রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার মোড়ে এখন রমরমা অবস্থা। মোড়ের চারপাশে নতুন দালানকোঠা। এসব ভবনের নিচতলা ও দোতলায় প্লাস্টিক, রাবার ও কেমিক্যালজাতীয় পণ্যের দোকান। আজ থেকে ছয় বছর আগে এই চুড়িহাট্টা মোড়েই মুহূর্তেই ৭১ জন মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন, সেই ভয়াবহতা যেন ভুলতে বসেছেন স্থানীয়রা। কেননা নানা পদক্ষেপ ও সচেতনতার কথা উঠলেও চুড়িহাট্টা বা পুরান ঢাকার বেশির ভাগ এলাকা থেকে এখনো সরেনি কেমিক্যাল, প্লাস্টিক বা দাহ্যজাতীয় পণ্যের দোকান, কারখানা বা গুদাম।
আজ ২০ ফেব্রুয়ারি স্মরণকালের ভয়াবহ সেই চুড়িহাট্টা অগ্নি-ট্র্যাজেডির ছয় বছর পূর্ণ হচ্ছে। ২০১৯ সালের আজকের দিনে রাত ১০টার দিকে জনাকীর্ণ চুড়িহাট্টা মোড়ে আকস্মিক বিকট শব্দে এক বিস্ফোরণ ঘটে। হাজি ওয়াহিদ ম্যানশন নামে একটি ভবন থেকে সূত্রপাত ঘটা ওই বিস্ফোরণ থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে যায় চুড়িহাট্টা মোড়ে। প্রায় কেউই সরে যেতে পারেননি। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে কয়লা হয়ে যান অনেকেই। এ ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যু হয় ৭১ জনের।
গত মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হাজি ওয়াহিদ ম্যানশন ভবনটি সম্পূর্ণ নতুন রূপে সেজেছে। এই ভবনের নিচতলায় প্লাস্টিক দানা বিক্রির দোকানসহ ১০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেখা গেছে। সবগুলো দোকানই নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। ভবনের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) একটি শাখা। ভবনের তৃতীয় তলায় এখনো সংস্কারকাজ চললেও চতুর্থ তলায় মেরামতের কাজ শেষ হয়েছে।
এদিকে ওয়াহিদ ম্যানশনের ঠিক বিপরীত পাশে থাকা ভবনটিও সেই বিস্ফোরণ ও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি ছয় বছরে ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। ছয়তলার ওই ভবনটির নিচতলায়ও মার্কেট এবং দ্বিতীয় তলা থেকে আবাসিক বসবাস। নন্দ কুমার দত্ত রোডে ওয়াহিদ ম্যানশনের পাশের ভবনের নিচতলায় রাজমহল হোটেলটি একইভাবে রয়েছে। তার বিপরীত পাশে বিরিয়ানির দোকানও চালু রয়েছে।
সরেজমিন আরও দেখা গেছে, উর্দু রোড ও নন্দ কুমার দত্ত রোডের সংযোগস্থল চুড়িহাট্টা মোড়ে সেই আগের মতোই রিকশা-ভ্যান, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের তীব্র যানজট লেগে আছে। যেন এক মিনিট সড়কটিতে ফাঁকা দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থা নেই। ঘিঞ্জি আবাসিক এই এলাকায় প্রতিটি দালানের নিচের তলায় বাণিজ্যিক দোকানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কারখানা দেখা গেছে।
চুড়িহাট্টা মোড়ে অবস্থানকালে স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপকালে তিনি খবরের কাগজকে জানান, এখানে বেশির ভাগ দোকান ও গুদামে প্লাস্টিক দানা, পারফিউম বা বডি স্প্রের পুরোনো বোতল প্রক্রিয়াজতকরণসহ নানা দাহ্য পণ্য রয়েছে। চুড়িহাট্টা, নিমতলীসহ বিভিন্ন স্থানে বড় বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও এগুলো নিয়ে তেমন কারোই মাথাব্যথা নেই। ঘটনা যখন ঘটে তখন কিছুদিন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংস্থার দৌড়ঝাঁপ দেখা যায়, এরপর সবকিছু সেই আগের মতোই চলতে থাকে।
গত মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে সরাসরি কথা হয় ওয়াহিদ ম্যানশনের নিচতলায় বাম পাশের প্লাস্টিক দানা বিক্রির প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাবিব এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মো. হাবিবের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলছিলেন, ‘এই ভবনে সব দোকানির মধ্যে আমি পুরোনো। ছয় বছর আগে চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আমি নিজে দেখেছি। কত মানুষ মরেছে। আমার দোকানও ওই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই একই জায়গায় আমার দোকান ছিল।’
এমন ভয়াবহতার পরও কীভাবে একই স্থানে দোকান করছেন- জানতে চাইলে মো. হাবিব বলেন, ‘আগে যে অগ্রিম টাকা দেওয়া ছিল সেটি রয়ে গিয়েছিল। আগুনে আমার দোকানের ১২ লাখ টাকার পণ্যের ক্ষতি হয়েছিল। কিন্তু আমি একটা টাকাও ক্ষতিপূরণ পাইনি। সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে আবেদন করেছি, কিন্তু ক্ষতিপূরণ দেয়নি। আগুনের ঘটনার পর চার বছর আমার ব্যবসা বন্ধ ছিল। অনেকটা ফকিরের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি, কেউ সাহায্য করেনি।’
ওয়াহিদ ম্যানশনের নিচতলায় জসিম এন্টারপ্রাইজ নামে প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. জসিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাড়ে তিন মাস হলো এখানে দোকান নিয়েছি। সেই অগ্নিকাণ্ডের সময় আমি ছিলাম না। তবে শুনেছি অনেক মানুষ মারা গিয়েছিলেন। এই ভবনও আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। আমার আগে এখানে যারা ব্যবসায়ী ছিলেন তারা চলে গেলে পরে আমি ভাড়া নিয়েছি। এ ছাড়া এখানে প্রায় সবাই এখন নতুন। পুরোনো ব্যবসায়ীরা এখানে তেমন কেউ নেই।’
তবে চুড়িহাট্টার সেই আগুনের কথা শুনলেও আতঙ্ক লাগে উল্লেখ করে জসিম বলেন, ‘বেশ কিছুদিন আগে রাজমহল হোটেল ভবনের চারতলায় আগুনের ঘটনা ঘটেছিল। এর আগে নন্দ কুমার দত্ত রোড়ে মাথায় একটি বিরিয়ানির দোকানেও আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এখন আতঙ্ক লাগে। মাঝেমধ্যে এমনও মনে হয়- এখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরিয়ে ফেলব।’
ছয় বছর আগে চুড়িহাট্টার সেই আগুনের ঘটনার সময় রাজমহল হোটেলও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেটিও এখন একই স্থানে চলছে। কথা হয় রাজমণি হোটেলের মালিক মো. শামীমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সময় এই হোটেল যারা পরিচালনা করেছিলেন তারা বিক্রি করে চলে গেছেন। আমরা কয়েকজন অংশীদার মিলে এই হোটেলটি বর্তমানে চালাচ্ছি। এখনে সব স্টাফ নতুন। আগুনের ঘটনার সময় আমি ছিলাম না।’
ওয়াহিদ ম্যানশনের বিপরীত পাশে মসজিদসংলগ্ন সড়কের কোণে একটি মুদি দোকান। আগুনের ঘটনায় এ দোকানটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে মেরামত করে নতুনভাবে একই দোকান চালু করা হয়েছে। তবে পরিবর্তন হয়েছে মালিকানা। দোকানের বর্তমান কর্ণধার আরমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই এলাকা অনেক ঘিঞ্জি। সারা দিন এই তিন রাস্তার মোড়ে যানজট লেগেই থাকে। মাঝে মাঝে ভয় লাগে। কিছুদিন আগে একটি ভবনের চারতলায় আগুন লেগেছিল। আগুনের খবর শুনলেই মনে ভয় লাগে। রাজমণি হোটেলের চারতলায় কিসের যেন কারখানা ছিল, কিছুদিন আগে এই কারখানায় আগুন লেগেছিল।’
স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিবছর ঘটনার কয়েক দিন আগে গণমাধ্যমকর্মীরা এসে কথা বলেন। পরিস্থিতি জানতে চান। কিন্তু এখন আর কোনো সরকারি সংস্থা খোঁজখবর নেয় না। এত মানুষের মৃত্যু হলো, কিন্তু এর বিচার এখনো হলো না। ধীরে ধীরে মানুষ এই ঘটনার ভয়াবহতা ভুলতে বসেছেন। এখান থেকে কেউ শিক্ষা নেয়নি বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় কয়েকজন।
সেদিন চুড়িহাট্টায় যা ঘটেছিল
২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে ব্যাপক যানজট। নানা ধরনের যানবাহন অনেকটা আটকে ছিল। এই সময় হঠাৎ বিকট শব্দে এক বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে চুড়িহাট্টা মোড়ে। হাজি ওয়াহেদ ম্যানশন ভবনসহ আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। কেউ দ্রুত সরে যাওয়ারও সুযোগ পাননি সেখান থেকে। হাজি ওয়াহিদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলা থেকে বৃষ্টির মতো অঝরে বিস্ফোরিত হয়ে পড়তে থাকে আমদানি করা বিদেশি সব বডি স্প্রের বোতল। মোডের তিনটি সড়কের অনেক দূর পর্যন্ত থাকা রিকশা, ভ্যান, পিকআপ ভ্যান, প্রাইভেট কার সবই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেখানে থাকা যাত্রী, পথচারীসহ ৭১ জন নির্মমভাবে প্রাণ হারান। দগ্ধ-আহত হন শতাধিক। রাত সাড়ে ১০টার দিকে লাগা ওই আগুন জ্বলতে থাকে পরদিন সকাল পর্যন্ত। ঘিঞ্জি এলাকার সরু রাস্তা এবং আগুনের প্রচণ্ড তাপের কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলের কাছে যেতে পারেননি ওই রাতে। আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে ঘটনাস্থল থেকে একে একে ৭১টি লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে পাঠান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। পরে নিহতের স্বজনদের মাধ্যমে ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে লাশ শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তাস্তর করা হয়।
মামলা হলেও শেষ হয়নি বিচার
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছয় বছর আগে চকবাজার থানাধীন চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জন নিহতের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছিল। তবে মামলার ছয় বছর পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি বিচারকাজ। ওই ঘটনায় মারা যাওয়া স্থানীয় বাসিন্দা জুম্মনের ছেলে মো. আসিফ আহমেদ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় মামলা করেছিলেন। মামলার এজাহারে ওয়াহিদ ম্যানশনের মালিকসহ দুজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়। আগুনের ঘটনার তিন বছর পর (২০২২ সালে) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুল কাইয়ুম ‘হাজি ওয়াহিদ ম্যানশন’ ভবনের মালিক দুই ভাইসহ আটজনকে দায়ী করে অভিযোগপত্র দেন। তারা হলেন ওই ভবনের মালিক মোহাম্মদ হাসান সুলতান ওরফে হাসান, তার ভাই হোসেন সুলতান ওরফে সোহেল এবং ওই ভবনের গোডাউনের মালিক ইমতিয়াজ আহমেদ, মোহাম্মদ জাওয়াদ আতিক, মোজাম্মেল ইকবাল, মোজাফফর উদ্দিন, মো. লবিল ও মোহাম্মদ কাশিফ। ওয়াহিদ ম্যানশনের মালিক ওই দুই ভাই গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন, কিন্তু কিছুদিন পরেই হাইকোর্ট থেকে তারা জামিনে মুক্ত হন। পাশাপাশি অন্যরা বিভিন্ন সময়ে জামিন নেন। ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। একই বছরের ১৭ অক্টোবর মামলার বাদী আসিফ আহমেদ সাক্ষ্য দেন। তবে তার সাক্ষ্যগ্রহণ এখনো শেষ হয়নি বলে আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ ছাড়া চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনার তদন্তে নামে ফায়ার সার্ভিস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিস্ফোরক পরিদপ্তর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনসহ মোট পাঁচটি সংস্থার তদন্ত কমিটি। ওই সময়ে মাঠপর্যায়ে ঘুরে ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে এবং ঘটনাস্থলের বিভিন্ন আলামত বিচার-বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন সংস্থার কমিটিগুলো তদন্ত প্রতিবেদনও তৈরি করে। তবে সবগুলো প্রতিবেদনেই আগুনের সূত্রপাত হাজি ওয়াহিদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় ‘পার্ল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল’ (কেমিক্যাল) গোডাউন থেকে হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
হদিস মেলেনি পার্ল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের মালিকদের
মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে জানা যায়, ‘পার্ল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ওয়াহিদ ম্যানশনের দোতলা গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করত। এ প্রতিষ্ঠানটি অন্তত তিন দশক ধরে সুগন্ধী ও কসমেটিকস-জাতীয় পণ্য আমদানি ও সরবরাহ করে আসছিল। পার্ল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের মূল অফিস ছিল পুরান ঢাকার চকবাজারের ৬৬ মৌলভীবাজারের তাজমহল মার্কেটে। এ ছাড়া হাতিরপুলের ১৩/১ নম্বর সোনারগাঁও রোডে কাশেম সেন্টারের ছয়তলায় একটি অফিস ছিল। ঘটনার পর তাদের এসব ঠিকানায় গিয়ে অফিসের গেট তালাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়। জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ কাশিফ এবং দুই পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ ও মোজাম্মেল ইকবাল ঘটনার পর থেকেই আত্মগোপনে চলে যান। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের কারও কোনো হদিস পায়নি পুলিশ।