দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফল আম। ভরা মৌসুমে এখন চারদিকে পাকা আমের মিষ্টি ঘ্রাণ। একটা সময় ছিল যখন ঢাকাবাসী কেবল রাজধানীর বাজারগুলো থেকে মৌসুমি পাকা আম কিনে খেতেন। এখন সময় বদলেছে। ঢাকাবাসী এখন স্থানীয় বাজারের চেয়ে বরং বাগান থেকে আম কেনায় আগ্রহী বেশি। আমের জন্য প্রসিদ্ধ জেলাগুলো থেকে সরাসরি আম এনে তা তৃপ্তির সঙ্গে খাচ্ছেন অনেকেই। সেই প্রক্রিয়াটি সহজ করে দিয়েছে কুরিয়ার সার্ভিসগুলো। অনলাইন পেজ বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পরিচিতদের মাধ্যমে বাগানের আম অর্ডার দিয়ে মাত্র এক দিনে নিতে পারছেন ঢাকায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমের স্বর্গখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আম এনে খাচ্ছেন রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের জেলার আমপ্রেমিরা। সরাসরি বাগান থেকে আম আনা হলে সেটি বিষমুক্ত হবে- এমনটাই বিশ্বাস করেন সমাজের বড় একটি অংশ। ফলে বিষমুক্ত আমের আশায় নগরবাসী এখন শরণাপন্ন হচ্ছে বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- সুন্দরবন, এসএ পরিবহন, জননী, করতোয়া, ও ইউএসবি এক্সপ্রেসসহ অন্তত ১০টি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় আম সরবরাহ হচ্ছে। এসব কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ১০০ ট্রাক আম ঢুকছে। প্রতি ট্রাকে ১২টন করে আম ধারণের ক্ষমতা রয়েছে। সেই হিসেবে ১২ লাখ কেজি আম আসছে কুরিয়ারে। যার দাম আনুমানিক ১২ কোটি টাকা। সেই বিবেচনায় প্রতিদিন রাজধানীতে ঢুকছে ১২ কোটি টাকার আম।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ ও রংপুরের আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, ওই এলাকার বাজারগুলোতে সবচেয়ে ভালো মানের হিমসাগর আম এখন ৯০ থেকে ১২০ টাকা, ল্যাংড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকা, আম্রপালি ৬০ থেকে ৮০ টাকা ও ফজলি ৪০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের কাছেই নানা মাধ্যমে সরাসরি অর্ডার দেওয়া যাচ্ছে। এরপর এসব পছন্দমতো আম পরিমাণ অনুসারে প্রতি কেজিতে ভোক্তাদের কাছ থেকে ১১ থেকে ১২ টাকা ফি নিয়ে সুন্দরভাবে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রতিদিন কোটি টাকার বেশি ব্যবসা করছে কুরিয়ার সার্ভিসগুলো। চাহিদা বেশি থাকায় নিজস্ব পরিবহনের পাশাপাশি ভাড়া করা ট্রাকেও আম আনছেন তারা।
সম্প্রতি রাজধানীর সুন্দরবন, এস এ পরিবহন, জননী ও ইউএসবি এক্সপ্রেসসহ বড় কুরিয়ার সার্ভিসগুলো ঘুরে দেখা যায়, বাগান থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে ভোক্তাদের কাছে রসালো ও সুমিষ্ট আম পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। ডেলিভারি (সরবরাহ) নিতে কুরিয়ার সার্ভিসগুলোতে মানুষের জটলা ছিল চোখে পড়ার মতো।
এ বিষয়ে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের ভাইস-চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান পুলক খবরের কাগজকে বলেন, এখন প্রচুর আম আসছে কুরিয়ারে। ফ্রেশ ও বিষমুক্ত আম খেতে রাজধানীবাসী এখন কুরিয়ারের ওপর আস্থা রাখছেন। আমরা খুব যত্ন করে আমগুলো নিয়ে আসি ও যথাসময়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিই। এ সময় আমচাষি- ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি কুরিয়ার সার্ভিসগুলো ব্যবসা করে লাভবান হচ্ছে।
সম্প্রতি জননী ও সুন্দরবন কুরিয়ারে আম এনেছেন আতিয়া সুলতানা। এ বিষয়ে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতিবছর একাধিকবার বাড়ি থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আম আসে। আগের তুলনায় এ বছর সেবার মান বেড়েছে বলে মনে হলো। বাজারের আমে কেমিক্যাল আছে কি না এই অনিশ্চয়তা থেকে এ বছর সরাসরি একাধিকবার আম কিনেছি উৎপাদকের কাছ থেকে। সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, রংপুর থেকে সুন্দরবন ও জননী কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আম আনা হয়েছে। এ বছর একাধিকবার আম আনিয়েছি বাগান মালিকদের কাছ থেকে।’
তিনি বলেন, ‘আম পরিবহনে কুরিয়ার সার্ভিসের সেবার মান ভালো হওয়ায় এক দিনেই আম চলে আসে। ফলে আম নষ্ট হয় না। তবে প্যাকেজিংটা ভালো হতে হয়। জননী কুরিয়ারের চেয়ে সুন্দরবন কুরিয়ার কেজিপ্রতি খরচ তুলনামূলক একটু বেশি। কেজিপ্রতি আমের দামের হিসেবে পরিবহন খরচ কমানো হলে সাধারণত মানুষ আম পরিবহনে কুরিয়ার সার্ভিসের সেবা নিতে আরও আগ্রহী হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আম আনা ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম খবরের কাগজকে জানান, অন্য বছরের মতো এবারও ঢাকায় আম আনা হয় সুন্দরবন কুরিয়ারে। প্রতি কেজিতে তারা ভাড়া নিয়েছে ১২ টাকা। এভাবে এক ক্যারেট বা ২০ কেজিতে ২৪০ টাকা ভাড়া নিয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় বেশি। তিনি বলেন, কুরিয়ার সার্ভিসে আনা আম সতেজ থাকে। আম আসার পর তারা খুদে বার্তা দিয়ে জানিয়ে দেন। তবে ফোনে জানান না। এতে যারা খুদে বার্তা দেখেন না, তাদের আম বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে যায়।
একাধিক আম ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরে ৫ মাস আমের মৌসুম। মে-সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত থাকে আমের মৌসুম। তবে জুন-জুলাই মাসে আমের ভরা মৌসুম। এ সময় বাজারে পাওয়া যায় বাহারি আম। প্রাকৃতিকভাবে পরিপক্ব হওয়ার এ সময়ে আম হয় সুস্বাদু। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু করে জুনের মাঝামাঝি সময়ে পাকে হিমসাগর, ক্ষীরসাপাত, গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, বৃন্দাবনি, গুলাবখাশ, রানীপছন্দ ও বারি-১ আম। এ ছাড়া জুলাই-সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পাকে বারি-৩ ও বারি-৪, ফজলি, আম্রপালি, মোহনভোগ, আশ্বিনা ও গৌড়মতি।
বরেন্দ্র কৃষি উদ্যোগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনজের আলম মানিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাগানের সতেজ আম খেতে সবাই পছন্দ করে। এখন বাজারে গিয়ে কেনার চেয়ে কুরিয়ারে আম কেনার চাহিদা বেড়েছে। প্রতিদিন উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শতাধিক ট্রাক আম নিয়ে যাচ্ছে রাজধানীতে।’ এখন আম্রপালির চাহিদা বেশি। প্রতিমণ আম্রপালি বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায়। এ ছাড়া ফজলি বিক্রি হচ্ছে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকায়।