রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে ধোলাইপাড় পর্যন্ত ব্যস্ততম সড়কটি এখন জনভোগান্তির প্রতিচ্ছবি। বছরের বেশি সময় ধরে সড়কটি যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। যারা রাস্তাটি ব্যবহার করছেন তারা প্রতিদিন দুর্ভোগে পড়ছেন। বড় বড় গর্ত আর খানাখন্দে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এটি। অল্প বৃষ্টি হলেই হাঁটুপানি জমে এ সড়কে। তার ভেতরে বর্জ্য ও মলমূত্র ভাসে। এর মধ্য দিয়েই প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন লাখো মানুষ।
এদিকে গত মঙ্গলবার সড়টির কিছু অংশ খুঁড়ে গর্ত করে রাখা হয়েছে। সেখানেও বৃষ্টির পানি জমে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে আছে।
এই সড়ক দিয়ে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষ যাতায়াত বেশি করেন। এ ছাড়া প্রতিদিন যাত্রাবাড়ী, ধোলাইপাড়, মাতুয়াইল, শনির আখড়া, পোস্তগোলা ও এর আশপাশের এলাকার মানুষ যাতায়াত করেন। অথচ এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের এই অবস্থা দেখে মনে হয়, এটি যেন কারও নজরেই আসে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সড়কের নিচ দিয়ে যাওয়া পুরোনো স্যুয়ারেজ লাইন দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। সেখান থেকেই প্রতিনিয়ত উঠে আসছে আবর্জনা। সেই পানির রং এতটাই কালচে যে, কেউ প্রথম দেখলে ভাববেন, এটি কোনো দূষিত খাল।
সরেজমিনে দেখা যায়, যাত্রাবাড়ী থেকে ধোলাইপাড় পর্যন্ত প্রায় দুই কিমি দীর্ঘ এই সড়কে চলাচল করে হাজারও রিকশা, মোটরসাইকেল, সিএনজি, লেগুনা ও প্রাইভেট কারসহ দূরপাল্লার গাড়ি।
সড়কের নানা অংশে দেখা গেছে বড় বড় গর্ত। কোনো কোনো জায়গায় গর্ত এত গভীর যে, যানবাহন পড়ে গিয়ে হুমড়ি খাচ্ছে। আর সামান্য বৃষ্টি হলেই সেই গর্ত রূপ নেয় মৃত্যুকূপে। খানাখন্দে ভরা রাস্তা দিয়ে কোনো যানবাহনই স্বাভাবিকভাবে চলতে পারছে না।
প্রতিদিন ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ছেন বয়স্ক, শিশু ও নারী যাত্রীরা। রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে, অনেক যাত্রী গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে পার হচ্ছেন। দূরপাল্লার বাস থেকে যারা নামছেন তাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। মালপত্র নিয়ে হেঁটে যেতে হয় অনেকটা পথ।
যাত্রাবাড়ী থেকে কিছুটা সামনে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার মধ্যে পানি জমে আছে। সেই পানির নিচ থেকে আবার বুঁদ বুঁদ উঠছে। পাশের এক দোকানি জানান, এর নিচে আসলে গ্যাসের লাইন রয়েছে। রাস্তায় গর্তের কারণে বা গাড়ির চাপে গ্যাসের লাইন লিক করেছে। তাই এমন বুঁদ বুঁদ উঠছে। এটা বিপজ্জনক বলেও জানান তিনি।
ওই পথে শিশুকে নিয়ে রিকশা করে যাচ্ছেন সাবিনা আক্তার। কিছু দূর যাওয়ার পর শিশুকে কোলে নিয়ে রিকশা থেকে নেমে হাঁটা শুরু করলেন তিনি। একই সঙ্গে তার ব্যাগ নিয়ে রিকশাও চলছে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পানি আর গর্ত থাকায় রিকশা উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাই। কিন্তু বৃষ্টির দিনে তো হেঁটেই পার হতে হয়। পরে আবার রিকশায় উঠব।’
স্থানীয় ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক সোলেমান মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘এই রাস্তায় রিকশা চালানো মানে প্রতিদিন পিঠে ঝাঁকি খাওয়া। গর্তে পড়ে গেলে যাত্রী পড়ে যান, তারপর আমাদের গালিও শুনতে হয়। কিন্তু কিছু করার নাই, রাস্তার কোনো মেরামত হয় না।’
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী আবদুল কাইয়ুম বলেন, প্রতিদিন অফিসে যেতে ২০ মিনিটের রাস্তা এখন ১ ঘণ্টায়ও শেষ হয় না।
গর্ত আর পানি দেখে চালকরা ঠিকভাবে গাড়ি চালাতে পারেন না, আবার রাস্তাও সরু হয়ে গেছে। এত বড় একটা রুট অথচ দেখার কেউ নেই।
এদিকে সড়কের পাশে খানাখন্দ আর পানির দুর্ভোগের পাশাপাশি নতুন আরেকটি বড় সমস্যা দখলদারত্ব। যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে ধোলাইপাড়ের দিকে যেতে কিছুটা সামনে ‘দক্ষিণ যাত্রবাড়ী’ সড়কের বড় অংশ দখল করে দোকান বসিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ফুটপাত না থাকায় মানুষ রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর এই সুযোগে সড়কের ওপরেই পসরা সাজিয়ে বসেছে জামাকাপড়, ফল, সবজি ও নিত্যপণ্যের দোকান। দেখে মনে হয় যেন অস্থায়ী কোনো হাট বসেছে। যান চলাচলই যেখানে কষ্টসাধ্য, সেখানে এসব দোকানের কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হচ্ছে। পথচারী ও যানবাহন চালক- দুই পক্ষই পড়ছে বিপাকে।
স্থানীয়রা বলছেন, একাধিকবার অভিযোগ করার পরও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কিংবা ওয়াসার পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এলাকাবাসী দ্রুত এই সড়কের গর্ত সংস্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন ও ভাঙা স্যুয়ারেজ লাইন মেরামতের জোর দাবি জানিয়েছেন।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সচিব মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ওই সড়কটি নিয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট রোড ম্যাপ রয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ হবে।’ আর সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত সোমবার সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে আমরা ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করতে বলেছি। তবে ঠিকাদার অর্থসংকটের অজুহাত দিয়েছেন। এ জন্য আমরা তাকে কিছু বিলও দিয়েছি, যাতে কাজ শুরু করতে পারেন।’