জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও জয়পুরহাট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন নিজ জেলায় ব্যাপক প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। আধিপত্য ধরে রাখতে অনুসারীদের নিয়ে গড়ে তোলেন শক্তিশালী বলয়। তাদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতেন পুরো জেলা। তার অনুসারীদের দাপটে অতিষ্ট ছিল সাধারণ মানুষ। বিপক্ষে কেউ কথা বললেই নানা হয়রানি করা হতো বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। এভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নিয়ে হয়েছেন অঢেল সম্পদের মালিক। এমনকি তার স্ত্রী মেহেবুবা আলমও হয়েছেন কোটিপতি।
তবে গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন স্বপন। তিনি দেশে আছেন, নাকি অন্য কোনো দেশে পালিয়ে গেছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আবার অনেকের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে, তিনি লন্ডনে পালিয়ে গেছেন। এদিকে সরকার পতনের পর জেলায় তার নামে হত্যাসহ প্রায় এক ডজন মামলা হয়েছে।
জানা গেছে, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের বাড়ি পাঁচবিবি উপজেলার বালিঘাটা এলাকায়। নওগাঁ সরকারি কলেজে ভর্তির পর ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং পরে কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ও সহসভাপতি হন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। তবে বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফার কাছে পরাজিত হন। নির্বাচনের কয়েক মাস পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হন তিনি। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হন। আবার ২০১৮ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য হয়ে জাতীয় সংসদের হুইপও হন। পরে ২০২৪ সালের নির্বাচনের পরও এমপির হয়ে হুইপের পদ পান।
জেলা আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালে এমপি হওয়ার পর থেকেই আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন জেলায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। তার অনুসারীদের রাজনৈতিক পদবিসহ জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসান। দলীয় প্রতিটি সভায় নিজেকে পরিচয় দিতেন ‘খাদেম’ হিসেবে। তার কথার ফুলঝুরিতে এলাকার মানুষ তাকে পরিচ্ছন্ন নেতা হিসেবে চিনলেও তার আসল রূপ ছিল ভিন্ন। তার রোষানল থেকে রেহায় পাননি সাধারণ মানুষসহ দলীয় পদধারী নেতারাও। ক্ষমতার দাপটে গোটা জেলায় তিনি ছিলেন একক ক্ষমতার অধিকারী। জেলার বিভিন্ন হাসপাতালের সামগ্রী ক্রয়ের টেন্ডার, বড় বড় হাট-বাজার ইজারা, নদী খনন, সেতু নির্মাণ, স্কুল-কলেজে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগসহ বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ সবই ছিল তার অনুসারীদের দখলে। তিনি এই সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। সিন্ডিকেটের সদস্যরাও ছিলেন ব্যাপক প্রভাবশালী। তাদের মধ্যে রয়েছে জয়পুরহাট জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক প্রভাষক এ ই এম মাসুদ রেজা, জয়পুরহাট পৌরসভার সাবেক মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক, জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক রাসেল দেওয়ান মিলন, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কালিচরণ আগরওয়ালা, সাবেক দোগাছী ইউপি চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম, পাঁচবিবির সাবেক মেয়র হাবিবুর রহমান, ক্ষেতলাল উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তাকিম মণ্ডল, কালাই উপজেলা চেয়ারম্যান মিনফুজুর রহমান মিলন প্রমূখ। অদৃশ্যমান হয়েই এসব ব্যক্তির কাছ থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। এ ছাড়া এমপি হওয়ায় চারটি কলেজের সভাপতিও ছিলেন স্বপন। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন দপ্তরের শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ কাগজে-কলমে অন্য ঠিকাদারের নামে থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়েছে সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য প্রভাষক মাসুদ রেজার মাধ্যমে। সম্প্রতি খবরের কাগজে পাঁচবিবি উপজেলার বড়মানিক এলাকার ‘ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পরও পারাপার’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেই কাজের কাগজে-কলমে ঠিকাদার যশোরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেও সেই কাজ বাস্তবায়ন করছেন মাসুদ রেজা। এ রকম বিভিন্ন কাজে বিভিন্ন জেলার ঠিকাদারের নাম থাকলেও সেসব কাজ করেছেন মাসুদ রেজাসহ স্বপনের ঘনিষ্ঠজনরা। সাবেক হুইপের কর্মকাণ্ডে এতদিন চুপ থাকলেও শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর মুখ খুলতে শুরু করেছেন সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতা-কর্মীরা।
এমপি হয়েই স্বপন যেন পেয়ে যান অবৈধ সম্পদ অর্জনের আলাদিনের চেরাগ। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তাকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। তবে নিষেধাজ্ঞার আগেই তিনি দেশ ছেড়ে লন্ডনে পালিয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। তার অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কিছু জানা যায়নি।
জানা গেছে, জয়পুরহাট সরকারি কলেজসংলগ্ন শহরের শান্তিনগর এলাকায় বিশাল একটি পাকা বাড়ি রয়েছে স্বপনের। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর তিনি স্ত্রী ও সন্তানের নামে ওই জায়গাটি কিনে নিয়ে ৬২ লাখ টাকা খরচ করে বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। গত ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর বাড়িটিতে লুটপাটের পর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। বাসার দরজা-জানালাও খুলে নিয়ে গেছে তারা।
২০০৮ সালে দেওয়া হলফনামায় ব্যবসা ও মৎস্য চাষে তার বার্ষিক মোট আয় ছিল মাত্র ৩ লাখ ৯৫ হাজার। নগদ ছিল ৫ লাখ টাকা। সেটিও রানিং ব্যবসায় লাগান। স্ত্রী ও নির্ভরশীলদের নামে কোনো অস্থাবর সম্পদ ছিল না। স্থাবর সম্পদের মধ্যে নিজ নামে ১০০ শতাংশ কৃষিজমি ছিল। অকৃষি জমি ছিল ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ।
সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবু সাঈদ আল মাহমুদের হলফনামায় তার বার্ষিক আয় ১ কোটি ১৪ লাখ ৬০ হাজার ৩৫২ টাকা ও নির্ভরশীলদের আয় ২৪ লাখ ৫ হাজার ৮৪ টাকা দেওয়া হয়েছে। নগদ টাকা ৪ লাখ ৫০ হাজার ও স্ত্রীর নগদ ১ লাখ টাকা।
নগদ টাকাসহ অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ১ কোটি ৯১ লাখ ৮৬ হাজার ৮২০ টাকার। আর তার স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ৬৭ লাখ ৩৬ হাজার ৯৩২ টাকা। নির্ভরশীলদের ১১ লাখ ১৭ হাজার ১১ টাকা।
হলফনামায় যৌথভাবে বা নির্ভরশীল সদস্যের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর বা ডিরেক্টর হওয়ার কারণে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৭৬৪ দশমিক ২৪ কোটি টাকা ঋণও রয়েছে স্বপনের। তবে এলাকায় জনশ্রুতি আছে, হলফনামার বাইরেও তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা সম্পদ গোপন করেছেন।
লুৎফর রহমান নামে এক ঠিকাদার বলেন, ‘সাবেক হুইপ স্বপনের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক মাসুদ রেজা। স্বপনের প্রভাবের কারণে জেলার বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ মাসুদ রেজাই পেতেন। এ ছাড়া অন্য কাজও স্বপনের লোকজনই বেশি পেতেন। আমরা তেমন কাজ পেতাম না। স্বপন বিভিন্ন দপ্তরে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে তার লোকজনকে জেলার বেশির ভাগ ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দিতেন।’
ক্ষেতলালের আফতাব নামে একজন বলেন, ‘জয়পুরহাটের বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মূল হোতা ছিলেন স্বপন। তার লোকজনকে দিয়ে তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। মেম্বার, চেয়ারম্যান নির্বাচনেও তাকে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা দিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন অনেকে। যত উন্নয়ন প্রকল্প আসত সবখানেই তার সিন্ডিকেট ছিল। কারও কিছু বলার ছিল না।’
জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান জেলা কমিটির সদস্য শেখর মজুমদার অভিযোগ করে বলেন, ‘সাবেক হুইপ স্বপন জেলায় একক আধিপত্য কায়েম করেছিলেন। যার যোগ্যতা নেই এমন ব্যক্তিকেও তিনি দলীয় চেয়ার থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধির চেয়ারে বসিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে কথা বলায় জেলার শত শত নেতা-কর্মী নির্যাতিত হয়েছেন। আমি বিগত সময়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক, সাংগঠনিক ও প্রচার সম্পাদক ছিলাম। আমাকে সেখান থেকে বাদ দিয়ে তার পছন্দের লোকজনকে ঢুকিয়েছেন। আর আমাকে শুধু সদস্য করা হয়েছে। জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে তার লোকজনের প্রধান্য ছিল। মানে স্বপন ছাড়া এখানে চলবে না- এমন একটা বিষয় ছিল। বিশেষ করে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাহফুজ চৌধুরী অবসর ও আওয়ামী লীগ নেতা বেলাল তার রোষানলের শিকার হয়েছিলেন। স্বপনের মদদেই তার লোকজন মামলা করেছিল। অবসর ও বেলাল জেলও খেটেছিলেন। এ রকম প্রতিটি উপজেলায় অনেক নির্যাতিত নেতা-কর্মী আছেন।’
ক্ষেতলাল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ারুজ্জামান তালুকদার নাদিম বলেন, ‘হুইপ স্বপনের দাপটের কারণে আমরা বিরোধী দলের নেতাদের মতো ছিলাম। জনবিচ্ছিন্ন ও হাইব্রিডদের দিয়ে তিনি দল পরিচালনা করে মানুষকে কোণঠাসা করে রেখেছিলেন। অসংখ্য নেতা-কর্মীকে অত্যাচার করা হয়েছে। তিনি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুরো জেলা নিয়ন্ত্রণ করতেন। তখন ত্যাগী হয়েও স্বপনের কারণে নির্যাতিত হয়েছি, এখনো রাজনৈতিক মামলায় হয়রানি হচ্ছি। আর তিনি পালিয়ে গেছেন। নিয়োগ-বাণিজ্য, ঠিকাদারি কাজ থেকে শুরু করে সবখানেই ছিল তার লোকজনের আধিপত্য। তার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেতেন না।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাবেক হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের মুঠোফোনে কল করলে তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।