উমরার প্রধান বা মূল কাজ বা আমল চারটি। ইহরাম বাঁধা। পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফ করা। সাফা-মারওয়া সাতবার সাঈ করা এবং মাথার চুল মুণ্ডানো বা ছোট করা। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হলো-
মূল আমল—১: ইহরাম বাঁধা
বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা হয়ে মক্কা গেলে আগেই ইহরাম বেঁধে নিন।
✓ ইহরামের সময় উমরার নিয়তে এই দোয়া পড়ুন- বাংলা উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল উমরাতা ফা-ইয়াসসিরহা লি ওয়া তাকাব্বালহা মিন্নি।’ বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ, আমি উমরার ইচ্ছা করছি; আপনি আমার জন্য তা সহজ করুন এবং কবুল করুন। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) যেভাবে তালবিয়া পড়েছেন, সেভাবে তালবিয়া পড়ুন।
✓ ইহরামের কাপড় পরবেন যেভাবে- ইহরামের কাপড় দুটি। একটি লুঙ্গির মতো করে পরতে হয়। অপরটি উভয় কাঁধ ঢেকে চাদর পরার মতো করে শরীরের ওপরের অংশে পরতে হয়। (আহকামে হজ: ৩৪)
সঙ্গে পায়ের পাতার উপরিভাগ খোলা থাকে এমন দুই ফিতাবিশিষ্ট চপ্পল বা স্যান্ডেল পড়ুন। (দুররুল মুখতার: ২/৬৮৫)
✓ ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজগুলো এড়িয়ে চলুন- ইহরাম বাঁধার পর থেকে পুরুষ ও নারীর জন্য কিছু কাজ করা হারাম বা নিষিদ্ধ। অভিজ্ঞ আলেম-মুয়াল্লিমের কাছে থেকে বিষয়গুলো মেনে চলুন।
✓ মসজিদে হারামে প্রবেশ করুন- মসজিদুল হারামে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ, দরুদশরিফ ও মসজিদে প্রবেশের দোয়া পড়ে ডান পা দিয়ে পরিপূর্ণ আদবের সঙ্গে প্রবেশ করুন এবং সঙ্গে আনা কাঁধে ঝুলানো ব্যাগে জুতা নিয়ে নিন। তাওয়াফ ও সাঈ সম্পন্ন করে কে কোথায় কীভাবে মিলিত হবেন, সে ব্যাপারে পরামর্শ করে সবাইকে দিকনির্দেশনা দিলে ভালো হয়।
✓ প্রথম কাবা দর্শন- আপনি এখন প্রভুর ঘরের সামনে। সারা জীবন দূর থেকে যে কাবাকে সামনে রেখে সিজদা করেছেন; আজকে বাস্তবে সেই কাবার সামনে হাজির হচ্ছেন। সুতরাং হৃদয়ের সবটুকু শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আবেগ-ভক্তি দিয়ে বিষয়টি অনুভব করুন এবং রব্বে কাবার কাছে কায়মানুবাক্যে দোয়া করুন। প্রথমবার কাবা দেখার সময় যে দোয়া করা হয়, তা কবুল হয়।
মূল আমল—২: ধারাবাহিক তাওয়াফ
পবিত্র কাবাঘর সাতবার প্রদক্ষিণ করাকে তাওয়াফ বলা হয়।
✓ ইজতিবা করুন- তাওয়াফের শুরুতে পুরুষরা প্রথমে ইজতিবা করুন। মানে ডান কাঁধ খালি রেখে চাদরের মাঝের অংশ বগলের নিচ দিয়ে পাশ বাম কাঁধের ওপর ফেলুন। তাওয়াফ শেষে চাদর এভাবে রাখুন।
✓ নিয়ত, ইসতিলাম করুন ও তাওয়াফ শুরু করুন- তালবিয়া পাঠ বন্ধ করুন। হাজরে আসওয়াদের ডান পাশে একটি সবুজ বাতি লাগানো রয়েছে; সেখান থেকে তাওয়াফ শুরু করুন। প্রথমে নিয়ম কানুন- ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য উমরার তাওয়াফ করছি। আমার জন্য তা সহজ করো এবং কবুল করো।’ ডান হাত দিয়ে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করে চুমু খান বা দূরে অবস্থান করে হাত উঁচু করে চুমু খাওয়ার ইশারা করুন এবং বলুন, ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’। (ফাতহুল বারি: ৩/৫৮০) এরপর পবিত্র কাবাঘরকে বামে রেখে ডান দিক ধরে তাওয়াফ শুরু করুন।
✓ রমল করুন- তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল করুন। মানে ছোট ছোট পদক্ষেপে দ্রুত হাঁটা। আর বাকি চার চক্করে স্বাভাবিক গতিতে হাঁটুন।
✓ তাওয়াফ দোয়া- তাওয়াফ করতে করতে যখন রুকনে ইয়ামেনিতে (হাজরে আসওয়াদের পর কাবাঘরের তৃতীয় কর্নার) পৌঁছাবেন, তখন সেই কর্নার স্পর্শ করার চেষ্টা করুন। স্পর্শ করা সম্ভব না হয়, তাওয়াফ চালিয়ে যান। রুকনে ইয়ামেনি থেকে হাজরে আসওয়াদের কর্নারের দিকে অগ্রসর হতে হতে এ দোয়া পড়ুন- বাংলা উচ্চারণ: ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আজাবান নার।’
বাংলা অর্থ: হে আমাদের রব, দুনিয়ায় আমাদের কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন। (সুরা বাকারা, ২০১) । যখনই হাজরে আসওয়াদের কর্নার অতিক্রম করবেন, তখন হাজরে আসওয়াদ অভিমুখী হয়ে বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে ইশারায় চুমু খান। এভাবে একই নিয়মে সাতবার তাওয়াফ করুন। প্রতি চক্করে যেকোনো জিকির, কোরআন তিলাওয়াত বা দোয়া করুন। কারণ এ সময় দোয়া কবুল হয়।
✓ তাওয়াফে অজু নষ্ট হয়ে গেলে- তাওয়াফে অজু ভেঙে গেলে যদি তিন বা এর কম চক্কর সমাপ্ত হয়; তবে অজু করে পূর্ণ সাত চক্কর দিন। আর চার বা এর বেশি চক্কর সমাপ্ত হয়, তবে অজু করে এসে বাকি চক্কর দিন। (ফাতহুল বারি, ৩/৫৬৫)
✓ দুই রাকাত নামাজ- তাওয়াফ শেষে যদি মাকরুহ বা হারাম ওয়াক্ত উপস্থিত না হয়; দুই রাকাত নামাজ আদায় করুন। এটা ওয়াজিব। মাকামে ইবরাহিমের কাছাকাছি বা এর পেছনে মসজিদের যেকোনো দূরত্বে এ নামাজ আদায় করা মুস্তাহাব। (বুখারি, ১/২২০) এরপর দোয়া করে। কারণ এটাও দোয়া কবুলের স্থান।
✓ জমজমের পানি পান করুন- নামাজ শেষে তৃপ্তিসহকারে জমজমের পানি পান করুন। শুরুতে বিসমিল্লাহ এবং শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলুন। কাবামুখী হয়ে তিন শ্বাসে পান করুন। (ইবনে মাজাহ: ৩০৬১) জমজমের পানি দাঁড়িয়ে বা বসে- উভয়ভাবেই পান করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) জমজমের পানি দাঁড়িয়ে পান করেছেন। (নাসাঈ: ২৯৬৪) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জমজমের পানি যে উদ্দেশে পান করা হয়; আল্লাহতায়ালা তা পূর্ণ করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১৪৮৪৯)
✓ হাজরে আসওয়াদ ও মুলতাজামে সতর্কতা- এরপর মুলতাজামে এসে বায়তুল্লাহ দেয়ালের সঙ্গে বুক ও ডান গাল লাগিয়ে ডান হাত ওপরের দিকে দিয়ে বায়তুল্লাহ জড়িয়ে ধরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন। (বাইহাকি: ৯৭৬৬)। বর্তমানে হাজরে আসওয়াদ ও মুলতাজামসহ কাবাঘরের বিভিন্ন স্থানে সুগন্ধি লাগানো থাকে আর ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি লাগানো নিষেধ। তাই হাজরে আসওয়াদে সরাসরি চুমু খাওয়া ও মুলতাজামে দোয়ার আমলগুলো পরে করা উচিত।
মূল আমল—৩: সাফা-মারওয়ায় সাঈ
সাফা-মারওয়ায় সাতবার চক্কর দেওয়াকে সাঈ বলে। (মুসলিম, ১২১৮) অনেকে সাফা থেকে মারওয়া পাহাড়ে গিয়ে আবার সাফায় আসাকে এক চক্কর গণনা করেন- এটা ভুল। শুদ্ধ হলো, সাফা থেকে মারওয়া এক চক্কর। মারওয়া থেকে সাফা দুই চক্কর। এভাবে সাফা থেকে সাঈ শুরু হয়ে সপ্তম চক্করে মারওয়াতে শেষ হবে।
✓নিয়ত করুন- সাঈ করার নিয়ত করুন- ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য সাঈ করছি। আমার জন্য তা সহজ ও কবুল করুন।’
✓ধারাবাহিকভাবে সাঈ করুন- মসজিদুল হারামের বাবুস সাফা (মাতাফে MASA লেখাটি অনুসরণ করুন) দিয়ে সাফা পাহাড়ে উঠুন। সাফা পাহাড়ে উঠে পবিত্র কোরআনের বাংলা উচ্চারণ: ‘ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন সায়াইরিল্লাহ।’ অর্থ: নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহতায়ালার নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত। (সুরা বাকারা, ১৫৮) এ আয়াতটি পাঠ করুন এবং বলুন- বাংলা উচ্চারণ: ‘আবদায়ু বিমা বাদায়াল্লাহু বিহি।’ অর্থ: আমি শুরু করছি যেভাবে আল্লাহতায়ালা শুরু করেছেন। (মুসলিম, ১২১৮)
এরপর কাবা শরিফের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে তিনবার ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলুন এবং তিনবার এ দোয়াটি পড়ুন- বাংলা উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু আনজাঝা ওয়াদাহু ওয়া নাসারা আবদাহু ওয়া হাজামাল আহজাবা ওয়াহদাহু। বাংলা অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তার কোনো শরিক নেই। রাজত্ব একমাত্র তার এবং তিনিই একমাত্র সব প্রশংসার অধিকারী। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তিনি তার ওয়াদা পূরণ করেছেন, তিনি তার বান্দাকে (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহায্য করেছেন এবং শত্রুদের সম্মিলিত বাহিনীতে পরাস্ত করেছেন। (মুসলিম: ১২১৮)
অনেক ফকিহের মতে, এ সময় হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করে হাতে চুমু খাওয়া সুন্নত। এরপর দরুদ শরিফ পড়ে হাত তুলে দোয়া করুন। কারণ এটি দোয়া কবুলের স্থান। এবার ডান দিকের রাস্তা দিয়ে মারওয়া পাহাড়ের দিকে স্বাভাবিক গতিতে সাঈর হাঁটা শুরু করুন। পথিমধ্যে সবুজ বাতির স্থানটুকু পুরুষরা মধ্যম গতিতে দৌড়ে অতিক্রম করুন এবং এই দোয়াটি পড়ুন- বাংলা উচ্চারণ: ‘রব্বিগফির ওয়ারহাম ইন্নাকা আনতাল আয়াজ্জুল আকরাম।’ বাংলা অর্থ: হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন। আপনি মহাপরাক্রমশালী সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১৫৮০৭) সবুজ বাতির অংশটুকু নারীরা স্বাভাবিকভাবে অতিক্রম করবেন।
এরপর মারওয়া পাহাড়ে পৌঁছালে সাঈর এক চক্কর সমাপ্ত হবে। মারওয়াতে উঠে কাবার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সাফায় সেভাবে সেসব দোয়া করেছেন; সেভাবে সেসব দোয়া করুন। এটিও দোয়া কবুলের স্থান। এরপর আবার সাফার দিকে সাঈ শুরু করুন। সাফায় পৌঁছালে সাঈর দ্বিতীয় চক্কর সমাপ্ত হবে। সাফায় উঠে আগের মতো কাবার দিকে ফিরে দোয়া করুন। এভাবে ধারাবাহিকভাবে সাত চক্কর সাঈ শেষ করুন এবং প্রত্যেকবার দুই পাহাড়ে দোয়া করুন।
✓ সাঈর দোয়া- সাঈকালীন নির্দিষ্ট দোয়া নেই। কোরআন-হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন দোয়া করা যেতে পারে। মাতৃভাষায়ও দোয়া করা যাবে। কোনো সমস্যা না থাকলে হেঁটে সাঈ করা ওয়াজিব। অসুস্থতা বা বার্ধক্যের কারণে হুইল চেয়ারে বসে সাঈ করা যেতে পারে।
সাঈ শেষ হলে এ দোয়া পড়ুন- বাংলা উচ্চারণ: ‘রাব্বানা তাকাব্বাল মিন্না ইন্নাকা আনতাস ছামিউল আলিম।’ বাংলা অর্থ: হে আমাদের রব, আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। আপনি নিশ্চয়ই সবকিছু শোনেন ও জানেন।
মূল আমল—৪: মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা
পুরুষরা মাথা মুণ্ডন করুন বা চুল ছোট করুন। আর নারীরা মাথার চুলের অগ্রভাগ থেকে আঙুলের এক কর বা এক ইঞ্চি পরিমাণ মাথার চুল কাটুন। এর মাধ্যমে উমরার মূল আমলের পরিসমাপ্তি ঘটল।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক