দেশে প্রায় ৪ হাজার ৪৫২টি রেজিস্টার্ড বেসরকারি হাসপাতাল আছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সীমিত শয্যা ও চিকিৎসকসংকট থাকায় দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলো এ ঘাটতি পূরণ করছে। চিকিৎসায় কালক্ষেপণ না করে সাশ্রয়ী ও যৌক্তিক খরচে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ২৪ ঘণ্টাই চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে খবরের কাগজ কথা বলেছে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তীর সঙ্গে।
খবরের কাগজ: কোন বিশেষত্বের জন্য একজন রোগী আপনার হাসপাতালকে বেছে নেবেন?
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী: ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আইএসও ৯০০১:২০১৫ সার্টিফায়েড প্রতিষ্ঠান, যা আমাদের সেবার মানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বহন করে। রোগীরা আমাদের বেছে নেন উন্নত চিকিৎসা সুবিধা, সর্বাধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ২৪ ঘণ্টার জরুরি চিকিৎসা এবং মানবিক ব্যবস্থাপনার জন্য।
খবরের কাগজ: চিকিৎসাসেবায় কোন কোন বিষয়ের ওপর আপনারা বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন?
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী: আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই রোগীর নিরাপত্তা, সঠিক রোগ নির্ণয়, সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাশ্রয়ী ও যৌক্তিক খরচে মানসম্মত সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে। ওয়ান স্টপ ক্রিটিকাল কেয়ার সার্ভিস এবং ২৪ ঘণ্টা কার্ডিয়াক ইমার্জেন্সি এই হাসপাতালের অন্যতম শক্তি।
খবরের কাগজ: বিশ্বমানের সেবা দিতে বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সরকারের সহযোগিতার প্রয়োজন আছে কি? থাকলে সে বিষয়ে জানতে চাই।
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী: অবশ্যই সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর-সুবিধা, বিশেষজ্ঞ তৈরির প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে যৌথ গবেষণা প্রকল্প অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবিমা চালু করা হলে রোগীর ওপর আর্থিক চাপ অনেকটাই কমবে এবং বিশ্বমানের সেবা গ্রহণ সবার জন্য সহজ হবে।
খবরের কাগজ: আধুনিক চিকিৎসাসেবা পেতে বিদ্যমান আইন ও মন্ত্রণালয়ের তদারকি কি পর্যাপ্ত বলে মনে করেন? স্বাস্থ্য সেবায় কোন ধরনের ব্যবস্থা সবার জন্য সহায়ক হবে?
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী: বর্তমান তদারকি ও আইনের আধুনিকায়ন প্রয়োজন। বিশেষত হাসপাতালের লাইসেন্সিং, চিকিৎসা নীতি এবং স্বাস্থ্য খাতের মান উন্নয়নে আরও কার্যকর নজরদারি দরকার। একই সঙ্গে রোগীর অধিকার সুরক্ষা, চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, বিদেশের মতো আমাদের দেশেও হাসপাতালে বহিরাগতদের অযথা অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ, হাসপাতালে রোগীর অনাকাঙ্ক্ষিত স্বজনের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ সবার জন্য সহায়ক হবে।
খবরের কাগজ: আপনার প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পরীক্ষার সঠিক মান নির্ণয় ও আধুনিক ল্যাবের সুবিধা কতটুকু রয়েছে? আপনার প্রতিষ্ঠানে যে ধরনের পরীক্ষা করা হয়, তা কি আন্তর্জাতিক মানের বলে আপনি মনে করেন?
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী: আমাদের হাসপাতালে অত্যাধুনিক ডায়াগনস্টিক ল্যাব রয়েছে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ পরীক্ষা করা হয়। সব টেস্ট আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী হয়। আমাদের ল্যাবের মান নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন ক্যালিব্রেশন ও গুণগত মান যাচাই করা হয়। ফলে রোগীরা এখানে মানসম্মত নির্ভরযোগ্য রিপোর্ট পান।
খবরের কাগজ: বিশেষায়িত সেবায় আপনার হাসপাতালের ভূমিকা কেমন? রোগীর বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে আপনি বা আপনার প্রতিষ্ঠান কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কি?
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী: আমরা ২৪ ঘণ্টা কার্ডিয়াক কেয়ার, ডায়ালাইসিস, ট্রমা ও অ্যাকসিডেন্ট ম্যানেজমেন্ট, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, নিউরোলজি, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিসহ ঝুঁকিপূর্ণ রোগী পরিবহনে আইসিইউ হেলিকটার ও কার্ডিয়াক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দিই। আমাদের ইমার্জেন্সি বিভাগ ২৪ ঘণ্টাই সেবা দেয়। রোগীরা যেন দেশের ভেতরেই মানসম্মত চিকিৎসা পান, সে জন্য আমরা জিই মেডিকেল সার্ভিসেসের বিশ্বমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করি।
খবরের কাগজ: রোগীর সর্বোত্তম সেবা ও স্বল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে আপনার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কেমন?
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী: স্বল্পমূল্যে কখনোই উন্নত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব না। তবে সাশ্রয়ী ও যৌক্তিক মূল্যে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। আপনারা জেনে খুশি হবেন, যেহেতু আমরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সেহেতু আমাদের হাসপাতালে ১০ শতাংশ ফ্রি বেড রয়েছে যার মাধ্যমে দরিদ্র ও অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী সরকারি হাসপাতালের মতো সেবা পায়। এ ছাড়া আমাদের একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি আছে, যার আওতায় অস্বচ্ছল রোগীর জন্য চিকিৎসায় ছাড় দেওয়া হয়।
খবরের কাগজ: মানবিক মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠায় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে আপনার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কী?
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী: আমাদের হাসপাতালের মূলনীতি হলো ‘চাই হাসিমুখ সবার’। আমরা রোগীর প্রতি মানবিক ব্যবহার, সহমর্মিতা ও সম্মান নিশ্চিত করি। পাশাপাশি হৃদরোগ প্রতিরোধ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও মাতৃস্বাস্থ্য বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মশালা ও বিশেষ দিবসগুলোতে ফ্রি ক্যাম্প আয়োজন করি। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল সার্ভিসেস নামে একটি মানসম্মত ডায়াগনস্টিক ও কনসালটেশন সেন্টার রয়েছে, যা স্থানীয় জনগণকে সাশ্রয়ীমূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়।
খবরের কাগজ: বাংলাদেশে বিশ্বমানের ডায়াগনস্টিক ও হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও কেন রোগীদের বিদেশমুখী প্রবণতা দেখা যায়?
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী: প্রধানত দুটি কারণে রোগীরা বিদেশমুখী হন- একটি হলো দীর্ঘদিনের অভ্যাস, অন্যটি আস্থার অভাব। অনেক সময় রোগীরা মনে করেন বিদেশের চিকিৎসা মানসম্মত ও নির্ভরযোগ্য। তবে বাস্তবে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় হাসপাতালগুলো ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছেছে। আস্থা বাড়াতে আমাদের সবাইকে প্রচার ও সঠিক সেবা দেওয়ার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে, দেশে থেকেও রোগীরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা পেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে আস্থা বাড়ানোর জন্য গণমাধ্যমের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে।
খবরের কাগজ: বিশ্বমানের আধুনিক সেবা দিতে দেশের হাসপাতালগুলো কী পদক্ষেপ নিতে পারে?
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী: বিশ্বমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে দক্ষ চিকিৎসক তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, হাসপাতালের অবকাঠামো ও প্রযুক্তি উন্নত করতে হবে। নিয়মিত মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং গবেষণামূলক কাজে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে রোগীর সেবায় মানবিকতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য।
খবরের কাগজ: আধুনিক চিকিৎসাসেবায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মান কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী: আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, যেন মানসম্মত নয়, এমন কোনো হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা ক্লিনিককে যেন অনুমোদন দেওয়া না হয়। প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, আধুনিক অবকাঠামো, রোগীর নিরাপত্তা, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সেবার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিমা কাভারেজ নিশ্চিত করা হলে হাসপাতালের মান সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের হবে।