রোগী চিকিৎসকের রুম থেকে বেরিয়ে এলেই তাকে ঘিরে ধরেন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। তারা রোগীর ব্যবস্থাপত্র নিয়ে ছবি তোলেন। একজনের ছবি তোলা হলে আরেকজন। এতে কিছু সময়ের জন্য সেখানে নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হয় রোগীদের। ছবি তোলা শেষে তারা ব্যবস্থাপত্র ফেরত দিলে তার পরই রোগী স্থান ত্যাগ করেন। সরকারি ছুটি ছাড়া প্রতিদিন সকাল থেকেই চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষা করেন কোম্পানির প্রতিনিধিরা। যতক্ষণ চিকিৎসক থাকেন, ততক্ষণ তারাও বাইরে থাকেন। আবার সুযোগ বুঝে চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করে স্ব-স্ব কোম্পানির ওষুধ সম্পর্কে অবহিত করেন।
ছবি তোলা এবং রোগীদের দেখার সময়ে চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশে রোগী এবং সঙ্গে থাকা স্বজন বিব্রত বা বিরক্ত হন। অনেক সময় চিকিৎসকও বিরক্ত হন। শুধু তা-ই নয়, কখনো কখনো ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঘটে অপ্রীতিকর ঘটনাও।
রোগীর কোনো তথ্য, প্রেসক্রিপশন বা ডকুমেন্টের ছবি তোলার বিষয়ে কঠোর হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কোম্পানির প্রতিনিধি এখন এগুলোর ছবি আর তুলতে পারবেন না। সেই সঙ্গে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের হাসপাতালে অবস্থানের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত তারা চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন। এ সময় অবশ্যই নিজ নিজ কোম্পানির দেওয়া আইডি কার্ড বা পরিচয়পত্র দৃশ্যমান রাখতে হবে। এর বাইরে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা সরকারি হাসপাতালের সীমানার মধ্যে অবস্থান করতে পারবেন না। তারা নিজেদের ওষুধের তালিকা সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের টেবিলেও রাখতে পারবেন না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব নির্দেশনা অমান্য করা হলে সেই কোম্পানির সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গত ১১ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এ বি এম আবু হানিফ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জনসাধারণের মধ্যে সরকারি চিকিৎসকদের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে ও যথাযথ চিকিৎসাসেবা প্রদানে দেশের সব সরকারি হাসপাতাল/ইনস্টিটিউটে নির্দেশনাগুলো পালন করা আবশ্যক।
এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি (বাপি)। তবে নির্দেশনা কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা ঠিক আছে। পালন করা বড় কথা। এটা পালন হবে কি না তা দেখার বিষয়। এটা ডাক্তারদের ওপর নির্ভর করে।
ডা. মুশতাক বলেন, ওষুধ কোম্পানি তাদের মার্কেটিংয়ে কোনো নিয়মনীতির বালাই রাখে না। কোম্পানিগুলো সায়েন্টিফিক সেমিনার করে ওষুধের গুণাগুণ তুলে ধরবে। কাজের গ্যাপ থাকার সময় ডাক্তাররা সেই সেমিনারে অংশ নেবেন। জনে জনে গিয়ে বোঝানোর কী আছে? ই-মেইল বা হোয়াটসঅ্যাপেও গুণাগুণ সম্পর্কে জানানো যায়।
চলতি বছরের ৫ মে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের হাসপাতালে না যাওয়ার সুপারিশ করা হয়। সুপারিশে বলা হয়, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো শুধু ই-মেইল বা ডাকযোগে ডাক্তারদের কাছে তাদের পণ্য সম্পর্কিত তথ্য পাঠাতে পারবে। প্রতিনিধিরা সরাসরি সাক্ষাতের মাধ্যমে দৈনন্দিন প্রোডাক্ট প্রমোশন করতে পারবেন না। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশের চার মাসের মাথায় এই নির্দেশনা দিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশে আরও বলা হয়, চিকিৎসকের চেম্বার বা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে কোনো ধরনের ওষুধের/পণ্য প্রচার কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ থাকবে, কারণ এসব কর্মকাণ্ডে চিকিৎসকের মনোযোগ বিঘ্নিত হয় এবং রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন। চিকিৎসকদের যেকোনো পেশাগত সংগঠন, যেমন- চিকিৎসক সমিতি, পেশাগত সংস্থা বা বিশেষজ্ঞ সমাজ কোনো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। নতুন ওষুধ বা নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য থাকলে তা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক না করে কেন্দ্রীয়ভাবে নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক সভার মাধ্যমে উপস্থাপন করতে হবে।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের ভিজিটের সময় নির্ধারণ করে দেওয়ার জন্য ওষুধ শিল্প সমিতি সরকারকে অনুরোধ জানিয়ে আসছিল। দেশে অন্তত ৩০০-এর মতো ওষুধ কোম্পানি আছে। এর মধ্যে দুই শতাধিক বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সদস্য। ব্যবস্থাপত্রের ছবি না তোলার ব্যাপারে গত তিন মাসে তাদের সদস্য কোম্পানিগুলোকে চারটি চিঠি দেওয়া হয়।
কোম্পানিগুলোর মার্কেটিং প্রধান ও মালিকদের সঙ্গে দুই দফায় বৈঠকও করে ওষুধ শিল্প সমিতি। বৈঠকে সমিতি থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, এর পরও যদি এই নির্দেশনা লঙ্ঘন করে, তবে তার দায় সংশ্লিষ্টকে বহন করতে হবে। এ ব্যাপারে ওষুধ শিল্প সমিতি কোনো দায় নেবে না।
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘ভিজিটের জন্য আমরা একটি নির্দিষ্ট দিন বা সময় নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা বলে আসছিলাম। এখন যে নির্দেশনা দিয়েছে, শুরু হিসেবে আমি এটাকে সাধুবাদ জানাই। এরপর যদি কারেকশন বা রিভিশন করা লাগে, তাহলে সেটি পরে অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা জানাব।’
তিনি বলেন, ‘প্রমোশনাল ম্যাটেরিয়াল চিকিৎসকের টেবিলে ওপর থাকবে না। ডাক্তাররা আগে দেখুক, তারা এভাবে যদি মনে রাখতে পারেন, আমরা ওগুলো থেকে বিরত থাকব। এর বাইরে নির্দেশনায় যদি আরেকটি কথা লিখতেন, তাহলে ভালো হতো। সেটি হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে অনেক সময় বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করি। কখনো আবার চিকিৎসকরা আয়োজন করেন, আমরা অংশ নিই। এই ধরনের অ্যাকাডেমিক ও রিসার্চের কাজে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কোম্পানি অংশ নেওয়ার নির্দেশনা থাকলে ভালো হতো। তাহলে আমার মনে হয় এই নির্দেশনা পূর্ণাঙ্গ হতো।’
ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রতিনিধিরা শিক্ষিত ও পেশাদার। আমি আশা করব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যেন তাদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করে। তারা তো জীবিকার তাগিদে যান। এটা তাদের পেশা। ওষুধ কোম্পানিগুলো কোনো অবৈধ-অনৈতিক কাজ করে না। আমরা যে প্রমোশনাল উপকরণ দিই, সেটি ঔষধ প্রশাসন থেকে অনুমোদিত। আইনগতভাবে বৈধ এবং নিয়মনীতির ভেতরে থেকে আমরা সবকিছু করতে চাই।’