দুস্থ, বিপন্ন ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান এবং তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নিজস্ব কার্যক্রম ও নানা প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। প্রকল্প ব্যয়ে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার গরমিল পাওয়া গেছে। প্রকল্পগুলোর আর্থিক নিরীক্ষায় (অডিট) অন্তত দেড় হাজার আপত্তি দেওয়া হয়েছে।
গত এপ্রিল মাসে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে ওই নিরীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মোট অডিট আপত্তি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৮১টি। এর মধ্যে সাধারণ আপত্তি ১ হাজার ১৫৯টি ও অগ্রিম আপত্তি ৫২২টি। এসব আপত্তির আর্থিক পরিমাণ মোট ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি ৪৫ লাখ ৮১ হাজার ৭১৯ টাকা। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের অর্থাৎ গত বছরের জুন মাস পর্যন্ত নতুন আপত্তি ১৯৬টিসহ মোট ৬৫৬টি অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি ছিল, যার পরিমাণ ১ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকার অসংগতি উঠে এসেছে কেবল গত বছরের জুলাই থেকে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে।
এ ছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরের নতুন আপত্তি ৫০টি যোগ করে সে বছরের মোট ৫০৫টি অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি ছিল, যার পরিমাণ ৮১৫ কোটি টাকা। তার আগে ২০২০-২১ অর্থবছরের নতুন আপত্তি ৪৯টি যোগ করে সে বছরের মোট ২২৫টি অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি ছিল, যার পরিমাণ ৭৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরের মোট ৭৮৫টি অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি ছিল, যার পরিমাণ ৫২ কোটি ১২ লাখ টাকা।
অডিট আপত্তির বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বাজেট ও অর্থ বিভাগের উপপরিচালক রবিউল করীম বলেন, ধরুন কোনো জায়গায় নিরীক্ষার সময় দেখা গেল যেখানে ভ্যাট নেওয়ার কথা ছিল ৭ শতাংশ, সেখানে দেওয়া হয়েছে ৩ শতাংশ। তখন সেই আর্থিক অসংগতির বিরুদ্ধে আপত্তি তোলা হয়। এখন এই আপত্তির বিপক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যদি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যুক্তি দেখাতে পারেন তবে তা নিষ্পন্নের প্রক্রিয়া হয়। আর যদি কর্তৃপক্ষ এবং ওই ব্যক্তি পদক্ষেপ না নেন, তাহলে এটি অনিষ্পন্ন অবস্থায় থেকে যায় বছরের পর বছর।
২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকাশিত অডিট আপত্তির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরের আর্থিক অসংগতির পরিমাণ শতকোটির নিচে থাকলেও ২০২১-২২ অর্থবছরে তা হঠাৎ ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা তার পরের বছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত অর্থাৎ প্রথম ১০ মাসেই অডিট আপত্তি এসেছে ২ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকার।
গত এপ্রিল মাসের ওই কেবিনেট প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৬টি অগ্রিম আপত্তি নিষ্পত্তি করতে ত্রিপক্ষীয় সভা হয়েছে গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর। ১৬টি আপত্তিই নিষ্পত্তির সুপারিশ করা হয়েছে। ১৭টি অগ্রিম আপত্তি নিষ্পত্তি করতে ত্রিপক্ষীয় সভা গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জানানো হয় ৫টি আপত্তি আগেই নিষ্পত্তি হয়েছে। অবশিষ্ট ১২টি আপত্তি নিষ্পত্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত বছরের ২ অক্টোবর যশোর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে ১০টি সাধারণ আপত্তি নিষ্পত্তির বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় সভা হয়েছে। সেখানে ৮টি আপত্তি নিষ্পত্তির সুপারিশ করা হয়। নিষ্পত্তিপত্র জারি করার জন্য কার্যপত্র অডিট অধিদপ্তরে দেওয়া হয়েছে। এরপর গত ৭ ডিসেম্বর ঢাকার আগারগাঁও সমাজসেবা অধিদপ্তরে ১৬টি সাধারণ আপত্তি নিষ্পত্তির বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় সভা হয়েছে। সেখানে ১২টি আপত্তি নিষ্পত্তির সুপারিশ করা হয়েছে এবং নিষ্পত্তিপত্র জারি করার জন্য কার্যপত্র অডিট অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
সারা দেশে অর্ধশতাধিক প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজসেবা অধিদপ্তর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় সমাজের অনগ্রসর, বঞ্চিত, দরিদ্র ও সমস্যাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কল্যাণসাধন, সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান ও ক্ষমতায়নের কাজ করছে। এ ছাড়া বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আছে নানা প্রকল্প।
অডিট আপত্তি নিষ্পন্নের বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অবস্থান জানতে চাইলে রবিউল করীম বলেন, ‘এ বিষয়ে বর্তমানে কঠোর অবস্থানে আছেন অধিদপ্তর ও সংশ্লিস্টরা। আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় কাগজ নিয়ে হোক অথবা জরিমানা অথবা দ্বিপক্ষীয় অথবা ত্রিপক্ষীয় বৈঠক করে হোক, এসব আপত্তি নিষ্পন্ন করতে হবে। আমরাও সে লক্ষ্যে কাজ করছি।’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সমাজসেবা বা মহিলা ও শিশু অধিদপ্তরের মতো জায়গাগুলো নিয়ে অনেক আগে থেকেই আমরা অভিযোগ পাচ্ছি ও দেখছি যে নামকাওয়াস্তে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় এবং টাকাগুলো পকেটে ভরা হয়। সমাজসেবার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে যেখানে একেবারে সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষকে নিয়ে কাজ করে, সেখানে এমন অনিয়ম ও আপত্তি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এগুলোকে এখন সংস্কারের মাধ্যমে নতুন নতুন কার্যকরী প্রকল্প প্রণয়ন করে তা নিয়মের মধ্যে রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ প্রকল্পগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় আরও স্বচ্ছতা বজায় রাখলে ও জবাবদিহি নিশ্চিত হলে হয়তো এ ধরনের অনিয়ম কমে আসবে।’