জুলাই বিপ্লবের পর সারা দেশে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি এবং সংস্কার কার্যক্রম চললেও একচুলও বদলাননি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সাব-রেজিস্ট্রার। আগের মতোই তিনি ঘুষ নীতিতে অটল আছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ নিয়ে দলিল লেখকরা বলেন, ‘সাব-রেজিস্ট্রার ভালো হননি। উল্টো বাড়িয়েছেন ঘুষের মাত্রা।’
এর আগে গত জুলাইয়ে তার বিরুদ্ধে সীমাহীন ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে খোদ তার দপ্তরে কর্মরত দলিল লেখক ও সেবাগ্রহীতাদের পক্ষ থেকে। এমনকি ঝাড়ুদারকে দিয়ে ঘুষের লেনদেন করানোর অভিযোগও আসে নানা মহল থেকে। এ নিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবিব ও তার দপ্তরের কোটিপতি ঝাড়ুদারের দুর্নীতি নিয়ে গণমাধ্যমে ফলাও করে খবর প্রকাশ করা হয়।
এবার হারুন উর রশিদ নামে এক দলিল লেখক (নিবন্ধিত) তার বিরুদ্ধে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ সামনে আনেন।
তিনি খবরের কাগজকে বলেন, “আমি গত সোমবার ওয়ারিশ সূত্রের একটি জমির দলিল উপস্থাপন করলে আমাকে খাস কামরায় ডেকে পাঠান সাব-রেজিস্ট্রার। এরপর তিনি আমার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। না হলে আমার কাজ হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন। আমি উত্তরে বলেছি, স্বাধীন দেশে কোনো ঘুষ নয়। উনি বললেন, ‘এটা অফিস খরচ।’ আমি বললাম, কিসের অফিস খরচ? তিনি বললেন, ‘তুমি একটু বেশি বোঝো হারুন, চালাকি করলে আমি তোমার লাইসেন্স বাতিল করে দেব।’ আমি বললাম, কেন স্যার? আপনি আমার লাইসেন্স বাতিল করবেন কেন? আমি তো ন্যায় কথা বলেছি। তিনি আমাকে ধমকের সুরে বললেন, ‘বেশি নীতি মারাইয়ো না, বের হও আমার রুম থেকে।’”
এদিকে বিষয়টি জানাজানি হলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন উপজেলার দলিল লেখকরা। এ পরিস্থিতিতে দলিল লেখক সমিতিতে হারুন উর রশিদকে ডেকে পাঠানো হয়। এ ঘটনার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন সমিতির নেতারা।
অন্যদিকে এ ঘটনা হারুন উর রশিদ কয়েকজন সাংবাদিককে জানান। এরপর ফারহান সিদ্দিক ও আব্দুল মামুন নামে দুই সাংবাদিক সংবাদ করতে সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যলয়ে ছুটে যান।
ফারহান সিদ্দিক বলেন, “আমি একটি জাতীয় দৈনিক কাজ করি। মুঠোফোনে খবর পেয়ে সংবাদ সংগ্রহে ছুটে যাই। আমার সঙ্গে ছিলেন সহকর্মী মামুন। অফিসে গিয়ে জানতে পারলাম, সাব-রেজিস্ট্রার তার খাস কামরায় আছেন। সেই কামরায় গিয়ে আমরা তার বক্তব্য নিতে চাইলে তিনি আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তিনি আমাদের ওপর চড়াও হন এবং রাগান্বিত স্বরে বলেন, ‘গেট আউট।’’’
এ বিষয়ে সাংবাদিক আব্দুল মামুন বলেন, ‘সাব-রেজিস্ট্রার আমাদের সঙ্গে অত্যন্ত অসৌজন্যমূলক, অপেশাদার আচরণ করেছেন। তার ব্যবহারে আমরা হতভম্ব হয়েছিলাম।’
সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবিবের ঘুষ দাবি ও এমন উগ্র আচরণ নতুন নয়। তার বিরুদ্ধে এর আগেও চাহিদামতো ঘুষ আদায় করতে ব্যর্থ হওয়ায় তার নিজ অফিসের বয়োবৃদ্ধ কর্মচারীর ওপর চড়াও হওয়ার অভিযোগ আছে। চাকরি হারানোর ভয়ে ওই কর্মচারী মুখ খোলেননি।
এর আগে গত জুলাইয়ে তার ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ডের দলিল লেখকরা ফুঁসে উঠেছিলেন। সে সময় নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (আইজিআর), জেলা রেজিস্ট্রার ও সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর তার ঘুষ-দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরে লিখিত অভিযোগ করা হয়। পরে আইজিআরের নির্দেশে জেলা রেজিস্ট্রারের হস্তক্ষেপে রায়হান হাবিব আর ঘুষ গ্রহণ না করার অঙ্গীকার করলে তাকে স্বপদে বহাল রাখা হয়। কিন্তু গত ৫ আগস্টের পর সারা দেশে দুর্নীতিবাজ, অসৎ কর্মকর্তারা শোধরালেও ভালো হননি সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবিব। নানা অজুহাতে তিনি ঘুষ লেনদেন অব্যাহত রেখেছেন বলে অভিযোগ আসছে। এ নিয়ে গত ৫ জুলাই দৈনিক খবরের কাগজে সীতাকুণ্ডে ‘সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কোটিপতি ঝাড়ুদার’ শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন ছাপানো হয়। এতে উঠে আসে এয়াকুব নামে এক চা দোকানের কর্মচারী সেখানে ঝাড়ুদারের অস্থায়ী চাকরি নিয়ে ঘুষ লেনদেন শুরু করেন। তার সঙ্গে বনিবনা না হলে রায়হান হাবিব কোনো দলিল সম্পাদন করেন না। কয়েক বছরের ব্যবধানে চা দোকানের কর্মচারী থেকে কোটিপতি হয়ে যান এয়াকুব। তার বিরুদ্ধে বাড়ি, গাড়ি, জমিজমাসহ অঢেল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এখন সীতাকুণ্ডবাসীর মুখে মুখে। পত্রিকায় খবর প্রকাশের পর কিছুদিন এয়াকুবকে বাইরে রাখেন রায়হান হাবিব। কিন্তু সম্প্রতি আবারও তাকে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পুনর্বাসন করার অভিযোগে এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন দলিল লেখক জানান, সাব-রেজিস্ট্রার আইন দেখিয়ে ‘ওয়ারিশ সূত্রের দলিলগুলো সম্পাদন করা যাবে না’ এ কথাটাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অথচ চাহিদামতো ঘুষ দেওয়ার সেই দলিল আবার নিবন্ধন করা যায়। গত এপ্রিলে রায়হান হাবিব যোগদানের পর থেকে এমন অসংখ্য দলিল সম্পাদিত হয়েছে তার হাত ধরেই। মূলত, তিনি ওই কথা বলে ঘুষের অঙ্ক বাড়ান। এ ছাড়া রায়হান হাবিব সব সময় বিসিএস কর্মকর্তা বলে ধমকান। যেন তার সঙ্গে সাবধানে কথা বলি।
সীতাকুণ্ড দলিল লেখক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত জুলাইয়ে জেলা রেজিস্ট্রারের অনুরোধে আমরা কলমবিরতি ও মানববন্ধন কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছিলাম। কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবিব ঘুষ নেওয়া বন্ধ করেননি। তিনি দলিল লেখকদের সঙ্গে অশালীন আচরণও থামাননি। তিনি নিজেকে আইন মন্ত্রণালয়ের অনেক বড় কর্তা মনে করেন। তার অপমানজনক আচরণ দিন দিন চরম আকার ধারণ করেছে। তরুণ থেকে বৃদ্ধ কেউই তার আক্রমণাত্মক আচরণ থেকে বাঁচতে পারছেন না। আমরা অবিলম্বে রায়হান হাবিবের অপসারণ দাবি করছি।’
নাদিয়া আক্তার নামে একজন নারী বলেন, ‘গত সোমবার আমি স্বচক্ষে দেখালাম সাব-রেজিস্ট্রার কীভাবে সাংবাদিক ও দলিল লেখকের সঙ্গে আচরণ করলেন। সেদিন তার আচরণ ছিল মারমুখী। তার অফিসের লোকেরাও চেষ্টা করে তাকে উগ্র আচরণ থেকে বিরত রাখতে পারেননি।’
এসব বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবিব বলেন, “ঘুষ লেনদেন কিংবা দাবির বিষয়টি সত্য নয়। আর আমি কেন আচরণ খারাপ করব? বরং দলিল লেখক হারুন অর রশিদ আমার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন। এ ছাড়া সাংবাদিকদের ‘গেট আউট’ বলে বের করে দিয়েছি, কারণ ওই সাংবাদিকরা হারুনের পক্ষে কথা বলছিলেন।”
এদিকে জেলা রেজিস্ট্রার মিশন চাকমা বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। তবে তদন্ত না করে এসব বিষয়ে কথা বলতে পারব না।’
রায়হান হাবিব এর আগে কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ও ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ দুই কর্মস্থলেও তার বিরুদ্ধে ওঠে ঘুষের অভিযোগ। তার মধ্যে ২০২০ সালের ২৯ জুন রাজারহাট উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার থাকাকালে সেখানকার নির্বাহী অফিসার বরাবর রায়হান হাবিবের বিরুদ্ধে ভুয়া দলিল সম্পাদনের লিখিত অভিযোগ করা হয়। এ ছাড়া ধোবাউড়া উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার থাকাকালেও তার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে অপসারণ দাবি করেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।