ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে ৪০ দিন সময় দিয়ে গত ১০ মার্চ ইসির পক্ষ থেকে গণবিজ্ঞপ্তিতে দিলেও এখন পর্যন্ত তেমন সাড়া মেলেনি। ইতোমধ্যে ৩০ দিন পেরিয়ে গেলেও ইসিতে এ বিষয়ে আবেদন জমা পড়েছে মাত্র পাঁচটি রাজনৈতিক দলের। এর মধ্যে বাংলাদেশ কনজারভেটিভ পার্টি নামে একটি দল নিবন্ধন পাওয়ার জন্য আবেদন করেছে। আর চারটি দল আবেদন করেছে সময় বাড়ানোর। এ দলগুলো হলো, সম্মিলিত ইসলামী ঐক্যজোট, আমজনতার দল, নতুন বাংলা ও গণতান্ত্রিক নাগরিক শক্তি।
সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত এনসিপি (জাতীয় নাগরিক কমিটি) এখন পর্যন্ত নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেনি।
নিবন্ধনের জন্য আগ্রহী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, তারা নিবন্ধনের জন্য বিদ্যমান আইনি শর্তগুলোর সংস্কার চাইছে। তারা বলছে, বিদ্যমান আইনে যেসব শর্তের কথা বলা হয়েছে সেগুলো পূরণ করা বেশ কঠিন। তাই এ বিষয়ে আইনি সংস্কারের প্রস্তাব দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে নতুন দলগুলো। এরই মধ্যে শর্ত পূরণ না করে গত ২৪ মার্চ ইসিতে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে ‘আওয়ামী লিগ’ নামে নতুন একটি দল। তবে এই আবেদন গ্রহণ করেনি ইসি।
নিবন্ধনে আগ্রহী দলগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে- মৌলিক বাংলা, সমতা পার্টি, আমজনতার দল, বাংলাদেশ সিটিজেন পার্টি, তৃণমূল জাতীয় পার্টি, সর্বজন বিপ্লবী দল ও বাংলাদেশ মুসলিম পার্টি।
কয়েকটি দলের নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অফিস ও কমিটি করতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে ইসিতে সময় বাড়ানোর আবেদন করবেন। এখনো নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেনি ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের সমন্বয়ে গঠিত এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি। নিবন্ধন সহজ করতে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এখনো রয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের টেবিলে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইন সংশোধন করে নিবন্ধনের শর্ত সহজ করা হবে, নাকি আগের আইনে কাজটি করা হবে সবই নির্ভর করছে ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর। এই কার্যক্রমে ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্ত ও শর্ত পূরণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও জানান এই নির্বাচন কমিশনার।’
এদিকে নতুনদের রাজনীতিতে আসার সুযোগ তৈরিতে দল নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকারের কাছে নিবন্ধনের শর্ত কিছুটা হালকা করার সুপারিশ করেছে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। ড. বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ওই কমিশন নতুন দল নিবন্ধনের শর্তে থাকা এক-তৃতীয়াংশ (২১টি) জেলা কমিটির পরিবর্তে ১০ শতাংশ জেলা এবং ১০০ উপজেলার পরিবর্তে ৫ শতাংশ উপজেলা বা থানায় দলের অফিস এবং দলের সদস্য ন্যূনতম ৫ হাজার রাখার সুপারিশ করেছে। তবে সংস্কারের মাধ্যমে দল নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার এই উদ্যোগ এবারের নির্বাচনে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ এ বিষয়ে সরকারের কাছে সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে পাঠানো সুপারিশের ব্যাপারে ইসিকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি সরকারের ঐকমত্য কমিশন। ফলে নিবন্ধন পেতে আগ্রহী নতুন দলগুলো তাকিয়ে আছে ঐকমত্য কমিশন ও ইসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।
নিবন্ধন প্রশ্নে নতুন দল
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন দল এনসিপি নিবন্ধনের জন্য এখনো আবেদন করেনি।
নিবন্ধন আবেদনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার খবরের কাগজকে বলেন, ‘দল গোছানোর পাশাপাশি আমরা নিবন্ধনের শর্তগুলো পূরণের চেষ্টা করছি। তবে বিদ্যমান আইনের সংস্কার দরকার। তারপরও চলতি আইনের সব শর্ত পূরণের সক্ষমতা আমাদের আছে। তবে ইসির ঘোষিত সময়টা যথেষ্ট মনে করছি না। সম্প্রতি সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে নিবন্ধন আইন সংশোধনের যে প্রস্তাব এসেছে তা সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে বিবেচনার দাবি জানাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘খুব শিগগিরই আমাদের দলের জেলা কমিটি গঠনের কাজ শুরু হবে। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক কমিটির উপজেলা পর্যায়ে থাকা সাড়ে ৪০০ কমিটিকে দলের কমিটিতে কনভার্ট করার চেষ্টা চলছে। আশা করছি, আগামী দেড়-দুই মাসের মধ্যেই দলের সব জেলা-উপজেলায় অফিস ও কমিটিগুলো গঠন করা সম্ভব হবে। দলের নিবন্ধন প্রস্তুতি, সময় বাড়ানোসহ সার্বিক বিষয়ে আমাদের কিছু পর্যবেক্ষণ জানাতে আমরা ২০ এপ্রিলের আগেই ইসির সঙ্গে দেখা করব। সেখানে সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চারটি বিষয়- ইসির গণবিজ্ঞপ্তি, আরপিও সংশোধন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার এবং জুনের মধ্যে ভোটের অ্যাকশন প্ল্যান সম্পর্কে ইসির সিদ্ধান্ত জানার চেষ্টা করব।’
নিবন্ধনের বিদ্যমান শর্ত সহজ করার দাবি জানিয়েছেন ‘মৌলিক বাংলা’ নামে আরও একটি নতুন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক ছাদেক আহম্মেদ সজীব। তিনি বলেন, ‘১/১১-এর পর শেখ হাসিনা সরকারের তৈরি করা যে আইন, তা মূলত সমাজের ধনিক শ্রেণির জন্য বা করপোরেট কোম্পানি তৈরির নানা নিয়মকানুন জুড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উপজেলা থেকে ২০০ সমর্থন স্বাক্ষর, এক-তৃতীয়াংশ উপজেলা ও জেলায় অফিস দেখানোসহ যেসব নিয়মনীতি তৈরি করেছে তা দ্রুত বাতিল করতে হবে। কারণ এতে যে পরিমাণ অর্থ ও সময় ব্যয় হবে তা দিয়ে গণ-মানুষের দল তৈরি করা সম্ভব না।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিটি এ বিষয়ে আইনি সংস্কারের যে প্রস্তাব দিয়েছে তা অতিদ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত। এরপর পুনরায় রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের জন্য গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে অনুরোধ করছি। এতে নতুন সম্ভাবনাময় দলগুলোর পক্ষে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাজনীতিতে ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।’
এদিকে গত ১০ মার্চ দল নিবন্ধনে ইসির জারি করা গণবিজ্ঞপ্তি ‘সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থি’ দাবি করে আদালতে রিট আবেদন করেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাসনাত কাইয়ুম। তার রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ মার্চ ওই দলটির জন্য নির্বাচন কমিশনের জারি করা গণবিজ্ঞপ্তির কার্যকারিতা স্থগিত করেন হাইকোর্ট।’
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘দলের নিবন্ধন প্রশ্নে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব এবং ইসি কমিটির পর্যবেক্ষণ অন্তর্বর্তী সরকারের ঐকমত্য কমিশনের কাছে পাঠানো হয়েছে। নিজেদের প্রস্তুতির পাশাপাশি এ কাজ শুরু করতে আমরা তাদের সিদ্ধান্ত জানার অপেক্ষা করছি। আইনি ইস্যুতে সরকারি সিদ্ধান্ত যেটা আসবে (সংশোধিত অথবা বিদ্যমান আইন) সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব। নিবন্ধন আবেদনকারী দলগুলোর ক্ষেত্রে আইনি শর্ত পূরণে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’ আবেদনের সময় কী বাড়াবেন? জবাবে এই কমিশনার বলেন, ‘সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। জমা পড়া আবেদনের সংখ্যা যদি খুব কম হয় এবং আগ্রহী দলগুলো যদি সময় বাড়ানোর আবেদন করে, সে ক্ষেত্রে আগের মতো এবারও সময় বাড়ানো হতে পারে। পূর্বনির্ধারিত ২০ এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করে কতটি আবেদন জমা পড়ে তা দেখার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।’
বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছিল ৪৪টি। গত বছর ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আদালতের আদেশে নিবন্ধন পায় আরও পাঁচটি দল। সেগুলো হলো- এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি), নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন ও বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি। সবমিলিয়ে এ পর্যায়ে দেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯। এরপর ২০২১ সালে বাতিল হওয়া জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপাও আদালতের আদেশে নিবন্ধন ফিরে পেতে যাচ্ছে। গত ১৯ মার্চ হাইকোর্ট দলটিকে পুনরায় নিবন্ধন দিতে ইসিকে আদেশ দেন। এ ছাড়া নিবন্ধন ফিরে পেতে আদালতের নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ লেবার পার্টি। খুব শিগগিরই এই দলটিও আদালতের আদেশে দল নিবন্ধন পাবে- খবরের কাগজকে এমন আশাবাদ জানিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান।
২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলের জন্য নিবন্ধন প্রথা চালু করে নির্বাচন কমিশন। আইন অনুযায়ী, প্রতি সংসদ নির্বাচনের আগে নিজ দলের প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নিতে নিবন্ধন পেতে আগ্রহী নতুন দলগুলোর কাছে আবেদন আহ্বান করে সংস্থাটি। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৫৪টি দল ইসির নিবন্ধন পেলেও পরবর্তী সময়ে শর্ত পূরণ, শর্ত প্রতিপালনে ব্যর্থতা এবং আদালতের নির্দেশে পাঁচটি দলের নিবন্ধন বাতিল করে ইসি। দলগুলো হলো- জামায়াতে ইসলামী, ফ্রিডম পার্টি, ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন, পিডিপি ও জাগপা। ২০১৮ সালেও শর্ত পূরণ না হওয়ার কারণ দেখিয়ে আবেদনকারী ৭৬ দলের কোনোটিকে নিবন্ধন দেয়নি ইসি। পরে ২০১৯ সালে আদালতের আদেশে নিবন্ধন পায় ববি হাজ্জাজের দল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম।