‘শরীরে এখনো ১২টি গুলি (ছররা) আটকা আছে। এর মধ্যে মাথায় আছে পাঁচটি। রাতে যখন ঘুমাতে চাই, তখন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। মাথায় গুলি, কী করে ঘুমাই? ঘুমই আসে না! এর মধ্যেই চাকরির খোজে ঢাকায় অবস্থান করছি। এমন অবস্থা শুধু আমার নয়, আহত অনেকেই শারীরিক ও মানসিক সঙ্কটে আছে। বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য তদারকিতে হেল্প ডেস্ক চাই।’ কথাগুলো বলছিলেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী শিক্ষার্থী ইফরাতুল হাসান রাহিম। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তিনি।
গত ১৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ছররা গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন ইফরাতুল হাসান রাহিম। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় একটানা চিকিৎসাধীন ছিলেন। একটি অপারেশন শেষে বাড়ি ফিরেছিলেন ২৫ আগস্ট। সেই থেকে শরীরে আটকে থাকা ছররা গুলি অপসারণ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত রাহিম।
ঘটনার প্রায় তিন মাস হতে চলল। কিন্তু স্বস্তি নেই রাহিমের। গত মঙ্গলবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করতেই অনেকটা আঁতকে ওঠার আর্তনাদ তার কণ্ঠে। রাহিম বলেন, ‘শরীরে এখনো ১২টি গুলি রয়ে গেছে। প্রায় সময় সেসব জায়গায় তীব্র ব্যথা অনুভব হয় এবং অস্বস্তি বোধ করি। বিশেষ করে রাতে যখন ঘুমাতে যাই, তখন ঘুমই আসে না। ছটফট করি। পাশে তো পরিবার ছাড়া কেউ নেই!’
সরকারের পক্ষ থেকে কোনো খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে কি না জানতে চাইলে রাহিম বলেন, ‘মাঝখানে একবার সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল হাসপাতাল থেকে আহতদের লিস্টের কথা বলে আমার নাম নেওয়া হয়েছিল। তারপর আর কেউ যোগাযোগ করেনি, কোনো পদক্ষেপের কথা জানিও না। সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক দিকনির্দেশনাও পাচ্ছি না। এই গুলিগুলো আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে, নাকি উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে এই তীব্র যন্ত্রণার মধ্য থেকে মুক্তি পাব, কিছুই জানি না।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিজস্ব তাড়না থেকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন রাহিম। জুনিয়রদের মনোবল বাড়াতে সার্বক্ষণিক আন্দোলনের মাঠে সক্রিয় থাকতেন। সেই সক্রিয়তা তিনি পুলিশের টার্গেটে পড়েছিলেন বলে জানিয়েছেন। ১৮ জুলাই শাবিপ্রবিতে পুলিশের প্রথম অ্যাকশনে তিনি ছররা গুলিবিদ্ধ হন।
পুলিশের ছোড়া ছররা গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে গেছে তার শরীর। ওসমানী হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিকিৎসা সহায়তায় সিলেটের কম্বাইন্ড মিলিটারি হসপিটালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানেই তার অপারেশন হয়। চিকিৎসকরা তার শরীর থেকে একটি গুলি বের করতে সক্ষম হন। ঝুঁকি আছে বলে মাথায় ৫টিসহ পুরো শরীরে ১২টি গুলি আটকে আছে এখনো। এই অবস্থায় গত ২৫ আগস্ট হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরেন।
রাহিম জানান, চিকিৎসার পর বাড়িতে ফিরলেও সেখানে আওয়ামী লীগের লাঞ্ছনার শিকার হন। বাড়ি তাদের নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌর এলাকা। রাহিম বলেন, ‘নোয়াখালীতে ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আব্দুল কাদের মির্জা আমার বাবাকে লাঞ্ছিত করেছেন এবং আমাদের পরিবারকে হুমকিও দেন। তারা তখন জানত না যে আমি বাড়িতে আছি, না হলে হয়তো আমারও ক্ষতি করত।’
পড়াশোনা শেষ হওয়ায় রাহিম সিলেট ছেড়ে বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। শারীরিক ও মানসিক- দুই অবস্থা খারাপ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমি সিলেট ছেড়ে ঢাকায় আসছি চাকরি খোঁজার উদ্দেশ্যে। কিন্তু কোনো কাজেই ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারছি না। এখন রাস্তাঘাটে হাঁটতেও ভয় হয় যে কখন কী হয়ে যায়! সব সময় মনের মাঝে অনিশ্চয়তা কাজ করে। ওই দিনের পর থেকে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না এবং ঘুম এলেও মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্নের কারণে ঘুম ভেঙে যায়।’
সরকারের আশু ভূমিকার ব্যাপারে রাহিম বলেন, ‘আন্দোলন কেটে গেলেও এর ফলে মানসিক ট্রমা রয়ে গেছে। এ সমস্যা দিন দিন বড় হচ্ছে। সমস্যার সমাধানে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। আন্দোলনে আহতদের শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও কাজ করা জরুরি। আমি মনে করি, সরকারের উচিত, আহতদের মানসিক স্বাস্থ্যের তদারকির জন্য একটি হেল্প ডেস্ক খোলা হোক। যেখান থেকে আহতদের নিয়মিত অনলাইনে এবং অফলাইনে কাউন্সিলিং করা হবে, যাদের ওষুধপত্র দরকার তাদের ওষুধ দেওয়া হবে।’