মায়ানমারের জান্তা সরকারের ব্যাপক নির্যাতনের মুখে দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসন নিয়ে বিপাকে বাংলাদেশ। কারণ, গত ৭ বছরে এই সংকটের সমাধান তো দূরের কথা, উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি। এরই মধ্যে চলমান রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে নতুন করে আরও কয়েকটি চ্যালেঞ্জ যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের সামনে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের বাংলাদেশ সফর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচেষ্টা কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসন মায়ানমারের যে রাখাইন রাজ্যে করার চেষ্টা চলছে, সেই রাখাইনের সার্বিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। সেখানে জান্তা সরকারের সঙ্গে আরাকান আর্মির (এএ) দীর্ঘ সংঘাতে বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা। সেখানে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। কর্মসংস্থানও নেই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ নেই বলে জানিয়েছে খোদ জাতিসংঘ। ফলে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ ছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব নয়।
সূত্র জানায়, রাখাইনে জান্তা সরকারের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ যোগ দিয়ে আরাকান আর্মির (এএ) বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে আরাকান আর্মির মধ্যে। বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যে ২৭১ কিলোমিটার সীমানাসহ রাখাইন রাজ্য এখন আরাকান আর্মির দখলে। এরপর থেকে বাংলাদেশ সরকার তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। জানা গেছে, প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান ইতোমধ্যে আরাকান আর্মির কমান্ডার ইন চিফ জেনারেল ওয়াং ম্রা নাইং-এর সঙ্গে দুই দফা ফোনে কথা বলেছেন। সেখানে আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন সমীকরণ নিয়ে কথা হয়েছে। কিন্তু জান্তা সরকারের পক্ষে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াই করায় প্রত্যাবাসনে অনীহা রয়েছে।
সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে এসে আরাকান আর্মি রোহিঙ্গা বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি নয়, বরং রাখাইনে রয়ে যাওয়া রোহিঙ্গারা এখনো তাদের হাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। রাখাইন থেকে নতুন করে এখনো রোহিঙ্গারা প্রতিদিন বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আরাকান আর্মি কতটা আগ্রহী হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ক্ষমতায় আসার পর রোহিঙ্গাদের জন্য আর্থিক সহায়তা অর্ধেক কমে গেছে। কারণ, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য আসা মোট বিদেশি অনুদানের ৫৫ ভাগ যুক্তরাষ্ট্র একাই দিয়ে থাকে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সেই অনুদান বন্ধ করে দেওয়ায় রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তাও অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে জাতিসংঘ। এতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে মানবিক সংকটসহ এক ধরনের অস্থিরতা শুরু হয়েছে। এই সংকট নিরসনে জাতিসংঘ মহাসচিবের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফর কতটা কাজে আসবে তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
এ বিষয়ে মায়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. সুফিউর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আরাকান আর্মি জানিয়েছিল রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকারকে তারা স্বীকৃতি দেয় এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চায়। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে আরাকান আর্মির মনোভাব অনেকটা অনুকূলে থাকলেও আলোচনার জন্য সে সুযোগগুলো বাংলাদেশ হাতছাড়া করেছে। কারণ, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গা যুবক জান্তা বাহিনীর পক্ষ নিয়ে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং এতে প্রায় ২০০ রোহিঙ্গা নিহত হয়। এই ঘটনায় আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের প্রতি নাখোশ রয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি এখনো কাটিয়ে উঠা সম্ভব, যদি রাখাইনের দুর্ভিক্ষ মোকাবিলাসহ আরাকান আর্মির পাশে থেকে সেখানে কিছু দৃশ্যমান সহায়তা করে বাংলাদেশ। এ ছাড়া আরাকান আর্মি যেহেতু বাইরের স্বীকৃতির চেয়ে অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের জন্য লড়ছে, সে ক্ষেত্রে প্রতিবেশীর কাছ থেকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এ মুহূর্তে তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই। তাই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তারা বাংলাদেশের প্রস্তাব কতটা বিবেচনা করবে, তা নিয়ে ভালোভাবে হোমওয়ার্ক করা প্রয়োজন। এতে দেশের ভেতর কাজ করা সংস্থাগুলোর মধ্যে যেমন ঐকমত্য সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন, তেমনি বাইরের শক্তির সঙ্গে আলোচনা ও দেনদরবারে দক্ষতা দেখানোর এটাই সময়। তবে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ-মায়ানমারের পুরো সীমান্তে এখন আরাকান আর্মির অবস্থান।