দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। দুনিয়ায় মুমিনদের কষ্ট-দুর্ভোগ সবই দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। কিয়ামতের পরে শুরু হবে এক নতুন জীবন। সে জীবনের শুরু আছে বটে, কোনো শেষ নেই। সেই অনন্ত জীবন কাফেরদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। এমন এক বোঝা, যা থেকে না তারা পালাতে পারবে, না এড়িয়ে যেতে পারবে। সেখানে মৃত্যু নেই, নেই শাস্তি থেকে বাঁচার কোনো উপায়।
আল্লাহতায়ালা কাফেরদের স্বাগত জানিয়েছেন জাহান্নামে। অভিনব পদ্ধতিতে তাদের শাস্তি দেওয়া হবে।
গায়ের চামড়া দগ্ধ করা হবে: জাহান্নামের আগুন তার অধিবাসীদের চামড়া দগ্ধ করবে। দগ্ধ চামড়া যখন অনুভূতিহীন হয়ে পড়বে, তখন আল্লাহ তাদের নতুন চামড়া দান করবেন। কারণ চামড়ার সাহায্যেই মানুষ দহন-যন্ত্রণা অনুভব করে। এভাবে অনন্তকাল পর্যন্ত চলতেই থাকবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আমার নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করে, তাদের আমি আগুনে দগ্ধ করবই। যখনই তাদের চামড়া দগ্ধ হবে, তখনই তার স্থলে নতুন চামড়া সৃষ্টি করা হবে, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৬)
পেটের সমস্ত কিছু গলিয়ে ফেলা হবে: জাহান্নামের মারাত্মক একটি শাস্তি হলো ফুটন্ত পানিতে গোসল। যারা জাহান্নামে যাবে, তাদের মাথায় গরম পানি ঢালা হবে। এই পানি এতটাই গরম হবে, তাদের পেট ও পাকস্থলী গলে যাবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা কুফরি করে, তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোশাক। তাদের মাথার ওপর ঢেলে দেওয়া হবে ফুটন্ত পানি, যা দ্বারা তাদের পেটে যা আছে, তা এবং তাদের চামড়া গলানো হবে।’ (সুরা হজ, আয়াত: ১৯-২০)
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জাহান্নামিদের মাথার ওপর অতি উত্তপ্ত পানি ঢেলে দেওয়া হবে। এই পানি বুক-পিঠ অতিক্রম করে পেটে চলে যাবে। পেটের সমস্ত কিছু বিগলিত করে বের করে দেবে। এরপর পা দিয়ে বেরিয়ে আসবে। এটাকেই ‘সাহর' বলা হয়। তাদের সঙ্গে অনবরত এমন হতেই থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৫৮২)
অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে: মানবদেহের সবচেয়ে সম্মানিত অঙ্গ হলো চেহারা। এ কারণে আল্লাহর রাসুল (সা.) চেহারায় প্রহার করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু জাহান্নামিদের এই সম্মানটুকুও রক্ষা করা হবে না। তাদের কিয়ামতের দিন মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায় উপস্থিত করা হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যাদের পথনির্দেশ করেন, তারাই পথপ্রাপ্ত। আর তিনি যাদের পথভ্রষ্ট করেন, আপনি কখনোই তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে তাদের অভিভাবক পাবেন না। কিয়ামতের দিন আমি তাদের সমবেত করব মুখে ভর করে চলা অবস্থায়-অন্ধ, মুক ও বধির করে। তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম। যখনই এর আগুন স্তিমিত হবে, তখনই আমি তাদের জন্য অগ্নিশিখা বৃদ্ধি করে দেব।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৯৭)
আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘যারা অসৎকর্ম নিয়ে আসবে, তাদের অধোমুখে নিক্ষেপ করা হবে জাহান্নামে এবং বলা হবে, তোমরা যা করতে তারই প্রতিফল তোমাদের দেওয়া হচ্ছে।’ (সুরা নামল, আয়াত: ৯০)
শুধু তা-ই নয়; আগুনের ঝাপটা তাদের চেহারা ঝলসে দেবে। নিস্তার পাবে না তারা কিছুতেই। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হায়, যদি কাফেররা সে সময়ের কথা জানত, যখন তারা তাদের সামনে ও পেছন থেকে আগুন প্রতিরোধ করতে পারবে না এবং তাদের কোনোরূপ সাহায্য করা হবে না।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩৯)
জাহান্নামের আগুনে টেনে নেওয়া হবে: কাফেরদের জাহান্নামের আগুনে অধোমুখী করে টেনে নেওয়া হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় অপরাধীরা বিভ্রান্ত ও বিকারগ্রস্ত। যেদিন তাদের উপুড় করে জাহান্নামের দিকে টেনে নেওয়া হবে, সেদিন বলা হবে, জাহান্নামের যন্ত্রণা আস্বাদন করো।’ (সুরা কমার, আয়াত: ৬৬)
তাদের চূড়ান্ত শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষে হাতে ও গলায় শৃঙ্খল ও বেড়ি পরিয়ে টেনে নেওয়া হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘শীঘ্রই তারা জানতে পারবে, যখন তাদের গলায় বেড়ি ও শৃঙ্খল থাকবে এবং তাদের টেনে নিয়ে যাওয়া হবে।’ (সুরা গাফির, আয়াত: ৭০-৭১)
চেহারা কালো করে দেওয়া হবে: আল্লাহতায়ালা আখেরাতে জাহান্নামিদের চেহারা কালো করে দেবেন। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘সেদিন কতক মুখ হবে উজ্জ্বল আর কতক মুখ হবে কালো। (যাদের মুখ কৃষ্ণবর্ণের হবে) তাদের বলা হবে, ঈমান আনার পরে কি তোমরা কুফরি করেছিলে? তবে তোমরা শাস্তি ভোগ করো-যেহেতু তোমরা কুফরি করেছিলে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৬)
তাদের মুখমণ্ডল এতটাই কালো হবে যে, দেখে মনে হবে, ঠিক যেন অমাবস্যার অন্ধকার। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যারা মন্দ কাজ করে, তাদের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ এবং তাদের আচ্ছন্ন করবে হীনতা। আল্লাহর হাত থেকে তাদের রক্ষা করার কেউ নেই। তাদের মুখমণ্ডল যেন রাতের অন্ধকার আস্তরণে আচ্ছাদিত। তারা জাহান্নামবাসী। সেখানে তারা স্থায়ী হবে।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ২৭)
আগুন কাফেরদের চতুর্দিক থেকে বেষ্টন করে ফেলবে : যেসব মানুষ কুফরিসহ সব ধরনের গুনাহে লিপ্ত হয়, কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুন তাদের চতুর্দিক থেকে পরিবেষ্টন করে ফেলবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘অবশ্যই, যারা পাপ করে এবং পাপ যাদের বেষ্টন করে ফেলে, তারাই জাহান্নামবাসী। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৮১)
উল্লেখ্য, এ ধরনের সামগ্রিক গুনাহ শুধু কাফের-মুশরিকদের ক্ষেত্রেই কল্পনা করা সম্ভব। এখানে পাপ দ্বারা কুফর ও শিরক বোঝানো হয়েছে। এ দুটি পাপ কারও মধ্যে পাওয়া গেলে তার সমস্ত গুণ ও পুণ্য নষ্ট হয়ে যায়। অন্যথায় তার কিছু পুণ্য বাকি থাকে।
পাপ যদি হাতের চুড়ির মতো সমস্ত দিক থেকে বেষ্টন করে ফেলে, তবে প্রজ্ঞার দাবি এটাই, শাস্তিও তাকে সকল দিক থেকে পরিবেষ্টন করে ফেলবে এবং হবেও তা-ই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জাহান্নামে তাদের (নিচে আগুনের) বিছানা থাকবে এবং ওপরে থাকবে (আগুনের) আচ্ছাদন। এভাবেই আমি জালিমদের শাস্তি দিয়ে থাকি।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৪১)
আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘নিশ্চয় জাহান্নাম কাফেরদের পরিবেষ্টন করে ফেলবে।’ (সুরা তওবা, আয়াত: ৪৯)
অন্তর গ্রাস করে নেবে জাহান্নামের আগুন: জাহান্নামের আগুন তাদের অস্থি-মজ্জা ও মাংস পুড়িয়ে কলিজা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কখনও নয়, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায়। আপনি কি জানেন, হুতামা কী? হুতামা হলো আল্লাহর প্রজ্বলিত অগ্নি, যা হৃদয়কে গ্রাস করে ফেলবে।’ (সুরা হুমাজা, আয়াত: ৪-৭)
জাহান্নামিদের নাড়িভুড়ি বেরিয়ে পড়বে: উসামা ইবনে জায়িদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন একশ্রেণির লোককে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হলে, তারা জাহান্নামের আগুনে নিজেদের ঝুলেপড়া নাড়িভুঁড়ি বয়ে বেড়াবে। পেষণযন্ত্রের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো গাধার মতো অনবরত ঘুরতে থাকবে। অন্য জাহান্নামিরা তাকে দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে। তারা নাম ধরে ডেকে জিজ্ঞেস করবে, কী অপরাধ তোমাদের? তোমরাই কি আমাদের ন্যায়ের আদেশ করতে না? অন্যায় কাজে নিষেধ করতে না? তারা বলবে, হ্যাঁ, আমরাই তোমাদের ন্যায়ের আদেশ করতাম। কিন্তু আমরা নিজেরা সেটা করতাম না। অনুরূপভাবে অন্যায় কাজে নিষেধ করতাম। কিন্তু সবার আগে আমরাই সেটা করতাম।’ (বুখারি, হাদিস: ৩২৬৭)
যারা জাহান্নামে ঝুলেপড়া নাড়িভুঁড়ি বয়ে বেড়াবে তাদের অন্যতম হলো, আমর ইবনে আমির। সেই সর্বপ্রথম ইসলামকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছে এবং দেবতার পশু উৎসর্গের প্রচলন ঘটিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি আমর ইবনে আমির আল-খুজায়িকে জাহান্নামে নাড়িভুড়ি বয়ে বেড়াতে দেখেছি।’ (বুখারি, হাদিস: ৪৬২৩)
জাহান্নামিদের জন্য রয়েছে শেকল, বেড়ি, শৃঙ্খল ও হাতুড়ি: মহান আল্লাহ জাহান্নামবাসীদের জন্য শেকল, বেড়ি, শৃঙ্খল ও হাতুড়ি প্রস্তুত করে রেখেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আমি কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি শেকল, বেড়ি ও জ্বলন্ত আগুন।’ (সুরা দাহর, আয়াত: ৪)
আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘আমার কাছে রয়েছে শৃঙ্খল ও প্রজ্বলিত আগুন। আর রয়েছে এমন খাদ্য, যা গলায় আটকে যাবে এবং রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা মুজজাম্মিল, আয়াত: ১২-১৩)
লেখক: আলেম ও গবেষক