ঋণখেলাপিদের আবারও বড় ধরনের ছাড় দিয়ে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি নতুন একটি বিশেষ ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালার আওতায় বলা হয়েছে, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে সর্বোচ্চ দুই বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পাবে ঋণখেলাপি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। ঋণখেলাপিদের ছাড় দেওয়া হবে না বললেও গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এখন খেলাপিদের জন্য নতুন নীতিমালা কার্যকর করেছেন।
খেলাপি ঋণ নবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সুবিধাকে দেশের ব্যাংক খাতের জন্য ‘ক্রেডিট নেগেটিভ’ বা ঋণের জন্য নেতিবাচক হিসেবে অভিহিত করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ণয়কারী সংস্থা মুডিস। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের নীতির কারণে ব্যাংকের ওপর চাপ সাময়িকভাবে কমলেও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি বাড়বে। সেই সঙ্গে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এক বছর আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার সময় বলেছিলেন, ব্যবসায়ীদের কোনো ‘অযৌক্তিক চাহিদা’ পূরণ করা হবে না। প্রায় এক বছর পর ঋণ পুনঃতফসিলসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে এখন। সংশ্লিষ্টরা এটিকে ঐতিহাসিকভাবে একটি ব্যর্থ নীতি বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, এই নীতির মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের সাহায্য করার কথা থাকলেও বাস্তবে টাকা আত্মসাৎ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেই দেখা গেছে যে, এই ধরনের নীতি থেকে অতীতে কখনো ভালো ফল পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতেও পাওয়া যাবে না। তারা মনে করছেন, অন্য সরকারগুলোর মতোই ‘বিভিন্ন মহলের’ চাপে বাংলাদেশ ব্যাংক এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, অতীতে প্রায় সব গভর্নরই ব্যবসায়ীদের এই ধরনের সুবিধা দিয়েছেন। কিন্তু কখনোই এ ধরনের সুবিধার কোন ফল পাওয়া যায়নি। ফলে এটা ঐতিহাসিকভাবে একটা ব্যর্থ নীতি। এই গভর্নর অবশ্যই অতীতের অনেক গভর্নরদের চেয়ে ব্যতিক্রম এবং কার্যকর কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু এই উদ্যোগটি তিনি কেন নিয়েছেন, তা বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, “আমার ধারণা চাপের কারণেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন গভর্নর। চাপ শুধুমাত্র ব্যবসায়ী গোষ্ঠী থেকে আসছে, তা নয়। এর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দল, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং নাগরিক সমাজ ও মিডিয়া থেকেও চাপ রয়েছে। সার্কুলারে ‘বৈষম্যের শিকার’ বা ‘অব্যবসায়িক আচরণ’-এর মতো রাজনৈতিক শব্দগুচ্ছের অন্তর্ভুক্তি এই বিভিন্নমুখী চাপের প্রমাণ।”
বর্তমান গভর্নর আগের গভর্নরের মতো নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী নন এবং তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরেও বিভিন্ন চাপের সম্মুখীন হতে হয়। ব্যবসায়ীরা সরাসরি গভর্নরের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে সরকারের মাধ্যমে চাপ তৈরি করছে।
ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতিগুলো জটিল চাপের ফল, যা একটি কৌশলগত আপসের অংশ হতে পারে, যদিও এর কিছু পদক্ষেপ ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসনের ক্ষেত্রে উদ্বেগ তৈরি করছে।’
৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নবায়নে বিশেষ কমিটি গঠন
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ৫০ কোটি টাকার কম ঋণ নবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে। তবে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধি রয়েছেন। এই প্রসঙ্গে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আগে নিয়ম ছিল যে একাধিক ব্যাংক মিলে কনসোর্টিয়াম বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ দিলে- কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সব ব্যাংকের ঐকমত্য লাগত। ঐকমত্য না হলে বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যেত। নতুন নিয়মে, ব্যাংকগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারলে ঋণগ্রহীতা এই কমিটির কাছে আবেদন করতে পারবেন। এর ফলে একটি তৃতীয় পক্ষ চলে এসেছে, যা ‘দেন-দরবারের’ একটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে এবং স্বচ্ছতার অভাব সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই ধরনের কমিটি গঠন মোটেও সমীচীন হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নতুন সুবিধা ব্যাংক খাতে ঝুঁকি বাড়াবে: মুডিসের সতর্কবার্তা
সম্প্রতি মুডিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড থাকলে ঋণগ্রহীতার প্রকৃত পরিশোধ ক্ষমতা যাচাইয়ে দেরি হবে। ফলে খেলাপি ঋণের হার কৃত্রিমভাবে কম মনে হতে পারে। সম্পদ-মানের ঝুঁকিও আড়াল হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনের উদ্ধৃতি দিয়ে মুডিস বলেছে, পুনঃতফসিলের পর ৯০ দিনের মধ্যে মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। এতে পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে বাধা তৈরি হতে পারে এবং ঋণগ্রহীতা আবার খেলাপি হলে ক্ষতির ঝুঁকি বাড়বে।
মুডিস আরও বলেছে, ২০২২ সালের জুলাই মাসে নিয়মকানুন শিথিল হওয়ার কারণে ব্যাংক খাতে ঋণ পুনঃতফসিলের প্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল, কিন্তু ঋণ পুনরুদ্ধার হয়নি।
তবে মুডিস মনে করে, এই শিথিল নীতির কারণে প্রকৃত অর্থে ঋণ পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে অনাদায়ী ঋণের ‘চিরায়ত সমস্যা’ দীর্ঘায়িত হবে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, ঋণ পুনঃতফসিল প্রক্রিয়ার যথাযথ তদারকি না হলে দুর্বল ঋণ কাগজে-কলমে সচল দেখানো হতে পারে। এতে বাস্তবে ঝুঁকি থেকে যাবে।
মুডিস বলেছে, ঋণগ্রহীতাদের চাপ কমানো ও খেলাপি ঋণ কমাতে ন্যূনতম সুদের হার থেকে কম সুদে ঋণ দেওয়ার বিধান করা হয়েছে। ফলে ঋণগ্রহীতার আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং খেলাপির ক্ষেত্রে ঋণদাতাদের ক্ষতিও তুলনামূলক কম হবে, যা উভয় পক্ষের জন্যই উপকারী। তবে মাত্র ২ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধের সীমা ঝুঁকি তৈরি করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে ব্যবসায়ীদের যেসব সুবিধার কথা বলা হয়েছে:
গত ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ব্যাংকার ও গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বিদ্যমান খেলাপি ঋণের স্থিতির ওপর কমপক্ষে ২ শতাংশ নগদে অর্থ জমা দিতে হবে। তাতে ঋণ নিয়মিত হলে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ (ঋণ পরিশোধে বিরতি) তা পরিশোধে ১০ বছর সময় পাওয়া যাবে। তবে এর আগে ঋণ তিন বা তার চেয়ে বেশিবার পুনঃতফসিল করা হলে অতিরিক্ত ১ শতাংশ অর্থ জমা দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের নির্ধারিত ঋণ পরিশোধের সূচি অনুযায়ী তিনটি মাসিক কিস্তি বা একটি ত্রৈমাসিক কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, আগে যেসব অর্থ জমা দেওয়া হয়েছে, তা ২ শতাংশ হিসেবে গণ্য হবে না। নতুন করে ২ শতাংশ অর্থ জমা দেওয়ার পর তা নগদায়ন হলে ছয় মাসের মধ্যে আবেদনটি নিষ্পত্তি করতে হবে।
প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতার ক্ষতির পরিমাণ ও প্রতিষ্ঠানের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, এই সুবিধা দেওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে ব্যাংক ও গ্রাহকের সোলেনামার মাধ্যমে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চলমান মামলার কার্যক্রম স্থগিতের ব্যবস্থা নিতে হবে।
দেশে গত জুন মাসের শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ২৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। দেশে এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। হঠাৎ খেলাপি ঋণ এভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক নিরাপত্তাসঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতিতে পড়েছে। যে কারণে এবার হাতে গোনা কয়েকটি ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পেরেছে। আবার আগামী বছর কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি হলে ওই ব্যাংক যত মুনাফা করুক লভ্যাংশ দিতে পারবে না। এসব কারণে ব্যাংকগুলো এখন খেলাপি ঋণ কমাতে তৎপর রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে গত এক বছরে দেশে তেমন কোনো ব্যবসাবাণিজ্য হয়নি। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীও ক্ষতিতে পড়েছেন। প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ক্ষতি কাটিয়ে দেশে ব্যবসাবাণিজ্যের গতি বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ কার্যকর হবে বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর ঋণখেলাপিদের প্রতি জিরো টলারেন্সের নীতি ঘোষণা করেছেন এবং বলেছেন যেকোনো দলেরই হোক না কেন, ঋণখেলাপিদের ছাড় দেওয়া হবে না এবং তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এর পরও খেলাপি হওয়া ব্যবসায়ীদের এ ধরনের ছাড় দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত সমস্যায় পড়ে ঋণ পরিশোধে বিপাকে পড়েছে, শুধুমাত্র সেসব প্রতিষ্ঠানকেই এই সুবিধা দেওয়া হবে। তা না হলে যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত এসব প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন করে ব্যবসা সচল ও লাভজনক করার লক্ষ্যে নীতিসহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।