বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ঘোষণা করে গত ২৭ মার্চ নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল রায় দেন। এই রায়ের পর নিয়মানুযায়ী নির্বাচন কমিশন গত ২৭ এপ্রিল গেজেট প্রকাশ করে। গেজেট প্রকাশের পর ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানোর ব্যবস্থা না করে উল্টো তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। গেজেট প্রকাশের এক সপ্তাহ পর গত ৫ মে এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করবে কি না, তা জানতে চেয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি দ্রুততম সময়ের মধ্যে জানাতে নির্দেশ দেয়। সেই চিঠির কপি সম্প্রতি খবরের কাগজের এই প্রতিবেদকের কাছে আসে।
এই চিঠি প্রসঙ্গে ইশরাক হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘গেজেটের পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কি এই চিঠি লিখতে পারে?’ এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘এটা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ঔদ্ধত্য ছাড়া আর কিছু নয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কোনোভোবেই নির্বাচন কমিশনকে এ ধরনের চিঠি লিখতে পারে না। নির্বাচন কমিশন তো তাদের অধীনে নয়। একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের কাছে এভাবে জানতে চাওয়া একধরনের থ্রেট ছাড়া আর কিছু নয়।’
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনের কাছে জানতে এভাবে চিঠি দিকে পারে কি না, এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রধান তোফায়েল আহমেদ প্রথমে মন্তব্য করতে চাননি। পরে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন কেন, আপিল তারা (স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়) করত।’
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মাহবুবা আইরিন নির্বাচন কমিশনে এই চিঠি পাঠান। মাহবুবা আইরিনের সঙ্গে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি উপদেষ্টা এবং সচিবের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। এই বিষয়ে কথা বলার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর মোবাইল ফোনে কল করলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই চিঠির শেষ দুই প্যারায় বলা হয়েছে, ‘এই বিভাগ কর্তৃক পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের মামলা নং ১৫/২০২০-এ প্রদত্ত রায়ের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করবে কি না অথবা অন্য কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে কি না সে সম্পর্কে অবগত হওয়া আবশ্যক।’
‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয় এই মামলার রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করবে কি না অথবা অন্য কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে কি না সে সম্পর্কে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই বিভাগকে অবগত করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’
এই বিষয়টিকে চাপ প্রয়োগ উল্লেখ করে ২১ মে বিকেলে ৪টা ২৮ মিনিটে ফেসবুকে পোস্ট দেন ইশরাক হোসেন। পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘গেজেট প্রকাশের পর পতিত ফ্যাসিবাদের অন্যতম শীর্ষ কর্তা অপসারিত মেয়র তাপসের পক্ষ নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার চাপ প্রয়োগ করে নির্বাচন কমিশনে চিঠি লেখেন। গেজেট প্রকাশের পর শপথ অনুষ্ঠান না করে এই ধরনের চিঠি দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে একধরনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এটি দেখে আইন সম্বন্ধে যারা জানেন তারা হতবাক ও চরম বিস্মিত হয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। কোর্টের রায় কার্যকর করতে তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তাপসের এই কাজটি করে না দিতে পেরে, এখন তাপসের টাকা খেয়ে নির্বাচন কমিশন অভিমুখে বিক্ষোভ করেছে একটি রাজনৈতিক দল। এই অভিযোগ কেউ তুললে কি ভুল বলা হবে?’
উল্লেখ্য, এই দিন দুপুর ১২টায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা-কর্মীরা নির্বাচন কমিশনের সামনে জড়ো হয়ে অবিলম্বে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি জানান।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া ওই চিঠির শুরুতে বলা হয়েছে, ‘প্রকাশিত সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী আদালতের কোনো স্থগিতাদেশ অথবা আইনগত জটিলতা না থাকলে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এই বিভাগকে অনুরোধ করা হয়।’
‘বিজ্ঞ নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের মামলা নং ১৫/২০২০-এর সার্টিফায়েড কপির পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিজ্ঞ ট্রাইব্যুনাল ওই মামলার রায়ে বিতর্কিত নির্বাচনটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ইশরাক হোসেনকে মেয়র হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করেন।’
তৃতীয় প্যারায় বলা হয়, ‘উল্লিখিত মামলায় ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর আরজি সংশোধন করে ওই মামলার বাদীকে মেয়র হিসেবে ঘোষণা করার প্রার্থনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ রিট মামলা ৭৮৯৩/২০১১-এ সিদ্ধান্ত প্রদান করেন যে, (Election Tribunal) ‘has no power to allow any amendment so as to relate back to date of filling of election petition’ অর্থাৎ নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলায় আরজি সংশোধনের সুযোগ নেই মর্মে উচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন।’
চতুর্থ প্যারায় বলা হয়েছে ‘উল্লিখিত নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের মামলাটিতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন পক্ষভুক্ত বিবাদী হলেও কমিশন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। ফলে বিবাদী পক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করায় মামলাটিতে একতরফা সূত্রে রায় প্রদান করা হয়।’
উল্লেখ্য, ইশরাক হোসেনের গেজেট কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে মো. মামুনুর রশিদ নামে সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী হাইকোর্টে রিট করেন। সেই রিট ২২ মে খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। এখন ইশরাক হোসেনের শপথ ঠেকাতে আপিলের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের সার্টিফায়েড কপির অপেক্ষায় আছেন রিটকারীর আইনজীবীরা।