আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে আগামী অর্থ বছরের বাজেটে নতুন করে আর কোনো খাতে রাজস্ব অব্যাহতি দেওয়া হবে না। এখনো রাজস্ব অব্যাহতি আছে এমন বেশির ভাগ খাত থেকেও তা প্রত্যাহার করা হবে। বিশ্লেষকরা বলেছেন, ঢালাওভাবে রাজস্ব অব্যাহতি প্রত্যাহার হলে শিল্প বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাজস্ব অব্যাহতি বেশির ভাগ কমিয়ে ফেলা বা প্রত্যাহার করা হলে দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এতে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আয় বাড়াতে হলে রাজস্বের আওতাও বাড়াতে হবে।’
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বছর দুয়েক থেকে ডলারসংকটের কারণে শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে ঢালাওভাবে রাজস্ব অব্যাহতি প্রত্যাহার বা কমানো হলে শিল্প বিনিয়োগে খরচ আরও বেড়ে যাবে। রাজস্ব অব্যাহতি প্রত্যাহার বা কমানো হলে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেওয়া হবে।’
চলতি অর্থবছরের গত আট মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ৫৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ঘাটতির হিসাব থাকলেও আইএমএফ থেকে অর্থমন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়ে আগামী তিন অর্থবছরে ২০ লাখ ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু এনবিআর থেকে আদায় করতে হবে ১৮ লাখ ৯ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। আগামী ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব খাত থেকে ৫ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। এর মধ্যে এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৫ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা। এ বড় অঙ্কের লক্ষ্যমাত্রা আদায় করতে আইএমএফ থেকে রাজস্ব অব্যাহতি প্রত্যাহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের রাজস্ব আদায়বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইএমএফ থেকে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৫৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৫ লাখ ৯৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ২০২৭-২০২৮ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর থেকে আদায়ের পরিকল্পনা ৬ লাখ ৮৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। রাজস্ব অব্যাহতির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে এনবিআরকে ঘাটতির বৃত্তে ঘুরপাক খেতে হবে। তাই রাজস্ব আদায় বাড়াতে আগামী অর্থবছরে নতুন করে আর একটি খাতেও রাজস্ব অব্যাহতি দেওয়া হবে না। এখনো বহাল আছে এমন বেশির ভাগ খাত থেকেই রাজস্ব অব্যাহতি কমানো বা প্রত্যাহার করতে হবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান ড. আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রভাবশালীদের খুশি করতে অপ্রয়োজনে অনেক খাতে রাজস্ব অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব অব্যাহতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। নতুন করে আর কোনো খাতে এসব দেওয়া হবে না। এনবিআর যে অঙ্কের রাজস্ব আদায় করে থাকে, অব্যাহতি দিয়ে তার প্রায় সমপরিমাণ রাজস্ব হারায়। এতে এনবিআরের প্রকৃত আদায় কমে যায়। অব্যাহতির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছি। বিভিন্ন কৌশলে কেন এসব সুবিধা নিতে হবে?’
আগামী অর্থবছরের বাজেটবিষয়ক এনবিআরের কর্মকৌশলে বলা হয়েছে, চলতি ও তার আগের বাজেটে কিছু খাতে রাজস্ব অব্যাহতি দেওয়া হলেও বেশির ভাগই এখনো বহাল আছে। ৪৩ শতাংশ কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতি আছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এসব অব্যাহতি কমিয়ে অর্ধেক করা হবে। নতুনভাবে একটি কাঁচামাল আমদানিতেও রাজস্ব অব্যাহতি দেওয়া হবে না। বিশেষভাবে স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় এমন সব কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে সম্পূর্ণ রাজস্ব অব্যাহতি প্রত্যাহার করা হবে। এতে নির্ধারিত শুল্ক দিয়েই আমদানি করতে হবে। ফলে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়বে।
চলতি বাজেটে আইটি বা সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান, পোশাক খাত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, মাইক্রো ফাইন্যান্স ও ইকোনমিক জোনে রাজস্ব অব্যাহতি কমানো বা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে ব্যবসায়ী নেতাদের চাপে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। কর্মকৌশলে বলা হয়েছে, আগামী বাজেটে এসব খাতের অব্যাহতি কমানো হবে। শিল্প খাতের পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ, জ্বালানি, যোগাযোগ এবং অন্য অত্যাবশ্যকীয় ৩০ ধরনের খাতে বিভিন্ন হারের কর অব্যাহতি সুবিধা নতুন করে দেওয়া হবে না। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের আয়, বিদেশি ঋণের সুদ, শেয়ার হস্তান্তরের ফলে মূলধনি মুনাফার ওপর অর্জিত আয়, রয়্যালটি, কারিগরি সহায়তার ফি এবং বিদেশি কর্মীদের আয়ের ওপর নির্দিষ্টহারে রাজস্ব অব্যাহতি কমানো হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় কর্মরত বিদেশিদের প্রথম তিন বছরের বেতনের ওপর ৫০ শতাংশ আয়কর আগামী বাজেটে নবায়ন করা হবে না।
কর্মকৌশলে বলা হয়েছে কৃষি, পশুসম্পদ, মৎস্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষাসহ জিডিপিতে অবদান আছে, এমন ৫০ শতাংশ পণ্য ও সেবায় ভ্যাট নেই। আসছে বাজেটে এ হিসাবে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এসব খাতের ওপর ঢালাওভাবে ভ্যাট অব্যাহতি আর দেওয়া হবে না। ওষুধের কাঁচামাল, সাবান-শ্যাম্পুর কাঁচামাল, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, সার্ভার, মাদারবোর্ড উৎপাদনে ভ্যাট বাড়ানো নিয়ে এনবিআর হিসাব করছে।
এনবিআরের কর্মকৌশলে আরও বলা হয়েছে, রাজস্ব অব্যাহতি দিয়ে সরকার এক অর্থবছরে গড়ে ২ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব কম আদায় করে থাকে। আয়কর খাতে রাজস্ব অব্যাহতি আদায়ের চেয়ে বেশি। ভ্যাট ও শুল্ক খাতে রাজস্ব অব্যাহতি ও আদায় প্রায় সমান। রাজস্ব অব্যাহতি প্রত্যাহার করা হলে এবং নতুন করে আর না দেওয়া হলে এনবিআরের প্রকৃত আদায় বেড়ে যাবে, যা লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়ক হবে।
সম্প্রতি এনবিআরের এক অনুষ্ঠানে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ কর ছাড়ের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘গত ৫০ বছর আমরা রাজস্ব অব্যাহতি দিয়ে শিশু লালন-পালন করছি; আর কতকাল লালন করব?’
তিনি আরও বলেন, “যে শিশুদের এত দিন ধরে লালন-পালন করা হয়েছে, তারা এখন শারীরিকভাবে বড় হয়ে গেছে। তারা এখনো বলে, ‘আমাদের সুরক্ষা দিন’, কিন্তু সুরক্ষার দিন তো চলে গেছে।”
২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ কর্মসূচি শুরু হয়। রাজস্ব সংস্কারসহ একগুচ্ছ শর্ত ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলে সাত কিস্তিতে ঋণ প্রদান করা হবে। না হলে কিস্তি আটকে দেওয়া হবে। আইএমএফ থেকে রাজস্ব অব্যাহতি প্রত্যাহার করার কথা বললেও বেশির ভাগই এখনো বহাল আছে। এতে অসন্তোষ প্রকাশ করে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব অব্যাহতি প্রত্যাহারে চাপ দিয়েছে সংস্থাটি।