সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে শিক্ষাগত যোগ্যতার জাল সার্টিফিকেট দিয়ে দলিল লেখকের লাইসেন্স করে এক যুগ পার করেছেন দলিল লেখক মো. রাশেদুজ্জামান রাশেদ। ২০১৩ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেননের সুপারিশেই দলিল লেখকের লাইসেন্স পান তিনি।
তার সনদ নম্বর ৩১৭। বর্তমানে তিনি দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক পদেও রয়েছেন। আওয়ামী সরকারের আমলে রাশেদ খান মেননের সুপারিশে চাকরি পেলেও ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভোল পাল্টিয়েছেন রাশেদ। বর্তমানে তিনি সিলেট বিমানবন্দর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক।
জানা যায়, দলিল লেখকের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য রাশেদ যে আবেদন করেছেন, তাতে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দ্য এইডেড হাইস্কুল থেকে মানবিক বিভাগে এসএসসি পাসের সার্টিফিকেট জমা দিয়েছেন। ওই সার্টিফিকেটে তার রোল নম্বর ৩০৭৬৭৯ ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১০৩০৪৩ দেওয়া ছিল। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ শিক্ষা মন্ত্রাণলয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে ওই রোল নম্বর ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর খোঁজ করলে সেটা দিয়ে কোনো ফলাফল আসছে না।
অনুসন্ধানে পাওয়া ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর তারিখে তার দলিল লেখক সনদ প্রাপ্তির আবেদনে তিনি লিখেছেন, তিনি একজন দরিদ্র পরিবারের লোক। তার পরিবারের সদস্যসংখ্যা ১৭ জন। তিনি ছাড়া তার পরিবারে উপার্জন করার মতো আর কোনো ব্যক্তি নেই। তিনি পাঁচ বছর ধরে সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক মো. আলম মিয়ার সঙ্গে সহকারী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে তাকে সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রিসংক্রান্ত কাজ করতে হয়। তাই তার দলিল লেখক সনদ একান্ত প্রয়োজন।
ওই আবেদনপত্রে তিনি তার জীবনবৃত্তান্ত উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি সংযুক্তি হিসেবে তিনি তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি জমা দিয়েছেন। ওই আবেদনপত্রের ঠিক ওপরের ডান পাশে তৎকালীন সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেননের সিল ও স্বাক্ষরসহ কলম দিয়ে লিখে দিয়েছেন বিশেষ বিবেচনার জন্য সুপারিশ করছি। পরবর্তী সময়ে এসএসসি পাসের জাল সার্টিফিকেট দিয়ে তিনি দলিল লেখক হিসেবে সনদ লাভ করেন।
এদিকে দ্য এইডেড হাইস্কুলের অফিসে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৬ সালে মানবিক বিভাগ থেকে ৫০ জন ছাত্র পাস করলেও মো. রাশেদুজ্জামান রাশেদ নামের কোনো শিক্ষার্থীর নাম পাওয়া যায়নি। ২০০৬ সালে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করেছেন মোট ২২৯ জন শিক্ষার্থী। তার মধ্যে মানবিক শাখায় ৫০ জন, বিজ্ঞান শাখায় ১০৯ জন এবং বাণিজ্য শাখায় ৭০ জন পাস করেছেন। তবে কোথাও শিক্ষার্থী হিসেবে রাশেদের নাম পাওয়া যায়নি। এই বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই সিলেট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি করেছে।
এমনকি রাশেদকে আওয়ামী লীগের দোসর দাবি করে ও জালিয়াতির অভিযোগে চলতি বছরের গত ৮ এপ্রিল সিলেটের সাব-রেজিস্ট্রার বরাবরে শফিকুল ইসলাম সুজন নামের এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগও করেছেন। ওই অভিযোগ জেলা রেজিস্ট্রার আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রারকে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শফিকুল ইসলাম সুজনের লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, মো. রাশেদুজ্জামান রাশেদ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তিনি এসএসসির জাল সার্টিফিকেট দিয়ে ২০১৩ সালে দলিল লেখকের সনদ (নং ৩১৭) পেয়েছেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের নেতাদের মদদে সনদ পেয়ে সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ, দুর্নীতি ও জালিয়াতির স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছেন।
শফিকুল ইসলাম সুজন খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাশেদ ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা। আওয়ামী লীগ সরকার থাকাকালীন তিনি ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে দলিল লেখক সনদ নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি আর্থিক লেনদেন করে সিলেটের বিমানবন্দর থানার স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হয়েছেন। এই বিষয়ে আমি ইতোমধ্যে লিখিত অভিযোগও করেছি। বিষয়টি আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে তদন্তেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
এ ব্যাপারে সিলেট জেলা রেজিস্ট্রার মো. জহুরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৫ দিনের মধ্যে একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
এ বিষয়ে কথা বলতে অভিযুক্ত মো. রাশেদুজ্জামান রাশেদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার পরিচিতজনরা বলছেন, জাল সনদের খবর সামনে আসার পর তিনি তার নিয়মিত ব্যবহার করা মোবাইল ফোনটি বন্ধ রেখে গা ঢাকা দিয়েছেন।