দুই দিন আগে রাজধানীতে খুচরা পর্যায়ে ডিমের দাম বেড়ে ডজন ১৮০ টাকায় ওঠে। পরিস্থিতি অস্থির হলে সরকার শেষ পর্যন্ত ভারত থেকে ডিম আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। তারপরও বুধবার (৯ অক্টোবর) বিভিন্ন বাজারে ১৫০-১৬০ টাকা ডজন বা সাড়ে ১২ থেকে সাড়ে ১৩ টাকা পিস কিনতে হয়েছে ভোক্তাদের। অথচ ভারত থেকে প্রতি পিস ডিম ৫ টাকা ১৬ পয়সা থেকে ৫ টাকা ৭০ পয়সা কেনা যাচ্ছে। এর সঙ্গে প্রতি পিসে শুল্ক-কর দিতে হচ্ছে আড়াই টাকা এবং ঢাকাতে আসতে ৫০ পয়সা পরিবহন খরচ হচ্ছে। কিছু লাভ করার পর ভারতের আমদানি করা ডিমের দাম পড়বে সর্বোচ্চ ১০ টাকা পিস বা ১২০ টাকা ডজন।
ভোক্তারা প্রশ্ন তুলেছেন, পাশের দেশে কম দামে বিক্রি হলেও বাংলাদেশে এত বেশি কেন? খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, এর কারণ ফার্মের মালিকরা বলতে পারবেন। ফার্মের মালিকরা বলছেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সিন্ডিকেট করে খাদ্য ও মুরগির বাচ্চার দাম বেশি নেওয়ায় উৎপাদন খরচ বেশি পড়ছে। গতকাল ডিম আমদানিকারক, করপোরেট ব্যবসায়ী, আড়তদার, খামারি, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
গত দুই বছরের মতো এ বছরও বর্ষার অজুহাতে জুলাই মাস থেকে খুচরা পর্যায়ে বেড়েই যাচ্ছে ডিমের দাম। বাধ্য হয়ে সরকার গত ১৫ সেপ্টেম্বর খুচরা পর্যায়ে ডিমের ডজন সর্বোচ্চ ১৪৪ টাকা দাম বেঁধে দেয়। তারপরও এ দামে কেউ ডিম কিনতে পারেননি। বাড়তে বাড়তে গত মঙ্গলবার ১৮০ টাকা ডজনে ঠেকে। এ নিয়ে সারা দেশে হইচই পড়ে যায়। ক্রেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে জানান, ওপর থেকেই দাম বাড়ছে। সরকার দাম বেঁধে দেওয়ার পরও প্রতিদিন বাড়ছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। খামারিরা বলছেন, নিয়মের তোয়াক্কা না করে করপোরেটরা সিন্ডিকেট করে প্রতিদিন বেশি দামে ডিম বিক্রি করছে। সেই ডিম ভোক্তাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
দাম বেঁধে দেওয়ার পর গত মঙ্গলবার ভারত থেকে সাড়ে চার কোটি পিস ডিম আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। সাতটি প্রতিষ্ঠানকে আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে বেনাপোল বন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক ও জান্নাত ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আল মামুন খবরের কাগকে বলেন, ‘সরকার অনুমোদন দেওয়ার পর ভারত থেকে ডিম আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। প্রতি পিসে ৫ টাকা ৭০ পয়সা মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। এর সঙ্গে প্রতি পিসে শুল্ক-কর দিতে হয়েছে আড়াই টাকা। সেই ডিম রাজধানীতে পৌঁছাতে প্রতি পিসে ৫০ পয়সা লাগবে। দুই দিনের মধ্যেই ডিম চলে আসবে। আমরা কিছু লাভ করব। তারপরও দেশের ডিমের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করা হবে। লাভ এবং সব খরচ মিলে প্রতি পিস সর্বোচ্চ ১০ টাকা বা ১২০ টাকা ডজন ভোক্তারা কিনতে পারবেন।’
বেনাপোল বন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মহসিন মিলন বলেন, ‘ডিমে ৩৩ শতাংশ শুল্ক-কর দিতে হয়। এটা সরকার তুলে নিলে সব খরচ বাদেও সাড়ে ৫ থেকে ৬ টাকা পিস বা ৬৬-৭২ টাকায় এক ডজন ডিম কিনতে পারবেন ভোক্তারা। কারণ ভারতে প্রতি পিস ডিম পাওয়া যাচ্ছে ৫ টাকা ১৬ পয়সায় । শুল্ক-কর লাগছে ২ টাকার বেশি। ঢাকাতে পৌঁছাতে ২৫ থেকে ৫০ পয়সা পরিবহন খরচ পড়ে। কিছু লাভ করার পরও সব মিলে সাড়ে ৭ থেকে ৮ টাকা পিস বা ডজন ৯০ থেকে ৯৬ টাকা খরচ পড়ে। সরকার বেশি আমদানির অনুমোদন দিলে আরও কম দামে ডিম খেতে পারবেন ভোক্তারা। কারণ ভারত থেকে আমদানি করা হবে- এমন ঘোষণা দেওয়ার পরই ডিমের দাম কমতে শুরু করেছে।
তার কথার সত্যতা জানতে ডিমের পাইকারি বাজার তেজগাঁও স্টেশন বাজার রোডে গেলে নিলিম এন্টারপ্রাইজের মালিক জুবায়ের খবরের কাগজকে বলেন, কয়েক দিন ধরে ডিমের দাম বাড়লেও মঙ্গলবার থেকে কমতে শুরু করেছে। গত রবিবার ১৩ টাকা ১০ পয়সা পিস বিক্রি করা হয়েছে। সেই ডিম গতকাল ১১ টাকা ৭০ পয়সা পিস বা ১৪০ টাকা ডজন বিক্রি করা হয়েছে। হঠাৎ কমার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাজী ফার্মসের আশুলিয়ায় ভোক্তা অধিদপ্তর অভিযান করেছে। সেই বার্তা সব জায়গায় চলে গেছে। কাজেই যারা সিন্ডিকেট করে বেশি দামে বিক্রি করত তারা কমাতে শুরু করেছে। এ জন্য আমরাও কম দামে ডিম পাচ্ছি। তাই কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সারা দেশে আরও অভিযান করলে ডিমের দাম আরও কমবে। আগে যেভাবে দাম কম ছিল সে পর্যায়ে নেমে আসবে। বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।’
উল্লেখ্য, ডিমের দাম বেড়ে গেলে সম্প্রতি সরকার খুচরা পর্যায়ে ডিম ১১ টাকা ৮৭ পয়সা বা ১৪৪ টাকা ডজন, পাইকারি পর্যায়ে ১১ টাকা ও উৎপাদন পর্যায়ে ১০ টাকা ৫৮ পয়সা বিক্রি করার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু কোথাও এ দামে বিক্রি হয় না।
এ ব্যাপারে তেজগাঁও ডিম আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি আমান উল্লাহ বলেন, ‘সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে আমরা কিনতেই পারি না। তাহলে বিক্রি করব কীভাবে। প্যারাগন, ডায়মন্ডসহ বিভিন্ন কোম্পানিই বেশি দামে বিক্রি করছে। তারা কমালে আমরাও কম দামে বিক্রি করতে পারব। অবশ্যই বাচ্চা ও খাদ্যের দাম কমাতে হবে। তাহলে উৎপাদন খরচ কমবে। খামারিদেরও কম দামে বিক্রি করতে হবে।’
এ ব্যাপারে প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের খামারে ডিমের উৎপাদন খরচই ১০ টাকা ২৯ পয়সা পিস। তাহলে কীভাবে ১০ টাকা ৫৮ পয়সা পিস বিক্রি করব। তারা আমাদের কাছে বেশি দামে খাদ্য ও মুরগির বাচ্চা বিক্রি করছে। তাই অবশ্যই সরকারকে খাদ্য ও বাচ্চার দাম কমাতে হবে। না হলে বাজারে কমবে না ডিমের দাম।’
ডিমের বাড়তি দামের ব্যাপারে ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন এলাকা বন্যায় ডুবে গেছে। আবার এবার গরমে অনেক এলাকার খামার নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে উৎপাদন কমে গেছে। কিন্তু চাহিদা ঠিকই রয়েছে। আবার ভুট্টা, সয়াবিনের দামও বাড়তি। ডলারের দামও কমছে না। ৮৬ টাকার ডলার ১২০ টাকা হয়েছে। তাই বাচ্চা ও খাদ্যের উৎপাদন খরচ বেশি।
ভারতে ডিমের দাম কম, দেশে বেশি কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘তাদের মুরগি কম খাদ্য খায়। তাদের খাবারের উৎপাদন খরচও কম। কারণ তারা নিজেরাই সব খাদ্য উৎপাদন করে। আর আমাদের চাহিদার ৮০-৮২ শতাংশ পোলট্রি ফিডের কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। তাদের তুলনায় আমাদের দেশে ভুট্টার দামও বেশি। তাদের ডিমের আকার আমাদের দেশের ডিমের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ছোট। এ জন্য দাম কম। সরকার আমাদের পোলট্রি ফিডের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক কমালে উৎপাদন খরচ কমবে। তখন আমরাও কিছুটা কম দামে ডিম বিক্রি করতে পারব।’