আসছে নভেম্বরে বাংলাদেশে কী ঘটতে যাচ্ছে? এ নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা ও গুঞ্জন। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও কম নয়। রাজনীতিকদের পাশাপাশি সুধীসমাজ, সচেতন জনগোষ্ঠীর আলোচনার প্রধান প্রসঙ্গ এখন আগামী নভেম্বর। বলা হচ্ছে, যা ঘটার বা হওয়ার, তা নভেম্বরের মধ্যেই স্পষ্ট হবে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর খবরের কাগজকে বলেন, আমরা নভেম্বর নিয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলিনি। আওয়ামী লীগই শাপলা চত্বরের মতো পরিণতির কথা বলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে চাইছে। তবে, আন্দোলনের ক্ষেত্রে নভেম্বর টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠুক, জনগণ এটাই চায়। বিএনপির আন্দোলনও এখন চূড়ান্ত বিজয়ের অপেক্ষায়।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান মনে করেন, নির্বাচনের তিন মাস আগের হিসেবে নভেম্বর মাস গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি নানা ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে নভেম্বর নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
নভেম্বরের প্রথমে না হলেও অন্তত দ্বিতীয় সপ্তাহে ঘোষণা হতে পারে নির্বাচনের তফসিল। এই তফসিলের সূত্র ধরে বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচির গতি-প্রকৃতি নির্ধারিত হবে। আবার নির্বাচনের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে রাজনৈতিক মেরুকরণেরও। কোন দল বা কারা আওয়ামী লীগের, আবার কারা বিএনপির রাজনৈতিক মিত্র হবে সবই নির্ধারিত হবে নভেম্বরের মধ্যেই। বড় দুই দলের মধ্যে সংলাপ, সমঝোতা উদ্যোগ, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকার, নাকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার- কোন কাঠামো শেষ পর্যন্ত বহাল থাকে, সেটির চূড়ান্ত ফয়সালাও নভেম্বরের ঘটনাবলির ওপর নির্ভর করছে।
সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর চূড়ান্ত অবস্থান বা উদ্যোগ কী হবে, তাও স্পষ্ট হবে নভেম্বরেই। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে বড় ধরনের চাপে ফেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন অব্যাহত আছে। কারও মতে, যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত ভিসা পলিসি আরও সম্প্রসারিত হবে। কেউ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বাংলাদেশের অনেকের পাচারকৃত অর্থ বাজেয়াপ্ত হতে পারে। আবার কেউ কেউ ট্রেড স্যাংশনের কথা বলছেন।
যদিও ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তলে তলে আপস হয়ে গেছে’ বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তবে ‘আসছে মার্কিনি ঝড়’ শিরোনামে এক নিবন্ধে সম্প্রতি আওয়ামী লীগপন্থি বলে পরিচিত একজন সম্পাদক স্পষ্ট করেই বলেছেন, অর্থ পাচার সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। ব্রাসেলসভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ সম্প্রতি এক রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সহিংস হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরিন আখতার সরকারকে কী বার্তা দিয়ে গেছেন তা নিয়েও সচেতন জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানামুখী আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে সরকারকে যে বার্তা আফরিন আখতার দিয়েছেন, সেটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক বার্তার বাইরে ‘পর্দার আড়ালে’ তিনি কিছু বলেছেন কি না, এ নিয়ে জনমনে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা ও কৌতূহল রয়েছে।
গত ১৬ অক্টোবর থেকে দুই দিনের ঢাকা সফরকালে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে চা-চক্রে মিলিত হন আফরিন আখতার। এসময় তিনি বাংলাদেশে বিশ্বাসযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও সহিংসতামুক্ত সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের পাঁচ দফা সুপারিশের প্রতি তাদের সরকারের জোরালো সমর্থনের কথা জানান। পাশাপাশি তিনি এও বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখবে যুক্তরাষ্ট্র।
গত ৮ থেকে ১২ অক্টোবর মার্কিন প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অর্থবহ সংলাপের পাশাপাশি পাঁচ দফা সুপারিশের কথা জানায়।
ভারত থেকে প্রকাশিত একটি অনলাইন পোর্টালে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে, সরকারকে সুষ্ঠু নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে আফরিন একটি সময়সীমা নিয়ে কথা বলেছেন। যদিও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত ওই পোর্টালের রিপোর্টের সত্যতার বিষয়ে বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানতে চেয়েও যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের মুখপাত্র ব্রায়ান শিলারের কাছ থেকে কোনো জবাব পায়নি। শিলার এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে শুধু বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায় এবং এবং দেশটির অবস্থান নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে নয়।
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিদেশিদের চাপ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক খান বলেন, বিদেশিরা এ দেশের নির্বাচন নিয়ে নতুন আর কী বলবে? তারা বড়জোর পরামর্শ দিতে পারেন। তবে নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে আফরিন আখতারের সঙ্গে চা-চক্রে উপস্থিত ছিলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার কারণেই নভেম্বর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ এই সময় দুই পক্ষই আন্দোলনকে ঘনীভূত করার চেষ্টা করবে। পরিস্থিতি তারা নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করবে। বিদেশিরা কিছু করবে, তারপর রাজনৈতিক পরিস্থিতির বদল হবে, এটি হওয়া উচিত নয়।
এক প্রশ্নের জবাবে সুধীসমাজের এই প্রতিনিধি বলেন, তিনি (আফরিন আখতার) যে কংক্রিট বা নতুন কিছু বলেছেন, আমার তা মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র সুষ্ঠু নির্বাচন ও সংলাপ বা আলোচনা চায়, এটাই তিনি বলেছেন। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ভারত পলিসি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত যা চাইবে, তার বাইরে যুক্তরাষ্ট্র কিছু করে ফেলবে, সেটা আমার মনে হয় না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, নভেম্বরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কথা রয়েছে। কারণ সরকার নির্বাচন করে ফেলার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। নির্বাচন কমিশনও সে পথেই হাঁটছে। বিএনপি মনে করছে, তফসিল ঠেকানো গেলে নির্বাচন বন্ধ করা যাবে। এসব কারণে নভেম্বর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা উন্নয়ন সহযোগীরা সরকারকে চাপে ফেলতে চাইবে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে উন্নয়নসহযোগীরা এক ধরনের বার্তা দিয়েই রেখেছে। তবে আরও কোনো পদক্ষেপ তারা নেবে কি না, তা নির্ভর করছে পরিস্থিতি কতটা জটিল হয় তার ওপর।
চলতি একাদশ সংসদের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হবে আগামী ২৯ জানুয়ারি। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে বলা হয়েছে। সে হিসেবে ২৯ নভেম্বর থেকে তিন মাস গণনা শুরু হবে। ফলে ওই দিনকে কেন্দ্র করেই আগামী ২৮ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশ ডেকেছে বিএনপি। এদিকে ৩ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ ডেকেছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন। আন্দোলনের বিষয়ে দলটির সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক সমঝোতা হয়ে গেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এদিকে, রাজপথে বিএনপির শক্তি কমাতেই আগের দুটি সংসদ নির্বাচনের মতো ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে সরকার। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে নভেম্বরে দেশের রাজনীতিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকমহল মনে করছে।
সালমান