রাজধানী ঢাকা, মাগুরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সম্প্রতি একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। এসবের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ধর্ষণ মামলার বিচার দ্রুত করার জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয়।
গত ১৭ মার্চ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) পরীক্ষার সনদ ছাড়াই আদালত যদি মনে করেন চিকিৎসা সনদ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিচার সম্ভব। তাহলে আদালত ডিএনএ সনদ ছাড়াই বিচার করতে পারবেন।
তবে ধর্ষণ মামলার বিচারে এমন একটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টাকে সমর্থন করছেন না সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করছেন, বিজ্ঞানসম্মত এই ব্যবস্থাকে না এড়িয়ে বরং ধর্ষণ মামলা নিষ্পত্তির হার কেন কম, তা বের করে সমাধানের পথ খোঁজা উচিত।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করা হয়। এর মধ্যে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান হন শিরীন পারভীন হক। ডিএনএ সনদ ছাড়াই মামলা নিষ্পত্তি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘২৫ বছর আগে যখন ডিএনএ ল্যাব স্থাপন করা হয়, তখন আমি এই উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলাম। ধর্ষণের শিকার একজন নারী বৈজ্ঞানিক এই পদ্ধতির মাধ্যমে সহজে ন্যায়বিচার পেতে পারেন। শুধু তা-ই নয়, নিরপরাধ একজন অভিযুক্ত পুরুষও এই পদ্ধতির ফলে নিষ্কৃতি পেতে পারেন।
কিন্তু এখন ধর্ষণ এবং নারী নিপীড়ন নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছেন। তাই সরকার জনতুষ্টির জন্য এসব কথা বলছে। তারা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কাজ করছে বা চেষ্টা করছে বোঝানোর জন্য এসব করছে। আমার কাছে এসব স্টান্টবাজি মনে হয়।
সরকার সত্যি সত্যি এই নিয়ে কাজ করতে চাইলে এবং ধর্ষণ ও নারী নিপীড়ন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে চাইলে চ্যালেঞ্জগুলো খুঁজে বের করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সে জন্য সময় লাগলে সময় নিক, তাড়াহুড়া করে কিছু করা উচিত হবে না।’
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘ডিএনএ পরীক্ষা একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থা। বিজ্ঞানের ওপর নির্ভর করতেই হবে।’
তিনি বলেন, ‘ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ ভুক্তভোগীই আইনের আশ্রয় নেন না। আবার অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়। আবার ধরুন, একটা গ্যাংরেপ হলে অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে কে কতটা দায়ী বা কেউ নির্দোষ হলে তা কীভাবে প্রমাণ হবে?
এমন সেনসিটিভ ও সিরিয়াস বিষয়ে শুধু সাক্ষীর ওপর নির্ভর করলে হবে না। বিশেষ করে আমাদের দেশে অনেক সাক্ষী আইনজীবীর শেখানো কথা আদালতে বলেন, তাতে তো ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না। তাই বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করতে হবে। এখন যদি বলা হয় যে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর জন্য এই ভাবনা। তাহলে বলব, ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট যেন এক সপ্তাহের মধ্যে পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থা করেন। প্রয়োজনে ল্যাবের সংখ্যা বাড়ান। তা না করে বিজ্ঞানসম্মত একটা ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যাওয়া উচিত হবে না। ডিএনএ পরীক্ষা এড়ানোর সুযোগ থাকলে এই আইনের অপব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি আছে। তাতে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও আছে।’
জানতে চাইলে ঢাকা আইনজীবী সমিতির অ্যাডহক কমিটির সভাপতি খোরশেদ মিয়া আলম বলেন, ‘চূড়ান্ত কিছু করার আগে সরকারের উচিত হবে খসড়াটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা। তাতে সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক মতামত দিতে পারবেন। সেসব মতামত দেখার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে আইনের প্রয়োগের পর ঝামেলা কম হবে।’
বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে ব্রেস্টফিডিং কক্ষ স্থাপন করার একটি নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বছর দুয়েক আগে হাইকোর্টের বহুল প্রশংসিত এই রায় আসে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসানের আইনি লড়াইয়ের ফলে। নারী অধিকারসংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টে সোচ্চার আইনজীবীদের মধ্যে তিনি একজন।
ডিএনএ পরীক্ষার সাম্প্রতিক ইস্যুতে জানতে চাইলে ইশরাত হাসান বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কথা বললে ডিএনএ পরীক্ষার ল্যাবের সংখ্যা বাড়ান। কিন্তু ধর্ষণ মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে শুধু ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট দেরিতে আসাটা একমাত্র কারণ না। অন্যান্য কারণও বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন: মামলার তুলনায় ট্রাইব্যুনাল অনেক কম। তাহলে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
আবার ট্রাইব্যুনাল যা-ও আছে, এই ট্রাইব্যুনালের বিচারককে আবার অন্যান্য মামলার বিচারও করতে হয়। তাই এই ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের শুধু এখানকার মামলার জন্য নিয়োজিত রাখতে হবে। এসব মামলা চলার মধ্যে অনেকে গিয়ে আবার হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন। একটা মামলা চার-পাঁচ বছর হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের মধ্যে থাকে। তো সেখানেও যেন বিষয়গুলো সময়মতো নিষ্পত্তি হয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
এসব না করে মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো ডিএনএ পরীক্ষাব্যবস্থা বাতিল করলে তো হবে না। এসব চিন্তা হচ্ছে আপাতত ব্যবস্থা বা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য কিছু করা। আসলে এটা কোনো সমাধান নয়।’