মনু মিয়ার বিয়ের পাঁচ বছর অতিবাহিত হতে চলল। এই দীর্ঘ সময়ে সে বিয়ের দিন ছাড়া স্ত্রীসহ মাত্র একবার শ্বশুরবাড়িতে তার পদধূলি দিয়ে দুটি দিন কাটিয়ে এসেছেন। এরপর আর ওমুখো হয়নি। অবশ্য এ কথা সত্য যে, মনু খানিকটা সাদাসিধা, বেড়ানোটা তার স্বভাব বিরুদ্ধ এবং তিনি অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির মানুষ।
জামাইয়ের শ্বশুরবাড়ি না যাওয়া নিয়ে তার নিজ পরিবারে যতটা, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আফসোস এবং আক্ষেপ রয়েছে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মধ্যে। মনুর শালা-শালি, শ্বশুর-শাশুড়িসহ শ্বশুরদিককার যত নিকটাত্মীয় আছেন, সবাই জামাইকে অনুরোধ-উপরোধ করে একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছেন। মুরুব্বিরা মনুকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনায় বেয়াদব জামাই বলে গালমন্দ করতেও ছাড়েননি।
সেই মনু মিয়া এবার বিশেষ প্রয়োজনে শ্বশুরবাড়ির কাছে যাচ্ছেন শুনে তার স্ত্রী ময়না আহ্লাদে আটখানা হয়ে স্বামীর হাতে-পায়ে পড়ে অনুরোধ করতে শুরু করলেন যেন দুই ঘণ্টার জন্য হলেও শ্বশুরবাড়ি যান।
মনু ভাবলেশহীনভাবে বললেন, আচ্ছা দেখা যাবে। সঙ্গে এ কথাও বললেন, বাড়িতে আগেই ফোন করে জানানোর দরকার নেই।
ময়না কোনো বিষয়েই স্বামীর সঙ্গে তর্কে জড়ান না। তর্ক করা কিংবা কোনো বিষয় নিয়ে চাপাচাপি করা মনু মোটেই পছন্দ করেন না। ময়না মনুর হাঁ বা না ভাব কিছুই বুঝতে পারলেন না। তবুও মনের কোণে একটু আশা জেগে রইল।
মনুর বেচারি শাশুড়ি! জামাইকে আদর-আপ্যায়ন করতে না পেরে রাজ্যের কষ্ট বুকে জমা করে রেখেছেন। জামাই সেই একবার শাশুড়ির হাতের পাটশাক রান্না খেয়ে যে প্রশংসা করেছেন, তা আজও তার স্মৃতিতে হানা দিয়ে তাকে গর্বিত করে তোলে। সেই সুখস্মৃতি মনে করে পুলকিতবোধ করেন তিনি। সেই শাশুড়ি দ্বিতীয়বার জামাইকে পাটশাক রান্না করে খাওয়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন না, সেটা একজন রান্না পটিয়সী নারীর জন্য যে কতটা মনঃকষ্টের, তা তিনি ছাড়া আর কে অনুভব করবে!
যাই হোক, কোনোরকম আগাম বার্তা বা ঘোষণা ছাড়াই আগন্তুকের মতো মনু শ্বশুরবাড়ি এসে হাজির। তাকে দেখে সবাই ভূত দেখার মতো হতবিহ্বল হয়ে পড়ল। বাড়ি জুড়ে একটা শোরগোল পড়ে গেল। কেউ বাতাস করতে শুরু করে, কেউ লুঙ্গি-গামছা এনে দেয়, তো কেউ অজুর পানি এগিয়ে দেয়। শ্বশুর নিজহাতে ডাব কেটে জামাইয়ের হাতে তুলে দিলেন। হুলস্থুল কাণ্ড! এ অবস্থায় মনু লজ্জায় ভীষণ আড়ষ্ট হয়ে গেলেন।
একপর্যায়ে সব স্থির হয়ে এলে রান্নাবাড়া শুরু হলো। বাড়ির পোষা হাঁস-মুরগি-কবুতর, নিকটবর্তী বাজার থেকে কচি খাসির মাংস, গরুর কলিজা-মগজ, ইলিশ মাছ, পুকুরের তিন-চার পদের মাছ, পলান্ন, মিষ্টান্ন তো থাকছেই। পাশাপাশি শাশুড়ির মনের কোণে লুকিয়ে থাকা জামাইয়ের প্রশংসাধন্য সেই পাটশাকও অবশ্যই ব্যঞ্জনের তালিকায় থাকবে, এতে আর বলার কী আছে!
এরপর এল খাবারের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সারে সারে সাজিয়ে রাখা ১৫-২০ রকমের ব্যঞ্জন! তার মনোমুগ্ধকর ঘ্রাণে মনুর পেট অর্ধেক ভরে উঠল।
মনুর শাশুড়ি জামাইয়ের পাশে বসে তার প্লেটে খাবার তুলে দিতে শুরু করলেন।
শুরুতেই তিনি পলান্নের সঙ্গে পাটশাক তুলে দিলেন পাতে। মনু খানিকটা আশ্চর্য হলেও গপাগপ তা খেয়ে ফেললেন। শাশুড়িকে আজও তার পাটশাক রান্নার প্রশংসায় ভাসালেন। জামাইয়ের প্রশংসায় শাশুড়ির তখন হাওয়া মে উড়তা যায়ে অবস্থা! তিনি আনন্দের আতিশয্যে আবার জামাইয়ের পাতে পাটশাক তুলে দিলেন।
মনু কিছুটা বিরক্ত হলেও এবার খানিকটা ব্যঙ্গ করে তার রান্নার সুখ্যাতি করলেন। শাশুড়ি জামাইয়ের মনোভাব বুঝতে না পেরে তৃতীয়বারের মতো শাক তুলে দিতেই মনু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। খাবার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং তার শৈশব-কৈশোর থেকে লালন করা এতকালের লজ্জা, সভ্যতা, ভব্যতা, সাদাসিধাভাব সব ঝেড়ে ফেলে শাশুড়িকে বললেন, আম্মা আর শাক দিতে হবে না। তার চেয়ে পাটখেতটা আমাকে দেখিয়ে দিন। আমি খেতে গিয়েই পাটশাক খাই! এ কথা বলেই মনু হনহন করে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।