বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রামে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে ডিমের বাজার। পাইকারিতে গত ৮ দিনে চারবার বেড়েছে পণ্যটির দাম। অপরদিকে খুচরা বাজারেও একেক জায়গায় একেক দরে বিক্রি হচ্ছে পণ্যটি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির দর লাগামহীনভাবে বাড়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করছেন সাধারণ ক্রেতারা।
ডিমের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ার পেছনে পাইকারি ব্যবসায়ীরা পোলট্রি ফার্ম মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদারদের দোষারোপ করছেন। তারা বলছেন, সরকার প্রতি পিস ডিম পাইকারিতে ১১ টাকা ০১ পয়সায় বিক্রি নির্দেশনা দিয়েছে। অথচ পোল্ট্রি ফার্মগুলো সরকার নির্ধারিত দর না মেনে ১২ টাকার ওপরে প্রতিটি ডিম বিক্রি করছে। তারা প্রতিটি ডিমে দেড় থেকে দুই টাকা লাভ করছে। অপরদিকে প্রান্তিক খামারিরা সরাসরি পাইকারের কাছে ডিম বিক্রি করতে পারে না। মধ্যস্বত্বভোগীর হাত ঘুরে পাইকারের কাছে আসে। আড়তদাররাও বাড়তি দরে বিক্রি করছে পণ্যটি। এসব কারণে দাম বেড়ে যাচ্ছে।
এদিকে দাম বাড়ায় পাইকারি বাজার পাহাড়তলীতে ডিমের সরবরাহ কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রতিটি গাড়িতে ১ লাখ ৪৪ হাজার পিস ডিম থাকে। বর্তমানে প্রতিটি ডিম কিনে আনতে খরচ পড়ছে ১২ টাকা ৫০ পয়সা। ওই হিসেবে এক গাড়ি ডিম আনতে একজন পাইকারকে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে ১৮ লাখ টাকা। আগে ১০ থেকে ১১ লাখ টাকা খরচ পড়ত। বাড়তি ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা খরচ বাড়ায় ডিম আনতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন পাইকাররা।
পাহাড়তলী পাইকারি বাজার যাচাই করে দেখা গেছে, গত ৮ দিন ধরে পাইকারিতেই প্রতিটি ডিম ১২ টাকা ৫০ পয়সার ওপরে বিক্রি হয়েছে। সেখানে প্রতিটি ডিম গত ২৭ সেপ্টেম্বর ১২ টাকা ৫০ পয়সায়, ২৮ সেপ্টেম্বর ১২ টাকা ৪০ পয়সায়, ২৯ সেপ্টেম্বর ১২ টাকা ৫০ পয়সায়, ৩০ সেপ্টেম্বর ১২ টাকা ৭০ পয়সায়, ১ অক্টোবর ১২ টাকা ৭০ পয়সায়, ২ অক্টোবর ১২ টাকা ৬০ পয়সায়, ৩ অক্টোবর ১২ টাকা ৮০ পয়সায় এবং ৪ অক্টোবর ১২ টাকা ৯০ পয়সায় বিক্রি হয়েছে।
চট্টগ্রাম ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল শুক্কুর খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদেরকে প্রতি পিস ডিম ১২ টাকা ৫০ পয়সার ওপরে কিনে আনতে হচ্ছে। ডিম আনতে গিয়ে আমাদের ব্যয়ের পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। তাই অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী ডিম আনছেন না। এতে করে সরবরাহও কিছুটা কমেছে।’
এদিকে খুচরা পর্যায়েও একেক জায়গায় একেক দরে বিক্রি হচ্ছে পণ্যটি। খুচরা বাজার যাচাই করে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরের নাসিরাবাদ এলাকায় প্রতিটি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩ টাকা ৫০ পয়সায়। আবার নগরের কাজীর দেউড়ি এলাকায় ১৪ টাকার ওপরে প্রতিটি ডিম বিক্রি করতে দেখা গেছে।
নগরের নাসিরাবাদ এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি কলেজের শিক্ষক সুবীর কান্তি নাথ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ডিমের বাজার অস্বাভাবিক বেশি। আমি ৩০টি ডিম ৪০০ টাকায় কিনেছি। আবার মাছের বাজার গরম। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ১৯০ টাকায়। ব্যবসায়ীরা তো সরকার নির্ধারিত দরের কোনো তোয়াক্কাই করছেন না। আমরা সাধারণ ক্রেতারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছি। কারণ আমাদের আয় তো নির্দিষ্ট। সরকারের উচিত ভোগ্যপণ্যের দিকে নজর দেওয়া, যাতে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেই হবে না। সেটা বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। কঠোরভাবে বাজার তদারকি করতে হবে। অপরাধীরা শাস্তির আওতায় আসছে না। তাই তারা অপরাধ করেই চলেছে। কাজেই কারা সিন্ডিকেট বা কারসাজি করে ডিমের দাম বাড়াচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তাহলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দূর করা সম্ভব হবে।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা পাহাড়তলী বাজারে অভিযান পরিচালনাকালে ডিমের দামে কারসাজির প্রমাণ পেয়েছি। প্রদর্শিত মূল্য তালিকার চেয়ে বেশি দামে ডিম বিক্রি করায় কয়েকজনকে জরিমানা ও সতর্ক করা হয়েছে। আমরা অভিযানে গেলেই ব্যবসায়ীদের নিয়ম মেনে ব্যবসা করার পরামর্শ দিয়ে থাকি।’