চীনের তীব্র চাপের মুখে মায়ানমারের জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স (থ্রিবিএইচএ)’-এ এখন ভাঙনের সুর। আরাকান আর্মি (এএ), ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এনডিএএ) এবং তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (টিএনএলএ) সমন্বয়ে ২০১৯ সালে গঠিত এই জোটে এখন আস্থা ও অস্ত্রের সংকট। কয়েক বছর ধরে এই জোটই মায়ানমারের জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছে এবং জান্তার নিয়ন্ত্রণ থেকে বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে নিয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স মায়ানমারের বিভিন্ন জায়গা দখলে নেওয়ার পর সেখানে চীনবিরোধী পশ্চিমা বিশ্বের তৎপরতা বেড়েছে। এ জন্য চীন তাদের সীমান্ত বরাবর থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে বহিরাগত শক্তির সঙ্গে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে নিষেধ করেছে।
সূত্র আরও জানায়, থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী মায়ানমারের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে পশ্চিমা বিশ্বের সহযোগিতা দেওয়ার প্রমাণও মিলেছে। এ ছাড়া চীনের সীমান্তবর্তী শান রাজ্যের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষ থেকে অস্ট্রেলিয়ার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন রাখাইন রাজ্যের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গেও পশ্চিমা বিশ্বের যোগাযোগ রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
বেইজিংয়ের অব্যাহত চাপের মুখে থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের বিদ্রোহী গোষ্ঠী তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) গত বুধবার চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিংয়ে মায়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। মায়ানমারে নিযুক্ত চীনের বিশেষ দূত দেং জিজুনের মধ্যস্থতায় জান্তা সরকারের সঙ্গে এই শান্তিচুক্তিতে সই করে টিএনএলএ। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তারা মান্দালয় অঞ্চলের মোগো এবং উত্তর শান রাজ্যের মংমিত শহরগুলোকে জান্তা সরকারের কাছে ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়। আর জান্তা সরকার টিএনএলএ-নিয়ন্ত্রিত অবশিষ্ট অঞ্চলে বিমান হামলা না চালানোর বিষয়ে সম্মত হয়। যুদ্ধবিরতির আগে জান্তা সরকার উত্তর শান রাজ্যের টিএনএলএ-অধিষ্ঠিত শহরগুলো এবং মান্দালয় অঞ্চলের মোগোতে প্রায় প্রতিদিনই বিমান হামলা চালাচ্ছিল।
এ ছাড়া গত জুলাই-অক্টোবরে টিএনএলএর ওপর বেইজিংয়ের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জান্তা সরকার একের পর এক বড় ধরনের আক্রমণ শুরু করে এবং চীন-মায়ানমারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট- মান্দালয়-লাশিও-মুস হাইওয়ের প্রধান কেন্দ্র নওংঘকিও, কিয়াউকমে এবং সিপাও শহরগুলো পুনরুদ্ধার করে। একই সময়ে টিএনএলএ-অধিষ্ঠিত শহর এবং গ্রামে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে জান্তা বারবার বিমান হামলা করে তাদের মুক্ত করা শহরগুলো ছেড়ে দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের আরেক বিদ্রোহী গোষ্ঠী ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মির (এনডিএএ) ওপরও চাপ অব্যাহত রেখেছে চীন সরকার। এ জন্য তাদের নেতা পেং ড্যারেনকে আটক করার কথা জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। চীনের চাপে এনডিএএ ঘোষণা করতে বাধ্য হয় যে তারা দক্ষিণ শান রাজ্যের রাজধানী মান্দালয় বা তাউংগিতে আক্রমণ করবে না এবং চীনবিরোধী কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে সহযোগিতা করবে না। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, চীনের হস্তক্ষেপে অস্ত্রসহ প্রয়োজনীয় রসদ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাঁচ-ছয় মাস ধরে এনডিএএ নিষ্ক্রিয় হয়ে রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশসংলগ্ন রাখাইন রাজ্যে থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের অন্যতম শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির ওপর চীন ধীরে ধীরে চাপ বাড়াচ্ছে। আরাকান আর্মির প্রধান নেতা মেজর জেনারেল তোয়ান মারত নাইং এর আগে থেকে চীনে অবস্থান করলেও তাকে সেখানে আর থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। তিনি এখন বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি রাখাইন রাজ্যে অবস্থান করছেন বলে কূটনৈতিক একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। আরাকান আর্মির ওপর চাপ বাড়ানোর অংশ হিসেবে চীনের দিক থেকে অস্ত্রসহ অন্য সরবরাহ লাইনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ লাইনের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র নিশ্চিত করে।
রাখাইন রাজ্যের ১৭টি শহরের মধ্যে ১৪টি এবং পার্শ্ববর্তী চীন রাজ্যের পালেতওয়া শহরতলি দখলে রেখেছে আরাকান আর্মি। এখন তারা আরাকান রাজ্যের রাজধানী সিত্তে এবং কিয়াকফিউ শহরতলি দখল নেওয়ার চেষ্টা করছে, যেখানে চীনের গভীর সমুদ্রবন্দর এবং ইউনান প্রদেশের সঙ্গে সংযোগকারী তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের টার্মিনালসহ প্রধান চীনা প্রকল্পগুলো অবস্থিত। এসব প্রকল্পের নিরাপত্তার জন্য আরাকান আর্মি একটি হুমকি হতে পারে বলে ধারণা করছে চীন। কেননা, আরাকান আর্মিকে সহযোগিতা দিতে পশ্চিমা বিশ্বের তৎপরতা আগামীতে ক্ষতিকর হতে পারে চীনের জন্য। ফলে স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে জান্তা বাহিনীর বিকল্প কিছু দেখছে না চীন। যদিও আগে আরাকান আর্মিকে হাতে রাখার জন্য কিছু সহায়তা দিত চীন।