তিনি আমার বাবা। তার নাম মির্জা সেকান্দার আলম। বাড়ি বরিশালের গৌরনদী উপজেলার পিঙ্গলাকাঠী গ্রামে। ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। পড়তেন অষ্টম শ্রেণিতে। সেই বয়সেই তিনি নেমে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে।
১৬ ডিসেম্বর বা ২৬ মার্চ এলেই বাবা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। বাবার কাছে জেনেছি , পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্বিচারে মানুষ মেরে চলছে। তাদের নির্মমতা পৌঁছে যায় গৌরনদী উপজেলাতেও। সেখানে ক্যাম্প করে মানুষকে হত্যা করছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে। পাকিস্তানি হানাদাররা একদিন বাড়ির পাশের সোহরাব ব্যাপারী নামের এক কিশোরকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। এই দৃশ্য দেখে নিজের নিশ্চিত মৃত্যু ধরে নেন আমার বাবা। কিন্তু মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তখন কয়েকজন স্বজন ও প্রতিবেশী মিলে যুদ্ধে যাওয়ার পরিকল্পনা আঁটেন।
যুদ্ধে যাওয়া প্রসঙ্গে বাবা বলেন, ‘পাকিস্তানি আর্মিরা তখন সব জায়গায় নির্বিচারে মানুষ মারছে, বিনা কারণে সবকিছু পুড়িয়ে দিচ্ছে। তখন মনে হলো যুদ্ধে যেতে হবে। মরলে বীরের মতো মরব। কয়েকটা পাকিস্তানি মেরেই তবে মরব।’
এরপর জুলাইয়ের এক দুপুরে কাউকে কিছু না বলে চালের মটকায় মায়ের লুকানো ২৬ টাকা, পাঁচ কেজি চিড়া আর গুড় নিয়ে ঘর ছাড়েন মির্জা সেকান্দার। পরিকল্পনামাফিক মটকার মধ্যে লিখে রাখেন কয়েক শব্দের একটি চিঠি। তাতে লেখা ছিলো ‘মা, আমি যুদ্ধে গেলাম। যদি বেঁচে থাকি, দেখা হবে। টাকাগুলো সঙ্গে নিলাম। খোঁজাখুঁজি করো না।’
এ কঠিন যাত্রায় সঙ্গী ছিলেন চাচা এম এ রশিদ, চাচা হাকিম মৃধা, প্রতিবেশী হুমায়ুন কবির, হাওলাদার নুরুল ইসলাম, খন্দকার আলাউদ্দিন, সরদার কালাম। এম এ রশিদ সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে এসেছেন। বাকিদের মধ্যে একজন বাদে সবাই ছাত্র ছিলেন।
আমার বাবা ও তার সঙ্গীরা কলকাতায় যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। তিনি ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে বরিশাল এবং ভোলা জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ ও সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।
বাবা বলেন ,‘বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে ভারতের উদ্দেশে রওনা দিই। পাকিস্তানি আর্মির ভয়ে খেত-কোলা দিয়ে হাঁটতাম। সে সময় হাজার হাজার মানুষকে পালাতে দেখেছি। হাঁটু সমান কাঁদায় হাঁটতে গিয়ে বয়স্ক মায়ের পা ভেঙে গেলে তাকে রেখে, কোলের শিশুটি মারা গেলে ক্ষেতের পাশে ছুঁড়ে ফেলে পরিবারের অন্যরা ছুটছে। কেউ কারোর দিকে তাকানোর সময় নেই, মৃত্যুর ভয়ে সবাই দিশেহারা।’
বাবা ও তার সঙ্গীরা প্রথম দুই দিনে পায়ে হেঁটে যশোর আড়পাড়া পৌঁছান। প্রথম ২৪ ঘন্টায় খাওয়ার সময়টুকু ছাড়া তারা টানা হেঁটেছেন। পাকিস্তানি আর্মির নজর এড়াতে বেশির ভাগ সময় তাঁরা জমি-ক্ষেত, খাল-বিলের পাশ দিয়ে হাঁটতেন। চলার খারাপ রাস্তা, কাদা-পানি-গর্ত; সবমিলিয়ে হাঁটার তেমন গতি ছিল না। সে সময় পথে পথে নানান বয়সের হাজার হাজার শিশু-নারী-পুরুষের সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছে। কেউ কেউ যুদ্ধে অংশ নিতে বাড়ি ছেড়েছিলেন। তবে বেশির ভাগ ছুটছেন শরণার্থী হিসেবে ভারতে গিয়ে প্রাণ বাঁচাতে। নারীদের কোলে-কাঁখে সন্তান, হাঁতে পুটুলি। পুরুষের মাথায় প্রয়োজনীয় জিনিসের বস্তা, কাঁধে সন্তান, বয়স্ক বাবা-মায়ের হাত ধরা। সবার ক্লান্ত-বিধ্বস্ত মুখ। পথে পথে মানুষের বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের লাশ পড়ে ছিল। কোনোটা থেকে পঁচে-গলে গন্ধ ছুটছে, তাতে মাছি উড়ছে, কোনোটা ফুলে ঢোল হয়ে আছে।
যশোর রোডে আর্মির গাড়ি টহল ছিল। ভারত যেতে এই রোড ক্রস করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যশোরে পরিচয় হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির সঙ্গে, যিনি এখান থেকে স্বর্ণ কিনে ভারতে গিয়ে বিক্রি করতেন। বর্ডার পার হতে তিনি সহযোগিতা করেন। চারদিন, চার রাত হেঁটে অবশেষে কলকাতার টাকিতে পৌঁছালেন। টাকি ছিল কলকাতার শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অন্যতম আশ্রয়স্থল।
বাবাসহ সাতজনের এই দল সপ্তাহখানেক টাকিতে অবস্থান করেন। ৯ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) জলিল সেখানে যুদ্ধে অংশ নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জেলাভিত্তিক দাঁড় করিয়ে আলাদা লাইন ধরতে বলেন। বরিশাল জেলার লাইনে শতাধিক ব্যক্তি ছিলেন। সেখান থেকে বাছাই করে ৯২ জনকে ৯টি দলে ভাগ করে বেগুনদিয়া প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দেন। সেখানে মাসখানেক ট্রেনিং শেষে অস্ত্র-গোলা-বারুদ দিয়ে দেশে পাঠান।
সেই সময়ের স্মৃতি হাতড়ে বাবা বলেন, ‘ঘণ্টাখানেক প্যারেড করিয়ে অস্ত্র হাতে দিল। ট্রেনিং বলতে অস্ত্র চালানো সম্পর্কে বেসিক ধারণা। এখানে মেজর জলিল ও ওসমানী সাহেব আত্মরক্ষার নানান কৌশল এবং গ্রেনেড, ডিনামাইট চার্জ করা শেখান।’
৯২ জনের এই দল খুলনা, যশোর হয়ে আগস্টে বরিশাল ফিরে আসে। এ সময় হানাদার বাহিনীর সঙ্গে খুলনায় তাদের প্রথম যুদ্ধ হয়। তবে এতে তাঁদের কেউ মারা যায়নি। এই মুক্তিযোদ্ধারা মূলত বরিশালের উজিরপুর, মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ ও ভোলার বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ করেছেন। এরমধ্যে শেষ দুইমাস ছিলেন ভোলায়। তাঁরা মূলত হাঁটতেন ও নৌপথে চলাচল করতেন। এ সময় নদীতে কিছুদূর পরপরই মরদেহ ভাসতে দেখতেন। অনেক সময় কয়েকটি মরদেহ একসঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকত।
একসময় আসে শবে বরাতের রাত। খবর আসে এ উপলক্ষে রাতে মেহেন্দীগঞ্জ থানায় আর্মির ক্যাম্পে গরু জবাই দিয়ে ভোজের আয়োজন হচ্ছে। সে রাতেই থানায় আক্রমণ চালায় মুক্তিযোদ্ধাদের এই দল। এ সময় গ্রেনেড চার্জ করা হয়। রাতভর গোলাগুলি চলে। তখন বিদ্যুৎ ছিল না। অন্ধকারে প্রতিপক্ষের হতাহতের সংখ্যা বোঝা যায়নি। তবে তাঁদের কমান্ডার গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। ভোর পর্যন্ত ক্যাম্পের দখল রাখেন মুক্তিযোদ্ধারা। পরে আর্মিদের উদ্ধারে হেলিকপ্টার এলে মুক্তিযোদ্ধারা ১৩ কিলোমিটার দূরের ক্যাম্পে ফিরে আসেন।
এরপর তাঁরা রাতের আঁধারে মেহেন্দীগঞ্জের উলানিয়া থেকে জেলেদের নৌকায় গায়ের উপরে জাল বিছিয়ে ভোলার বোরহানউদ্দিনের উদ্দেশে রওনা দেন। ভোলার ভৌগলিক অবস্থানের কারণে দলের কয়েকজন মেহেন্দীগঞ্জ থেকে যান। তখন ৩৯ জনের দলটি বোরহানউদ্দিন হাইস্কুলে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত দুটো বেজে যায়। চারটার দিকে তাঁদের ওপর পাকিস্তানি আর্মি আক্রমণ করে। শুরু হয় দুই পক্ষের গোলাগুলি। নতুন ও অপরিচিত জায়গা হওয়াতে তাঁরা সঠিক জায়গায় অবস্থান নিতে পারেননি, পিছু হটেন। এই যুদ্ধে তাঁর সাত সহযোদ্ধাকে হারান।
এই দলটির শেষ গন্তব্য ছিল ভোলার চরফ্যাশন। ১০ ডিসেম্বর ভোলা হানাদারমুক্ত হয়। তখন রেডিও ছিল তথ্যের একমাত্র উৎস। বুঝতে পারেন দেশ জয়ের দিকে যাচ্ছে। যেকোনো সময় স্বাধীন বাংলা পাবেন। ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা চরফ্যাশনেই ছিলেন। পরে তাঁরা ভোলা সদর হয়ে নৌপথে বাড়ি ফিরে আসেন।
যুদ্ধ শেষে অস্ত্র জমা দিয়ে আমার কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বাবা মির্জা সেকান্দর আবার ফিরে যান পড়ার টেবিলে। এসএসসি পাশ করে ভর্তি হন স্থানীয় গৌরনদী কলেজে। তবে রক্ষীবাহিনীর অত্যাচারে বরিশালের তিনটি কলেজ পরিবর্তন করেও সেখানে পড়াশোনা করতে পারেননি। পরে চট্টগ্রামে বড় ভাইয়ের কর্মস্থলের কাছাকাছি এক বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা শেষ করেন।
তিনি সবসময় মানুষের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করেন। এ কারণে পরিবারের সবাই ঢাকা বসবাস করলেও তিনি গ্রামে থাকেন। পেশা হিসেবে রাজনীতিকে বেছে নিয়েছেন। তাকে বিভিন্ন সময় জেল-জুলুমের শিকার হতে হয়েছে। প্রায় ১৫ বছর তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় তিনি দুইবার বরিশালের শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান হিসেবে পুরস্কৃত হন। বিদেশেও রাষ্ট্রীয় সফর করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই মেয়ে ও দুই ছেলের বাবা। তাঁর তিনটি নাতি-নাতনিও রয়েছে।
বিজয়ের ৫৪ বছর কেটে গেলেও দেশ নিয়ে তাঁর ভেতরে হাজারো আক্ষেপ। মানুষের নৈতিক অবক্ষয়, দুর্নীতি আর অনিয়ম তাকে হতাশ করে। তবে চোখের কোণে এখনো একটি সুন্দর দেশের অপেক্ষা জ্বলজ্বল করে।