মো. রমিজ (৫৫)। বাড়ি বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার আফরা গ্রামে। সম্প্রতি তিনি স্ট্রোক করে মারা যান। তার পরিবারের সদস্যরা জানান, রমিজের উচ্চ রক্তচাপ ছিল। কিন্তু তিনি নিয়মিত ওষুধ খেতেন না। রক্তচাপও মাপাতেন না। শরীর একটু খারাপ লাগলে ওষুধের ফার্মেসি থেকে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ কিনে খেতেন। শরীর একটু ভালো লাগলে খাওয়া বন্ধ করে দিতেন। শুধু রমিজ নয়; রমিজের মতো অসংখ্য মানুষ আছেন যারা নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ খান না। যার কারণে অনেকে অসুস্থ হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন। অনেকে মারা যান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও দেশব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি এবং ব্যক্তিগতভাবে উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণে এর পেছনে যত ব্যয় হবে তার তুলনায় কয়েক গুণ সুফল পাওয়া যাবে।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. এনামুল হক বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে যে উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা ও ওষুধে ১ টাকা বিনিয়োগ করলে সামগ্রিকভাবে ১৮ টাকার সুফল পাওয়া যায়। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষভাবে তা ব্যবহার করা সম্ভব হলে উচ্চ রক্তচাপজনিত অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
চিকিৎসকরা বলছেন, নিয়মিত ওষুধ না খেলে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না রাখলে যেকোনো সময় হার্ট অ্যাটাক কিংবা স্ট্রোক করে অকালমৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অধিকাংশ সময় উচ্চ রক্তচাপের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ থাকে না। রোগী বুঝতেই পারেন না যে তার উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। এ জন্য উচ্চ রক্তচাপকে নীরব ঘাতক বলা হয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সকালের দিকে মাথাব্যথা, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, হৃৎপিণ্ডের অনিয়মিত ছন্দ, দৃষ্টিতে পরিবর্তন এবং কানে গুঞ্জন অনুভূতি প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অত্যধিক উচ্চ রক্তচাপ ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, বমি, বিভ্রান্তি, উদ্বেগ, বুকে ব্যথা এবং পেশি কম্পন এর কারণ হতে পারে।
এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘আপনার রক্তচাপ সঠিকভাবে পরিমাপ করুন, এটি নিয়ন্ত্রণ করুন, দীর্ঘজীবী হোন’। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করার সঠিক উপায় হলো চিকিৎসক বা পেশাদার স্বাস্থ্যকর্মী দ্বারা নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করা। উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা করা না হলে হৃদরোগ যেমন: বুকে ব্যথা বা অ্যানজাইনা, হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইল এবং হার্ট বিট অনিয়মিত হতে পারে। এ ছাড়াও উচ্চ রক্তচাপের কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ অর্থাৎ স্ট্রোক এবং কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত এমনকি বিকল হতে পারে। শুধু তাই নয়; গ্লোবাল বারডেন অফ ডিজিজ স্টাডি (জিবিডি), ২০১৯ এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মৃত্যু এবং পঙ্গুত্বের প্রধান তিনটি কারণের একটি উচ্চ রক্তচাপ।
কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার প্রোগ্রামের (এইচ আর ডি অ্যান্ড মিউনিটি মোবিলাইজেশন) ম্যানেজার ডা. গীতা রানী দেবী বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে যেকোনো সময় হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক করে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। হার্ট অ্যাটাক করলে কিংবা স্ট্রোক করল, কিন্তু দ্রুত যথাযথ চিকিৎসা পেল না। তাহলে কী হবে? সে জন্য উচ্চ রক্তচাপ যাতে না হয়, সে ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। প্রতিরোধের বার্তাগুলো সবাইকে জানাতে হবে। যাতে সবাই নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করেন এবং বয়স ৪০ হলে তারা যেন মাঝে মাঝে রক্তচাপ মাপিয়ে দেখেন। এ ছাড়া যারা ঝুঁকিপূর্ণ অর্থাৎ চিহ্নিত রোগীদের নিয়মিত ফলোআপে রাখতে হবে। ওষুধ, খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন মেনে চললে এটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সরকারিভাবে নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে উচ্চ রক্তচাপ স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম রয়েছে। ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি সেখানে তাদের স্বাস্থ্য শিক্ষা দেওয়া হয়। যাতে তারা এই বিষয়ে সচেতন হতে পারেন। উপজেলা পর্যায়ে এনসিডি কর্নার আছে। সেখানে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উচ্চ রক্তচাপবিষয়ক প্রথম বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০-৭৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর ৩৩ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। গত ৩০ বছরে (১৯৯০-২০১৯) মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬৫ কোটি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০ কোটিতে। বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের (৩০-৭৯ বছর বয়সী) অর্ধেকই জানে না যে তাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের হার খুবই কম, মাত্র ৩৮ শতাংশ। নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে মাত্র ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ৭ জনে ১ জন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৭৩ হাজার মানুষ হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেছে, যার ৫৪ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে স্ট্রোকে মারা যান ৪৫ হাজার ৫০২ জন, ২০২০ সালে মারা যান ৮৫ হাজার ৩৬০ জন। এ ছাড়া ২০১২ সালে দেশে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর হার ছিল ২২ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২২ সালে ১৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
চিকিৎসকরা বলছেন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস যেমন, খাদ্যের সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ (সোডিয়াম) গ্রহণ, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার, তামাক ও অ্যালকোহল সেবন এবং বায়ুদূষণ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। যেমন শারীরিক পরিশ্রম না করা, অতিরিক্ত ওজন, মানসিক চাপ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ফলমূল ও শাকসবজি না খাওয়া। এ ছাড়া পারিবারিকভাবে উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস থাকলে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে (৬৫ বছরের পর) এবং ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। তাই স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের পর জোর দিয়েছেন তারা।