রাজধানী মোহাম্মদপুর এলাকা অপরাধের স্বর্গরাজ্য পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর পুলিশের তৎপরতা কমে যাওয়ায় এ এলাকার কিশোর গ্যাংসহ চিহ্নিত অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। গত কয়েক দিনে মোহাম্মদপুরে বেশ কয়েকজন মানুষ খুন হয়েছেন। ডাকাতির ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকটি। এ ছাড়া ছিনতাই ও চাঁদাবাজি এখানে নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ১৬ অক্টোবর জেনেভা ক্যাম্পে দুর্বৃত্তের গুলিতে শাহনেওয়াজ কালু (৩৭) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। পরের দিন চাঁদ উদ্যান রোড নাম্বার ৪-এ শাহরিয়ার আশিক (১৯) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। আশিক পেশায় সিএনজিচালক ছিলেন। এর আগে গত ৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন জেনেভা ক্যাম্পের বাবুল হোসেনের ছেলে অটোরিকশাচালক সানু।
জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই থানায় যোগদানের পর থেকে আমি অপরাধ দমনের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। পুলিশ প্রতিদিনই টহল দিচ্ছে। তবে আমাদের জনবল ও গাড়িসংকট রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘গত সেপ্টেম্বর মাসে মামলা হয়েছে ৬৭টি। এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় মামলার সংখ্যা ২০। এর আগে এ থানাতে প্রতি মাসে গড়ে ২০০ মামলা হতো। আমি আসার পর শক্ত হাতে অপরাধ দমনের চেষ্টা করছি। ফলে মামলার সংখ্যাও কমে এসেছে।’
সরেজমিনে মোহাম্মদিয়া হাউজিং, মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড় (বছিলা বেড়িবাঁধসংলগ্ন), মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজসংলগ্ন জেনেভা ক্যাম্প ও টাউন হলের বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে দেখা যায়, মোহাম্মদপুরের এই এলাকাগুলো অপরাধীদের বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, ৫ আগস্টের পর বেশ কিছুদিন কিশোর গ্যাংসহ এলাকার অপরাধীরা গা-ঢাকা দিলেও এখন আস্তে আস্তে বের হতে শুরু করেছে। আগে এরা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নামে মিছিল করলেও এখন তারা ছাত্রদলের নামে মিছিল করে এলাকার মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। তবে তাদের প্রকৃত ছাত্র মনে হয় না।
বাস ও ট্রাকশ্রমিকসহ রাজধানীর পরিবহন শ্রমিকদের বড় একটি অংশ মোহাম্মদপুরে বসবাস করেন। এ ছাড়া ভ্যান, রিকশা, লেগুনা চালকদের একটি বড় অংশেরও বসবাস এই এলাকায়। সন্ধ্যার পরে মোড়ে মোড়ে শুরু হয় আড্ডা এবং রাত গভীর হলে অলিগলি ও রাস্তার ধারে মাদকসেবন, বেচাকেনাসহ সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু হয়।
আগে নিয়মিত পুলিশের টহল দেখা গেলেও হাসিনা সরকারের পতনের পর এখন পুলিশের তেমন জোরালো তৎপরতা নেই। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুলিশের ঢিলেঢালাভাবের কারণেই অপরাধীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
গত রবিবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে মোহাম্মদি হাউজিং লিমিটেডের ৩ নম্বর রোডে প্রকাশ্যে নেসলে কোম্পানির গাড়ি আটকিয়ে ১১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।
নেসলের মোহাম্মদপুর এরিয়া অ্যাকাউন্ট্যান্ট মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সকাল ৯টায় অফিস থেকে টাকা নিয়ে বের হই ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য। যখন মোহাম্মদপুর হাউজিং লিমিটেড এলাকায় পৌঁছাই তখন রাস্তা ভাঙার কারণে আমাদের গাড়ি কিছুটা ধীরগতিতে চলতে থাকে। এর মধ্যে সকাল ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে পেছন থেকে দুটি মোটরসাইকেলে করে মোট ৬ জন ছিনতাইকারী এসে আমাদের গাড়ির লুকিং গ্লাস ভাঙচুর করে। তখন তারা দুটি মোটরসাইকেল নিয়ে আমাদের গাড়ির সামনে চলে আসে। আমরা গাড়ি থামালে তারা চাপাতিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে গাড়ির কাচ ভাঙচুর করে এবং আমাদের কোপ দেয়। তাদের কোপে আমি পড়ে গেলে তারা ব্যাগে থাকা অফিসের টাকা এবং আমার পকেটে থাকা টাকাও নিয়ে চলে যায়।’
মোহাম্মদি হাউজিংয়ের ৩ নম্বর রোডে ফার্মেসির মালিক শাফায়েত খবরের কাগজকে বলেন, ‘দিনের বেলায়ই ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা আতঙ্কিত। সরকার যদি আমাদের নিরাপত্তা দিতে না পারে তবে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে যাবে।’
সম্প্রতি মোহাম্মপুর তিন রাস্তার মোড়ে (বছিলা বেড়িবাঁধসংলগ্ন) হাজী ভিলায় মধ্যরাতে সেনাবাহিনী ও র্যাবের পোশাক পরে সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ডাকাতদল একটি বাসায় ঢুকে ‘নগদ ৭৫ লাখ টাকা ও ৭০ ভরি স্বর্ণালংকার’ লুট করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ঘটনার পর এলাকার মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য সব বাড়ির গেটে তালা লাগানো হয়েছে।’
হাজী ভিলার দারোয়ান জামশেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘মুখে মাস্ক লাগিয়ে সেনাবাহিনী ও র্যাবের পোশাকে বেশ কয়েকজন লোক ঘটনার দিন বাসায় আসে। বলে, তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক, অভিযান পরিচালনা করবে। পরে তাদের পোশাক দেখে গেট খুলে দিই। এরপর তারা বাড়ির মালিকের (তিনতলা) ফ্ল্যাটে যায়। সেখানে জোর করে ঢুকে ডাকাতি করে পালিয়ে যায়।’
জামশেদ আরও জানান, খুন, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই এই এলাকার নিত্যদিনের ঘটনা। বিপদের সময় ডাকলেও পুলিশ পাওয়া যায় না।
এই বাড়ির মালিক আবু বকর খবরের কাগজকে বলেন, ‘যেসব জিনিস খোয়া গেছে তার ১৬ আনার এক আনা উদ্ধার করা গেছে। তবে তিনি এখন এসব জিনিস হাতে পাননি।’
এলাকার নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অপকর্ম বেড়েছে। এ ছাড়া বাড়িগুলো দেখভাল করতে রাতে কোনো প্রহরী থাকে না ও পুলিশের তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না। ফলে প্রতিনিয়ত অপরাধ বেড়ে চলেছে।’
মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড়ে নূর বিরিয়ানি হাউসের মোহাম্মদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই এলাকায় ব্যবসা করাও কঠিন। সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের নেতারা পালিয়ে গেলেও এখন কিশোর গ্যাং সক্রিয়। প্রতিদিন তারা সন্ধ্যার পর চাঁদা তুলতে আসে।’
বছিলা এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর জানান, সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারে ভেঙে পড়েছে। আগে রাত-বিরাতে ঘোরাফেরা করলেও কোনো ভয় লাগত না। কিন্তু ৫ আগস্টের পর পুলিশের অনুপস্থিতির কারণে ডাকাতি, প্রকাশ্যে কোপাকুপি ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড় থেকে বছিলা ব্রিজ, স্বপ্নধারা হাউজিং, ফিউচার টাউন হাউজিংসহ বিভিন্ন এলাকায় দিন দুপুরে তারা চুরি-ছিনতাই করছে। অনেকে ভয়ে মুখ খুলতে পারে না। পুলিশের টহল না থাকায় তারা যা ইচ্ছা তাই করছে।
ফিউচার টাউন হাউজিংয়ের বাসিন্দা তসলিম শান্তি বলেন, ‘ইদানীং দেখছি ছোট ছোট ছেলেরা প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে মহড়া দিচ্ছে। তাদের দমন করা দরকার। না হলে পরিবেশ স্বাভাবিক হবে না।’
এলাকার একাধিক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি খবরের কাগজকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর কিশোর গ্যাং যেন স্বাধীন হয়ে গেছে। সারা দিন তাদের ঘোরাঘুরি ও উগ্র-আচরণ চোখে পড়ে।’