দেশে দুর্নীতি দমনের পাশাপাশি প্রতিরোধেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুর্নীতি দমনের অংশ হিসেবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, আমলাসহ যে কারও বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে অনুসন্ধান, মামলা ও চার্জশিট দেওয়ার ক্ষেত্রে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন দুদক কর্মকর্তারা। এ ছাড়া ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফাঁদ অভিযান চালানো হচ্ছে। ঘুষ লেনদেনে জড়িতদের হাতেনাতে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধের অংশ হিসেবে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিতসহ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে দৈনন্দিন অনিয়ম-দুর্নীতি ও সেবাপ্রত্যাশীদের হয়রানি করার বিষয়ে তথ্যানুসন্ধানে আকস্মিক অভিযান পরিচালনায় কাজ করছেন দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমের সদস্যরা। শুধু তা-ই নয়, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে জেলায় জেলায় গণশুনানি করা হচ্ছে। এসব গণশুনানিতে দুদকের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন ও দুই কমিশনারসহ পুরো কমিশন উপস্থিত থাকছে, যা আগের কমিশনগুলোতে সচরাচর দেখা যায়নি।
এ ব্যাপারে দুদকের মুখপাত্র ও মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ দুদকের নিয়মিত কাজের অংশ। এ জন্য সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান, মামলা দায়ের, তদন্ত ও চার্জশিট দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জোরালো কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জেলায় জেলায় গণশুনানির আয়োজন করা একটি অন্যতম কাজ। প্রতি মাসে একাধিক জেলায় এই গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এ ছাড়া দুদকের সার্বিক তত্ত্বাবধানে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির আয়োজনে প্রতিটি জেলা-উপজেলায় দুর্নীতিবিরোধী আলোচনা সভা, সেমিনার, মানববন্ধন, র্যালি, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, রচনা প্রতিযোগিতাসহ জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করা হয়।’
দুদক সূত্র জানায়, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে দুদকের আয়োজনে কার্যকর গণশুনানিরও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গত ১১ ডিসেম্বর ড. মোহাম্মদ আব্দুল মোমেনের নেতৃত্বে পুনর্গঠিত কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যমান আইনের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমনের পাশাপাশি প্রতিরোধেও জোরালো অবস্থান নেওয়া হয়। বিশেষ করে গণশুনানিগুলোতে চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারসহ পুরো কমিশনের উপস্থিতি একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করে। বিগত মঈনউদ্দিন আব্দুল্লাহর নেতৃত্বাধীন কমিশন গত বছর জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১৪টি জেলায় গণশুনানির যে তালিকা প্রণয়ন করে সেখানে উপস্থিতির ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের নাম রাখা হয়নি। প্রতিটি শুনানিতে সচিব ও দুই কমিশনারের মধ্যে একজন করে নাম রাখা হয়। যদিও গত বছর কোনো গণশুনানি আয়োজন করতে পারেনি মঈনউদ্দিন আব্দুল্লাহর কমিশন। তবে বর্তমান কমিশন সেই তালিকা ধরে নতুন তারিখ নির্ধারণ করে গণশুনানি আয়োজন করছে।
ইতোমধ্যে বর্তমান কমিশন প্রথমে গত ২৯ জানুয়ারি কুমিল্লায় গণশুনানি আয়োজন করে এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। যেখানে দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন, দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহ্সান ফরিদ, এসজিপি, এনডিসি, পিএসসি উপস্থিত ছিলেন। এমন কর্মকাণ্ডে দুর্নীতিবাজদের মনে দুদক-আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিগত কয়েক বছর দুদকের কর্মকাণ্ডে একযোগে সব ক্ষেত্রে এমন তৎপরতা দেখা যায়নি।
এদিকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পাবনায়, ২০ এপ্রিল নীলফামারী ও ২১ এপ্রিল লালমনিরহাটে গণশুনানি সফল করে দুদক। এসব গণশুনানিতেও পুরো কমিশন উপস্থিত ছিল। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার এবং আগামী মাসে খাগড়াছড়িসহ কয়েকটি জেলায় গণশুনানি আয়োজনের কথা রয়েছে।
গণশুনানি ছাড়াও দুদকে আসা অভিযোগের ভিত্তিতে রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব এলাকায় সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিতসহ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্যানুসন্ধানে আকস্মিকভাবে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়টি অভিযান পরিচালনা করছেন দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমের সদস্যরা। তথ্য সংগ্রহের পর অভিযোগের সত্যতা পেলে আইনি ব্যবস্থা নিতে কমিশনে প্রতিবেদন পেশ করা হয়। প্রতিবেদনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে আইনগত ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।