চলতি বছরে এ পর্যন্ত জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতরা রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এই হাসপাতালে বিড়াল-কুকুরসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়-আঁচড় খাওয়া রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। মৃত ৩৮ জনের ৩৪ জন কুকুর এবং ৪ জন বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে এ হাসপাতালে বেশি চিকিৎসা নিতে আসছেন বিড়ালের কামড়-আঁচড় খাওয়া মানুষ। প্রতিদিন অন্তত ৪০০-৫০০-এর মতো রোগী আসেন।
সবাইকে টিকা এবং এক-দেড় শ জনকে জলাতঙ্ক ইমিউনোগ্লোবুলিন দিতে হয়েছে। টিকার সরবরাহ থাকলেও ৪-৫ মাস ধরে নেই ইমিউনোগ্লোবুলিনের সরবরাহ। এতে বিপাকে পড়ছেন রোগী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘জলাতঙ্ক নির্মূলে কাজ করি সবাই মিলে’। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলাতঙ্ক একটি প্রতিরোধযোগ্য, জুনোটিক ভাইরাল রোগ। যা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে। এটি কুকুর, বিড়াল, গবাদিপশু এবং বন্যপ্রাণীসহ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে ছড়াতে পারে এবং সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে লালার সংস্পর্শে এলে মানুষর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত কামড়, আঁচড় অথবা মিউকোসার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে (যেমন চোখ, মুখ বা খোলা ক্ষত) সংক্রমিত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জলাতঙ্কের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, ব্যথা এবং ক্ষতস্থানে অস্বাভাবিক বা ব্যাখ্যাতীত খোঁচা বা জ্বালাপোড়ার মতো সাধারণ লক্ষণ। ভাইরাসটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের প্রদাহ বৃদ্ধি পায়। মানুষের ক্লিনিক্যাল জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, তবে খুব কমই নিরাময় করা যায়। জলাতঙ্কের দুটি রূপ রয়েছে। তীব্র জলাতঙ্কের ফলে অতিসক্রিয়তা, উত্তেজনাপূর্ণ আচরণ, হ্যালুসিনেশন, সমন্বয়ের অভাব, হাইড্রোফোবিয়া (জলের ভয়) এবং অ্যারোফোবিয়া (ড্রাফ্ট বা তাজা বাতাসের ভয়) দেখা দেয়। কার্ডিও-রেসপিরিটরি অ্যারেস্টের কারণে কয়েক দিন পরে রোগীর মৃত্যু ঘটে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের মোট আক্রান্তের প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে পক্ষাঘাতগ্রস্ত জলাতঙ্ক রোগ দেখা দেয়। এই ধরনের জলাতঙ্ক রোগটি তীব্র জলাতঙ্ক রোগের তুলনায় কম নাটকীয় এবং সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয়। ক্ষতস্থান থেকে শুরু করে পেশিগুলো ধীরে ধীরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। রোগী ধীরে ধীরে কোমায় চলে যায় এবং অবশেষে মৃত্যু ঘটে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, প্রায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে মানুষের জলাতঙ্কের মৃত্যুর কারণ হলো কুকুর। প্রতিবছর কুকুর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে জলাতঙ্কে বিশ্বে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। যাদের ৪০ শতাংশ ৫-১৫ বছর বয়সী। বিশ্বের ১৫০টি দেশে জলাতঙ্ক রোগ বিস্তৃত রয়েছে। এই রোগে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৫৯ হাজার মানুষ মারা যায়। যার ৯৫ শতাংশ ঘটনা আফ্রিকা ও এশিয়ায় ঘটে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে জলাতঙ্কপ্রবণ ৯টি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভুটান, উত্তর কোরিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মায়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালে দেশে ৮৩ জনের, ২০১৬ সালে ৬৬, ২০১৭ সালে ৮০, ২০১৮ সালে ৫৭, ২০১৯ সালে ৫৭, ২০২০ সালে ২৬, ২০২১ সালে ৪০, ২০২২ সালে ৪৫, ২০২৩ সালে ৪৭, ২০২৪ সালে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়।
রাজধানী মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আরিফুল বাসার বলেন, ‘চলতি বছরের এ পর্যন্ত জলাতঙ্কের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসাধীন ৩৮ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। জলাতঙ্কেই মৃত্যু হলো কি না, তা আমরা নিশ্চিত হতে পারি না। সেই সুবিধা আমাদের দেশে নেই। এই ৩৮ জনের মধ্যে চারজনকে বিড়াল ও বাকিদের কুকুর কামড় দিয়েছিল। কুকুড়ের কামড়ে জলাতঙ্ক বেশি হয়। তবে এখন বেশি রোগী আসছে বিড়ালের কামড় খেয়ে। জলাতঙ্কে মৃত্যুর হার শতভাগ।
তিনি বলেন, প্রতিদিন বিভিন্ন প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ৪০০-৫০০-এর মতো রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। সবাইকে টিকা দেওয়া লাগে। এক-দেড় শ জনকে জলাতঙ্ক ইমিউনোগ্লোবুলিন দেওয়া লাগে। টিকা লাগে ৪০০-৫০০-এর মতো। টিকার সরবরাহ আছে। প্রায় ৪-৫ মাস ইমিউনোগ্লোবুলিনের সরবরাহ নেই। মাঝে এক হাজার দিয়েছিল। আমাদের অনেক রোগী। তা এক সপ্তাহে শেষ হয়ে গেছে। এটার জন্য খুব ঝামেলায় পড়ছি। রোগীর লোকজন ঝামেলা করেন। একটা জিনিস হাসপাতালে সরবরাহ না থাকলে যা হয়। আশপাশে ব্যবসা শুরু হয়ে যায়। স্টাফরা সেই ব্যবসায় যুক্ত হয়ে যান।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ক্লিনিক্যাল লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরে জলাতঙ্ক কার্যত মারাত্মক আকার ধারণ করে। তবে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে ভাইরাসের পৌঁছানো বন্ধ করে দ্রুত পোস্ট এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিসের (পিইপি) মাধ্যমে জলাতঙ্কে মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। পিইপিতে রয়েছে ক্ষত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ধোয়া, মানুষের জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া এবং নির্দেশিত হলে জলাতঙ্ক ইমিউনোগ্লোবুলিন (আরআইজি) দেওয়া।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আরিফুল বাসার বলেন, ‘রোগটি প্রতিরোধে পোষা কুকুর-বিড়ালকে নির্দিষ্ট সময়ে টিকা দেওয়া উচিত। কুকুর-বিড়ালে কামড় দিলে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থান পরিস্কার সাবান দিয়ে কমপক্ষে আধা ঘণ্টা ধরে ধুতে হবে। পোষা কুকুর-বিড়াল হলে ১০ দিন পর্যবেক্ষণ করতে হবে, কোনো অস্বাভাবিক আচরণ আছে কি না। এ ছাড়া বাইরের প্রাণী কামড়ালে পর্যাবেক্ষণ করার সুযোগ নেই। দেরি না করে টিকা নিয়ে নিতে হবে।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, কুকুরের টিকাদান এবং কুকুরের সংখ্যা ব্যবস্থাপনা, কুকুরের কামড় প্রতিরোধ এবং সংস্পর্শে আসার পর সর্বজনীন টিকাদানের সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে জলাতঙ্ক দূর করা সম্ভব। বিশ্বব্যাপী এটি দেখানো হয়েছে ৭০ শতাংশ কুকুরের টিকাদানের মাধ্যমে কুকুরের জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মানুষের জলাতঙ্ক প্রতিরোধে কার্যকর মানব টিকা এবং ইমিউনোগ্লোবুলিন বিদ্যমান। সন্দেহভাজন প্রাণীর দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ক্ষত পরিষ্কার এবং টিকাদান জলাতঙ্কের সূত্রপাত এবং মৃত্যু রোধ করতে পারে।
বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস ২০২৫ পালন উপলক্ষে গতকাল শনিবার প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে (বিএআরসি) এক সেমিনারের আয়োজন করে।
সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘জলাতঙ্ক রোগ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আতঙ্কিত না হয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণত কুকুর বা বিড়ালের আঁচড়কে গুরুত্ব দিই না। তবে দেরি না করে শুরুতেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।’