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি দাসত্বের আদেশনামা, বাজেটে ঠাঁই হয়নি শ্রমিক-কৃষকের: ওয়ার্কার্স পার্টি এজিই তৈরি করবে জেফ বেজোসের এআই স্টার্টআপ গোপালগঞ্জে ১০ শয্যার আইসিইউ উদ্বোধন: ১০ ভেন্টিলেটরের ৯টিই নষ্ট! মায়ের সঙ্গে অভিমান করে ভারতে যাওয়া সেই কিশোরীকে ফেরত রোমানিয়ার নেতৃত্বে নতুন মুখ, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত আদ্রিয়ান ভেস্তেয়া ‘নতুন কুঁড়ি’ জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যাওয়ার বাতিঘর: কবীর আহমেদ ভূঁইয়া প্রাকৃতিক ভূগোল অধ্যায়ের ১১টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ২য় পর্ব, এইচএসসির ভূগোল ১ম পত্র সফল হয়েও অপরাধবোধে ভোগেন? জেনে নিন ১০টি লক্ষণ সীমান্তে বৃদ্ধকে পুশইনের চেষ্টা, জয়পুরহাটে উত্তেজনা ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে চার শিশুর মৃত্যু কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা গণমাধ্যমকে অন্ধকার থেকে মুক্ত আকাশে বের করেছেন শহিদ জিয়া: তথ্যমন্ত্রী জাহাঙ্গীরনগরে শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ছাত্রদলের বিক্ষোভ যুদ্ধবিরতি আলোচনায় তেহরানে কাতারের প্রতিনিধি দল বন্ধুর ফাঁদে কিশোরী, দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩ কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন শাকিব, পূর্ণিমার ‘চাঁদ তারার গুঞ্জরণ’ মানবতার এক ফোঁটা রক্ত জীবন বাঁচায় নতুন রূপে ফিরছে ঐতিহ্যবাহী আগ্রাবাদ জাম্বুরী মাঠ দেশব্যাপী ‘Go For Gold’ রাইডিং ক্যাম্প শুরু করল উত্তরা মোটর্স
Nagad desktop

স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস ভয়কে জয় করে জীবনের জয়গান

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৫, ০৩:৩৪ পিএম
ভয়কে জয় করে জীবনের জয়গান
অসুস্থ অবস্থায় মাজেদা রহমান ঝর্ণা (ডানে), সুস্থ হয়ে স্বামী সন্তানের সঙ্গে (বামে)

প্রতিবছর অক্টোবর মাসটি বিশ্বজুড়ে ‘পিঙ্ক রিবন’ বা গোলাপি ফিতার মাধ্যমে স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস  হিসেবে পালিত হয়। এই মাসে বিশ্বজুড়ে নানা আয়োজন হয়। এসব আয়োজনের মূল লক্ষ্য স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা। এসব আয়োজন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি পৃথিবীর সব নারীর জন্য একটি জোর বার্তা- যে বার্তায় বাঁচতে পারে লাখ লাখ জীবন। স্তন ক্যানসার যদিও বিশ্বজুড়ে নারীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ, তবুও এর বিরুদ্ধে আমাদের হাতে একটি শক্তিশালী অস্ত্র আছে: তা হচ্ছে এ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীরব থাকার কোনো সুযোগ নেই। এই রোগ সম্পর্কে জানতে হবে, জানাতে হবে এবং ভয় না পেয়ে নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।

স্তন ক্যানসার নারীদের অন্যতম প্রধান ঘাতক হলেও, অসংখ্য নারীর গল্প প্রমাণ করে যে এটিই শেষ কথা নয়। আমাদের মাঝে এমন অনেক নারী আছেন, যারা স্তন ক্যানসারকে পরাজিত করে ফিরে এসেছেন। তাদের গল্প আমাদের প্রেরণা জোগায়। তাদের অদম্য মনোবল এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, স্তন ক্যানসার এখন আর নিরাময় অসাধ্য কোনো রোগ নয়।

এমনই একজন নারী মাজেদা রহমান ঝর্ণা। একজন গৃহিণী ও মা। স্তন ক্যানসার ধরা পড়ার পর ভেঙে না পড়ে বরং দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে রোগ নয়, তিনিই জিতবেন। যখন তার ক্যানসার ধরা পড়ে, তখন তিনি দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। তার ক্যানসার যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা এবং মনের অদম্য জোর। তিনি চিকিৎসকদের পরামর্শে কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, অস্ত্রোপচার এবং পরবর্তী সব চিকিৎসা ধৈর্যের সঙ্গে গ্রহণ করেন। হ্যাঁ, তার এই চিকিৎসা বাংলাদেশেই হয়েছে। চিকিৎসা চলাকালে শারীরিক কষ্টের সময়েও তিনি ইতিবাচক মনোভাব হারাননি। তার পরিবার তাকে সার্বক্ষণিক সমর্থন জুগিয়েছিল, যা তার মনোবল বাড়িয়ে দেয়। ঝর্ণার গল্প এই বার্তা দেয়, প্রাথমিক লক্ষণ দেখলে দ্বিধা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে এবং মনের জোর বজায় রাখতে হবে, তবেই জীবন ফিরে পাওয়া সম্ভব।

কণ্ঠশিল্পী সিঁথি সাহার কথা বলা যায়। তিনি প্রমাণ করেছেন যে ক্যানসার জয় করে সুস্থ জীবন এবং স্বাভাবিক মাতৃত্বও সম্ভব। তিনি একটি পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ক্যানসার নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তৃতীয় বা চতুর্থ স্টেজ থেকেও অনেক নারী কামব্যাক করছেন এবং আমার মতো হাসিখুশিভাবে জীবনযাপন করছেন।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিকা গায়ত্রী চট্টোপাধ্যায়ের ২০২১ সালে স্তন ক্যানসারের তৃতীয় পর্যায় ধরা পড়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘মনের জোর থাকলে ক্যানসারের থার্ড স্টেজ অবধি সারিয়ে ফেলা যায়।’ তার এই লড়াই ছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পারিবারিক— বহুমুখী। তিনি দেখিয়েছেন যে, মানসিক শক্তি, চিকিৎসকের সহযোগিতা এবং ভালোবাসার মাধ্যমে সামাজিক ছুঁতমার্গকে উপেক্ষা করেও জীবন ফিরিয়ে আনা যায়।

এসব নারীর জীবনজয়ের গল্প প্রমাণ করে যে স্তন ক্যানসার মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ বহুদূর এগিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যদি স্তন ক্যানসার একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়, তবে পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৯৯% পর্যন্ত হতে পারে। 

আসুন, এই বিশেষ মাসে আমরা স্তন ক্যানসারসংক্রান্ত সেই দুটি মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা করি, যা জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

১. নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হউন 
চিকিৎসকদের মতে, স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হলো নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হওয়া। স্তন ক্যানসার হঠাৎ করে হয় না। এর লক্ষণগুলো প্রথম দিকে সামান্য হলেও, তা গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের সমাজে অনেকেই দ্বিধা বা অজ্ঞতার কারণে এই লক্ষণগুলো উপেক্ষা করেন। তাই ২০ বছর বয়স থেকেই প্রত্যেক নারীর উচিত মাসে অন্তত একবার নিজের স্তন পরীক্ষা করা। ঋতুচক্র শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পর এটি করার উপযুক্ত সময়। পিণ্ড বা চাকা অনুভব করা, স্তনের আকার বা আকৃতির পরিবর্তন, ত্বকে টোল পড়া বা স্তনবৃন্ত থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণ— এমন যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। ৪০ বছর বয়স হলে বা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ম্যামোগ্রাম এবং ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট পরীক্ষা করাতে হবে।

এক্ষেত্রে সামান্য দ্বিধা বা অবহেলা রোগকে কঠিন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। মনে রাখবেন, স্তন ক্যানসার যত আগে ধরা পড়বে, নিরাময়ের সম্ভাবনা তত বেশি।

২. ‘মনের জোর রাখুন’
ক্যানসার শব্দটাই ভয়ের। কিন্তু স্তন ক্যানসার মানেই জীবন শেষ  হয়ে যাওয়া নয়— এটি একটি যুদ্ধ, যা জেতা সম্ভব। যুদ্ধ জয়ের জন্য যেমন সুচিকিৎসা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন অদম্য মানসিক শক্তি। চিকিৎসা পদ্ধতি এখন অনেক উন্নত। ইতিবাচক মানসিকতা শরীরকে দ্রুত আরোগ্য লাভে সহায়তা করে। ক্যানসার রোগীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তার মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

আসুন, এই অক্টোবরে আমরা সবাই মিলে শপথ করি: আমরা আর নীরব থাকব না। ‘পরীক্ষা করুন’ এবং ‘মনের জোর রাখুন’— এই দুটি কথাকে আমরা আমাদের জীবনের মন্ত্র করে তুলব। আপনার সামান্য সচেতনতাই পারে একটি জীবনকে সুরক্ষিত রাখতে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বিশ শতকের শেষভাগে উত্তর-উপনিবেশবাদী তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যখন প্রশ্ন তুলেছিলেন–‘সাবঅল্টার্ন কি কথা বলতে পারে?’ তখন অনুন্নত বা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রান্তিক মানুষের ‘প্রতিনিধিত্ব’ বা রিপ্রেজেন্টেশনের সংকটটি বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। দীর্ঘকাল ধরে দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষত বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ, জলবায়ু শরণার্থী কিংবা শ্রমজীবীশ্রেণি পশ্চিমা আলোকচিত্রী বা নৃবিজ্ঞানীদের ক্যামেরায় কেবলই ‘দুর্দশার উপাত্ত’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশের চারুকলার জগতে এই ঔপনিবেশিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে। নৃবিজ্ঞানের মাঠপর্যায়ের পদ্ধতি ‘ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি’ (Visual Ethnography) এবং বাস্তবতার দলিল ‘ডকুমেন্টারি চর্চা’ (Documentary Practice)–এ দুইয়ের সীমানা ভেঙে দিয়ে সমকালীন বাংলাদেশি শিল্পীরা ক্যানভাস, ভিডিও আর্ট ও স্থাপনাশিল্পকে (Installation) করে তুলেছেন ঔপনিবেশিক বয়ান প্রতিরোধের এক একটি অ্যাকাডেমিক ও নান্দনিক হাতিয়ার।

একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যদিয়ে যদি আমরা এ রূপান্তরকে ব্যবচ্ছেদ করি, তবে এর তাত্ত্বিক গভীরতা অনুধাবন করা সহজ হবে:

নৃবিজ্ঞানগত ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফির চিরাচরিত উদ্দেশ্য হলো কোনো নির্দিষ্ট সমাজ বা আদিবাসী গোষ্ঠীর আচার-অনুষ্ঠান, ভাষা ও জীবনযাত্রাকে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণের স্বার্থে ‘পদ্ধতিগত নথিকরণ’ বা ট্যাক্সোনমিক ডকুমেন্টেশন করা। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ওপর প্রথাগত নৃবিজ্ঞানীরা যে ভিজ্যুয়াল কাজ করেন, তার মূল লক্ষ্য থাকে সাংস্কৃতিক অবলুপ্তি ঠেকানো বা অ্যাকাডেমিক জ্ঞান উৎপাদন করা।

কিন্তু যখন ই এথনোগ্রাফি চারুকলার প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডিতে প্রবেশ করে, তখন তার উদ্দেশ্য আর কেবল তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধ থাকে না। হ্যাল ফস্টার (Hal Foster) তার বিখ্যাত ‘দ্য আর্টিস্ট এজ এথনোগ্রাফার’ (১৯৯৫) প্রবন্ধে দেখিয়েছিলেন কীভাবে সমকালীন শিল্পীরা নিজেরা নৃবিজ্ঞানী হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের শিল্পীরা–যেমন কামরুজ্জামান স্বাধীন বা জিহান করিম–মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে স্রেফ তুলে ধরেন না; বরং তারা সেই বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে ‘ধারণাগত সমালোচনা’ (Conceptual Critique) তৈরি করেন। জলবায়ু পরিবর্তন বা পুঁজিবাদের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি কীভাবে ধ্বংস হচ্ছে, চারুকলার ডকুমেন্টারি চর্চায় তার এক একটি ‘কাঠামোগত ব্যবচ্ছেদ’ ঘটে। এখানে নথিকরণ রূপান্তরিত হয় রাজনৈতিক ও নান্দনিক প্রতিবাদে।

পদ্ধতিগত নৃবিজ্ঞানে তথ্যের ‘নৈর্ব্যক্তিকতা’ বা অবজেকটিভিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে উপস্থাপনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় টেক্সট-ভিত্তিক নৃবিজ্ঞানধর্মী চলচ্চিত্র বা অপরিবর্তিত মূল আর্কাইভ (Raw Archive)। সেখানে দৃশ্যের নান্দনিক কাটছাঁটের চেয়ে তথ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা বেশি জরুরি।

অথচ, চারুকলার প্রেক্ষাপটে এই মাধ্যমগুলো এক একটি জাদুকরী ও রূপক রূপ ধারণ করে। শিল্পীরা মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত অডিও রেকর্ডিং, পুরোনো চিঠি, বা আলোকচিত্রকে সরাসরি প্রদর্শন না করে সেগুলোকে ‘পরিমার্জিত আর্কাইভ’ হিসেবে ব্যবহার করেন। যেমন–বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলায় ব্রেট আর্টস ট্রাস্ট বা ঢাকা আর্ট সামিটের প্রদর্শনীগুলোতে দেখা যায়, যমুনার ভাঙনে ঘরহারা মানুষের জীবনের প্রামাণ্যচিত্রটি কেবল স্ক্রিনে আটকে নেই; তা রূপান্তরিত হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ইনস্টলেশন, ভিডিও আর্ট কিংবা স্থানীয় মাটি ও পোড়াকাঠ দিয়ে তৈরি মিশ্র-মাধ্যমের ভাস্কর্যে (Mixed-media sculpture)। লুইজি মারিন (Louis Marin) আর্ট থিওরিতে যাকে ‘স্পেশাল প্র্যাকটিস’ বা স্থানিক চর্চা বলেছেন–শিল্পী এখানে দর্শককে কেবল ছবি দেখান না, বরং গ্যালারির ত্রিমাত্রিক পরিমণ্ডলে সে যন্ত্রণার একটি বাস্তব ও স্থানিক অনুভূতি তৈরি করেন।

সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ও নৈতিক রূপান্তরটি ঘটে কাজের ‘বিষয়’ (Subject) বা মানুষের অবস্থানের ক্ষেত্রে। চিরাচরিত ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফিতে প্রান্তিক মানুষটি কেবলই একজন ‘ইনফরম্যান্ট’ বা তথ্যদাতা। গবেষক ক্যামেরা হাতে তার সামনে দাঁড়ান, তিনি অবজেক্ট বা লক্ষ্যবস্তু মাত্র।

কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান চারুকলা আন্দোলনের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিল্পীরা এই ক্ষমতার ভারসাম্যকে বদলে দিয়েছেন। এখানে বিষয়ের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্কটি সহভাগিতার। উদাহরণস্বরূপ, তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) নারী শ্রমিকদের জীবন নিয়ে যখন কোনো সমকালীন ভিজ্যুয়াল প্রজেক্ট তৈরি হয়, তখন সেই নারী শ্রমিকরা কেবল ক্যামেরার সামনে পোজ দেন না; অনেক সময় তাদের নিজেদের হাতে ক্যামেরা তুলে দেওয়া হয় কিংবা তাদের ব্যবহৃত কাপড়ের টুকরো দিয়েই তৈরি হয় স্থাপনাশিল্প। ফলে, তথাকথিত ‘সাবঅল্টার্ন’ বা প্রান্তিক মানুষটি এখানে স্রেফ গবেষণার উপাদান থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন শিল্পের একজন ‘সহ-স্রষ্টা’ (Co-creator)।
আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে এই অ্যাকাডেমিক আলোচনার বাস্তব প্রতিফলন আমরা রাজপথে ও গ্যালারিতে দেখতে পাই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকার দেয়ালগুলোতে যে গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রের বিপ্লব ঘটে গেল, তা কিন্তু এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত ‘স্ট্রিট এথনোগ্রাফি’। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, আকাঙ্ক্ষা এবং ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিলগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সাদা গ্যালারি থেকে বেরিয়ে এসে রাজপথের ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে।

তবে এ মেলবন্ধনের উল্টো পিঠে কিছু সংকটও রয়েছে, যা সংবাদপত্রের পাতায় আলোচনা হওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর অর্থায়নে যখন অনেক ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি বা ডকুমেন্টারি প্রজেক্ট তৈরি হয়, তখন অনেক সময় ‘এনজিও নান্দনিকতা’র (NGO Aesthetics) চাপে পড়ে শিল্পের নিজস্ব স্বাধীনতা বা স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়। পশ্চিমা ফান্ডিং এজেন্সির মনঃপূত করার জন্য বাংলাদেশের দারিদ্র্য বা দুর্যোগকে এক ধরনের ‘শৈল্পিক পণ্য’ হিসেবে বিক্রির প্রবণতাও সমকালীন শিল্পসমালোচকদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে চারুকলার ভেতরে ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি এবং ডকুমেন্টারি চর্চার এই অনুপ্রবেশ কেবল দুটি মাধ্যমের মিলন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। জয়নুল আবেদিনের ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের স্কেচ থেকে শুরু করে আজকের তরুণ ভিডিও শিল্পীদের কাজ–এই দীর্ঘ যাত্রায় স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের শিল্পকলা সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো বিনোদন নয়। সমাজ ও সংস্কৃতির বাস্তব উপাত্তকে নান্দনিকতার ছাঁচে ফেলে যেভাবে এ দেশের শিল্পীরা ইতিহাস বিকৃতি ও প্রান্তিককরণের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন, তা চারুকলার সীমানাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। ক্যানভাস এখানে কেবল রঙের খেলা নয়, ক্যানভাস এখানে সমাজ ও ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

লেখক: চারুকলা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ-ইউওডা, ঢাকা
[email protected]

রক্তদান মহৎ কিন্তু নিরাপদ রক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১১:২৫ পিএম
রক্তদান মহৎ কিন্তু নিরাপদ রক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ
ডা. তিমির কুমার সাহা

দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিনিয়ত অসংখ্য রোগীর জীবন বাঁচাতে রক্ত সঞ্চালন করা হয়। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, প্রসূতি মা, ক্যান্সার রোগী, অস্ত্রোপচাররত রোগী কিংবা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত কোনো শিশুর প্র্রয়োজন হয় রক্তের। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়। যে রক্ত দেওয়া হচ্ছে, সেটি কতটা নিরাপদ? এক ব্যাগ রক্ত জীবন বাঁচাতে পারে, আবার সঠিক পরীক্ষা ছাড়া সেই রক্তই নতুন রোগ, জটিলতা এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। 

বিশুদ্ধ বা নিরাপদ রক্ত আসলে কী?
অনেকেই মনে করেন, রক্তে কোনো রোগ না থাকলেই সেটি নিরাপদ। বাস্তবে নিরাপদ রক্তের তিনটি মৌলিক শর্ত রয়েছে। রক্তটি হতে হবে: ১. সংক্রমণমুক্ত, ২. সঠিক রক্তের গ্রুপ এবং ৩. রোগীর শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা।

কেন রক্ত পরীক্ষা করা হয়?
একজন মানুষ দেখতে সম্পূর্ণ সুস্থ হলেও তার রক্তে এমন ভাইরাস বা জীবাণু থাকতে পারে; যা তিনি নিজেও জানেন না। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) রক্ত সঞ্চালনের আগে কিছু বাধ্যতামূলক সংক্রমণ পরীক্ষা করার সুপারিশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো- এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া (বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে)।

ICT ও ELISA : কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশসহ অনেক দেশে রক্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রে ICT এবং ELISA পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। ICT (Immunochromatographic Test) দ্রুত ফলাফল দেয় এবং প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের জন্য কার্যকর। তবে কিছু ক্ষেত্রে খুব প্রাথমিক সংক্রমণ শনাক্ত করার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।

ELISA (Enzyme-Linked Immunosorbent Assay)
ELISA তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল এবং নির্ভরযোগ্য। ভাইরাস বা সংক্রমণের ক্ষুদ্র উপস্থিতিও শনাক্ত করার সক্ষমতা বেশি হওয়ায় এটি আন্তর্জাতিকভাবে বহুল ব্যবহৃত।

NAT Testing : আধুনিক নিরাপত্তার আরেক ধাপ
উন্নত দেশগুলোতে অনেক ব্লাড ব্যাংক এখন NAT (Nucleic Acid Testing) ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তি ভাইরাসের জিনগত উপাদান শনাক্ত করতে পারে।

শুধু গ্রুপ মিললেই কি যথেষ্ট?
এর উত্তর হলো, না। রোগীর শরীর ও দাতার রক্তের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে থ্রি-ফেজ ক্রস ম্যাচিং করাও দরকার। এই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হয়, রোগীর শরীরে এমন কোনো অ্যান্টিবডি আছে কি না, যা দাতার রক্তের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তা পরীক্ষা করা হয়।

ভুল বা অপরীক্ষিত রক্ত কতটা বিপজ্জনক?
HIV সংক্রমণ, হেপাটাইটিস বি অথবা সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া, তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া, হেমোলাইটিক ট্রান্সফিউশন রিঅ্যাকশন, কিডনি বিকল হওয়া, বহু অঙ্গ বিকল হওয়া। এমনকি মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে।

এক ব্যাগ রক্তের নিরাপত্তার আট ধাপ
একটি নিরাপদ রক্ত রোগীর শরীরে পৌঁছানোর আগে সাধারণত কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে। ১. রক্তদাতা নির্বাচন, ২. স্বাস্থ্য ইতিহাস যাচাই, ৩. রক্ত সংগ্রহ, ৪. সংক্রমণ পরীক্ষা (ICT, ELISA বা NAT), ৫. রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ, ৬. থ্রি-ফেজ ক্রস ম্যাচিং, ৭. সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং ৮. রোগীর শরীরে সঞ্চালন।

রক্ত নেওয়ার আগে রোগী বা স্বজনদের জানা উচিত
রক্ত কোথায় পরীক্ষা হয়েছে, WHO-স্বীকৃত স্ক্রিনিং সম্পন্ন হয়েছে কি না, ক্রস ম্যাচিং করা হয়েছে কি না, রক্ত সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না ইত্যাদি। এসব প্রশ্ন করা রোগীর অধিকার এবং নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয়।

রক্তদান একটি মহৎ কাজ, কিন্তু নিরাপদ রক্তদান আরও বড় দায়িত্ব। এক ব্যাগ রক্তের পেছনে থাকে বিজ্ঞান, পরীক্ষা, সতর্কতা এবং দায়িত্বশীলতার সমন্বয়। কারণ রক্তের প্রয়োজনীয়তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক রোগীর জন্য সঠিকভাবে পরীক্ষিত রক্ত নিশ্চিত করা। বিশ্বের সকল রক্তগ্রহীতা পাক নিরাপদ নিশ্চিত রক্ত। বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের শুভেচ্ছা।

ডা. তিমির কুমার সাহা: এমবিবিএস, পিজিটি, মেডিকেল কাউন্সেলর, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন

বড় বাজেটের বড় প্রশ্ন

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম
বড় বাজেটের বড় প্রশ্ন
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

কয়েক সপ্তাহ ধরে সামাজিকমাধ্যমে একটা কথা বেশ ঘুরছে। কেউ কেউ বলছেন, এবারের বাজেট ‘উচ্চাভিলাষী’। কেউ আবার বলছেন, ‘একই বাজেট, নতুন মোড়ক।’ এই দুই মেরুর মাঝখানে বসে আমি যখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের মূল কাঠামোটা পড়লাম, মনে হলো আলোচনাটা আসলে অনেক গভীরে যাওয়া দরকার।

সরকার এবারের বাজেটে ১৩টি খাতকে অগ্রাধিকারে রেখেছে। তালিকায় আছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, সৃজনশীল অর্থনীতিসহ আরও কিছু। লক্ষ্যও বড়। ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, এই অগ্রাধিকার তালিকাটা কি আসলে কার্যকর পরিকল্পনা, নাকি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি?

সরাসরি বলছি, ১৩টি খাত একসঙ্গে অগ্রাধিকার পেলে কোনটি আসলে কার্যকর মনোযোগ পাবে, সেটা নিয়েই আমার মূল সংশয়। বাংলাদেশের বাজেটের ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই বড় বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক থেকে যায়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বছরের পর বছর ধরে অব্যয়িত অর্থের অভিযোগ নতুন নয়। 

এবারের বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। এই বড় বাজেটের পেছনে যুক্তি আছে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণ, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা, আর নতুন বেতন কাঠামোর বোঝা সামলানো। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের চিত্র যদি আগের বছরগুলোর মতো হয়, তাহলে ঘাটতির চাপটা কোথায় গিয়ে পড়বে?

আমার মতে, বাজেটের আকারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা। বড় সংখ্যা মানুষকে আশাবাদী করে, কিন্তু মাঠে পৌঁছানোটাই আসল কাজ।

এবারের অগ্রাধিকারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সবার আগে রাখা হয়েছে। এটা সময়োচিত। গত দুই বছর ধরে সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপে আছে। বাজারে গেলে এ বাস্তবতা বোঝা যায়। মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত, সবার জন্যই বাজার করার হিসাবটা এখন আগের চেয়ে কঠিন। সরকার বলছে, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা আছে। লক্ষ্যটা বাস্তবসম্মত, কিন্তু পথটা কঠিন। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই মূল্যস্ফীতি কমে না। এর জন্য সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক করতে হয়, বাজার তদারকি জোরদার করতে হয়, আর আমদানি নীতিতে নমনীয়তা আনতে হয়। সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নামানোর চেষ্টা চলছে। এটি একটি পরিচিত পদ্ধতি। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো বেসরকারি বিনিয়োগ ধাক্কা খায়। ঋণের সুদ বাড়লে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে পিছিয়ে আসেন। এই দুই লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখাটাই আসল চ্যালেঞ্জ।

কর্মসংস্থানের বিষয়টাও আলাদাভাবে ভাবার আছে। দেশে প্রতি বছর বিশাল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে আসছে। শুধু ভর্তুকি দিয়ে বা সরকারি চাকরির সুযোগ বাড়িয়ে এই চাহিদা মেটানো সম্ভব না। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আর তার জন্য ব্যবসার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে হবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, সুদের হার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, এগুলো যতক্ষণ না কমবে, বিনিয়োগকারীরা উৎসাহ পাবেন না। বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়নে মনোযোগের কথা বলা হয়েছে। তবে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ছাড়া এটা কাগুজে থেকে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এবারও বরাদ্দ বেড়েছে। এটা ইতিবাচক। দেশে বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, বিধবা অনেকেই আছেন যারা রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়া টিকতে পারেন না। কিন্তু এই খাতের দীর্ঘদিনের একটা সমস্যা হলো উপকারভোগীদের তালিকার নির্ভরযোগ্যতা। প্রকৃত অভাবীরা তালিকায় নেই, অথচ সচ্ছল পরিবারের সদস্যরা সুবিধা পাচ্ছেন, এই অভিযোগ পুরোনো। ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাইয়ের কথা বলা হচ্ছে বছরের পর বছর। বাস্তবায়নের গতি এখনো যথেষ্ট দ্রুত নয়।

স্বাস্থ্য আর শিক্ষা, দুটো খাত নিয়ে আলাদাভাবে একটু বলতে চাই। স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বেড়েছে, ভালো কথা। কিন্তু মোট বাজেটের অনুপাতে এটা এখনো যথেষ্ট নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হলো, জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যে ব্যয় করা উচিত। আমরা এখনো সেখানে নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে বোঝা যায় বাস্তবতা। অনেক জায়গায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই। ওষুধ নেই। যন্ত্রপাতি থাকলেও চালানোর লোক নেই। টাকা বরাদ্দ হলেই সব ঠিক হয় না। ব্যবস্থাপনার উন্নতি না হলে বরাদ্দের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছায় না।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা, সর্বত্র কিছু না কিছু সমস্যা আছে। শিক্ষকের মান, পাঠ্যক্রমের মান, মূল্যায়ন পদ্ধতি, এগুলো নিয়ে গত কয়েক বছরে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে পরিবর্তনটা এখনো দৃশ্যমান নয় সব জায়গায়।

আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর কথা বলা হয়েছে। এটা সবচেয়ে দরকারি পদক্ষেপ, আমার মতে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বিপুল। এই টাকাগুলো আটকে থাকার কারণে নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পান না। ব্যাংকের সুদের হার কমে না। বিনিয়োগের পরিবেশ সংকুচিত থাকে। এই সমস্যাটার সমাধান না হলে অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক হবে না।
এবারের বাজেটে আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। দেখার বিষয় হলো, এটা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়।

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কি সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব। তবে সেটার জন্য শুধু বাজেটের আকার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার, শাসনব্যবস্থার উন্নতি, আর দুর্নীতি কমানো না হলে লক্ষ্যমাত্রা কাগজেই থাকবে। এবারের বাজেটের সুযোগ হলো, নতুন সরকারের প্রতি মানুষের একটা প্রত্যাশা আছে। সেই প্রত্যাশা পূরণের জানালা বেশি দিন খোলা থাকে না।

বাজেটের পরিকল্পনা ভালো হলেই সব হয় না। মাঠপর্যায়ে যারা বাস্তবায়ন করবেন, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। আগামী অর্থবছরের শেষে যদি এই ১৩টি খাতের অর্ধেকেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়, সেটাই হবে বড় অর্জন।

লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ: এনবিআরের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম
রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ: এনবিআরের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের নানা হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে। সরকার যেহেতু ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে, তাই প্রথমে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন; পরে সে অনুযায়ী আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্যয়ের দিক থেকে সরকার চেষ্টা করে কতটা সংকোচন করা যায়, অর্থাৎ ব্যয় কতটা কমানো সম্ভব। অপরদিকে, আয়ের ক্ষেত্রে সরকার চেষ্টা করে কীভাবে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা যায়। আয়ের খাত যত বৃদ্ধি পাবে, সরকার তত বেশি আর্থিকভাবে নিশ্চয়তা লাভ করবে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর বছরে ন্যূনতম ১ হাজার টাকা ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন খাতে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধির পরিকল্পনাও করছে এনবিআর। অর্থাৎ, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর অন্যতম কৌশল হিসেবে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান সরকার অগ্রিম কর বৃদ্ধির পরিকল্পনাও করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকার কেন ভ্যাট ও আয়কর বৃদ্ধির এই পরিকল্পনা গ্রহণ করছে? একই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–এ উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং আদৌ কতটা সফল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে?

সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বাজেট বৃদ্ধি করছে। ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারকে আয় বৃদ্ধি করতে হবে, অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি ঘটাতে হবে। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সুতরাং, শুধু বর্তমান অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলেও আগামী অর্থবছরে ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে হবে। এ কারণেই যাদের মোট বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকা, তাদের কাছ থেকে বছরে ১ হাজার টাকা ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককেই বহন করতে হবে। 

বর্তমান সরকার আগামী অর্থবছরেই ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ লাখ থেকে ২০ লাখে উন্নীত করতে চায়। অথচ বর্তমানে নিবন্ধিত ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের সবাই নিয়মিত ভ্যাট প্রদান করে না। এর মধ্যে মাত্র সাড়ে ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট দেয়। আবার যারা ভ্যাট প্রদান করে, তারা সবাই সঠিকভাবে ভ্যাট দেয় কি না, সে বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অন্যদিকে অবশিষ্ট আড়াই লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ভ্যাট প্রদান করে না এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি।

সুতরাং প্রশ্ন থেকেই যায়, এ সংখ্যা ৮ লাখ থেকে ২০ লাখে উন্নীত করা কতটা সম্ভব হবে? আর যদি তা সম্ভবও হয়, তাহলে সবাই কি সঠিকভাবে ভ্যাট প্রদান করবে? আমাদের দেশে যারা ভ্যাট বা আয়কর প্রদান করেন, তাদের শনাক্ত করা এবং অডিট করার জন্য পর্যাপ্ত কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু যারা ভ্যাট বা আয়কর দেন না, অথচ যাদের তা দেওয়ার সামর্থ্য ও যোগ্যতা উভয়ই রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করার জন্য রাষ্ট্র কিংবা এনবিআরের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যায় না। ফলে যারা নিয়মিত ভ্যাট প্রদান করেন, তাদের অনেকের মধ্যেই এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে ভ্যাট দেওয়ার চেয়ে না দেওয়াই যেন সুবিধাজনক। অন্যদিকে, যারা আয়কর বা ভ্যাট প্রদান করেন, তারাও সব সময় যে সঠিক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাবের ভিত্তিতে তা দেন, এমনটিও নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভুল বা শুদ্ধ–যেভাবেই হোক, তারা অন্তত কর ও ভ্যাট প্রদান করছেন। তাহলে যারা একেবারেই ভ্যাট বা আয়কর দেন না, তাদের কেন আমরা কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারছি না?

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দেশের কল্যাণে কতটুকু নিবেদিত? রাষ্ট্রের স্বার্থে তাদের আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীলভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিকেরও নিজের অধিকার ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, দৈনিক কালবেলা পত্রিকায় ৪ জুন ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘রয়্যালটি কমিয়ে ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজারের মহেশখালীতে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে নির্মাণাধীন ‘মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড’ প্রকল্পে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন এবং শতকোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্র রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য যতই চেষ্টা করুক না কেন, বাস্তবতা অনেকটা সর্ষের মধ্যে ভূতের মতো। একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সে প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অপরদিকে, অনেক করদাতাও ভ্যাট বা আয়কর পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যাদের মোট বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকা, তাদের জন্য বছরে ১ হাজার টাকা ভ্যাট প্রদান করার কথা কোনো বড় বিষয় হওয়ার কথা নয়। তার পরও অনেকে বিভিন্ন উপায়ে কীভাবে কর ফাঁকি দেওয়া যায়, সেই পথ খোঁজেন। দেখা যায়, এনবিআরে নিবন্ধিত হিসাবে যে ব্যাংক হিসাবের তথ্য দেওয়া আছে, অনেকেই বাস্তবে সেই হিসাবে লেনদেন করেন না। আবার যারা রাষ্ট্রের হয়ে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের মধ্যেও অনেকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে দেশের যে পরিমাণ উন্নয়ন হওয়ার কথা, তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। আরও একটি উদাহরণ হলো–গত মে ৫, ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ হিমাগার মালিক সমিতিকে চিঠি দেয় এনবিআর। প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটির সভাপতি বলেন, যারা সংগঠনের সদস্য নন তাদের তথ্য আমরা দিতে পারব না। আর সদস্যরা বলবেন, ‘সদস্য হয়ে আমরা বিপদে পড়েছি।’ এতে সমিতি দুর্বল হবে, ব্যবসায়ীদের আস্থা কমবে। এ ধরনের চিন্তা অবিবেচনাপ্রসূত এবং দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা। ঠিক যেন রাষ্ট্রের চেয়ে সংগঠন বড়, সংগঠনের চেয়ে ব্যক্তি।

অপরদিকে, সরকার যদি আয়কর বৃদ্ধির তুলনায় ভ্যাট বৃদ্ধি করাকে সহজতর মনে করে, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতিও এক ধরনের পরোক্ষ কর, যার প্রভাব থেকে একজন দিনমজুরও রেহাই পান না। আবার ভ্যাট বৃদ্ধি করা হলে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা সরকারের সাফল্য অর্জনের পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি বছরে যে আয় করেন, তার করযোগ্য আয়ের অংশ ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি হলেই তিনি আয়কর প্রদান করবেন। অর্থাৎ তার আয়কর দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে বলেই তিনি আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী সরকার তথা এনবিআরকে আয়কর প্রদান করবেন। কিন্তু সরকার যদি কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করে, তবে তা আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও এর প্রভাব হবে ব্যাপক। কারণ এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা একজন দিনমজুরও এড়াতে পারবেন না। অথচ আয়কর আদায় বৃদ্ধি পেলে মূলত যারা আয়কর দেওয়ার যোগ্য, তারাই এর প্রত্যক্ষ প্রভাব বহন করবেন। নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠী এ ধরনের করের প্রভাব থেকে অনেকাংশে মুক্ত থাকবে। তাই রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আমাদের দেশে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো প্রায়ই এমন কৌশল খোঁজে, যার মাধ্যমে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে কর-সুবিধা কিংবা আয়কর মওকুফের সুযোগ নেওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে সরকারও ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাদের সেই সুবিধা দিতে বাধ্য হয়। এর ফলে গত কয়েক দশকে বিত্তবান শ্রেণি আরও বেশি সম্পদশালী হয়েছে, অথচ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ তাদের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারেনি।

সরকারের বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার কারণে রাষ্ট্রের এই কঠিন সময়ে সফল হওয়ার অন্যতম প্রধান উপায় হলো সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। তবেই হয়তো আমাদের দেশেও মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আয়কর ও ভ্যাট প্রদান করতে উৎসাহিত হবে। যখন নাগরিকরা দেখবেন যে তাদের প্রদত্ত কর সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে, তখন কর প্রদানের প্রতি তাদের আস্থা ও আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছে যাবে প্রতিটি মানুষের কাছে। সর্বোপরি, রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন তখনই সম্ভব হবে, যখন সরকার ও নাগরিক উভয়েই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশীদার হবে দেশের প্রতিটি মানুষ ও প্রতিটি নাগরিক।

লেখক: ব্যাংকার ও লেখক
[email protected]

ভূমিকম্পে ক্ষতির বড় কারণ শুধু কম্পন নয়, বরং খারাপ মানের ডিজাইন ও নির্মাণ

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:০১ পিএম
ভূমিকম্পে ক্ষতির বড় কারণ শুধু কম্পন নয়, বরং খারাপ মানের ডিজাইন ও নির্মাণ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি করতে পারে। তবে প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো–ভূমিকম্পে মানুষ সাধারণত কম্পনের কারণে মারা যায় না; বরং ভবন, সেতু ও অন্যান্য কাঠামো ধসে পড়ার কারণেই অধিকাংশ প্রাণহানি ঘটে।

একই মাত্রার ভূমিকম্পে কোনো কোনো ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়ে, আবার কোনো ভবন সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই পার্থক্যের মূল কারণ ডিজাইনের মান, নির্মাণের গুণগত মান এবং প্রকৌশলগত নিয়ম মেনে কাজ করা হয়েছে কি না। তাই বলা যায়–ভূমিকম্প নয়, দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ ভবনই মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু।

কেন ডিজাইন এত গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকম্পের সময় মাটির কম্পনের কারণে ভবনের ওপর বিভিন্ন ধরনের বল কাজ করে। ভবনের নিজস্ব ওজনের পাশাপাশি অতিরিক্ত গতিশীল বল (Dynamic Force) সৃষ্টি হয়।
প্রধানত দুই ধরনের বল গুরুত্বপূর্ণ: অনুভূমিক বল (Lateral Force)। ভূমিকম্পে মাটি ডানে-বামে কাঁপে। ফলে ভবনের ওপর অনুভূমিক বল কাজ করে। সাধারণত ভবনগুলো উল্লম্ব লোড (নিজস্ব ওজন) বহনের জন্য বেশি প্রস্তুত থাকে, কিন্তু ভূমিকম্পের অনুভূমিক লোড ভবনের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। গতিশীল বল (Dynamic Load)। ভূমিকম্প একটি গতিশীল ঘটনা। কম্পনের ফলে ভবনের বিভিন্ন অংশে ত্বরণ (Acceleration) সৃষ্টি হয়, যা অতিরিক্ত বল তৈরি করে। ভবনের ওজন যত বেশি, তত বেশি ভূমিকম্পীয় বল সৃষ্টি হয়।

খারাপ ডিজাইনের প্রধান সমস্যাসমূহ
Soft Storey (দুর্বল নিচতলা): বাংলাদেশে অনেক ভবনের নিচতলা গ্যারেজ, দোকান বা খোলা জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে নিচতলায় দেয়াল কম থাকে এবং কাঠামোগত দৃঢ়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ভূমিকম্পের সময় ওপরের তলাগুলো তুলনামূলক শক্ত থাকলেও নিচতলা অতিরিক্ত বিকৃত হয়।
একে বলা হয়: Soft Storey Failure। এর ফলে পুরো ভবন একসঙ্গে নিচের দিকে ধসে পড়তে পারে। অনেক ভূমিকম্পে দেখা গেছে যে, পার্কিং ফ্লোরযুক্ত ভবনগুলো প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। Irregular Shape (অসামঞ্জস্যপূর্ণ আকৃতি): স্থাপত্যগত সৌন্দর্যের জন্য অনেক সময় L-Shape, U-Shape বা অন্যান্য জটিল আকৃতির ভবন নির্মাণ করা হয়।

সমস্যা কোথায়
ভূমিকম্পের সময় ভবনের সব অংশ সমানভাবে নড়াচড়া করে না। ফলে ভবনের ওপর Torsion (মোচড়) Uneven Stress Distribution Concentrated Damage সৃষ্টি হয়। ফলে একটি অংশে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে কাঠামোগত ব্যর্থতা ঘটতে পারে। নিম্নমানের উপকরণ ও নির্মাণকাজ: ডিজাইন যত ভালোই হোক, নিম্নমানের নির্মাণকাজ পুরো প্রকল্পকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। নিম্নমানের সিমেন্ট ব্যবহার, অপর্যাপ্ত রড, অপর্যাপ্ত কংক্রিট কভার, ভুল রড বাঁধাই, পর্যাপ্ত curing না করা। এর ফলে কংক্রিটের শক্তি কমে যায় এবং ভূমিকম্পের সময় কাঠামো ভেঙে পড়ে। সঠিক Load Path না থাকা। Roof→Beam→Column→Foundation. যদি Load Path সঠিক না হয় তাহলে স্থানীয়ভাবে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। কিছু অংশ হঠাৎ ব্যর্থ হয় অর্থাৎ Progressive Collapse শুরু হতে পারে। ফলে পুরো ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দুর্বল কলাম–শক্তিশালী বিম সমস্যা।

ভূমিকম্পপ্রতিরোধী ডিজাইনের একটি মৌলিক নীতি হলো: Strong Column–Weak Beam
অর্থাৎ কলাম হবে শক্তিশালী এবং বিম তুলনামূলক দুর্বল। ভূমিকম্পের সময় বিম ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবন সাধারণত দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু কলাম ব্যর্থ হলে পুরো ভবন ধসে পড়তে পারে। তাই আধুনিক ভূমিকম্প প্রতিরোধী ডিজাইনে কলামকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কীভাবে ভালো ডিজাইন জীবন বাঁচায়? Ductility (নমনীয়তা): ভূমিকম্পের সময় একটি ভালো ভবন সম্পূর্ণ শক্ত ও অনমনীয় হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ভবন এমনভাবে ডিজাইন করা উচিত যাতে এটি: শক্তি শোষণ করতে পারে। কিছুটা বাঁকতে পারে। হঠাৎ ভেঙে না পড়ে: এটাই Ductility। Redundancy (বিকল্প লোড বহন ব্যবস্থা): ভালো ডিজাইনে একাধিক Structural System থাকে। একটি উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য অংশগুলো লোড বহন করতে পারে। ফলে সম্পূর্ণ ধসের সম্ভাবনা কমে যায়।

Regularity (সুষম বিন্যাস): সুষম আকৃতির ভবনে Stress Distribution ভালো হয়। Torsion কম হয়। ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকে। Code Compliance (কোড অনুসরণ): ভূমিকম্প প্রতিরোধী ডিজাইনের জন্য অবশ্যই প্রযোজ্য বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে হবে।
বাংলাদেশে: BNBC (Bangladesh National Building Code)। আন্তর্জাতিকভাবে: ACI, ASCE, ,IBC. Eurocode-এর নীতিমালা অনুসরণ করা হয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতা: বিশেষ করে ঢাকা শহর একটি ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। বর্তমানে অনেক প্রধান সমস্যাগুলো অনুমোদিত ডিজাইন অনুসরণ না করা। প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানের অভাব। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী। অতিরিক্ত তলা নির্মাণ। পুরোনো ভবনের কাঠামোগত মূল্যায়ন না করা। সঠিক Soil Investigation না করা। এসব কারণে ভূমিকম্পের সময় ক্ষতির ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়।

নেপাল ভূমিকম্প ২০১৫–একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ। ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছিল। তদন্তে দেখা যায় দুর্বল নকশা, অপর্যাপ্ত রড, নিম্নমানের কংক্রিট, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ, ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম কারণ ছিল। অন্যদিকে সঠিক প্রকৌশল নীতিতে নির্মিত অনেক ভবন উল্লেখযোগ্যভাবে টিকে ছিল। এটি প্রমাণ করে ভালো ডিজাইন জীবন বাঁচায়। প্রকৌশলীদের করণীয়: Structural Analysis নিশ্চিত করা, Static Analysis, Dynamic, Analysis, Response Spectrum Analysis, প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হবে। Seismic Load বিবেচনা করা: ডিজাইনের শুরু থেকেই ভূমিকম্পীয় লোড অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। Proper Detailing নিশ্চিত করা, Beam-Column Joint, Stirrup Spacing, Anchorage Length, Lap Splice সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। Construction Supervision জোরদার করা। ডিজাইন অনুযায়ী নির্মাণ হচ্ছে কি না তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

ভূমিকম্প থামানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, প্রকৌশল নকশা, মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী এবং দক্ষ তদারকির মাধ্যমে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
একটি নিরাপদ ভবন কেবল ইট, বালি, সিমেন্ট ও রডের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রতীক।

লেখক: প্রকৌশলী বিভাগীয় প্রধান, প্রকৌশল বিভাগ, স্টুডিও ডিএনএ, প্রতিষ্ঠাতা, হেলদি কংক্রিট ও হেলদি এডুকেশন