যাত্রাপথে নারী চাকরিজীবীদের চলাচল স্বচ্ছন্দ ও আরামদায়ক করতে ১৯৯৮ সালে পরীক্ষামূলক মহিলা বাস সার্ভিস চালু করেছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। পরবর্তী সময় এই বাসের চাহিদা বাড়ায় ক্রমান্বয়ে ২০টি রুটে ২৩টি মহিলা বাস সার্ভিস চালু করা হয়। সকালে ও বিকেলে অফিস শুরু ও শেষে নারীদের জন্য এই সেবা চালু করা হয়।
এর মধ্যে করোনার সময়ে ২০২০ সালের ২৩ মার্চ থেকে পুরোপুরি বন্ধ থাকে এই সেবা। পরবর্তী সময়, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ৬টি রুটে ৬টি মহিলা বাস চালু করা হয়। এ ব্যাপারে বিআরটিসি অফিস থেকে বিবৃতি দেওয়া হয় চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমান্বয়ে রুটগুলো চালু করা হচ্ছে। বর্তমানে বিআরটিসির ওয়েবসাইট থেকে জানা যায় ৯টি রুটে মোট ৯টি মহিলা বাস সার্ভিস সচল রয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, যাত্রীসংকটে এরই মধ্যে একটি রুটের মহিলা বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৮ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপে নারীর হিস্যা ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ বলা হয়েছে। এদের সিংহভাগই রাজধানীর বাসিন্দা। এই বিপুলসংখ্যক নারী কর্মজীবীর যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম লোকাল বাস। তবে এসব বাসে চলতে গিয়ে নারীরা বিভিন্নভাবে মানসিক ও শারীরিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। ভিড়, ঠেলাঠেলি তো আছেই, এর মধ্যে গায়ে হাত দেওয়ার মতো জঘন্য ঘটনাও অহরহ হয় এসব বাসে। অতিরিক্ত ভিড়ে সিট না পেয়ে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকতেও অনেক বিড়ম্বনা পোহাতে হয় নারীদের।
যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিস একপ্রকার আশীর্বাদ হওয়ার কথা ছিল নারীদের জন্য। শুরুতে এই সার্ভিস ব্যাপক সাড়া ফেললেও অপর্যাপ্ত বাস, সঠিক সময়ে বাস না ছাড়া, যাত্রী উঠানোর জন্য বারবার থামানো আর একই জায়গায় অধিক সময় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকার ফলে ধীরে ধীরে এতে আগ্রহ হারাতে থাকেন নারী যাত্রীরা। সঠিক সময় অফিসে পৌঁছানো এবং তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসার জন্য নারীরা নানারকম প্রতিবন্ধকতা ঠেলে লোকাল বাসেই চলাচলে আগ্রহ দেখান। তা ছাড়া রাজধানীতে মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর নারীরা মেট্রোতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ফলে দুই-একটা স্টপেজ ছাড়া বিআরটিসির মহিলা বাসে যাত্রীর তেমন দেখা পাওয়া যায় না বললেই চলে। এ ছাড়া রাজধানীতে মহিলা বাসের সংখ্যা কম। একটা স্টপেজ থেকে নির্দিষ্ট সময়ে একটাই বাস ছাড়া হয়। কিন্তু সবার কাজের সময় একই সঙ্গে শুরু হয় না। ফলে একেক জনকে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বের হতে হয়। তা ছাড়া বিআরটিসির চালকদের ধীরগতি আর সময়মতো বাস না ছাড়াও যাত্রীদের আগ্রহ হারানোর কারণ।
মহিলা বাসে কম আগ্রহের পেছনে যাত্রীদের চাহিদার সঙ্গে বাসের সেবার অসামঞ্জস্যতা মূল কারণ বলে মনে করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় পরিবহন কম থাকায় বিকল্প পরিবহন খুঁজতে হয় নারীদের। মহিলা বাসের নির্ধারিত ভাড়াও একটা কারণ। মহিলাদের ভাড়া একটু বেশিই।
তিনি বলেন, মহিলা বাসগুলোতে ওঠা কর্মজীবী নারীদের মধ্যে অধিকাংশই স্বল্প বেতনে কাজ করেন। তাদের কথা চিন্তা করে বাসের ভাড়া যদি কম রাখা হয় তাহলে অনেক নারীই এই সেবা নিতে আগ্রহী হবেন।
বিআরটিসির মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল রুটে বাসের চালক মো. শাহীন মাতুব্বর খবরের কাগজকে বলেন, বাসের যাত্রীসংখ্যা একেবারেই কম। ৫২ সিটের ডাবল ডেকার বাসে যাত্রী থাকেন মাত্র ১৮ থেকে ২২ জন। এর পেছনে রাস্তায় অতিরিক্ত জ্যাম আর মেট্রোরেলে যাতায়াতের সুবিধাকে কারণ হিসেবে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, যারা আগে মোহাম্মদপুর থেকে বাসে উঠতেন তারা এখন একটু সামনে গিয়ে খামারবাড়ি থেকে মেট্রোতে ওঠেন। দ্রুতগতি আর আরামদায়ক যাত্রার জন্য এখন নারীরা মেট্রোতেই চলাচল করেন।
বিআরটিসির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী রূপনগর থেকে আগারগাঁও হয়ে মতিঝিল, মিরপুর ১০ নম্বর থেকে শ্যামলী হয়ে মতিঝিল, নারায়ণগঞ্জ থেকে মতিঝিল, মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল, নতুন বাজার (কোকাকোলা) থেকে মতিঝিল, মেরাদিয়া থেকে মতিঝিল, তালতলা থেকে মালিবাগ হয়ে মতিঝিল, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে জিপিও এবং কলাবাগান থেকে মৎস্য ভবন হয়ে মতিঝিল এই ৯টি রুটে ৯টি বিআরটিসি মহিলা বাস চলাচল করে। তবে এসব বাসের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার থেকে জিপিও পর্যন্ত যে মহিলা বাস ছিল সেটা এখন বন্ধ আছে। এ সার্ভিস বন্ধের বিষয়ে বিআরটিসি থেকে অফিশিয়াল কোনো বিবৃতি এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে বিআরটিসির যাত্রাবাড়ী বাস ডিপোর ম্যানেজার মো. মাসুদ তালুকদার খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাস সাময়িকভাবে বন্ধ আছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে দেশে বিভিন্ন বাসের আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। তখন থেকেই সুরক্ষার কথা চিন্তা করে বাস সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। তা ছাড়াও এই রুটে যাত্রীদের সংখ্যা একদম কম। তাই যাত্রীদের পক্ষ থেকেও তেমন প্রেশার নেই। তবে আমাদের এই বাসের সার্ভিসের উন্নতির ব্যাপারে কিছু কাজ করা হচ্ছে। কাজ শেষ হলেই যত দ্রুত সম্ভব বাস রুটে চলাচল করবে।’
নারায়ণগঞ্জ থেকে মতিঝিল রুটের বাসের চালক নূর মোহাম্মদ মিঠু জানান, এই রুটের বাসে নারী যাত্রী খুব কম ওঠেন। ৭৫ সিটের বাসে আপ টাইমে যাত্রী পাওয়া যায় সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৪০ জন। ডাউন টাইমে যাত্রী আরও কম আসেন। ধরতে গেলে বাস প্রায় খালি ফেরত আসে। তালতলা থেকে মতিঝিল রুটের বাসচালক শুক্কুর খান বলেন, অফিস টাইমে দুই তলা বাসে যাত্রী থাকে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ জন। তিনি জানান, যাত্রী থাকুক বা না থাকুক তার দৈনিক রাজস্ব দিতে হয় ২২০০ টাকা। যাত্রী কম থাকলে মাঝে মাঝে নিজের কাছ থেকেও ভর্তুকি দিতে হয়।