দীর্ঘ ছয় বছর পর অনুষ্ঠিত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন পরিস্থিতিতে এ নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ ছিল দেশজুড়ে; জনমনে ছিল ব্যাপক কৌতূহল। তবে এই নির্বাচনের ফলাফলে তাক লাগিয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট।
ডাকসুর ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ ১৫টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে ১২টি এবং ১৩টি সদস্য পদের মধ্যে ১১টি পদে জয় পেয়েছে তারা। দলীয় সমর্থনে ডাকসুর ইতিহাসে রেকর্ড রেজাল্ট। তাই চলছে নানা বিশ্লেষণ। বোঝার চেষ্টা হচ্ছে, এই ফলাফল কি আকস্মিক, নাকি শিবিরের দীর্ঘ পরিকল্পনার ফল। অনেকেই মনে করছেন, আত্মপ্রকাশের পর থেকে দলটির সুসংগঠিত শিক্ষার্থীবান্ধব কার্যক্রম, তৈরি করা ন্যারেটিভের বিপরীতে নিজস্ব কৌশল নির্ধারণ এবং অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর বিভক্তি ও ব্যর্থতার কারণে ফলাফলের এই চিত্র।
ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, বিশ্লেষক, ক্যাম্পাস রিপোর্টার তাদের মতামত জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্যে একাধিক কারণ উঠে এসেছে। শিবিরের সাংগঠনিক শক্তি, অন্যদের বিভক্তি, শিবির নেতাদের আচরণ, বিগত সরকারের সময়ে শিবির ট্যাগ লগিয়ে শিক্ষার্থী নির্যাতন, অতিমাত্রায় অ্যান্টিশিবির রাজনীতি, শিবিরের ওয়েলফেয়ার পলিটিক্স, ন্যারেটিভের রাজনীতি, ছাত্রদলের আচরণের সঙ্গে ছাত্রলীগের মিল হিসেবে উপস্থাপন, ব্যক্তি সাদিক কায়েমের জুলাই আন্দোলনের ইমেজ এবং পরবর্তী সময়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে না জড়ানো, এনসিপি-বাগছাস কর্তৃক শিবিরের নেতাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য, নির্বাচনি প্রচার কৌশল এবং সর্বোপরি ছাত্রশিবিরকে সময়ের বাস্তবতায় বিকল্প ভেবে নিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর উপাচার্যের সঙ্গে ছাত্র সংগঠনের বৈঠকে অংশগ্রহণ নিয়ে সামনে আসে ছাত্রশিবির। সেদিন সাদিক কায়েম নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা জানান। এ সময় তিনি ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ না করা এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি জানান। পরে ধাপে ধাপে শিবিরের অন্য নেতারা সামনে আসেন। তখন সংগঠনটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরই মধ্যে জুলাই আন্দোলনে কার কী ভূমিকা এসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসে সমন্বয়কদের বক্তব্যে, যেখানে ছাত্রশিবিরের নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা হয়। এই সময়ে জুলাই অভ্যুত্থানে কর্মসূচি নির্ধারণে সাদিক কায়েমের ভূমিকা নিয়ে আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনায়েন সায়ের স্ট্যাটাস দেন ফেসবুকে; যা সাদিকের ভূমিকাকে দৃঢ় করে। এরপর থেকে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে নতুন গঠিত দল এনসিপির নেতাদের মধ্যে নানা ইস্যু নিয়ে বাদানুবাদ চলতে থাকে। ক্যাম্পাসে কোণঠাসার চেষ্টা করা হয় তাদের।
অন্যদিকে শিবির ক্যাম্পাসে সৃজনশীল ও সময় উপযোগী কর্মসূচি নির্ধারণ করে। ‘মেধাবীদের মুখোমুখি’ শিরোনামে শিবির সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়। এ ছাড়া সায়েন্স ফেস্টিভেল, জুলাইকেন্দ্রিক কর্মসূচি, শিক্ষার্থীদের জন্য পানির ফিল্টার স্থাপন, মেডিকেল ক্যাম্প, ইফতারসামগ্রী বিতরণসহ শিক্ষার্থীদের সমস্যাকেন্দ্রিক কর্মসূচি পালন করেন তারা।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নির্বাচনের আগে শিবিরকে ঘিরে এক ধরনের নেতিবাচক প্রচার চলছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনগুলো তাদেরকে ‘ট্যাগ’ করে আলাদা করে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল এই ট্যাগিং শিক্ষার্থীদের ভোটের আচরণে উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক নির্যাতনের সাড়ে ১৫ বছরের ইতিহাস শিবিরকে শিক্ষার্থীদের চোখে এক ধরনের ‘ভিকটিম’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ভোটারদের একটি বড় অংশ এই ইমেজে সহানুভূতি খুঁজে পেয়েছে। নেতিবাচক প্রচার, অহংকারপূর্ণ আচরণ এবং অতিরিক্ত শিবির-বিরোধী ট্যাগিং ভোটারদের কাছে বিরক্তির জন্ম দিয়েছে। বাম সংগঠনগুলোর বিভক্তি, দুর্বল সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং ইসলামফোবিয়ানির্ভর প্রচারণা তাদের অবস্থানকে আরও দুর্বল করেছে। ভোটের ফলাফলে আরেকটি দিক প্রকাশ পেয়েছে। সেটি হলো, শিক্ষার্থীরা নেতিবাচক রাজনীতিতে আগ্রহী নয়; মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ন্যারেটিভ কিংবা ট্যাগিংকেন্দ্রিক প্রচারণা তাদের ভোটের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখেনি।
প্যানেলে বৈচিত্র্য ও নারীদের ভোট, চ্যালেঞ্জ সামনে
ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্যানেলে ছিল বৈচিত্র্য। মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে ইনকিলাব মঞ্চের ফাতেমা তাসনিম জুমা, আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে জুলাইয়ে চোখ হারানো জসীমউদ্দীন খান এবং সদস্য পদে সর্বমিত্র চাকমার অন্তর্ভুক্তি ভোটের মাঠকে প্রভাবিত করেছে। অন্যদিকে, নারী শিক্ষার্থীদের ভোট কম পাওয়ার যে অনুমান ছিল, সেটিও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। জগন্নাথ হল ছাড়া বাকি সব হলে এই প্যানেলের প্রার্থীদের ভোটসংখ্যা বেশি ছিল। নানা নেতিবাচক প্রচারের মধ্যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় নির্বাচিত এই প্যানেলের সামনে চ্যালেঞ্জও অনেক বেশি। ঘোষিত ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার্থীদের মতামতকে সম্মান জানিয়ে প্রত্যাশা পূরণ করাকে অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
ছাত্রদলের বিভক্তি ও শিক্ষার্থীদের মনোভাব বুঝতে না পারা
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাইদুর রহমান ডাকসুতে ছাত্রদলের পরাজয় নিয়ে দীর্ঘ বিশ্লেষণ লিখেছেন। এতে তিনি লেখেন, বর্তমান ছাত্রদলের বস্তাপচা জনকল্যাণহীন রাজনীতি, যুগের সঙ্গে নিজেদের পরিবর্তন না করা, মিছিলে কতজন হলো বা সমাবেশ কত বড় হলো, এতে কিছু যায়-আসে না, সেটাই প্রমাণ হলো। ছাত্রদের অধিকার, পড়াশোনা, গবেষণা এসব বিষয়ে ছাত্রদল এখনো অনুপস্থিত। তাই সবার আগে ছাত্রদলকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি, বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের বিভক্তি, নব্বইয়ে ডাকসু নির্বাচনে জয়ীদের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ না করার বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে ছাত্রদলের একাধিক নেতা-কর্মী জানান, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার কম সময় পায় দলটি। কারণ ডাকসুতে কারা নির্বাচন করবেন, সেটি নির্ধারণ করতে অনেক দেরি করা হয়েছে। অন্যদিকে শিবির অনেক আগেই তাদের প্রার্থীর পরিকল্পনা নির্ধারণ করে। ছাত্রদলের বিভিন্ন কোরাম থাকায় কোন পক্ষ থেকে কে আসবেন সেটি নির্ধারণ নিয়েও জটিলতা ছিল। ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি বিবেচনায় দলের জ্যেষ্ঠদের বাদ দিয়ে তরুণদের মধ্য থেকে প্রার্থী নির্ধারণ করা হয়। ফলে বাদ পড়াদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা পায়নি ছাত্রদলের সমর্থনে নির্বাচন করা প্রার্থীরা।
বাগছাসের ভরাডুবির পেছনে অহংকার ও বিতর্ক
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কর্মসূচি পালিত হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে; যা নিরপেক্ষ ব্যানার হিসেবে বিবেচিত হতো। অভ্যুত্থানের সময়ে হলভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয় তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু অভ্যুত্থান পরবর্তী সমন্বয়কদের মধ্য থেকে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধের কথা জানানো হয়। পরে এই প্ল্যাটফর্মের একাংশ বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু আত্মপ্রকাশের দিনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে মারামারিতে লিপ্ত হয় দুই পক্ষ। পরে বিভিন্ন সময় জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে এলেও দল দুটির পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়। অভ্যুত্থানের প্রধান শক্তি হিসেবে দাবি করে অন্যদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। পাল্টাপাল্টি বিভিন্ন ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য দেখা যায়। ডাকসু নির্বাচনের প্রাক্কালে এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলাম ভিপি পদে কাদের, জিএস পদে বাকের মজুমদারের জন্য ভোট চান। এনসিপির ফেসবুক পেজ থেকেও ভোট চাওয়া হয়। উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ভিপি পদে কাদেরকে নিয়ে স্ট্যাটাস দেন। এসব কারণে বাগছাসকে সরকারদলীয় সংগঠন হিসেবে বিতর্ক ওঠে। এ ছাড়া সাবেক সমন্বয়কদের বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার ক্ষেত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অনেকে ভিপি পদে আবদুল কাদেরকে তৃতীয় অবস্থানে রাখলেও প্রত্যাশার অনেক কম ভোট পেয়েছেন তিনি। তিনি মাত্র ১ হাজার ১০৩ ভোট পেয়েছেন।
ক্যাম্পাস শান্ত রাখার চ্যালেঞ্জ
অতীতে ক্যাম্পাসগুলোতে সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের একচ্ছত্র প্রাধান্য থাকত। এখন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকায় সব ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে সরব আছে। নানা পক্ষের উসকানিতে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্টরা ক্যাম্পাস শান্ত রাখাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। ক্যাম্পাসে সব ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন অনেকেই।