রাজধানী ঢাকার প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র সচিবালয়, গুলিস্তান ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাঝখানে এক টুকরো সবুজের নাম ওসমানী উদ্যান। একসময়ে এ উদ্যানকে বলা হতো ‘ঢাকার ফুসফুস’। ব্যস্ত নগরের মাঝখানে মানুষের বিশ্রাম ও বিনোদনের প্রিয় স্থান ছিল এটি। কিন্তু আজ সেই সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে কংক্রিটের আড়ালে আর অব্যবস্থাপনার দমবন্ধ বাস্তবতায়। সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে যাওয়ায় এটি এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পার্ক বা উদ্যানে ৫ শতাংশের বেশি অবকাঠামো করা উচিত নয়। তবে ওসমানী উদ্যানের ক্ষেত্রে এ নিয়মের তোয়াক্কা করা হয়নি, বরং উদ্যানটির ২৩ শতাংশের বেশি স্থানে অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এটি ‘খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০’-এর পরিপন্থি।
সচিবালয়, নগর ভবন, গুলিস্তান, পল্টন- সব মিলিয়ে এ অঞ্চলটি দেশের প্রশাসনিক হৃদয়। অথচ মাঝখানের উদ্যান এখন ‘অবাঞ্ছিত এলাকা’ হয়ে পড়েছে। নাগরিকরা চাইছেন, ওসমানী উদ্যানে যেন সত্যিকারের উন্নয়ন হয়- যে উন্নয়নে ফিরবে গাছ, ফুল, সবুজ আর ইতিহাসের মর্যাদা। না হলে এই ‘ঢাকার ফুসফুস’ একদিন পুরোপুরি নিশ্বাস নিতে ভুলে যাবে।
পুরোনো আর নতুন প্রকল্প, বুলডোজার চলছে সবুজ উদ্যানে
দীর্ঘ আট বছর ধরেই সংস্কারের নামে ওসমানী উদ্যান বন্ধ রয়েছে। ২০১৭ সালে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন প্রায় ৫৮ কোটি টাকায় একটি প্রকল্পের কাজ শুরু করেছিলেন। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে কাজের উদ্বোধন হলেও সময়মতো শেষ হয়নি। পরে মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এসে প্রকল্পে কিছু পরিবর্তন আনেন এবং বাজেট বাড়ান। প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। কিন্তু সময় ও দফায় দফায় বরাদ্দ বাড়ানোর পর ২০২৫ সালেও কাজ শেষ হয়নি।
এদিকে ‘জুলাই ছাত্র আন্দোলনে’ নিহতদের স্মরণে এবং জুলাইয়ের চেতনাকে অম্লান রাখতে উদ্যানের ভেতর নির্মিত হচ্ছে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ৪৬ কোটি ৪০ লাখ টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। নকশা অনুযায়ী, স্মৃতিস্তম্ভে থাকবে আটটি আয়তাকার কলাম এবং মাঝখানে একটি ৯০ ফুট উচ্চতার বৃত্তাকার স্তম্ভ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের নকশায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহিদদের স্মৃতি ও ইতিহাসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।
এদিকে পুরো উদ্যান টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখায় ২০১৮ সাল থেকে সাধারণ নাগরিকের প্রবেশ নিষেধ। উন্নয়নকাজের ধীরগতিতে একদিকে নাগরিক সুবিধা হারিয়েছেন মানুষ, অন্যদিকে সুযোগ নিচ্ছে অপরাধ চক্র। উদ্যানের চারপাশে টিনের বেড়া দেওয়ার পর থেকেই এটি অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। রাত নামলেই চলে মাদকসেবীদের আড্ডা, কিশোর গ্যাংয়ের আনাগোনা, এমনকি দেহব্যবসারও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি ওসমানী উদ্যান ঘুরে দেখা যায়, টিনের বেড়ার আড়ালে যেন চলছে আরেক দুনিয়া। উদ্যানের প্রবেশপথেই বসেছে চা-সিগারেটের দোকান, যেগুলোর আড়ালেই চলে মাদক বিক্রি। ভেতরে উঁকি দিতেই চোখে পড়ে দল বেঁধে বসে থাকা মাদকসেবীদের। কেউ মাতাল হয়ে পড়ে আছে, কেউ আবার প্রকাশ্যেই সেবন করছে মাদকদ্রব্য।
স্থানীয় চা-দোকানি মো. আবদুল হক বলেন, ‘আগে সন্ধ্যায় অনেকেই সপরিবারে হাঁটতে আসতেন। সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি লোকজন বসে গল্প করতেন, এখন ওসব নেই। রাতে এখানে মাদকসেবী আর দেহব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য এমন পর্যায়ে গেছে যে এখন ভয়ে সাধারণ নাগরিকরা আসেন না। পুলিশ এসব দেখেও দেখে না।’
হারাচ্ছে সবুজ, বেড়েছে কংক্রিটের দখল
গত শতকের আশির দশক থেকে এই উদ্যানে চলছে বুলডোজার। নব্বইয়ের দশকে এসে উদ্যানে পাঁচতারকা হোটেল নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের আন্দোলনের মুখে তা বন্ধ হয়। এ ছাড়া গভীর রাতে গোপনে গাছ কেটে সবুজ ধ্বংস করার নজিরও রয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এই উদ্যানের ভাগ্যও পরিবর্তিত হয়েছে। কোনো সময় তা সংরক্ষণের উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং অবহেলা ও ধ্বংসের শিকার হয়েছে উদ্যান।
একসময়ে ওসমানী উদ্যানের আয়তন ছিল প্রায় ২৪ একর, যা বর্তমানে নির্মাণ প্রকল্প ও রাস্তা সম্প্রসারণের কারণে হ্রাস পেয়েছে। সবুজ গাছপালা কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ায় পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, রাজধানীর মাঝখানে এত বড় সবুজ এলাকা হারিয়ে গেলে ঢাকার তাপমাত্রা ও দূষণ উভয়ই বাড়বে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির খবরের কাগজকে বলেন, “উন্নয়ন ও চেতনার নামে পার্ক ও উদ্যান ধ্বংস করা হচ্ছে। যেকোনো নগরীর আয়তনের তুলনায় ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকার কথা। সেখানে আমাদের উত্তর সিটি করপোরেশনে রয়েছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ সিটিতে রয়েছে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। যা রয়েছে তাও ধ্বংস করা হচ্ছে। এই কারণে আমাদের জলবায়ু বারবার পরিবর্তন হচ্ছে। ঢাকা ‘হিট’ শহরে রূপান্তরিত হয়েছে। তার পরও বিভিন্ন চেতনার নামে আমাদের উদ্যানগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে।”
আইন আছে, কিন্তু মানা হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উদ্যান ধ্বংস করা যাবে না এই জন্য আইন রয়েছে। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তারা সেই আইন মানেন না। বাইরে জায়গা থাকতে ঢাকার ফুসফুস কেন ধ্বংস করতে হবে? সবই টাকা খাওয়ার ধান্দা। কারণ যত বেশি প্রকল্প, তত বেশি টাকা পাচ্ছেন কর্মকর্তারা।’
ইতিহাসের সাক্ষী আজ অবহেলায়
ওসমানী উদ্যান কেবল একটি পার্ক নয়, বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান, যা ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর নামে এর নামকরণ করা হয়। কিন্তু বর্তমানে উদ্যানটি অযত্নে-অবহেলায় রয়েছে এবং এর ঐতিহাসিক ফলক, স্মৃতিস্তম্ভ ও স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া খোঁড়াখুঁড়ির কারণে গাছের গোড়া ধ্বংস হচ্ছে এবং অসংখ্য গর্ত তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় নাগরিক মিজানুর রহমান (৬৮) বলেন, ‘এই উদ্যান একসময় ছিল শান্তির জায়গা। এখন যেখানে গিয়েই দেখি ধুলো, মাটি আর টিন। ইতিহাসের জায়গাটা হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের চোখের সামনেই।’
দক্ষিণ সিটির নগর ভবনের উল্টো দিকে, সচিবালয়ের দেয়ালঘেঁষা ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন অফিসগামী রুবেল মিয়া। তিনি বলেন, ‘ওসমানী উদ্যানের পাশে অফিস করি। আগে অফিস শেষে এসে একটু বসতাম। এখন ওখানে ঢোকাই যায় না। দিন দিন জায়গাটা আরও ভয়ংকর হয়ে যাচ্ছে।’
আরেক পথচারী সুমি আক্তার প্রতিদিন গুলিস্তান হয়ে সচিবালয় যান। তিনি বলেন, ‘আগে পার্কের পাশে দিয়ে গেলে ঠাণ্ডা হাওয়া লাগত। এখন গরম ধোঁয়া আর ময়লার গন্ধে দাঁড়ানো যায় না। এটা শহরের মাঝখানে থাকা এক দমবন্ধ জায়গা।
নগর পরিকল্পনাবিদদের উদ্বেগ
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ওসমানী উদ্যানের এই অবস্থা পুরো ঢাকার জন্যই বিপজ্জনক। শহরে এমন উন্মুক্ত জায়গা কমে গেলে বায়ুদূষণ ও তাপমাত্রা আরও বাড়বে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ বলেন, একটি জাতীয় উদ্যান দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে আছে। সঠিক পরিকল্পনা না করে অপরিকল্পিতভাবে এগোনোর কারণে উন্নয়নের নামে উদ্যানের মূল চরিত্র পাল্টে দেওয়া হয়েছে। ফলে এই উদ্যান ব্যবহারের অনুপযোগী করে রাখা হয়েছে। উদ্যানের প্রকল্পের ডিজাইন কখনোই জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করা হয় না। নিয়ম অনুযায়ী কোনো উদ্যানে ৫% এর বেশি অবকাঠামো তৈরি করা যাবে না। কিন্তু আমরা দেখেছি- ৫ শতাংশ অনেক বেশি অবকাঠামো করে উদ্যানের মূল চরিত্র পাল্টে দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক কাল স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির নামে উদ্যানে আবারও কংক্রিটের কার্যক্রম চলছে।
তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরে যেখানে সবুজ উদ্যান- পার্কের পরিমাণ এত কম, সেখানে যদি একটা উদ্যান ডিজাইন করতে ৮-১০ বছর লাগিয়ে দেয় সেটা কোনো ভালো পরিবর্তন হতে পারে না। এ ধরনের প্রবণতা গত সরকারের সময় ছিল। আমরা মনে করছিলাম, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উদ্যানের কাজ দ্রুত সেরে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে দেখতে পাচ্ছি তা করা হয়নি।’
ওসমানী উদ্যানের বেহাল বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, “আমি এখানে এসেছি প্রায় দুই মাস। আগের বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ হয়ে গেছে। আগের কন্ট্রাক্টর মারা গেছেন। এখন কাজ চলছে, কিছু টাকা বাকি রয়েছে। সেগুলো দেওয়া হবে। আগামী বছরের জুনে খুলে দেওয়া হবে।
‘সবুজ ধ্বংস করে উন্নয়ন হচ্ছে’ এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্মৃতিস্তম্ভ যেখানে হচ্ছে জায়গাটা আগে থেকে খালি ছিল। গাছও ছিল না। উদ্যানের পরিবেশের ওপর খুব বেশি প্রভাব পড়বে না।