ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন চলতি অর্থবছরে অর্থসংকটে পড়েছে। নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইতোমধ্যে বাজেট ঘোষণা করেছে সংস্থা দুটি। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত কার্যক্রম থেকে শুরু করে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। এতে নগরবাসী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সিটি করপোরেশনের আয়ের প্রধান উৎস হোল্ডিং ট্যাক্স, সম্পত্তি কর, ট্রেড লাইসেন্স, বাজার ফি ও বিজ্ঞাপন খাত। কিন্তু এসব খাতে আয় আশানুরূপ হচ্ছে না। বৈঠক করে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন কর্মকর্তারা। কিন্তু চলতি মাসে টার্গেটের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি সংস্থাগুলো। এদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নানা সমস্যার কারণে দুই সিটি করপোরেশনের লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক রাজস্বও আদায় হয়নি। বরং রয়ে গেছে দেনা। দুই সিটির কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, রাজস্ব আহরণে নানা সমস্যার কারণে চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। বিপরীতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক সময় প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরও অর্থাভাবে কাজ থেমে যাচ্ছে।
দুই সিটির রাজস্ব ও অর্থসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সিটি করপোরেশনগুলোর বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ- রাস্তাঘাট মেরামত, নর্দমা পরিষ্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কাজ চলমান রাখতে হচ্ছে। এই কাজগুলোতে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। দুই সিটি করপোরেশনের কাছে বিভিন্ন সংস্থা, ব্যক্তি এবং ঠিকাদারের পাওনা রয়েছে। এই পাওনাগুলো পরিশোধও করতে হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিটি করপোরেশনের কাজের ‘ওয়ার্ক অর্ডার’ পেয়ে ডজনেরও বেশি ঠিকাদার কাজ শুরু করেছিলেন। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারা কাজ বন্ধ রেখে পালিয়ে গেছেন। সে সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ নিয়েছেন। তাতে লোকসান হয়েছে সিটি করপোরেশনের।
এদিকে নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক জায়গায় সড়ক মেরামত হচ্ছে না, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক হচ্ছে না, স্ট্রিট লাইট অনেক এলাকায় নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। নালা-নর্দমা পরিষ্কার না করায় সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক এলাকায় পানি জমে যাচ্ছে।
উত্তর সিটি করপোরেশনের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা। আদায় করতে পেরেছে ৮০৬ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও আদায় করতে পারেনি সংস্থাটি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৬ হাজার ৬৯ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে উত্তর সিটি করপোরেশন। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য এই সিটি করপোরেশনের হাতে রয়েছে ৮৫০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। আদায় করতে পেরেছে ৭০৮ কোটি টাকা। এতে ঘাটতি দাঁড়ায় ৬৩০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে। নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৭৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাজস্ব আদায়ে আমাদের টার্গেট বাড়ানো হয়েছে। দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কোনো অর্থসংকট নেই ।’
তবে সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মঈন উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘মিটিং করে রাজস্ব বাড়ানোর টার্গেট দেওয়া হয়েছে। এখন বোঝা যাচ্ছে না। ডিসেম্বরের মধ্যে বোঝা যাবে। যে কাজগুলো অর্ধেক বা অপেক্ষমাণ রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমরা পরিকল্পনা করে এগোচ্ছি। সব কাজ একসঙ্গে ধরা যাবে না।’
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের অর্থবছর তো শুরু হলো। রাজস্ব আদায়ের জন্য কিছু খাতে আমাদের টার্গেট দেওয়া রয়েছে। এখনো উন্নতি কম। সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের দিকে টার্গেট পূরণ হয়ে যাবে বলে আশা করি।’
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দেনা কত রয়েছে? এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় আমাদের কিছু দেনা রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কিছু কাজের বিল ঠিকাদাররা পাবেন। আরও কিছু প্রতিষ্ঠানও বিল পাবে।’
উত্তর সিটি করপোরেশনে ৪ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা নগরবাসীর উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ২ হাজার ৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দক্ষিণ সিটির বাজেটে সড়ক ও ট্রাফিক অবকাঠামো খাতে ৩৬৫ কোটি ১১ লাখ, খাল উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসন খাতে ১১৫ কোটি টাকা।
কিন্তু ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলির রাস্তাও ভাঙা। রয়েছে বড় বড় গর্ত আর ময়লা-অবর্জনা। এর মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, পল্টনসহ পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি সড়ক। ঢাকার দুই সিটির খালগুলো ময়লা-আবর্জনা আর দখলে জর্জরিত হয়ে পড়ে আছে। এর মধ্যে উত্তর সিটি করপোরেশনের কয়েকটি খাল খনন ও পরিষ্কার করা হলেও দক্ষিণে উন্নয়নের কোনো খবর নেই।
উত্তরের বাজেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে, ৪৩৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। দক্ষিণে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫৭ কোটি ২০ কোটি টাকা। কিন্তু দৈনিক বাসাবাড়ির ময়লা নিয়ে গেলেও সড়ক ও অলিগলিতে যত্রতত্র অবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়। গত ২২ এপ্রিল বাড্ডার নতুনবাজারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা বকেয়া বেতনের দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন। পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সড়কের ওপর ময়লা-আবর্জনা ফেলে তাদের এই বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সে সময় তারা অভিযোগ করেন, তিন মাস ধরে তাদের বেতন-ভাতা ঠিকমতো দেওয়া হচ্ছে না। একই অভিযোগে গাবতলী ময়লার-ডিপোতে কাজ করা পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা বিক্ষোভ করেন।
মশা নিয়ন্ত্রণে উত্তর সিটি পৌনে ১৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। দক্ষিণ সিটিতে মশক নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্য খাতে ৫৭ কোটি ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবর্জনা অপসারণ ও মশা-ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ বরদ্দের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয়। দৈনিক নাগরিক সেবার জন্য অর্থ ব্যয় হচ্ছে। তাই চাইলেও সব কাজ একসঙ্গে ধরা হচ্ছে না। এ ছাড়া দক্ষিণ সিটিতে মশকনিধন কর্মী কম রয়েছেন। একই অবস্থা উত্তর সিটিতেও।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে দৈনিক ভিত্তিতে নিয়োজিত শ্রমিকদের মজুরি ৬০০ থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু যত শ্রমিক নিয়োগ করার কথা, অর্থসংকটের কারণে তত শ্রমিক নিয়োগ হয়নি বলে জানা গেছে।
২০১১ সালে যখন ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করা হয়, তখন দুই সিটি করপোরেশনের আর্থিক অবস্থা ভালোই ছিল। কাউকেই দেনা নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়নি। উল্টো অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের প্রায় ৩৮০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের টাকা সমান ভাগ করে নেয় দুই সিটি করপোরেশন।