ঢাকা ৪ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
উজবেকিস্তানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে কলোম্বিয়ার শুভ সূচনা গ্রাহক আস্থা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় সাফল্যের চূড়ায় পূবালী ব্যাংক ১৩ অঞ্চলে ঝড়ের পূর্বাভাস, নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত রাসুল (সা.)-এর রাতের অভ্যাস কি ছিল? মেসি-দ্যুতিতে রঙিন বিশ্ব ভুল পরিকল্পনায় ঝুলে গেল মন্ত্রীদের জন্য মসজিদ নির্মাণ প্রকল্প মেসিতে মাতাল বিশ্ব বাঁশখালীতে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় যুবকের মৃত্যু কুমিল্লায় কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ২ বিশ্বকাপে অভিষেকেই বিরল ভৌগোলিক কৃতিত্ব উজবেকিস্তানের ঝিনাইদহের শৈলকুপায় ফ্যামিলি কার্ডের উদ্বোধন করেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান শেষ মুহূর্তের ইরেনকির গোলে পানামাকে হারিয়ে ঘানার জয়; খেলোয়াড়দের রেটিং দূরত্ব হাজার মাইল, উৎসব ক্যাম্পাসে তিস্তায় আরেকটি ব্যারেজ নির্মাণ হবে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী ফিফা বিশ্বকাপে কোচ হিসেবে পঞ্চম ব্যালন ডি’অর বিজয়ী হলেন ফাবিও ক্যানাভারো বিশেষ ‘লেগাসি’ ব্যাজ পরে মাঠে নামলেন রোনালদো, মেসি ও মদ্রিচ গ্রুপসেরার দৌড়ে এগিয়ে যাওয়ার লড়াই শিশুদের স্বপ্নের কথা শুনলেন জাইমা রহমান প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে সিন্ডিকেট বিলুপ্তিসহ ৭ দাবি চট্টগ্রামে এইডসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা তরকারি পুড়ে যাওয়ায় গৃহকর্মীকে পুলিশ দম্পতির নির্যাতন আমানত ফিরে পাওয়ার দাবিতে চট্টগ্রামে ‘রোডমার্চ’ ময়মনসিংহ বিভাগ: নীরবে বাড়ছে এইচআইভির বিস্তার বরিশালে ভুয়া ভাড়ার তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তি শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক নীলিমাইব্রাহিমের মৃত্যুবার্ষিকী আজ নদী খননের মাটির নিচে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পশুর শিংয়ে নান্দনিক শিল্পকর্ম কসাইয়ের ‘এইভাবে পইড়া থাকলে বাচ্চা দুইডা মইরা যাইব’ ছড়িয়ে পড়ছে এইডস: আক্রান্ত তরুণ ও শিক্ষার্থীরা কালীগঙ্গা নদীর ওপর সেতু আছে, তবু খেয়া পারাপার
Nagad desktop

অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ বাড়াবে বিএনপি

প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১০:৪১ এএম
আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৪:২৫ পিএম
অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ বাড়াবে বিএনপি
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফিকস

নির্বাচন প্রশ্নে আগের চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর আরও চাপ বাড়াবে বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো।

গত বৃহস্পতিবার (৩০ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকার নিয়ে দলগুলোর মধ্যে নতুন করে আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা চলছে। 

বিশেষ করে ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যাপারে ড. ইউনূস কতটা পক্ষে বা বিপক্ষে তা খতিয়ে দেখছে ওই দলগুলো। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্য নিয়ে বিএনপিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের মধ্যে নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। গত সোমবার স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নির্বাচনের দাবিতে ফেব্রুয়ারিতে নতুন কর্মসূচি নিয়ে মাঠের নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। এরই মধ্যে ছাত্রদের রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে ড. ইউনূসের অবস্থানের বিষয়টি সামনে এল। দু-এক দিনের মধ্যে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপি ও তার সমর্থিত দলগুলোর একাধিক নেতা খবরের কাগজকে বলেছেন, নির্বাচন প্রশ্নে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বক্তব্য নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও ড. ইউনূস এ প্রসঙ্গে এতদিন সরাসরি কোনো অবস্থান ব্যক্ত করেননি। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ছাত্রদের সম্পর্কের একটা ভারসাম্য বজায় রেখে চলছিলেন। যেকোনো ইস্যুতে বিরোধ তৈরি হলে দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে তিনি পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। দ্রুততম সময়ে নির্বাচনের দাবি করলেও দলগুলো এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য কোনো অবস্থান নেয়নি। গত কয়েক মাস তারা বলেছেন, সরকারকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হবে। 

নেতারা আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির অপসারণ, সংবিধান সংস্কার, জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র ঘোষণা, আগে সংস্কার নাকি নির্বাচন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধসহ নানা ইস্যুতে মতবিরোধ তৈরি হলেও বিএনপিসহ ওই দলগুলো সতর্ক থেকে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে। বলা হয়েছে, নির্বাচন প্রশ্নে সরকারকে চাপে রাখলেও বিরোধে জড়াবে না। কিন্তু ছাত্রদের রাজনৈতিক দল গঠন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের পর দলগুলোর মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

অনেকের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দল গঠনের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, সরকারের অবস্থান এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, প্রথমত বাংলাদেশের আইন মোতাবেক যে কেউ সংগঠন বা দল গঠন করতে পারে এবং ঘোষণাও দিতে পারে। গণতান্ত্রিক দেশে যে কারও রাজনৈতিক দল গঠনের অধিকার রয়েছে। কিন্তু তাদের আদর্শ, নীতি ও নেতৃত্ব কতটুকু গ্রহণ করা হবে, তা নির্ভর করছে জনগণের ওপর।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার নিজেরা ঘোষণা দিয়েছে, তারা নিরপেক্ষ ও জনগণের সরকার। এই সরকারের কোনো উপদেষ্টা যদি রাজনৈতিক দল গঠন করে, তাহলে সেই দল সরকার-সমর্থিত প্রতিষ্ঠিত দল হিসেবে চিহ্নিত হবে। সহযোগিতা করলে সরকার নিরপেক্ষতা হারাবে। পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক দল গঠনের পর তাদের মূল্যায়ন করবে জনগণ।

অন্যরা যা বলছেন 

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘রাজনীতি করতে চাইলে তো আমি কোনো অসুবিধা দেখি না। রাজনীতি করতে চাইলে তারা করতে পারে। সে অধিকার তাদের আছে। জনগণ দেখবে কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ। তবে কিংস পার্টি দিয়ে রাজনীতি হবে না।’

সরকারি সম্পদ বা সরকারি কর্তৃত্ব ব্যবহার করে রাজনীতি করাটা জনগণ এবং অনেক রাজনৈতিক দল ভালোভাবে দেখবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। জি এম কাদের বলেন, ‘এমনটি হলে আগামী নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডও নিশ্চিত হবে না।’

তিনি বলেন, এবার গণ-অভ্যুত্থানের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ঐকমত্য হয়েছিল, সেটি হলো তারা রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। দাবি উঠেছিল, ইলেকশনের সময় যারা ক্ষমতায় থাকবেন তারা কোনো দল করতে পারবেন না। দল করতে চাইলে সরকারের বাইরে থেকে করতে হবে। এখন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করলে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নষ্ট হবে। সে রকম কিছু হলে আগামী নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ছাত্ররা দল গঠন করতে পারে, তারা আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিশ্রুতি জনগণকে দিতে পারে। জনগণ যদি তাদের গ্রহণ করে তবে স্বাগতম। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও ক্ষমতায় থেকে দল গঠন করেছেন। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা, যারাই ক্ষমতায় আসুন না কেন, তা যেন বৈধ প্রক্রিয়ায় হয়। জনগণ যদি ভোট দিয়ে কাউকে ক্ষমতার মসনদে বসায়, তাহলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’ 

ভারতের কয়েক মাসব্যাপী নির্বাচনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘ইসি শক্তিশালী হলে কে ক্ষমতায় আছে বা কে নেই, তাতে নির্বাচনের ওপর প্রভাব পড়বে না।’ 

যা বললেন বিএনপির মিত্ররা

বিএনপির মিত্র দলগুলো বলছে, দেশের গণতান্ত্রিক বিধিবিধান ও নির্বাচন কমিশনের আইন মেনে যে কেউ রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারে। উপদেষ্টাদের দল গঠনের আগে পদ ত্যাগ করা উচিত। কিংস পার্টি গঠন করলে ছাত্রদের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবে। 

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার খববের কাগজকে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশের বিধিবিধান মেনে দল গঠন করলে আপত্তি নেই। আমি মনে করি, উনি (প্রধান উপদেষ্টা) ছাত্রদের সম্মান দেখিয়ে সুযোগ করে দিতে চাইছেন। তবে রাজনৈতিক দল গঠন করলে ছাত্রদের উপদেষ্টা পদে থাকা উচিত হবে না। এতে সরকারের নির্দলীয় চরিত্র থাকবে না, গ্রহণযোগ্যতা কমবে। তবে কোনো উপদেষ্টাকে দল গঠনের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কথা বলতে শুনিনি।’ 

গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা ও নাগরিক ঐক্যর সভাপতি মাহামুদুর রহমান মান্না খবরের কাগজকে বলেন, ‘পদ্ধতির মধ্যে থেকে যে কেউ দল গঠন করতে পারে। প্রধান উপদেষ্টা হোক বা অন্য কেউ তাকে সাপোর্ট করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ক্ষমতায় থেকে দল গঠন নিয়ে। তারা যদি রাজনৈতিক দল গঠন করতে চান, তাহলে এখনই ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু তারা বলছেন, এখনই তারা ক্ষমতা ছাড়বেন না। এটা তো সততা হলো না? এসব বিষয় উনি (প্রধান উপদেষ্টা) জানেন।’ 

তিনি বলেন, ‘উনি (প্রধান উপদেষ্টা) ছাত্রসংগঠনগুলোকে সুযোগ করে দিতে চাচ্ছেন। উনি যে দায়িত্বে আছেন, সেখান থেকে এভাবে বলতে (আমি সুযোগ দিতে চাই) পারা যায় কি না, তা ভেবে দেখতে হবে। জনগণ যদি ছাত্রদের রাজনীতি করার সুযোগ দেয়, তাহলে সরকার সুযোগ দিতে পারে। সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে সরাসরি জনগণের মধ্যে যেন প্রশ্ন না ওঠে। সেটা হলে তা আমাদের জন্য বড় বিপর্যয়কর হবে। জনগণ চাইবে, ক্ষমতায় থেকে সরকারের ছায়া, সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে কেউ যেন দল গঠন না করে। আর কাউকে যদি সমর্থন করার প্রয়োজন থাকে, তাহলে সরকারের উচিত নয় প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়া।’

১২-দলীয় জোটের মুখপাত্র ও বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমানে ছাত্রদের মধ্যে ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাতিকে গভীর সংকটে ফেলবে। কিংস পার্টি গঠন করে তাদের মধ্যে ক্ষমতায় থাকার ইচ্ছা দেখা যাচ্ছে। খেয়াল রাখতে হবে, এর ফলে সরকারের নিরপেক্ষতা এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে যেন প্রশ্ন না ওঠে। পাশাপাশি কিংস পার্টি গঠন করে নির্বাচনে অংশ নিলে ছাত্রদের গ্রহণযোগ্যতাও থাকবে না।’ তিনি বলেন, ‘সরকারকে সঠিক পথে আনতে বিএনপির সঙ্গে রাজপথে থেকে সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করতে মাঠে থাকবে ১২-দলীয় জোট।’

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা আশা করি, প্রধান উপদেষ্টা তার পদে থেকে রাজনৈতিক দল গঠনে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন না। যদি ছাত্রদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন, তাহলে নতুন বিতর্ক শুরু হবে।’

তিনি বলেন, ছাত্রদের উপদেষ্টা থেকে পদত্যাগ করে দল গঠন করা উচিত। তবে আগামী নির্বাচনে সরকার নিরপেক্ষ থাকতে পারবে কি না, তা পরিস্থিতি বলে দেবে।

পশুর শিংয়ে নান্দনিক শিল্পকর্ম কসাইয়ের

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩১ এএম
আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
পশুর শিংয়ে নান্দনিক শিল্পকর্ম কসাইয়ের
রাজশাহীর কসাই রিপন আলীর সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার শিং ও মাথার খুলি দিয়ে তৈরি ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম। ছবি: সংগৃহীত

পেশায় তিনি কসাই। প্রতিদিন পশু জবাই ও মাংস বিক্রিই তার কাজ। কিন্তু এই পেশার মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন এক ভিন্ন জগতের সন্ধান। অন্যরা যেখানে পশুর মাথা ও শিংকে বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেন, সেখানে রাজশাহীর রিপন আলী সেগুলোকে রূপ দিচ্ছেন দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্মে। গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার পরিত্যক্ত মাথা সংগ্রহ করে দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় তৈরি করছেন ব্যতিক্রমী শোপিস, যা এখন দর্শনার্থীদের কৌতূহল ও প্রশংসা কুড়াচ্ছে।

৪০ বছর বয়সী রিপন আলী রাজশাহী নগরীর শালবাগান এলাকার বাসিন্দা। গত এক দশক ধরে তিনি এই ব্যতিক্রমী শিল্পচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে তার সংগ্রহে শতাধিক নান্দনিক শোপিস জমা হয়েছে। বাড়ির একটি কক্ষজুড়ে সাজিয়ে রেখেছেন এসব শিল্পকর্ম। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রচুর মানুষ তার এই সংগ্রহ দেখতে ভিড় করছেন।

রাজশাহী নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রথমে কৌতূহল থেকে দেখতে এসেছিলাম। এখানে এসে আমি সত্যিই মুগ্ধ। সাধারণত যেসব জিনিস আমরা বর্জ্য হিসেবে দেখি, সেগুলোকে এত সুন্দর ও নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করা যায়, তা কল্পনাও করিনি।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সংগ্রহের ছবি দেখে এখানে এসেছি। কাছ থেকে দেখে আরও ভালো লাগছে। প্রতিটি শোপিসের পেছনে যে শ্রম, ধৈর্য ও মেধা রয়েছে, তা স্পষ্ট বোঝা যায়। একজন কসাইয়ের হাতে এমন ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।’

জানা গেছে, রিপনের এই শিল্পযাত্রার শুরুটা হয়েছিল একেবারেই সাধারণ একটি ঘটনা থেকে। কসাইপট্টিতে কাজ করার সময় একটি বড় মহিষের শিং তার নজর কাড়ে। শিংটির সৌন্দর্য দেখে তিনি ভাবেন- এটি কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় অনুসন্ধান।

প্রথমদিকে কাজটি সহজ ছিল না। পশুর মাথা সংরক্ষণ ও দুর্গন্ধমুক্ত রাখার কোনো কার্যকর পদ্ধতি তার জানা ছিল না। এ বিষয়ে জানতে তিনি বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাননি। এরপর নিজেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। বছরের পর বছর চেষ্টা, ব্যর্থতার পর তিনি একটি কৌশল বের করেন। এই কৌশলের ফলে পশুর মাথা ও শিং দীর্ঘদিন পচনমুক্ত রেখে শৈল্পিক রূপ দেওয়া সম্ভব হয়।

রিপন জানান, ২০১৭ সাল থেকে তিনি পরিকল্পিতভাবে এই কাজ শুরু করেন। তবে সব ধরনের পশুর মাথা তিনি সংগ্রহ করেন না। যেসব পশুর শিং বা মাথার গঠন দেখতে আকর্ষণীয় ও নান্দনিক, সেগুলোই বেছে নেন। পরে সেগুলো পরিষ্কার, সংরক্ষণ ও শৈল্পিক উপস্থাপনের মাধ্যমে শোপিসে রূপ দেন।

এই কাজে তাকে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখিও হতে হয়েছে। পশুর হাড় ও মাথা সংগ্রহ করে বাড়িতে রাখার কারণে একসময় পরিবার ও প্রতিবেশীদের সমালোচনা শুনতে হয়। দুর্গন্ধ ও অতিরিক্ত খরচের কারণে অনেকে তাকে নিরুৎসাহিতও করেছিলেন। বর্তমানে পরিস্থিতি  বদলে গেছে। একসময় যারা তার এই কাজকে অদ্ভুত ভাবতেন, তারাই এখন প্রশংসা করছেন। এই শিল্পকর্মের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়েও অনেকে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

রিপন আলী বলেন, আমি শুধু বাজার থেকে সংগ্রহ করা গৃহপালিত পশুর মাথা ও শিং ব্যবহার করি। কোনো সংরক্ষিত বা বন্যপ্রাণীর অঙ্গ ব্যবহার করি না। আমার বিশ্বাস, গৃহপালিত পশুর হাড় ও শিং দিয়ে তৈরি নান্দনিক শোপিস জনপ্রিয় হলে বন্যপ্রাণীর অঙ্গ দিয়ে ঘর সাজানোর প্রবণতা কমবে। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই উদ্যোগ একদিন ক্ষুদ্র শিল্পে পরিণত হবে।

ছড়িয়ে পড়ছে এইডস: আক্রান্ত তরুণ ও শিক্ষার্থীরা

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
ছড়িয়ে পড়ছে এইডস: আক্রান্ত তরুণ ও শিক্ষার্থীরা
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এইডস রোগী, বাড়ছে মৃত্যু। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, একসময়ে এইচআইভি সংক্রমণ নগর ও শহরকেন্দ্রিক ছিল। এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে জেলা পর্যায়েও। এইডসে আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
বিশ্বের অনেক দেশেই এখন নতুন করে এইচআইভি সংক্রমণ কমছে, এইডসে মৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে। তবে বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। চলতি বছর জেলা পর্যায়ে সমকামী তরুণদের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে বিষয়টি নজরে আসে সংশ্লিষ্টদের। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস ও সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ (এসটিডি) কন্ট্রোল প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ১ হাজার ৪৩৮ জন নতুন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৯১ জনে, যা উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে। ২০২৫ সালে এইডসে ২৫৪ জন মারা যান। অন্যদিকে চলতি বছরও সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বছরের মাঝামাঝি সময়েই আক্রান্তের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। সংক্রমিতদের বড় অংশের বসবাস ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, খুলনা ও সিলেট অঞ্চলে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের হার দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালে নতুন শনাক্তদের মধ্যে অবিবাহিতদের হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই শ্রেণিতে সংক্রমণের হার ১০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এই হার চলতি বছরে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব, সামাজিক লজ্জা ও কলঙ্ক, পর্যাপ্ত পরীক্ষা সুবিধার সংকট এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের কারণে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। অনেক মানুষ এখনো স্বেচ্ছায় এইচআইভি পরীক্ষা করাতে চান না। অন্যদিকে বিদেশগামী ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছেন, যা সংক্রমণ শনাক্তকরণকে আরও কঠিন করে তুলছে। খবরের কাগজের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যেও দেখা গেছে এইডস সংক্রমণের ভয়াবহ চিত্র। 

প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এইডস সংক্রমণ। চলতি বছরের সাতজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি এইডস এইচটিসি (এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং)/ এআরটি (অ্যান্ট্রি রিট্রোভাইরাল থেরাপি) সেন্টার। আর গত মে মাসে এইচআইভি আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে জেলায় ৩৮৫ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসা নিচ্ছেন।

বরিশালের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গত মাসের শেষ দিকে জেলার শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে তিন হাজারের বেশি মানুষের রক্ত পরীক্ষা করে ২০ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ১১ জনই উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। 

এআরটি সেন্টারের কাউন্সেলর জসিম উদ্দিন জানান, আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই এইচএসসি থেকে মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থী। বয়স ১৭ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বরিশালে এসে তারা পড়াশোনা বা বসবাস করছেন।

সিলেট ব্যুরোপ্রধান জানান, জেলায় চলতি বছর ২২ জন এইডস আক্রান্তের সন্ধান পাওয়া গেছে। সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, সিলেটে ২০২৪ সালে ৩১ জন, ২০২৫ সালে ৬৬ জন এবং ২০২৬ সালের মে মাসের ৩ তারিখ পর্যন্ত ২২ জন এইডস আক্রান্ত হয়েছেন। এটা সেনসেটিভ বিষয় তাই কারণ বলা যাবে না। সিলেটে রোগীদের অ্যান্টিভাইরাল ট্রিটমেট দেওয়া হয়। এইডস আক্রান্ত কেউ হাসপাতালে ভর্তি নেই।

যশোরের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, জেলার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ জন এইচআইভি সংক্রমিত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ১০ জন পুরুষ ও ৬ জন নারী। এর মধ্যে ৯ জন তরুণ শিক্ষার্থী। ২০২৫ সালে সংক্রমিত ও আক্রান্ত হওয়া ৪৫ জনের মধ্যে ২৫ জন পুরুষ এবং ১৬ জন নারী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো–আক্রান্তদের মধ্যে ২৫ জনই শিক্ষার্থী। যেখানে ২০২৪ সালে মোট আক্রান্ত ২৫ জনের মধ্যে শিক্ষার্থী ছিলেন ১২ জন।

রাজশাহী ব্যুরোপ্রধান জানান, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার (সিএস) ডা. বায়েজীদ-উল ইসলাম বলেন, জেলায় ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১ হাজার ২১৯ জনের স্ক্রিনিং করে ৩৪ জন এইচআইভি পজিটিভ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ৩১ জন পুরুষ ও ৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের। এর মধ্যে পুরুষ ৩১ জনের মধ্যে ৬ জন বিবাহিত ও বাকি ২৫ জন অবিবাহিত। বয়সের হিসাবে ৯ জন ২৫ বছরের নিচে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং সার্ভিস (এইচটিসি) সেন্টার থেকে জানা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ২৪৮ জন এইচআইভি সংক্রমিতকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ৪৩ জন, ২০২৫ সালে ৩৮ জন ও ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ১৮ জনের শরীরে এইচআইভি ধরা পড়েছে। ময়মনসিংহ জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় দেড় শ জন এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন। বাকিরা নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুরসহ আশপাশের জেলার বাসিন্দা। 

ময়মনসিংহ থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারের কাউন্সিলর কাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মো. আবদুল আল মামুন বলেন, এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই সমকামী পুরুষ। তাদের মধ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, যাদের বেশির ভাগই মেসে থেকে পড়াশোনা করেন। তাদের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এইচআইভি সংক্রমণের বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটে অরক্ষিত যৌন মিলনের কারণে। এইচআইভিতে আক্রান্ত পুরুষের মাধ্যমে স্ত্রীও আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্ত মায়ের মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমিত বাচ্চারও জন্ম হয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। এইডসে প্রথম মারা যান ২০০০ সালে। বর্তমানে দেশে অনুমিত এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ জন। এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৩১৩ জন। শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৭৫ জন চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। অর্থাৎ শনাক্ত রোগীদের প্রায় ৭৪ শতাংশ চিকিৎসা পাচ্ছেন, তবে এখনো ২৬ শতাংশ রোগী চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের চিত্রও উদ্বেগজনক। শনাক্ত সংক্রমিতদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ পুরুষ সমকামী, ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী, ১২ শতাংশ প্রবাসী, ১১ শতাংশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য এবং ৬ শতাংশ শিরায় মাদক গ্রহণকারী। নারী যৌনকর্মী ও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার ১ শতাংশ করে। বাকি ২২ শতাংশ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে শনাক্ত হয়েছে।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তদের সবচেয়ে বড় অংশ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। মোট আক্রান্তের ৬২ দশমিক ৬১ শতাংশের বয়স ২৫ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের হার ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণের উপস্থিতি রয়েছে। ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

এদিকে এইডস হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশন (এএইচএফ) জানিয়েছে, দেশের ৪১টি জেলায় এখনো এইচআইভি পরীক্ষা চালানো যাচ্ছে না। ফলে দেশের বড় একটি অংশ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট সংক্রমিতদের প্রায় ১৮ শতাংশ এখনো শনাক্ত হয়নি। আবার শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যেও প্রায় এক-চতুর্থাংশ চিকিৎসা গ্রহণ করছেন না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এইচআইভি এমন একটি ভাইরাস, যা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে আক্রমণ করে। চিকিৎসা না নিলে সংক্রমণের চূড়ান্ত পর্যায়ে অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম (এইডস) দেখা দেয়। বর্তমানে এই রোগের কোনো স্থায়ী নিরাময় নেই। তবে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) ব্যবহারের মাধ্যমে ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আগমনের পর তাদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের বিস্তৃতি দেখা গেছে। তারা যেহেতু আমাদের দেশে রয়েছে, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আমাদের সামাজিক ও অসামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমণ বিস্তারের ঘটনা ঘটে।’

তিনি বলেন, আগে দেশে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। তবে বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার সামাজিক লজ্জা, কুসংস্কার ও বৈষম্যের ভয়ে অনেকেই পরীক্ষা বা চিকিৎসা নিতে অনাগ্রহী থাকেন। ফলে সংক্রমণ অজান্তেই আরও মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

একসময়ে এইচআইভি সংক্রমণ প্রধানত বড় শহরকেন্দ্রিক থাকলেও এখন তা জেলা ও প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কেবল চিকিৎসা নয়, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রচার কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এই বিশেষজ্ঞ।

নারায়ণগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি গেছে শ্রমিক লীগ নেতার ভাটায়

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:০৮ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
নারায়ণগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি গেছে শ্রমিক লীগ নেতার ভাটায়
নারায়ণগঞ্জের আলীগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি কেটে জলাশয়ে পরিণত করেছেন ঠিকাদারের লোকজন। ছবি: খবরের কাগজ

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পদ্মা সেতুর রেললাইনের সংযোগ উড়াল সেতুর পিলারের নিচে থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করে দিয়েছেন ঠিকাদার। পিলারের নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লক তুলে ফেলা হয়েছে। তবে এরই মধ্যে মাটি কাটার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মাটি কাটায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত পদ্মা রেলসেতুর সংযোগ রেললাইনের উড়াল সেতুটি রেলওয়ের হলেও প্রকল্পটির দায়িত্বে রয়েছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার্স কোর। প্রকল্পটির প্রধান নির্মাতা চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। তবে বাংলাদেশের সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে রিংটেক লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান আলীগঞ্জ ভায়াডাক্ট (উড়াল সেতু) নির্মাণে যুক্ত ছিল। দুটি প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুসারে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও এখনো তারা প্রকল্পের বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করে যাচ্ছে। এমনকি বিক্রি থেকে বাদ যায়নি মাটিও।

গতকাল মঙ্গলবার আলীগঞ্জ উড়াল সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে মাটি কাটার কারণে রেললাইনের সংযোগ সেতুর পাঁচটি পিলারের নিচের দুই পাশে মাটি নেই। রেললাইনের ৮৫ নম্বর পিলার থেকে শুরু করে ৮৯ নম্বর পিলার পর্যন্ত পিলারের প্রায় ১৭৫ মিটার এলাকাজুড়ে গভীর করে মাটি কাটায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। মাটির নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লকগুলো তুলে ওপরে ফেলে রাখা হয়েছে। এতে পদ্মা সেতুর সংযোগ রেললাইনের উড়াল সেতুর পিলারের অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা তৈরি হওয়ায় প্রতিবাদ জানান স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে স্থানীয় একটি ইটভাটার মালিক পরিচয়ে পিলারের নিচ থেকে মাটি কেটে ট্রাকভর্তি করে দাপা এলাকায় নিয়ে গেছে। এলাকাবাসী বাধা দিলে ইটভাটার মালিক কুতুবপুর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার এবং ফতুল্লা শ্রমিক লীগ নেতা আবু বক্কর তা মানেননি, বরং রেলসেতুর পিলারের পাশ থেকে মাটি কেটে নেওয়ার পাশাপাশি মাটির নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লকও তুলে ফেলা হয়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে চলাচলের রাস্তাও। মেম্বার এলাকাবাসীকে জানিয়েছেন, ঠিকাদারের কাছ থেকে তার ভাটার জন্য তিনি মাটি কিনেছেন। পরে মাটি কাটার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসনের লোকজন মাটি কাটা বন্ধ করে দেন। তবে মাটি ফেরত এনে খনন করা গর্ত ভরাট করা না হলে রেল চলাচলের অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। 

ভিডিও দেখে মাটি কাটা বন্ধ করে দেওয়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ওইখানে রেলওয়ের লোকজনসহ ঠিকাদারদের মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছি। রেললাইনের সংযোগ উড়াল সেতুর পিলার রক্ষার পরবর্তী কাজ করবে রেল কর্তৃপক্ষ।’

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাটি কাটার কোন বৈধ অনুমতি পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক রায়হান কবির। তিনি খবরের কাগজে বলেন, মাটি কাটার একটি ভিডিও ভাইরাল হলে দেশি-বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে নথিপত্রসহ হাজির হতে বলা হয়। কিন্তু তাদের মাটি কাটার বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসন তাই মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি গর্ত ভরাটে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।

মুঠোফোনে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা বলেন, রেলওয়ে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মাটি কাটার অনুমতি দেয় না। যারা মাটি কেটেছে তাদের মাটি নেওয়ার চুক্তিও নেই। তাদেরকে মাটি অপসারণের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। অনুমোদনহীন মাটি কাটার বিষয়ে ইতোমধ্যে রেলওয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই তদন্ত কমিটিই পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবে বলে জানান তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে ব্রহ্মপুত্র কমবে পানি, বাড়বে খরার ঝুঁকি

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:১২ এএম
জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে ব্রহ্মপুত্র কমবে পানি, বাড়বে খরার ঝুঁকি
ছবি: সংগৃীহত

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াল থাবায় অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ছে ব্রহ্মপুত্র নদ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ মেয়াদে এই নদে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। এর ফলে ভবিষ্যতে অববাহিকা এলাকায় খরার তীব্রতা যেমন বাড়বে, তেমনি হুমকির মুখে পড়বে নদীর পরিবেশগত প্রবাহ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের (আইডব্লিউএফএম) একদল গবেষক এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছেন। জার্নাল অব ওয়াটার অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জে চলতি বছর তাদের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন জারিন তাসনিম ও এ কে এম সাইফুল ইসলাম। গবেষক দলের অন্য সদস্যরা হলেন ইন্দ্রনীল সরকার, মো. সাইদুজ্জামান, খন্দকার এম অনিক রহমান, মোহাম্মদ আসাদ হোসেন এবং মো. সাদমান সাকিব। গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশনের অর্থায়নে ‘ইনহ্যান্সিং কোস্টাল রেজিলিয়েন্স থ্রু নেচার-বেজড সলিউশনস’ প্রকল্পের আওতায় এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণায় প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। 

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে দূরপাল্লার পূর্বাভাস
গবেষণায় সিএমআইপি-৬ ক্লাইমেট প্রজেকশন (গ্লোবাল ক্লাইমেট মডেল) এবং সয়েল অ্যান্ড ওয়াটার অ্যাসেসমেন্ট টুল–‘স্যাট’ নামক হাইড্রোলজিক্যাল মডেল ব্যবহার করে ব্রহ্মপুত্র নদের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা গেছে, ২০৪০ থেকে ২০৬৯ সময়কালে নদে পানির প্রবাহ সামান্য বাড়তে পারে। তবে ২০৭০ সাল থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি সময়ে পানির প্রবাহ প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

স্টান্ডার্ডাইজড ডিসচার্জ ইনডেক্স বিশ্লেষণ বলছে, ভবিষ্যতে এই অববাহিকায় শুষ্ক ও আর্দ্র চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রকোপ বাড়বে। বিশেষ করে দূর ভবিষ্যতে খরার তীব্রতা ও পৌনঃপুনিকতা অনেক বেশি হবে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।

নদীর স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় জরুরি ‘ইকোলজিক্যাল ফ্লো’ নিয়েও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন গবেষকরা। জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি মডেল এসএসপি৩-৭.০ অনুযায়ী, নিকট ভবিষ্যতেই নদীর প্রবাহ প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানির প্রবাহের এই নিম্নমুখী প্রবণতা জলজ প্রাণীর প্রজনন ও সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষকরা জানান, ব্রহ্মপুত্র একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তসীমান্ত নদ, যা বাংলাদেশসহ চারটি দেশের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। ভবিষ্যতের চরম অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় গবেষকদের পরামর্শ হলো অবিলম্বে সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি আন্তসীমান্ত সহযোগিতা বৃদ্ধি ছাড়া এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কংক্রিটের জঙ্গলে জলবায়ু ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তনের মরণফাঁদে থাকা বাংলাদেশের শহরগুলোর অস্তিত্ব রক্ষায় কেবল কংক্রিটের স্থাপনা আর যথেষ্ট নয়। এর বদলে শহর গড়ার পরিকল্পনা ও অবকাঠামো নির্মাণে ‘প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান’ গ্রহণের বিকল্প নেই বলে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এবং গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশনের (জিসিএ) এক নতুন প্রতিবেদনে।

২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত ‘কম্পেনডিয়াম অন নেচার-বেজড সলিউশনস ফর আরবান রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রথাগত উন্নয়নের চেয়ে প্রকৃতিকে সঙ্গী করে নেওয়া অবকাঠামোই ভবিষ্যতে শহরগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দিতে সক্ষম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একদিকে যেমন তীব্র তাপপ্রবাহ বাড়ছে, অন্যদিকে পানিসংকটের মতো সমস্যাও প্রকট হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথাগত ‘ধূসর’ বা কৃত্রিম অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানকে একটি সাশ্রয়ী ও টেকসই বিকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে খরা
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ খরা এখন কেবল স্থানীয় সংকট নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষণা কর্মসূচি-ক্লেয়ার প্রোগ্রামের অধীনে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণা ও অভিযোজনমূলক কার্যক্রম নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আজ ১৭ জুন ‘বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এশিয়া ও আফ্রিকার খরাপ্রবণ অঞ্চলের পরিবর্তনের এই চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত এক দশকে বিশ্ব এমন সব খরার মুখোমুখি হয়েছে, যা গত কয়েক দশকের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ভারত, নেপাল, উগান্ডা, তাঞ্জানিয়া ও কেনিয়াসহ আফ্রিকার ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চলের দেশগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে প্রকট। এই খরা কেবল ফসলের ক্ষতিই করছে না, বরং খাদ্য নিরাপত্তা, সুপেয় পানির সংকট, জনবসতির স্থানচ্যুতি এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক সংঘাত খরা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ভয়াবহ করে তুলছে।

এই প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, খরা মোকাবিলায় কেবল প্রযুক্তি বা অবকাঠামোই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পানির ন্যায্য বণ্টন। খরাপ্রবণ দেশগুলোকে জলবায়ু বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ সংকুলান রাখার পরামর্শও দিয়েছে ক্লেয়ার

শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিধিনিষেধ সময়ের দাবি

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম
শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিধিনিষেধ সময়ের দাবি
ছবি: সংগৃহীত

খেলার মাঠের হইহুল্লোড় কিংবা বইয়ের পাতার ঘ্রাণ–শৈশবের এই চিরচেনা অনুষঙ্গগুলো এখন অনেকটাই ইতিহাস। বর্তমান প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের শৈশব এখন বন্দি হয়ে পড়েছে স্মার্টফোনের নীল আলোর স্ক্রিনে। ফেসবুক, টিকটক কিংবা ইনস্টাগ্রামের ভার্চুয়াল জৌলুশে বুঁদ হয়ে থাকা এই প্রজন্ম কেবল শারীরিক সক্ষমতাই হারাচ্ছে না, বরং জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাং কালচারসহ নানা ভয়াবহ অপরাধ ও মানসিক অস্থিরতায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির এই লাগামহীন ব্যবহার কোমলমতি শিশুদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশে ডেকে আনছে এক মারাত্মক বিপর্যয়। 

শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে এখন নজিরবিহীন কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছে। ফ্রান্স, স্পেন, ব্রিটেন ও চীনের মতো দেশগুলোও নিয়েছে একই পথ। বিশ্বের প্রায় ৭৯টি দেশে স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ।

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপের প্রসঙ্গ নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। 

স্ক্রিনে বন্দি শৈশব ও মানসিক অবক্ষয়
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম শিশুদের মধ্যে ‘ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশন’ বা তাৎক্ষণিক তৃপ্তিবোধের এমন এক আসক্তি তৈরি করছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগের ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বাস্তব জগতের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হওয়া এই শিশুরা ক্রমেই সৃজনশীলতা হারাচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে ঘুমের ব্যাঘাত, স্থূলতা এবং দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এখন ঘরে ঘরে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩২ শতাংশ শিশু সাইবার বুলিং ও ডিজিটাল হয়রানির শিকার। অথচ প্রযুক্তির এই অপব্যবহার কেবল ব্যক্তিগত সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা রূপ নিচ্ছে সামাজিক ব্যাধিতে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে শিশুরা বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বলে জানান সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা অধিশাখার পরিচালক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বাচ্চাদের সাইকোলজিক্যাল ও সাইকো-সোশ্যাল সমস্যা হচ্ছে। আমরা লক্ষ্য করছি যে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ফলে সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে।’

নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে শিশুদের বিপথগামী হওয়ার বিভিন্ন উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে অল্প বয়সে বিয়ের মতো ঘটনা বাড়ছে, যা পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতা তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচয় হওয়ার সূত্র ধরেই এমন পরিণতির দিকে এগোচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা।

কিশোর গ্যাং: স্মার্টফোনের অন্ধকার অধ্যায়
প্রযুক্তির আশীর্বাদের আড়ালে ডালপালা মেলছে ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতি। অপরাধের নীল নকশা তৈরি, সদস্য সংগ্রহ, প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়া–সবকিছুর মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন। র‌্যাবের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে প্রায় ১ হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও টিকটক ব্যবহার করেই তারা অপরাধের যাবতীয় সমন্বয় করত। টিকটক বা ফেসবুকে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা অনেক মেধাবী কিশোরকে ঠেলে দিচ্ছে চরম অপরাধের পথে।

বিশ্বজুড়ে কড়াকড়ি, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়
১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মুর্তুজা জুলকার নাঈন নোমান।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সাইবার নিরাপত্তা আইন, বিপিডিএ বা ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আলোকে আমরা সাইবার বুলিং মোকাবিলায় গুরুত্ব দিচ্ছি। যদি সরকার ভবিষ্যতে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজনীয়তা মনে করে, তবে সংশ্লিষ্ট আইনগুলোতে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা নতুন নীতিমালা তৈরির সুযোগ রয়েছে। আইসিটি বিভাগ এবং ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি (এনসিএ) তখন সে অনুযায়ী কাজ করবে।’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশিদ ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের এখানে (আইসিটি বিভাগ) এখনো এ বিষয়ে কোনো কিছুই সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। হয়তো এই বিষয়গুলো নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা হবে।’

ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলিং ও আইনি সুরক্ষা
অনলাইনে পরিচয়ের সূত্র ধরে ব্ল্যাকমেইলিং ও যৌন হয়রানির ঘটনা এখন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সম্প্রতি সরকার ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি ও রিভেঞ্জ পর্নো ছড়ানোর মতো অপরাধের শাস্তি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান করেছে।

তবে আইনি প্রতিকারের চেয়েও বেশি প্রয়োজন সচেতনতা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা অধিশাখার পরিচালক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম মনে করেন, ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় রেস্ট্রিকশন আরোপ করা এখন সময়ের দাবি।

একক নয়, সমন্বিত উদ্যোগের পরামর্শ
ইউনিসেফ এবং সরকারের যৌথ উদ্যোগে ইতোমধ্যে অনলাইন সুরক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ কোর্সের আওতায় প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার শিশুকে সনদ প্রদান করা হয়েছে। তবে পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ইউনিটে গত ৬ বছরে ৬০ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়ার ঘটনা প্রমাণ করে, সাইবার সহিংসতা কতটা গভীরে পৌঁছেছে। শিশুদের অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সামাজিক কাঠামো ও পারিবারিক বন্ধনের যথাযথ ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

সম্প্রতি শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনার সময় এমন মতামত দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহবুবা সুলতানা। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিশুদের অপরাধ প্রবণতার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। কোনো একটি কারণকে কেন্দ্র করে এর সমাধান সম্ভব নয়। এটি অনেক উপাদানের একটি অংশ মাত্র।’

অধ্যাপক মাহবুবা সুলতানা মনে করেন, বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা অন্য দেশ থেকে ভিন্ন। এ দেশের সমাজব্যবস্থায় এখনো অনেক ক্ষেত্রেই যৌথ পরিবারব্যবস্থা বিদ্যমান এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বেশ সক্রিয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো পিয়ার গ্রুপ এবং আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী। এই সামাজিক কাঠামো ও সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে যেকোনো প্রযুক্তি বা মাধ্যমকে পজিটিভলি কাজে লাগানো সম্ভব। এসব কারণেই অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট অনেকটাই মিনিমাইজ করা সম্ভব হয়।’

তবে এ বিষয়ে আরও নিবিড় গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অন্য দেশের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট হুবহু মিলবে না। এ জন্য বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়ে সময় সাপেক্ষে চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কনটেক্সট ভিন্ন হওয়ায় শিশুদের এই সংকট মোকাবিলায় কোনো একমুখী চিন্তার সুযোগ নেই বলেও মত দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।

কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে রিট 
শিশু ও কিশোরদের ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত ফেসবুক, টিকটকসহ সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং এসব প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার রোধে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদন করতে যাচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সানাউল্লাহ নূরী। আগামী রবিবার লিগ্যাল ভয়েস ফাউন্ডেশনের পক্ষে তিনি এই রিট আবেদন করবেন। এতে বিবাদী করা হয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি)।