ঢাকা ৬ আষাঢ় ১৪৩৩, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বৃহত্তর কুষ্টিয়ার প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী আব্দুল জলিলের স্মরণসভা ইবি ছাত্রদলে পদ পাচ্ছে ছাত্রলীগ কর্মীরা! প্রাথমিক পরীক্ষায় শিশুদের থেকে ফি আদায় প্রসঙ্গে গাজীপুরে তেল কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, নিয়ন্ত্রণে ৩ ইউনিট রাজশাহীতে অটো ভাড়া বৃদ্ধি তিস্তা ইস্যুতে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি, পরবর্তী কর্মসূচি ‘ঢাকা ঘেরাও’ নায়িকা ববির কথিত স্বামী আবুল বাশার গ্রেপ্তার সিটি কলেজ ক্যাম্পাস, ষোলশহরে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল সোনারগাঁয় যুবলীগ-ছাত্রলীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার সম্পর্কের পর বিয়ে হয়নি বলে ধর্ষণের অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়, রায় কোর্টের সিরাজউদ্দৌলা নাটকের ৩টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ৭ম পর্ব, এইচএসসির বাংলা ১ম পত্র খোলা ড্রামে ভোজ্যতেল: ভোক্তার অধিকার কোথায়? আগস্টের মধ্যেই ঢাকা-পাবনা রুটে সরাসরি ট্রেন: নৌপরিবহনমন্ত্রী গাজী গিয়াস উদ্দিনকে মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহিত্য পুরস্কার প্রদান তীব্র তাপপ্রবাহে করণীয় আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করুন নিত্যপণ্যের দামে কোনো চাপ নেই, বাজেট জনবান্ধব: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী উদ্ভিদের বংশ বৃদ্ধি অধ্যায়ের ১০টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান দেশে বাড়ছে হামের প্রকোপ, একদিনে ৭ মৃত্যু ছত্রিশ-চব্বিশের পরকীয়া নিয়ে তুলকালাম মায়ের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হারুন আল রশীদ খাল খননের পর ভরাট করে গাড়ির গ‍্যারেজ, কার গরজে? রংপুরে নিখোঁজের এক দিন পর পাটখেতে মিলল শিক্ষার্থীর মরদেহ পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে বদলে যাবে ২৪ জেলার দৃশ্যপট, তৈরি হবে নতুন সম্ভাবনা নিয়োগ দেবে ব্যাংক এশিয়া জিপিএস ছাড়া গণপরিবহনের ফিটনেস সনদ ইস্যু ও নবায়ন হবে না পরিবেশবান্ধব বায়োগ্যাস প্রযুক্তি সম্প্রসারণে একসঙ্গে কাজ করবে প্রাণ ডেইরী ও এটিইসি খিলগাঁওয়ে স্কয়ার গ্রুপের ফ্রি হেলথ ক্যাম্প অনুষ্ঠিত জামালপুরে পুলিশের চাকরি দেওয়ার চুক্তি, ২ প্রতারক গ্রেপ্তার সাঙ্গু নদে নিখোঁজ শিশুর সন্ধান মেলেনি ১৬ ঘণ্টায়ও

সিজদার আয়াত তেলাওয়াত কি জোরে পড়া উত্তম?

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৫, ০৭:০০ পিএম
সিজদার আয়াত তেলাওয়াত কি জোরে পড়া উত্তম?
কোরআনুল কারিমের ছবি। সংগৃহীত

প্রশ্ন: আমরা প্রতিদিন ভোরে, ফজরের নামাজের পর, বাসায় কোরআন তেলাওয়াত করি। ওই সময় পরিবারের কেউ অন্য কাজে ব্যস্ত থাকে, কেউ জিকির করে, আবার কেউ ঘুমিয়ে থাকে। আমার মনে হয়, তেলাওয়াত একটু উঁচু আওয়াজে পড়লে ভালো লাগে। কিন্তু যখন সিজদার আয়াত আসে, তখন আমি দ্বিধায় পড়ে যাই আস্তে পড়ব, নাকি জোরে? যদি আস্তে পড়ি, তবে অন্যরা শুনতে পাবে না। আর জোরে পড়লে তাদের হয়তো কষ্ট হবে বা তারা সিজদা দিতে পারবে না। আমার মনে হয়, সিজদা দিতে কষ্ট কিসের? সবার শোনা উচিত, যাতে তারা সিজদা আদায় করতে পারে। কোনটি সঠিক?


উত্তর: আপনার প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তেলাওয়াতের আদব ও অন্যদের প্রতি সম্মান দেখানোর সঙ্গে সম্পর্কিত। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই উত্তম।যদি ঘরের সবাই তেলাওয়াত শোনার জন্য প্রস্তুত থাকে, অজুর সঙ্গে থাকে এবং সিজদা আদায় করার মতো পরিবেশ থাকে, তাহলে আপনি অবশ্যই উঁচু আওয়াজে সিজদার আয়াত তেলাওয়াত করতে পারেন। এতে সবাই সওয়াব পাবে এবং সিজদা আদায় করতে উৎসাহিত হবে।

তবে, যদি ঘরের সদস্যরা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন, ঘুমান, অথবা সিজদা আদায় করার জন্য প্রস্তুত না থাকেন, তাহলে সিজদার আয়াতটি আস্তে পড়া উত্তম। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে:

১. কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা: জোরে পড়লে যদি অন্যদের ঘুম বা কাজে ব্যাঘাত ঘটে, তবে তা তাদের জন্য কষ্টের কারণ হতে পারে। ইসলাম অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করে। 
২. গুনাহ থেকে বাঁচানো: যদি আপনি জোরে পড়েন এবং তারা ব্যস্ততার কারণে সিজদা আদায় করতে না পারেন, তাহলে তারা গুনাহগার হতে পারেন। তাদেরকে এই গুনাহের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আস্তে পড়া ভালো। 
৩. ভুল এড়ানো: যদি তারা শোনে কিন্তু পরে সিজদা করতে ভুলে যায়, তাহলেও গুনাহ হতে পারে। তাই, এমন পরিস্থিতিতে তেলাওয়াতের আওয়াজ কম রাখাই শ্রেয়।

অতএব, আপনার মনে যে খটকা লাগে যে জোরে পড়া উচিত, তা ভুল নয়। কিন্তু শরিয়ত এ ক্ষেত্রে অন্যদের অবস্থা বিবেচনা করার পরামর্শ দেয়। যদি আপনি নিশ্চিত হন যে অন্যরা সিজদা আদায় করতে পারবে না, তবে তাদের প্রতি সম্মান ও দয়া দেখিয়ে সিজদার আয়াত আস্তে পড়াই অধিক উত্তম।

তথ্যসূত্র: মাজমাউল আনহুর (১/২৩৮), বাদায়েউস সানায়ে (১/৪৫০), আননাহরুল ফায়েক (১/৩৪৩)

তীব্র তাপপ্রবাহে করণীয়

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৫:০০ পিএম
তীব্র তাপপ্রবাহে করণীয়
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের আকাশ এখন আগুনঝরা। বিভিন্ন জেলার ওপর দিয়ে বইছে তাপপ্রবাহ; কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছুঁইছুঁই। রাস্তায় বের হওয়া দিনমজুর, রিকশাচালক, কৃষক ও খেটে খাওয়া মানুষ এই তাপপ্রবাহে সবচেয়ে কষ্টে আছেন। এমন সময়ে একজন মুমিনের কর্তব্য কেবল গরমে হাঁসফাঁস করা নয়; বরং ঈমান, সবর ও সতর্কতা মিলিয়ে নিরাপদভাবে জীবনযাপনের চেষ্টা করা উচিত।

ইসলাম তাপকে নিছক প্রাকৃতিক বিড়ম্বনা হিসেবে দেখে না, দেখে এক গভীর স্মারক হিসেবে। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘বলো, জাহান্নামের আগুন এর চেয়েও কঠিন উত্তপ্ত, যদি তারা বুঝত!’ (সুরা তাওবা, ৮১)। দুনিয়ার সামান্য রোদের এই অসহনীয় তাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়; আখিরাতের কঠিন উত্তাপের কথা। তাই গরম যেন আমাদের গুনাহ থেকে বিরত থাকার এবং বেশি বেশি ইস্তিগফারের তাগিদ দেয়।

আবার পানির অপরিহার্যতা স্মরণ করিয়ে আল্লাহ এরশাদ করেছেন, ‘আমি পানি থেকেই প্রতিটি জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া, ৩০)। গরমে শরীরের পানিশূন্যতাই সবচেয়ে বড় বিপদ, তাই পানির এই নিয়ামতের কদর করা ঈমানি দায়িত্ব। পানাহারে আল্লাহর নির্দেশ হলো সংযম, তিনি এরশাদ করেছেন, ‘খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।’ (সুরা আরাফ, ৩১)।

তীব্র গরমে নামাজ নিয়েও রাসুলুল্লাহ (সা.) দিয়েছেন স্বস্তির নির্দেশনা। তিনি বলেছেন, ‘গরম যখন প্রচণ্ড হয়, তখন (জোহরের) নামাজ ঠাণ্ডার সময়ে আদায় করো; কেননা প্রচণ্ড গরম জাহান্নামের উত্তাপের নিশ্বাস থেকে।’ (বুখারি, ৫৩৩-৫৩৪; মুসলিম, ৬১৫)। অর্থাৎ দুপুরের তীব্র রোদে কষ্ট করে নয়, একটু দেরিতে; যখন তাপ কমে আসে, তখন জোহর পড়ার অনুমতি দিয়েছেন তিনি। এ যেন গরমকালে মুসল্লির জন্য রহমতস্বরূপ ব্যবস্থা।


তাপপ্রবাহে নিরাপদ থাকতে সুন্নাহ ও বিজ্ঞান মিলিয়ে পরামর্শগুলো মেনে চলা যায়–

প্রথমত, পর্যাপ্ত পানি পান করুন। তৃষ্ণা পাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে নিয়মিত পানি, ডাবের পানি বা খাবার-স্যালাইন পান করুন। অতিরিক্ত ঘামে শরীর থেকে লবণ বেরিয়ে যায়, তাই স্যালাইন বিশেষ উপকারী। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সবচেয়ে প্রিয় পানীয় ছিল মিষ্টি ও ঠাণ্ডা পানীয় (তিরমিজি, ১৮৯৫)।

তীব্র গরমে ডাবের পানি, লেবু-পানি বা ঠাণ্ডা পানি যে শরীর ও মনকে স্বস্তি দেয়, নবিজি (সা.)-এর এই পছন্দে তারই ইঙ্গিত আছে। আর পানি পানের পদ্ধতিও তিনি শিখিয়েছেন–এক নিশ্বাসে ঢকঢক করে নয়, বরং কয়েক নিশ্বাসে ধীরে ধীরে পান করতেন (মুসলিম, ২০২৮)। গরমে হঠাৎ অতিরিক্ত ঠাণ্ডা পানি একসঙ্গে গলায় ঢালার চেয়ে এ পদ্ধতি অনেক বেশি নিরাপদ।

দ্বিতীয়ত, রোদ এড়িয়ে চলুন। বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৩-৪টা পর্যন্ত সূর্য সবচেয়ে প্রখর থাকে। এ সময় খুব প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়াই ভালো; বের হলে ছাতা, টুপি বা ভেজা কাপড় ব্যবহার করুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) দীর্ঘক্ষণ এমনভাবে বসতে নিষেধ করেছেন, যাতে শরীরের একাংশ রোদে আর একাংশ ছায়ায় থাকে; তিনি একে শয়তানের বসার স্থান বলেছেন (আবু দাউদ, ৪৭৮৮)। আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, এর একটি হিকমত হলো রোদের তাপে কষ্ট পাওয়া এড়ানো। অর্থাৎ দুপুরের প্রখর রোদকে নবিজি (সা.) নিজেই এড়িয়ে চলার শিক্ষা দিয়েছেন।

তৃতীয়ত, হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরুন। ইসলাম পর্দা ও শালীনতা বজায় রেখে আরামদায়ক পোশাকের অনুমতি দেয়। সুতির, হালকা রঙের ঢিলেঢালা কাপড় তাপ শোষণ কম করে এবং বাতাস চলাচলে সাহায্য করে। আনাস ও উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সবচেয়ে প্রিয় পোশাক ছিল ‘কামিস’ (লম্বা, ঢিলেঢালা জামা) (আবু দাউদ, ৪০২৫; তিরমিজি, ১৭৬২) 
উষ্ণ আবহাওয়ায় তার পরিধেয় ছিল মূলত ঢিলেঢালা ও আবৃত পোশাক, যা শরীরকে রোদ থেকে রক্ষা করত আর বাতাস চলাচলেও বাধা দিত না। 

চতুর্থত, হালকা খাবার খান। ভারী, অতিরিক্ত মসলাযুক্ত ও বেশি ভাজাপোড়া খাবার গরমে শরীরের ওপর চাপ বাড়ায়। মৌসুমি ফল, শসা, লেবু-পানি শরীরকে ঠাণ্ডা রাখে।
মিকদাম ইবনে মাদিকারিব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আদম-সন্তান পেটের চেয়ে খারাপ কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখার মতো কয়েক লোকমাই তার জন্য যথেষ্ট। তবু যদি বেশি খেতেই হয়, তাহলে এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ নিশ্বাসের জন্য রাখুক।’ (তিরমিজি, ২৩৮০; ইবনে মাজাহ, ৩৩৪৯) । ভারী ও অতিরিক্ত খাবার গরমে হজমে চাপ ফেলে শরীরকে আরও ক্লান্ত করে–এই পরিমিতির সুন্নাহই তখন সবচেয়ে উপকারী।

পঞ্চমত, হিটস্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন। মাথা ঘোরা, প্রচণ্ড দুর্বলতা, ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া, বমিভাব বা অজ্ঞান হওয়া–এসব দেখা দিলে দ্রুত ছায়াযুক্ত শীতল স্থানে নিয়ে শরীরে পানি দিন এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জ্বর জাহান্নামের উত্তাপ থেকে, তাই তা পানি দিয়ে ঠাণ্ডা করো।’ (বুখারি, ৩২৬৩; সহিহ মুসলিম, ২২০৯) শরীর অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে গেলে পানি দিয়ে শীতল করার এই নির্দেশনা সরাসরি হিটস্ট্রোক মোকাবিলার সঙ্গে মিলে যায়–আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও মাথা ঘোরা, প্রচণ্ড দুর্বলতা বা অজ্ঞানভাব দেখা দিলে দ্রুত শরীর ঠাণ্ডা করার পরামর্শ দেয়।

তীব্র গরমে শুধু নিজে বাঁচলেই হবে না, অন্যকে বাঁচানোও ঈমানের দাবি। সাহাবি সাদ ইবনু উবাদা (রা.) যখন তার প্রয়াত মায়ের পক্ষ থেকে সদকা করতে চাইলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন কোন সদকা সর্বোত্তম। তিনি উত্তর দিলেন, ‘পানি পান করানো।’ (ইবনে মাজাহ, ৩৬৮৪; আবু দাউদ, ১৬৭৯) 
এরপর সাদ (রা.) মদিনায় একটি কূপ খনন করে দিয়েছিলেন। আজকের প্রেক্ষাপটে রাস্তার পাশে তৃষ্ণার্ত পথিক, রিকশাচালক বা শ্রমিকদের জন্য একটু ঠাণ্ডা পানি বা স্যালাইনের ব্যবস্থা করা–এ এক মহৎ সদকা।

এমনকি অবলা প্রাণীর তৃষ্ণা মেটানোও আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। নবিজি (সা.) সেই ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে তৃষ্ণার্ত এক কুকুরকে কূপ থেকে পানি তুলে পান করিয়েছিল, আর তাতেই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিটি জীবন্ত প্রাণের সেবায় সওয়াব রয়েছে।’ (বুখারি, ২৩৬৩; মুসলিম, ২২৪৪)। তাই বাড়ির ছাদে বা উঠানে পাখি ও প্রাণীর জন্য এক পাত্র পানি রেখে দেওয়াও এক নীরব ইবাদত। এই তাপপ্রবাহ আমাদের জন্য দ্বিমুখী পরীক্ষা–সবরের পরীক্ষা এবং প্রজ্ঞার পরীক্ষা। গরমকে গালি না দিয়ে বরং একে আখিরাতের স্মারক হিসেবে নিয়ে বেশি বেশি ইস্তিগফার করি, সুন্নাহ ও বিজ্ঞানের নির্দেশনা মেনে নিজেকে নিরাপদ রাখি, আর তৃষ্ণার্ত মানুষ ও প্রাণীর পাশে দাঁড়াই। 

লেখক: খতিব, বঙ্গভবন জামে মসজিদ

২০ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৭:০০ এএম
২০ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি
জুন, ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচির ছবি

প্রতিদিন সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। নামাজ (সালাত) ইসলাজুনর পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি এবং ইসলাজুনর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, (হে আল্লাহর রাসুল!) আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় আমল কোনটি? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘নামাজ (বুখারি ও মুসলিম)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সেভাবে নামাজ আদায় করো, যেভাবে আমাকে নামাজ আদায় করতে দেখেছ।’ (বুখারি, ৬৩১)

সঠিকভাবে নামাজ আদায় করতে হলে, নামাজের সময় জানতে হবে।

 

আজ ২০ জুন ২০২৬, শনিবার। ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো— 

জোহর

১২.০৩ মিনিট

আসর

৪.৩৯ মিনিট

 

মাগরিব

৬.৫১ মিনিট

এশা

৮.০৮ মিনিট

 

ফজর (২১ জুন)

.৪৪ মিনিট

 

 

বিভাগীয় শহরের জন্য উল্লিখিত সময়ের সঙ্গে যেসব বিভাগে সময় যোগ-বিয়োগকরতে হবে।

বিয়োগ

চট্টগ্রাম: ৫ মিনিট

সিলেট: ৬ মিনিট

যোগ

খুলনা: ৩ মিনিট

রাজশাহী: ৭ মিনিট

রংপুর: ৮ মিনিট

বরিশাল: ১ মিনিট

 

সূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন

মৌসুমি ফল আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৭:০০ পিএম
মৌসুমি ফল আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত
ছবি: সংগৃহীত

ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ যেন ফলের এক অফুরন্ত ভান্ডার। বছরজুড়ে ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় বাজারের ফলের ডালি। প্রতিটি মৌসুম নিয়ে আসে নতুন স্বাদ, নতুন পুষ্টি। এই বৈচিত্র্য নিছক প্রকৃতির খেলা নয়, বরং মহান আল্লাহর অপার দয়ার নিদর্শন।

পবিত্র কোরআনে ফলকে আল্লাহ বারবার তার নেয়ামত হিসেবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি এরশাদ করেছেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য তা দিয়ে উৎপন্ন করেন শস্য, জলপাই, খেজুর, আঙুর এবং সব ধরনের ফল।’ (সুরা নাহল, ১১)। অন্যত্র মানুষকে নিজের খাবারের প্রতি দৃষ্টি দিতে বলে আল্লাহ আঙুর, খেজুর, বাগান ও ফলের কথা উল্লেখ করে এরশাদ করেছেন, ‘এসব তোমাদের ও তোমাদের গবাদিপশুর জীবনোপকরণস্বরূপ।’ (সুরা আবাসা, ২৪-৩২)। প্রতিটি মৌসুমি ফল তাই আল্লাহরই দান, যা চিন্তাশীল মানুষকে তার কুদরতের কথা স্মরণ করায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে মৌসুমি ফল খেতেন এবং তা উপভোগ করতেন। বর্ণিত আছে, তিনি তরমুজ পাকা খেজুরের সঙ্গে খেতেন (আবু দাউদ, ৩৮৩৬; তিরমিজি, ১৮৪৩)। তিনি শসা খেতেন পাকা খেজুরের সঙ্গে (বুখারি, ৫৪৪০; মুসলিম, ২০৪৩) বিশেষভাবে, মৌসুমের প্রথম ফল হাতে পেলে নবিজি (সা.) আল্লাহর কাছে বরকতের দোয়া করে এই দোয়া পড়তেন–আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি সামারিনা, ওয়া বারিক লানা ফি মাদিনাতিনা...—হে আল্লাহ! আমাদের ফলে বরকত দিন, আমাদের শহরে বরকত দিন...। এরপর তিনি ফলগুলো উপস্থিত সবচেয়ে ছোট শিশুর হাতে তুলে দিতেন (মুসলিম, ১৩৭৩)। এ থেকে শেখা যায়, নতুন ফল পেলে কৃতজ্ঞতা ও দোয়ার সুন্নাহ।

নেয়ামত ভোগের পর শুকরিয়া আদায় ঈমানের দাবি। আল্লাহ এরশাদ করেছেন, ‘আমি তোমাদের যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি তা খাও এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো।’ (সুরা বাকারা, ১৭২)। আর শুকরিয়ার প্রতিদান বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও তিনি দিয়েছেন, এরশাদ করেছেন, ‘যদি কৃতজ্ঞ হও, অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম, ৭)। তাই প্রতিটি মৌসুমি ফল মুখে দেওয়ার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ আর শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে আমরা যেন স্মরণ করি–এ স্বাদ, এ পুষ্টি সবই আল্লাহর দান। আল্লাহ আমাদের তার নেয়ামতের কদর করার ও যথাযথ শুকরিয়া আদায়ের তওফিক দিন। আমিন।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

‘বাংলাদেশ থেকেও বিশ্বমানের উমরা সেবা দেওয়া সম্ভব’

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৩:০০ পিএম
‘বাংলাদেশ থেকেও বিশ্বমানের উমরা সেবা দেওয়া সম্ভব’
ছবি: খবরের কাগজ

প্রতি বছর লাখ লাখ বাংলাদেশি উমরা পালনের জন্য সৌদি আরব যান। কিন্তু সেবার মান, এজেন্সির স্বচ্ছতা ও যাত্রীদের ভোগান্তি নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। বাংলাদেশ থেকে কি বিশ্বমানের উমরা সেবা দেওয়া সম্ভব নাকি অসম্ভব, প্রতিবন্ধকতা কী কী—এসব নিয়েই ট্রাভেল সেবা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উমরা সেবা ও মনির গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান মো. মনিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলেছেন মুফতি উমর ফারুক আশিকী

অন্যান্য মুসলিম দেশের তুলনায় বাংলাদেশের উমরা সেবা নিয়ে এত সমালোচনা কেন?
মো. মনিরুল ইসলাম: সততার সঙ্গে স্বীকার করছি, সমালোচনার কিছু ভিত্তি আছে। আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে এ সেক্টরে ‘যত কম খরচে যত বেশি যাত্রী নেওয়া যায়’ এমন একটা মানসিকতা কাজ করেছে। আর যখন কম খরচে বেশি যাত্রী নেওয়ার মানসিকতা কাজ করবে, তখন সেবার মান গৌণ হয়ে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশ প্রশিক্ষিত গাইড, নির্দিষ্ট মানের হোটেল এবং প্যাকেজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে সুনাম কুড়িয়েছে। আমরা সে জায়গায় পিছিয়ে। আমাদের উমরা প্যাকেজ বিভিন্ন অস্বচ্ছতায় মোড়ানো থাকে। তবে এগুলো অযোগ্যতার সমস্যা নয়, ব্যবস্থাপনার সমস্যা, যা খুব সহজেই ঠিক করা সম্ভব।

বিমান টিকিট ও ফ্লাইট নিয়ে অভিযোগ আসে, এ ব্যাপারে আপনাদের অবস্থান কী?
মো. মনিরুল ইসলাম: বড় অভিযোগ হলো শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট পরিবর্তন করা বা দীর্ঘ ট্রানজিট চাপিয়ে দেওয়া। অনেক যাত্রী জানেনই না তিনি কোন বিমানে যাচ্ছেন, কত ঘণ্টার ট্রানজিট বিরতিতে যাচ্ছেন। আমরা চুক্তির সময়ই বিমানের নাম, রুট ও ট্রানজিটের সময়সহ সব আলোচনা লিখিতভাবে জানিয়ে দিই। বয়স্ক যাত্রীদের জন্য যথাসম্ভব সরাসরি বা স্বল্প-ট্রানজিট ফ্লাইট রাখি, কারণ দীর্ঘ যাত্রা তাদের শরীরে মারাত্মক চাপ ফেলে।

হোটেল ও আবাসন নিয়ে সবচেয়ে পুরোনো অভিযোগ হলো—যে মানের হোটেল দেওয়ার কথা ছিল তার চেয়ে নিম্নমানের হোটেল দিয়েছে। এর সমাধান কী?
মো. মনিরুল ইসলাম: উমরা সফরের সবচেয়ে বড় ফাঁকি হলো এটি। অনেকে হারামের কাছে বলে বাস্তবে কয়েক কিলোমিটার দূরে রাখেন। এখন নুসুকের নিয়মে কেবল মন্ত্রণালয় অনুমোদিত হোটেলই ব্যবহার করতে হয়, আর বুকিং ডিজিটালি নথিভুক্ত হয়–ফলে মিথ্যা বলার সুযোগ কমেছে। আমরা হোটেলের নাম, হারাম থেকে দূরত্ব ও গুগল ম্যাপের লিংক যাত্রীকে আগেই দিই, যেন নিজে যাচাই করতে পারেন।

খাবার নিয়ে যাত্রীদের, বিশেষত বয়স্কদের অভিযোগ থাকে। এ বিষয়ে কী করছেন?
মো. মনিরুল ইসলাম: ভিনদেশি খাবারে অনেকেরই, বিশেষ করে বয়স্ক যাত্রীদের কষ্ট হয়। আমরা পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বাংলা ঘরানার খাবার–ভাত, ডাল, মাছ-মাংস দেওয়ার ব্যবস্থা রাখি এবং খাবারের মান নিয়মিত তদারকি করি। ইবাদতের পূর্ণ শক্তি ধরে রাখতে সুস্থ শরীর জরুরি, তার ভিত্তিই হলো ভালো খাবার।

ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও গাইড বা মুয়াল্লিম সেবা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
মো. মনিরুল ইসলাম: এটিই উমরার প্রাণ। অনেকে জীবনে প্রথমবার যান, ইহরাম-তাওয়াফ-সাঈর নিয়ম ঠিকমতো জানেন না। আমরা যাত্রার আগে দেশে প্রশিক্ষণ করাই এবং সঙ্গে প্রশিক্ষিত মুয়াল্লিম দিই, যিনি প্রতিটি ধাপে কোরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী সঠিক নিয়ম শেখান। নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা সহায়িকা ও নিরাপদ ব্যবস্থা রাখা হয়।

প্যাকেজের দাম ও লুকানো খরচ নিয়ে বড় অভিযোগ। স্বচ্ছতা কীভাবে আসবে?
মো. মনিরুল ইসলাম: লুকানো খরচই আমাদের এ খাতের সবচেয়ে বড় আস্থার সংকট। এ থেকে বেরিয়ে আশা আবশ্যক। কারণ, উমরা সাধারণ কোনো সফর না, এটি ইবাদতের সফর। সুতরাং এ সফরে কোনো কিছু লুকানো থাকা উচিত না। 

আমরা চুক্তিপত্রে ভিসা, বিমান, হোটেল, খাবার, পরিবহন, জিয়ারত–প্রতিটি খাত আলাদা করে লিখে দিই; পরে কোনো বাড়তি টাকা নেওয়া হয় না। যাত্রী আগেই জানেন তিনি কী পাচ্ছেন, কত টাকায়। স্বচ্ছতাই দীর্ঘমেয়াদে আস্থা তৈরি করে, আর আস্থাই এ ব্যবসার মূলধন।

আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বমানের উমরা সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা কী কী?
মো. মনিরুল ইসলাম: বাংলাদেশ থেকে বিশ্বমানের উমরা সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানতম সমস্যা হলো যথেষ্ট প্রশিক্ষণের অভাব। বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশ, যারা ভালো মানের উমরা সেবা দেন বলে বিশ্বে স্বীকৃত তারা যাত্রীদের উন্নতমানের ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে সফরে পাঠান। আমাদের দেশে এ প্রশিক্ষণের প্রচণ্ড অভাব। যারা কিছু প্রশিক্ষণ দেন, তাও যথেষ্ট নয়। 

এছাড়া আরেকটি সমস্যা হলো, উমরা সেবাকে নিছক বাণিজ্যিকীকরণ মানসিকতা। ব্যবসা করা তো হলাল, তবে উমরা সেবাকে নিছক ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করার কারণে মানসিকতাগত ঘাটতি ঘটে এবং এর ফলে যাত্রীরা প্রতারিত হন। 

বাংলাদেশ কি বিশ্বমানের উমরা সেবা দিতে পারবে?
মো. মনিরুল ইসলাম: অবশ্যই পারবে, এ ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী। আমাদের যাত্রীর সংখ্যা বিশাল, চাহিদাও প্রবল। দরকার শুধু জবাবদিহি, প্রশিক্ষণ আর সততা। সরকার ও হাব যদি কেবল লাইসেন্সধারী, যাচাই করা এজেন্সিকে কাজের সুযোগ দেয়, অসাধুদের কঠোরভাবে দমন করে, আর আমরা মালিকরা মুনাফার আগে যাত্রীর মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিই; তাহলে মালয়েশিয়া কেন, যেকোনো দেশের সম সেবা বাংলাদেশ দিতে পারবে। মনে রাখতে হবে, আমরা শুধু পর্যটক পাঠাচ্ছি না, আল্লাহর মেহমান পাঠাচ্ছি। এই দায়িত্ববোধটুকু জাগলেই বাংলাদেশের উমরা সেবা বিশ্বসেরা হবে, ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহর মাস মুহাররমে করণীয়-বর্জনীয়

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১০:০০ এএম
আল্লাহর মাস মুহাররমে করণীয়-বর্জনীয়
ছবি: সংগৃহীত

বছর শেষ হয়। নতুন বছর আসে। কিন্তু আরবি নববর্ষের আগমন শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয়। এটি একটি ডাক, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার বান্দার দিকে ডাক। নতুন করে শুরু করার, পুরোনো গুনাহ ঝেড়ে ফেলার, আর তার দিকে ফিরে আসার ডাক। কেননা আরবি ১২ মাসের প্রথম মাস, মুহাররম, কোনো সাধারণ মাস নয়। এটি স্বয়ং আল্লাহর মাস। মুহাররম শব্দটি আরবি হারাম ধাতু থেকে এসেছে, অর্থ নিষিদ্ধ বা পবিত্র। নামের মধ্যেই এই মাসের মর্যাদার ইঙ্গিত।

ইসলামপূর্ব আরবেও এই মাসকে সম্মান করা হতো। যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ থাকত, রক্তপাত নিষিদ্ধ ছিল। ইসলাম এসে সেই মর্যাদাকে আরও সুদৃঢ় করেছে। দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে হিজরি সনের গণনা শুরু করেন। তিনি মুহাররমকেই এই নতুন সনের প্রথম মাস নির্ধারণ করেন।

আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা ১২টি, আল্লাহর কিতাবে, যেদিন থেকে তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। সুতরাং এই মাসগুলোয় তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না। (সুরা তাওবা: ৩৬)। এই চারটি সম্মানিত মাস হলো, মুহাররম, রজব, জিলকদ ও জিলহজ। ইমাম ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ মাসগুলোয় গুনাহের ভার বহুগুণ বেশি, তেমনি নেক আমলের প্রতিদানও বহুগুণ বেশি। মানুষ যেন সারা বছর পাপ করে এই মাসে এসে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ পায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ। (মুসলিম: ১১৬৩) ইবনে রজব (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন অত্যন্ত চমৎকার কথা–আল্লাহতায়ালা শুধু সেই সত্তা বা বস্তুকেই নিজের দিকে সম্বন্ধিত করেন, যা তার কাছে সর্বোচ্চ মর্যাদার, যেভাবে তিনি তার নবিদের আবদুল্লাহ বলেছেন, কাবাকে বায়তুল্লাহ বলেছেন, আর উষ্ট্রীকে নাকাতুল্লাহ বলেছেন। সেই একই সম্মানে মুহাররমকে বলা হয়েছে শাহরুল্লাহ, আল্লাহর মাস। আর যেহেতু রোজাকে আল্লাহ নিজেই বলেছেন এটি আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব, তাই এই মাসে রোজা রাখার মর্যাদা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

মুহাররমের দশম দিন, আশুরা। আরবি আশারা থেকে এই নাম, অর্থ দশ। এই একটি দিনে আল্লাহতায়ালা একাধিকবার তার অসীম রহমতের দরজা খুলে দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় ঘটনা, এই দিনে হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। সমুদ্র দুই ভাগ হয়েছিল। লাখ লাখ মানুষ পার হয়েছিল। আর পেছনে ফেরাউন তার বাহিনীসহ সেই পানিতেই ডুবে গিয়েছিল। ইতিহাসের সেই বিস্ময়কর দৃশ্যের কথা কল্পনা করুন, একটি অসহায় জাতির মুক্তি, একটি অহংকারী জালিমের পতন। এই দিনেই! হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটা কেন? তারা বলল, এটা মহান দিন। এই দিনে আল্লাহ মুসা ও তার সম্প্রদায়কে রক্ষা করেছেন, ফেরাউনকে ডুবিয়ে দিয়েছেন। তাই মুসা (আ.) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রোজা রেখেছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আমরা মুসার অধিক হকদার। তখন তিনি নিজে রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখতে বললেন। (বুখারি: ২০০৪)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আশুরার রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি, তিনি বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন। (মুসলিম: ১১৬২), এক বছরের ছোট গুনাহ! শুধু একটি রোজার বিনিময়ে। এই সুযোগ কি হাতছাড়া করতে পারে?

তবে শুধু দশম তারিখে রোজা রাখলে ইহুদিদের সঙ্গে মিল হয়ে যায়। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, পরের বছর বেঁচে থাকলে আমি নবম তারিখেও রোজা রাখব। (মুসলিম: ১১৩৪), পরের বছর আসার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেছেন। 

মুহাররমে করণীয় আমল

অধিক নফল রোজা রাখা। গোটা মুহাররম মাসই নফল রোজার জন্য বিশেষ। ইবনে রজব (রহ.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জিলহজ মাসে রোজা রেখে বছর শেষ করল এবং মুহাররমে রোজা রেখে বছর শুরু করল, তার পুরো বছরটি ইবাদতের মধ্যে ধরা যায়।

তওবা ও ইস্তেগফার বাড়ানো। নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই পুরোনো গুনাহের বোঝা ঝেড়ে ফেলুন। মাসটি আল্লাহর মাস, তাই তার কাছে বেশি বেশি ফিরে আসুন। প্রতিটি সন্ধ্যায় একটু সময় রাখুন হিসাব-নিকাশের, গত বছর কী হারিয়েছি, এই বছর কী পাওয়ার চেষ্টা করব।

নেক আমলে মনোযোগী হওয়া। সম্মানিত মাসে নেক আমলের প্রতিদান বহুগুণ বেশি। কোরআন তেলাওয়াত, নামাজ, সদকা–সবকিছুতে মনোযোগ বাড়ান। ইমাম ইবনে কাসির বলেছেন, আল্লাহ যাকে সম্মান দিয়েছেন, জ্ঞানীরা সেটাকে সম্মান করে।

পরিবারের জন্য খরচ বাড়ানো। একটি বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি আশুরার দিন পরিবারের জন্য প্রশস্ত খরচ করে, আল্লাহ সারা বছর তার রিজিকে প্রশস্ততা দেন। তবে এই হাদিসটি মুহাদ্দিসদের দৃষ্টিতে দুর্বল। তাই এটি ফজিলতের আমল হিসেবে বিবেচনা করা গেলেও একে মজবুত ভিত্তিতে প্রচার করা ঠিক নয়।

মুহাররমে বর্জনীয় বিষয়

নিজেদের ওপর জুলুম করা। আল্লাহ নিজেই সুরা তাওবায় সতর্ক করেছেন, এই মাসে নিজেদের প্রতি অন্যায় করো না। পাপাচারে জড়ানো, হক নষ্ট করা, এগুলো অন্য মাসেও হারাম, কিন্তু এই মাসে আরও বেশি গুরুতর।

মাতম ও বুকে বাড়ি মারা। হজরত হুসাইন (রা.)-এর স্মরণে বুকে বাড়ি মারা, শোকমিছিল বের করা, নিজেকে আঘাত করা, এগুলো ইসলামের নির্দেশ নয়, বরং জাহেলি প্রথা। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট বলেছেন, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে গালে থাপ্পড় দেয়, কাপড় ছেঁড়ে এবং জাহেলি যুগের মতো বিলাপ করে। (বুখারি: ১২৯৪; মুসলিম: ১০৩) হজরত ইয়াকুব (আ.) প্রিয় পুত্র ইউসুফকে হারিয়ে কাঁদতেন, তার চোখ সাদা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তিনি বুকে বাড়ি মারেননি, জামা ছেঁড়েননি। বেদনা প্রকাশের ইসলামসম্মত পথ হলো ধৈর্য আর দোয়া।

আশুরাকে বিশেষ উৎসব বানানো। কেউ কেউ এই দিন বিশেষ খাবার রান্না করে, উৎসব পালন করে, এরও কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই। ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, এই দিনকে কেউ শোকের দিন বানায়, কেউ উৎসবের দিন বানায়, দুটোই বিদআত।

মুহাররমকে অশুভ মাস মনে করা। অনেকে মনে করেন এই মাসে বিয়ে-শাদি বা শুভ কাজ করা যায় না। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কুসংস্কার, ইসলামে এর কোনো প্রমাণ নেই।

৬১ হিজরির মুহাররমের দশম তারিখ। ইরাকের কারবালার মাঠ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র, ফাতেমা (রা.)-এর কলিজার টুকরা, হজরত হুসাইন (রা.) সেদিন ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শহিদ হয়েছিলেন। সেই ত্যাগ মুসলিম উম্মাহর জন্য চিরকালের অনুপ্রেরণা। তাকে ভালোবাসা ঈমানের দাবি, কিন্তু সেই ভালোবাসা প্রকাশ পাবে তার পথে চলার মধ্যে, মাতম আর শোকমিছিলে নয়। মুহাররম আমাদের দরজায় এসে দাঁড়ায় প্রতি বছর, একটাই বার্তা নিয়ে; নতুন করে শুরু করো। গুনাহ ছেড়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসো। আশুরার রোজা এই যাত্রার সবচেয়ে মূল্যবান পাথেয়। রমজান আসতে এখনো অনেক বাকি, কিন্তু এখনই একটি রোজা রাখলে এক বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যেতে পারে।

 

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক