ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শিল্পনগরী টঙ্গীতে মাদকবিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কমে গেছে। এ সুযোগে টঙ্গীতে প্রায় ২১টি বস্তির অলিগলিতে, প্রকাশ্যে ও নির্ভয়ে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এসব বস্তিতে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা চলে মাদকের বিকিকিনি। বহু অভিযানের পরও নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি এখানকার মাদকবাণিজ্য।
সরেজমিনে দেখা গেছে, টঙ্গীর মাজার বস্তিতে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা এখন মাদকদ্রব্যের বেচাকেনা চলে। এখান থেকে মাদকদ্রব্য কিনে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে বিক্রি করা হয়। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের টঙ্গী অঞ্চলের পশ্চিম থানার আওতাধীন তুরাগ নদীর উত্তরপাশে সোনাবানের মাজার বস্তি। লোকজন এটিকে মাজার বস্তি হিসেবে চেনেন। এই বস্তিতে ২৪ ঘণ্টাই পাওয়া যায় গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, দেশি-বিদেশি মদ, প্যাথেডিন, চরশ ও আফিম। কয়েক বছর ধরে মাজার বস্তি নিয়ন্ত্রণ করেন সিদ্দিকুর রহমান ডুবলি। স্থানীয়রা জানান, গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গা-ছাড়া ভাব দেখা যাচ্ছে। আগে এখানে শুধু রাতে মাদক বেচা-কেনা হতো। এখন রাতদিন ২৪ ঘণ্টাই রমরমা ব্যবসা চলে। ফলে মাদক ব্যবসায়ীরা আগের তুলনায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে টঙ্গীর কেরানীরটেক বস্তি দীর্ঘদিন ধরেই ‘মাদকপল্লি’ নামে কুখ্যাত। এখানে কুলছুম-সিরাজ, নারগিস-কামাল, রহিমা, বড় রানি, ছোট রানি, আকলী-আনু, বাবলু-স্বর্ণালী, নাজমা, খালেদা, আখি-সুমন, আমির আলী, সেহেরজান, মনির-মর্জিনা, রহিম প্রমুখ সরাসরি মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তাদের অর্থ জোগায় সুদি জাকির। এই বস্তির পাশেই রয়েছে চার তারকা মানের হোটেল জাভান। যেখানে প্রকাশ্যে বিদেশি মদ বিক্রি হয় কিশোর-যুবকদের কাছে। রাতভর চলে অসামাজিক কাজ।
নতুন বাজার এলাকায় অবস্থিত সমবায় ব্যাংক মাঠ বস্তিতে ‘মাদকসম্রাজ্ঞী’খ্যাত মোমেলা ও তার স্বামী জাহাঙ্গীরের সিন্ডিকেট পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। ইয়াবা বিক্রি করেন কল্পনা, রানি, বাচ্চু, বাদলের মা; প্যাথেডিন বিক্রি করেন মিনারা। টঙ্গীর আলোচিত মাদকসম্রাজ্ঞী মোমেলা বেগম (৪০)। থাকেন মাদক অধ্যুষিত টঙ্গীর কো-অপারেটিভ ব্যাংক মাঠ বস্তিতে। এক যুগ ধরে বস্তিতে বসে চালিয়ে যাচ্ছেন মাদকের ব্যবসা। গড়ে তুলেছেন কয়েক কোটি টাকার সম্পদ। খোদ টঙ্গীতেই রয়েছে মোমেলার তিনটি অলিশান বাড়ি ও একাধিক গাড়ি। একাধিক বাড়ি-গাড়ি থাকা সত্ত্বেও বস্তি ছাড়েননি মোমেলা। মাদক মামলায় একাধিকবার জেল খেটে জামিনে বের হয়ে ফের বস্তিতে গিয়ে ওঠেন তিনি। সেখানে বসে আবার চালিয়ে যান মাদকের ব্যবসা। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে এক যুগ ধরে চলছে মোমেলা বেগমের মাদকসাম্রাজ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে ইয়াবার বড় চালান ও দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ফেনসিডিলের চালান টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তিতে নিয়ে আসেন মোমেলা বেগম। এরপর ছোট ছোট চালানে সেসব পৌঁছে দেন টঙ্গী ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। স্থানীয় প্রশাসনের মাদক ব্যবসায়ীদের নামের তালিকার শীর্ষে রয়েছে মোমেলা বেগমের নাম। মোমেলা মাদক বিক্রির টাকায় টঙ্গীতে কিনেছেন তিনটি বাড়ি। ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের মরকুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন কুদ্দুস খলিফা রোডে ‘জাহিদ হাসান ভিলা’ নামে একটি বহুতল বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে তার। একই ওয়ার্ডের শিলমুন পূর্বপাড়া যুগীবাড়ি রোডে মাতৃকোল সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির স্বপন মাস্টারের কাছ থেকে কেনেন অর্ধকোটি টাকার একটি বাড়ি। পুবাইলের করমতলা পূর্বপাড়া আবাসিক এলাকায় পৌনে ৪ কাঠা জমির ওপর একটি আধাপাকা বাড়ি রয়েছে তার। ব্যাংক মাঠ বস্তিতে রয়েছে একাধিক আধাপাকা ঘর। মোমেলা তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলমকে কিনে দিয়েছেন চারটি মিনি ট্রাক ও সিএনজি। মেয়ের জামাই পুলিশের কথিত সোর্স হৃদয়কে কিনে দিয়েছেন ২০ লাখ টাকা দামের একটি প্রাইভেট কার। এ ছাড়া টঙ্গী ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় মোমেলার রয়েছে নামে-বেনামে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ।
সূত্র জানায়, ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোমেলার বিরুদ্ধে টঙ্গী পূর্ব থানা, গাজীপুর ডিবি, র্যাব ও গাজীপুর মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে ২৫টি মাদক মামলা হয়।
এ বিষয়ে জানতে মোমেলার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন কয়েক মাস আগে মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক মাঠ বস্তির প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু ঘুরেফিরে শুধু আমার নামেই মামলা হয়।’
এরশাদনগর বস্তি এলাকায় ৩ নম্বর ব্লকে ইয়াবা বিক্রি করছেন খালেদা, শারমিন, লিপি, আরিফ; ৪ নম্বর ব্লকে পারুলী। ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডে নজরুলের বস্তির সামনে ওয়াসিম ও বৃষ্টি; লাল মসজিদ বস্তিতে সুন্দর আলী। ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের হাজি মাজার বস্তিতে বর্তমানে ডুবলির নেতৃত্বে চলছে হেরোইন, ইয়াবা ও গাঁজার ব্যবসা। এখান থেকে সারা দেশে পাইকারি মাদক সরবরাহ হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের অভিযান অনেক সময় ‘লোক দেখানো’ হয়। সেনাবাহিনী কয়েকবার অভিযান চালালেও পর দিনই আবার ব্যবসা জমে ওঠে। জনগণের দাবি- মাদকের জন্য চিহ্নিত বস্তিগুলো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হোক। কারণ এই ব্যবসা ধ্বংস করে দিচ্ছে পুরো প্রজন্মকে।
এ বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসকান্দার হাবিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মাদকের বিরুদ্ধে কোনো আপস নেই। থানা পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা দিয়ে কঠোর নজরদারি চলছে। মাদক ব্যবসায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।