আগস্ট অভ্যুত্থানের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের আওতায় দেওয়া হয় শরিয়াভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকগুলোকে। সেই ব্যাংকগুলোতে আকস্মিকভাবে গ্রাহকের মধ্যে আমানত উত্তোলনের চাপ বেড়েছে। সেই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও চাকরি হারানোর আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের একটি বক্তব্যের পর এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে সেই ব্যাংকগুলোতে।
দেশের সব ইসলামি ব্যাংক একীভূত করে দুটি বড় ইসলামি ব্যাংক গঠন করা হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন গভর্নর। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি এমন মন্তব্য করে বলেন, ‘অধিকাংশ ইসলামি ব্যাংক এখন সংকটে থাকায় দেশের ইসলামি ব্যাংকিং খাতকে পুরোপুরি ঢেলে সাজানো হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স, ২০২৫ অনুমোদন করেছে। দুর্বল ব্যাংকগুলো এই অধ্যাদেশের আওতায় অবসায়ন বা মার্জার হতে পারে।’
ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে এবং জনপ্রিয় হয়েছে। তাদের মতে, শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলো এক সময় যথেষ্ট সফলও হয়। তাদের সাফল্য দেখে অন্য অনেক ব্যাংকও শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকিং খাত চালু করে। আগস্ট অভ্যুত্থানের পর ব্যাংকগুলো এখন পরিবর্তিত ব্যবস্থাপনায় চলছে। সেখানে ফরেনসিক অডিট চলছে। এই অবস্থায় ব্যাংকগুলোর প্রকৃত চিত্র এখনো প্রকাশ পায়নি। এ সময় গভর্নরের এমন মন্তব্য আমানতকারী ও ব্যাংকের দক্ষ ব্যবস্থাপকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তাফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘কেবল ইসলামি ব্যাংকগুলোই নয়, বর্তমানে পুরো ব্যাংক খাতই একটা সংকটের মধ্যে আছে। সেই সংকট কাটাতে হলে ব্যাংকগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে ব্যাংকের স্বাস্থ্য ঠিক করতে হবে। ব্যাংকের সংখ্যা কমানো হবে কি না, সেটা পরের বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর চেয়ে সুশাসন ফিরিয়ে আনা ও আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সুশাসন নিশ্চিত না করে যদি দুর্বল একাধিক ব্যাংককে একীভূত করা হয়, তাহলে ভালো ফল আসবে না। তাই ব্যাংকিং খাতের মূল সমস্যা দূর করে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। যদিও আট মাস পার হলেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের স্বাস্থ্য ঠিক করার পর কার সঙ্গে কার মার্জ করা হবে, সেটি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই ঠিক করতে হবে।’
যদিও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ব্যাংক মার্জারের বিষয়ে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি গভর্নর।
একই বিষয়ে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন খবরের কাগজকে বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিতের জন্য কাজ করছেন। এ ক্ষেত্রে গভর্নরের বক্তব্য নিয়ে গ্রাহকের মধ্যে ভুল-বোঝার অবকাশ তৈরি হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, গ্রাহকদের অনেকেই বলছেন বড় দুটি ইসলামি ব্যাংক থাকবে। বাকিগুলো থাকবে না। ফলে গ্রাহকরা ওই সব ব্যাংক থেকে আবার আমানত উত্তোলনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, যা এই ব্যাংকগুলোতে নতুন সংকট তৈরি করেছে। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকে মানুষ আমানত রাখে তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য। যাতে যেকোনো সময় চাইলেই সেই আমানত তিনি তুলতে পারেন। আমানতকারীরা যখন এ ধরনের কথা শোনেন, তখন তারা আতঙ্কিত হবেন- এটাই স্বাভাবিক।
অভিজ্ঞ এই ব্যাংকার বলেন, একটি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকের সঙ্গে অন্য একটি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক মার্জার করা হলে সেটা তো ক্ষতিগ্রস্তই থেকে যাবে। তাই এই ব্যাংকগুলোকে আগে শক্তিশালী করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি ইসলামি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা খবরের কাগজকে বলেছেন, বিগত সরকারের সময়ে বেশ কয়েকটি ব্যাংকে লুটপাট হয়েছে। এই ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে অডিট চলছে। অডিটের ফলের ভিত্তিতে ব্যাংক মার্জারের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। সে বিষয়টিই হয়তো গভর্নর বলেছেন। অর্থাৎ তিনি ফলের কথা আগেই বলেছেন। যদিও এর আগে অনেকগুলো ধাপ আছে। ব্যাংকগুলোতে যে ফরেনসিক অডিট চলছে, তার মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ বেরিয়ে আসবে। এ ছাড়া ব্যাংক রেজল্যুশন অ্যাক্ট নামে একটি অধ্যাদেশ পাস করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেটার আওতায় একটা ব্রিজ ব্যাংক হবে। ব্রিজ ব্যাংকের মাধ্যমে এই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর খারাপ সম্পদ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে হস্তান্তর হবে। তবে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে বেশ সময় লাগবে। আর এই প্রক্রিয়া যদি ফেল করে, তখন হয়তো মার্জার প্রসঙ্গ সামনে আসবে। কিন্তু গভর্নরের হঠাৎ এই বক্তব্যে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ফলে আবারও আমানত উত্তোলনের চাপ কিছুটা বেড়েছে।
শুধু তা-ই নয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও একধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে। যেহেতু তারা দেখছেন নতুন আমানত আসার চেয়ে উত্তোলন বেশি হচ্ছে। সেই সঙ্গে তারা যখন গভর্নরের এ ধরনের বক্তব্য শোনেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে একধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের এক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু গভর্নরের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য মোটেই আশা করি না।’
জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক আছে। সেগুলো হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। গত বছর শেষে এই ১০ ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। এদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
সিফাত/