জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিনব কৌশল! একটি বাড়ি দেখিয়েই বহু ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। মামলাও হয়েছে ১২টি। আদালতে বিচার চলছে বছরের পর বছর। সুরাহা মিলছে না। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও নিরীহ ভুক্তভোগীরা। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে তেজকুনিপাড়ার একটি বাড়ি দেখিয়ে সরকারি-বেসরকারি ১১টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে আলাদাভাবে বন্ধক রাখা হয়েছে। প্রতিটি ব্যাংকের কাছে গড়ে ৮০ লাখ টাকা করে ঋণ নিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
বাড়ির প্রকৃত মালিককে আড়ালে রেখে ভুয়া ব্যক্তি দিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে এসব অপকর্ম করেছে চক্রটি। এদিকে রাজধানীর পল্টনে টিনশেড ঘরসহ আড়াই কাঠা জমি বন্ধক রেখে তিনটি ব্যাংক থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঋণ নেন জান্নাত ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক জান্নাত আরা ফেরদৌস। একটি ব্যাংক খেলাপির দায়ে বাড়িটির নিলাম বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় প্রকাশ করলে আরেক ঋণদাতা ব্যাংক সেটি দেখে জান্নাতের বিরুদ্ধে মামলা করে।
আরেকটি কেস হলো সাভারে। একটি বাড়ি দেখিয়ে দুটি ব্যাংকের তিনটি শাখা থেকে ঋণ নেন বাড়ির মালিক। খেলাপির দায়ে আদালতের আদেশে বাড়িটি নিলামে বিক্রি হয়। ক্রেতা নির্বিঘ্নে বসবাস করেন সাত বছর। এরপর আরেক ঋণদাতা ব্যাংক ওই বাড়ির নিলাম ক্রেতাকে উচ্ছেদের নোটিশ দেয়। এ নিয়েও দুই বছর ধরে চলছে মামলা-মোকদ্দমা।
তেজগাঁওয়ের তেজকুনিপাড়ার ১৯৫/৩ নম্বর বাড়িটির মালিক আব্দুল মজিদ ও তার স্ত্রী নুরজাহান বেগম। ২০১০ সালের ২২ জানুয়ারি আব্দুল মজিদ মারা যান। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঋণের জিম্মাদার হিসেবে তাদের নোটিশ করে ন্যাশনাল ব্যাংক ইসলামপুর শাখা ও সাউথইস্ট ব্যাংক আগানগর শাখা (কেরানীগঞ্জ)। মৃত আব্দুল মজিদের ছেলেমেয়েরা এই নোটিশ পেয়ে বিস্মিত হন। কারণ তারা নিশ্চিতভাবেই জানেন তাদের বাবা-মা কখনোই কোনো ঋণ নেননি কিংবা জিম্মাদার হননি। তারা জানতে পারেন, ২০০৫ থেকে ২০০৬ সালে একটি চক্র অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তিকে আব্দুল মজিদ ও অজ্ঞাতনামা এক মহিলাকে নুরজাহান সাজিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের নামে বন্ধকি দলিল করে দেওয়া হয়। প্রতিটি জাল দলিলে ১৫ শতাংশ জমিসহ তিনতলা বাড়ি দেখিয়ে সরকারি-বেসরকারি ১১টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অন্তত ১০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করে চক্রটি। এ ঘটনায় ২০১২ সালের এপ্রিলে ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে-৮-এ মামলা করেন মৃত আব্দুল মজিদের ছেলে শওকত মজিদ। পাশাপাশি ঋণের টাকা আদায়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও মামলা করা হয়। প্রায় ১২ বছর ধরে চলছে এসব মামলার বিচার। সুরাহা হয়নি আজও। সরেজমিনে দেখা গেছে, বাড়িটি এখন সোনালী ব্যাংক প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় শাখায় দায়বদ্ধ। এ বিষয়ে একটি নোটিশ বাড়িটির প্রধান ফটকে ঝুলছে। চার বছর আগেও এ বাড়িটি ঋণ প্রদানকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেডের (ইউসিএল) দখলে ছিল। এ ব্যাপারে কথা হয় ইউসিএলের এসভিপি অ্যান্ড সিএফও মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা (ইউসিএল) ঋণের টাকা উদ্ধার করতে আদালতের শরণাপন্ন হই। রায়ে ওই সম্পত্তির মালিকানা পায় ইউসিএল। এরপর নামজারি ও খাজনা পরিশোধ করে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নিলাম করা হয়। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতাকে ওই সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে ওই সম্পত্তিতে ইউসিএলের আর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
শওকত মজিদের দায়ের করা ওই মামলায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখাগুলোর ম্যানেজার, ঋণ প্রদানকারী কর্মকর্তা, ঋণ গ্রহণকারী ব্যক্তি ও তাদের দালাল চক্রের ৪৫ জনকে বিবাদী করা হয়েছে। এর মধ্যে বিবাদীর তালিকায় আছেন সরকারি ব্যাংক সোনালী ও জনতা, বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, উত্তরা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, আল-আরাফাহ ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, প্রাইম ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেডের ম্যানেজার ও ঋণ প্রদানকারী কর্মকর্তারা। ঋণ গ্রহণকারী ও দালালদের মধ্যে বিবাদীর তালিকায় আছেন নরডিক এন্টারপ্রাইজের মালিক সামসুল মাহামুদ খান, ওয়ারীর বাসিন্দা সামার বণিক, আরটিএস একসেসরিজের মালিক গিয়াসউদ্দিন, নাসিরউদ্দিন, পারভিন সুলতানা, নুরুল ইসলাম, দক্ষিণ শাহজাহানপুরের বাসিন্দা নাফিস সাহিল, নারায়ণগঞ্জের মাসদাইরের আনোয়ারুল কবির, ম্যাক্সিমকোর মালিক ইকবাল হোসেন ও তার স্ত্রী ইসমত আরা টুপুর, আশিকা ব্রিকসের মালিক হাসান ইমাম লিটু, রাকা স্টিলের মালিক শাহজাহান, মালিবাগের বাসিন্দা কবিরুল ইসলাম ও তার দুই স্ত্রী শাহনাজ পারভীন ও রুমানা পারভিন, সামসুদ্দিন অ্যাসোসিয়েটের আমজাদ হোসেন চৌধুরী এবং পিপি ল্যাব ডায়াগনস্টিকের মালিক ডা. আতাউর রহমান শামীম।
সাভার পৌর এলাকার গেন্ডা এ-ব্লকের একটি বাড়ি দেখিয়ে ১৯৯৭ সালে অগ্রণী ব্যাংকের রায় সাহেব বাজার শাখা ও প্যারিদাস রোড শাখা এবং ইসলামী ব্যাংকের মৌচাক শাখা থেকে পৃথকভাবে তিন দফায় ১৩ লাখ টাকা ঋণ নেন অগ্রণী ব্যাংকেরই তৎকালীন কর্মকর্তা এনামুল হক। খেলাপের দায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে ইসলামী ব্যাংক। মামলায় ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে রায় হয়। এরপর অর্থ জারির মামলা করে ইসলামী ব্যাংক। এই অর্থ জারি-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আগেই এনামুল হক মারা যান। অবশেষে ২০০৩ সালে সম্পত্তিটি নিলামে বিক্রি করা হয়। এর প্রায় ২০ বছর পর অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গত বছর অর্থঋণ আদালতের আদেশের ভিত্তিতে ইসলামী ব্যাংকের নিলাম ক্রেতাদের উচ্ছেদের জন্য পুলিশ পাঠায়। এরপর নিলাম ক্রেতারা বাধ্য হয়ে অগ্রণী ব্যাংকের বিরুদ্ধে অর্থ ঋণ আদালতে মিস কেস করেন। বর্তমানে মৃত এনামুল হক আনসারির ছেলেমেদের বিরুদ্ধে মামলার বিচার চলছে।
এ ব্যাপারে ইসলামী ব্যাংকের কাছ থেকে নিলাম ক্রেতাদের আইনজীবী আব্দুস সালাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘২০০৩ সালে নিলাম কেনাবেচার ২০ বছর পর আরেকটি ব্যাংক অর্থ জারি ও উচ্ছেদের নোটিশ পাঠালে নিলাম ক্রেতারা অস্বস্তিতে পড়েন। তারা এই নোটিশ অগ্রণী ব্যাংকের অর্থ জারি মামলা বাতিল চেয়ে মামলা করেছেন। মামলাটি বিচারাধীন। তবে আশা করছি, অগ্রণী ব্যাংকের মামলাটি অকার্যকর হবে।’
জান্নাত ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক জান্নাত আরা ফেরদৌস। রাজধানীর পুরানা পল্টনে তার নিজ মালিকানার টিনশেড ঘরসহ আড়াই কাঠা জমি ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ফাইন্যান্স ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড কমার্স (আইএফআইসি) ব্যাংকের মতিঝিল ইন্টারন্যাশনাল শাখায় বন্ধক রেখে ৬০ লাখ টাকা ঋণ নেন। এরপর তথ্য গোপন করে দুই মাস পরেই ২০১৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এনআরবি ব্যাংকের গুলশানের করপোরেট অফিস থেকে ৭৫ লাখ টাকা ঋণ নেন। একইভাবে বছর না ঘুরতেই ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই সোনালী ব্যাংকের কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন আইসিডি শাখা থেকে গৃহনির্মাণ বাবদ ৫০ লাখ টাকার ঋণ নেন। আইএফআইসি ব্যাংক জান্নাত আরাকে ঋণখেলাপি ঘোষণা করে টাকা আদায়ের জন্য অর্থঋণ আদালতে মামলা করে রায় পায়। এরপর অর্থ জারি মামলাতেও ব্যাংকের পক্ষে রায় হয়। ফলে আদালতের আদেশে বাড়িটির নিলামে বিক্রির জন্য গত মে মাসে দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তি দেখে সোনালী ব্যাংক কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন আইসিডি শাখার ম্যানেজার জামিউল ইসলাম গত ১ জুন জান্নাত আরা ফেরদৌসের বিরুদ্ধে শাহজাহানপুর থানায় মামলা করেন। মামলাটির তদন্ত চলছে।
সালমান