আয় বাড়াতে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অনেক পণ্য ও সেবা খাতে রাজস্বের (শুল্ক কর ও ভ্যাট) হার বাড়ানো হয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রাজস্ব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় আগের চেয়ে বেড়ে যাবে। শিল্পে উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে।
ব্যবসায়ী নেতারা রাজস্বসংক্রান্ত প্রস্তাব সংশোধন করে বাজেট চূড়ান্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। একই মত দিয়েছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরাও।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব বাড়ানো হয়েছে। বাড়তি রাজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক হবে না। এই বাজেটে নেওয়া পদক্ষেপের ফলে সব মিলিয়ে গড়ে রাজস্বের হার ২৮ শতাংশ হয়েছে। উন্নত দেশে এ হার গড়ে ৭ থেকে ৮ শতাংশ। আমাদের দেশে অধিকাংশ শিল্পের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আমদানি-নির্ভর শিল্পে শুল্ক বাড়ানো হলে তা অর্থনীতির জন্য সহায়ক হয় না। আমি সাধারণ ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে প্রস্তাবিত কর, শুল্ক ও ভ্যাট হার সংশোধন করে কমানোর সুপারিশ করছি।
ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ও ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কোনো উৎসাহ বাজেট প্রস্তাবে দেখতে পাইনি। এসব বিষয়ও চূড়ান্ত বাজেটে আনতে হবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সংশোধনের জন্য বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনগুলো বলেছে প্রস্তাবিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট সার্বিকভাবে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হয়নি। বাজেটে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, সিএমএসএমই ও ব্যাংকিং খাত সংস্কারে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। ব্যবসায় গতি আনার জন্যও উল্লেখযোগ্য দিকনির্দেশনা নেই। চূড়ান্ত বাজেটে এসব বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্যবসায়ী সংগঠন থেকে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিনিয়োগ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ২৯.৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। আমদানি প্রবাহও কমে গেছে। অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ও উচ্চ সুদের হারের কারণে দেশের শিল্প খাত সংকটের মধ্যে আছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে গুরুত্ব না দিয়ে রাজস্ব আয় বাড়াতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে অনেক খাতের রাজস্ব অব্যাহতি প্রত্যাহার করা হয়েছে। কোনো খাতে কর অবকাশ সুবিধা নতুনভাবে দেওয়া হয়নি। এগুলো ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপ নয়। এসএমই খাতে আমাদের দেশের সর্বমোট শ্রমশক্তির ৫০ শতাংশ ও ৮০ লাখের বেশি মানুষ জড়িত। অথচ বাজেটে এই খাত নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ দেওয়া হয়নি। টার্নওভার কর ০.৬০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যবসার জন্য এটি অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। দেশের অর্থনীতির গতি বাড়াতে চূড়ান্ত বাজেটে এসব প্রস্তাব সংশোধন করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, বাজেটে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। আমদানি পর্যায়ে করমুক্ত পণ্যের ওপর ২ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপ করা হয়েছে। এতে ব্যবসার কার্যকরী মূলধন কমে যাবে। এ প্রস্তাব বাতিল করতে জোরালো দাবি জানাচ্ছি।
ব্যবসায়ী এই নেতা আরও বলেন, অটোমোবাইল খাতে খুচরা যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনে ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। অনলাইন ব্যবসার লেনদেনে শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রস্তাব কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট খাতে খরচ বাড়বে। ফলে ওই সব ব্যবসায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এসব প্রস্তাব চূড়ান্ত বাজেটে সংশোধন করে কমানোর জোরালো দাবি জানাচ্ছি।
রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে চলতি মাসেই প্রস্তাবিত বাজেট চূড়ান্ত করবেন। তবে ২ জুন প্রস্তাবিত ভ্যাট (ভেলু এডেড ট্যাক্স) বা মূসক (মূল্য সংযোজন কর) ও শুল্কসংক্রান্ত প্রস্তাব বাজেট ঘোষণার পরই কার্যকর হয়েছে। তবে আয়কর সংক্রান্ত প্রস্তাব ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট রড ও সিমেন্টের মতো নির্মাণসামগ্রীর কাঁচামাল এবং তালিকাভুক্ত নয় এমন প্রতিষ্ঠানের কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। যা কার্যকর হলে এসব খাতের ব্যবসা বাড়বে না, বরং কমবে। এমন বিপরীতমুখী প্রস্তাব চূড়ান্ত বাজেটে বাতিল করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, উৎপাদন পর্যায়ে তুলা ও কৃত্রিম তন্তুর সুতার ওপর ভ্যাট কেজিপ্রতি ৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বস্ত্র খাতকে আমদানি নির্ভরতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রস্তাব সংশোধন করে আগের অবস্থায় নেওয়া প্রয়োজন।
বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালি চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বিশেষ শর্ত দিয়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কর হার ২২ দশমিক পাঁচ শতাংশ থেকে ২৭ শতাংশ করা হয়েছে। যা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। আমি এ প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।
অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে নেওয়া রাজস্বসংক্রান্ত পদক্ষেপ কার্যকর হলে বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। এসব প্রস্তাব নতুনভাবে ভেবে চূড়ান্ত বাজেটে পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার অর্থসংকটে আছে। খরচ চালিয়ে নিতে বিদেশি ঋণ ও অনুদান যোগাড়ে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়েই অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে আয় বাড়াতে বিভিন্ন কৌশলে রাজস্ব বাড়ানো হয়েছে। এ পথ থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। চূড়ান্ত বাজেটে অনেক বিষয়ে নতুন করে হিসাব কষতে হবে।