২০২১ সালের ২ আগস্ট সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ‘মিঠামইন রেস্ট হাউস নির্মাণ’ প্রকল্পের অনুমোদন দেন। খরচ ধরা হয়েছিল সাড়ে ৩৮ কোটি টাকা। এ প্রকল্প ২০২১-এর জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুনে শেষ করার কথা। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের ফলে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এই প্রকল্পে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন এ প্রকল্পটির গত মার্চ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৫১ শতাংশ।
বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটির কাজ ২০১৭ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়। আগামী জুনে এই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু মার্চ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ। সারা দেশে চলমান শত শত প্রকল্পের এই হচ্ছে দশা। একেবারে স্থবির হয়ে গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন প্রকল্পেরও একই হাল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঠিকাদার পালিয়ে যাওয়া ও ঠিকমতো অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ার কারণে উন্নয়নকাজ এগোচ্ছে না। তারা বলছেন, সরকার পরিবর্তনের ফলে উন্নয়নকাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিব পালিয়ে গেছেন। তাদের অনুসরণ করে অনেক ঠিকাদারও আত্মগোপনে চলে গেছেন। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে কাজ। আবার অন্তর্বর্তী সরকারের কড়াকড়ির ফলে অনেক প্রকল্পে অর্থায়নও বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো কোনো প্রকল্প রাজনৈতিক কারণেও বাতিল করা হয়েছে। ফলে উন্নয়নকাজ থমকে গেছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০১৭-এর জুলাই থেকে কয়েকবার সংশোধন করে ২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়ার প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে। তার পরও ১ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকার এই প্রকল্পের গত মার্চ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২৫ দশমিক ২৯ শতাংশ।
সিরাজগঞ্জ জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০১৭ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে কয়েকবার সংশোধন করে জুনে শেষ হওয়ার তালিকায় রয়েছে। কিন্তু ৫৩৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্পটির গত মার্চ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩১ শতাংশ।
দেশব্যাপী ‘বহুমুখী দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প’টি তৃতীয়বার সংশোধন করে আগামী জুনে শেষ হওয়ার তালিকায় রাখা হয়। পরামর্শকদের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করেও ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর একনেক সভায় অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির অগ্রগতি গত মার্চ পর্যন্ত মাত্র ৪০ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের ৩ হাজার ৭৮ কোটি টাকার ঋণের এই প্রকল্পটি আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা সম্ভব হচ্ছে না।
শুধু তা-ই নয়, গলার কাঁটা ‘রোহিঙ্গাদের জন্য জরুরিভিত্তিতে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় মাল্টি সেক্টর প্রকল্পটিও জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও হচ্ছে না। গত মার্চ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে ৫০ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের অনুদানের এই প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একনেক সভায় অনুমোদন দেয় সরকার। ১ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি ২০১৮-এর ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুনে শেষ করার অনুমোদন দেওয়া হয়। মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়নের সম্ভাব্যতা জরিপ প্রকল্পটির কার্যক্রম ২০২৩ সালের মে মাসে শুরু হয়। আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও হচ্ছে না। কারণ গত দুই বছরে এক শতাংশও বাস্তবায়ন হয়নি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, রাজধানীর পরিবেশের উন্নয়ন, জলাধার সংরক্ষণ, সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ২০১০ সালের ৬ জুলাই একনেক সভায় ‘গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন’ প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন খরচ ধরা হয়েছিল ৪১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল তিন বছর অর্থাৎ ২০১০-এর জুলাই থেকে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত। এরপর এক বা দুবার নয়, চারবার সংশোধন করা হয়েছে। খরচ ছাড়াই এভাবে সময় বাড়ানো হয়। চতুর্থবার সংশোধন করে আগামী জুনে কাজ শেষ করার ছিল। যখন দেখা গেল যে এত অল্প সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব না, তখন পঞ্চমবারের মতো সংশোধন করে সময় বাড়ানো হয় ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তাতে খরচ ১৪৫ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৫৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এর অনুমোদন করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সারা দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী (একনেক) কমিটি গঠন হলেও আগের মতো সভা হয় না। গত ১০ মাসে এ পর্যন্ত ১০টি একনেক সভা হয়েছে। এসব সভায় অনুমোদিত প্রকল্পের সংখ্যা ১০০-এর বেশি হবে না। শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে চলতি অর্থবছরে (২০২৪-২৫) ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিবি) কাটছাঁট করা হয়েছে। এনইসি সভায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার অনুমোদন দেওয়া হয়। মূল এডিপি থেকে কমানো হয়েছে ৫২ হাজার কোটি টাকা। জীবনের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগসহ অন্য বিভাগ এবং মন্ত্রণালয়েও বরাদ্দ কমানো হয়েছে। উন্নয়ন বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ১১ হাজার ১৫১ কোটি টাকা থেকে বরাদ্দ ৫ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। কমানো হয়েছে ১৯ শতাংশ।
সড়ক পরিবহন বিভাগের বরাদ্দ প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ২১ হাজার কোটি টাকায় আনা হয়েছে। ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ৪৯টির বরাদ্দ ২৯ শতাংশ কমানো হয়েছে। তবে আটটির বরাদ্দ ১৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে আইএমইডির হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের গত ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) উন্নয়নকাজের জন্য এক পয়সাও খরচ করতে পারেনি। প্রায় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে এই অবস্থা। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগও ২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে মাত্র ৫২ কোটি টাকা খরচ করেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ সর্বোচ্চ ৩৬ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়ে খরচ করেছে ১৬ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা বা এডিপি বাস্তবায়ন করেছে ৪৫ দশমিক ২৬ শতাংশ। এভাবে ৫৭টির মধ্যে ৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১৫ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এ সময়ে খরচ হয়েছে মাত্র ৮৩ হাজার কোটি টাকা বা ৩৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। এটা গত বছরের চেয়ে ২৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা কম, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ আলম তালুকদার খবরের কাগকে বলেন, ‘কিছুদিন ধরে উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি কমে গেছে। টেন্ডার খুবই কম হচ্ছে।’
এনএন এন্টারপ্রাইজের মো. রাসেল হাওলাদার বাচ্চু নামে এক ঠিকাদার বলেন, ‘অনেক ঠিকাদার আত্মগোপনে থাকায় কাজ হয়নি। এই সরকারের অর্থসংকট রয়েছে।
ঠিকমতো টেন্ডার হয় না। আবার কাজ পেলেও অর্থছাড় হয় না। এ জন্য কাজে গতি বাড়ে না।’
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও সরকারের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের ফলে উন্নয়নকাজে ধাক্কা লেগেছে। অনেক কিছু পাল্টে গেছে। কারণ আগে রাজনৈতিকভাবে অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এসে এসব যাচাই-বাছাই করে কিছু বাদ দিয়েছে।’
উন্নয়নকাজের স্থবিরতার ব্যাপারে আইএমইডি সচিব মো. কামাল উদ্দীন বক্তব্য প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করেন। তবে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য হচ্ছে- সঠিক কর্মপরিকল্পনার অভাব, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ও ছাড়ের অভাব, সরকার পরিবর্তনের পর ঠিকাদার পালিয়ে যাওয়া, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ে মনিটরিংয়ের ঘাটতি। এ ছাড়া বিদেশিদের শর্ত প্রতিপালনে সমস্যা, ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ ও ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি না বাড়ার অন্যতম কারণ। এ ছাড়া সরকার পরিবর্তনের ফলে শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় সব অফিসে বদলি-আতঙ্কে রয়েছেন কর্মকর্তারা। অনেকেই মুখ খুলে কিছু বলতে চাচ্ছেন না। ফলে টেন্ডার কার্যক্রমও একেবারেই কমে গেছে।