মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা ও বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) ঘাঁটি দখলের পর বাংলাদেশের সীমান্তের ওপারে আধিপত্য বিস্তার করছে সেখানকার সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। তারা সে দেশের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংস নির্যাতন চালাচ্ছে। তাই এখন রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের চারটি বিদ্রোহী গ্রুপ ইতোমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আর এ জন্য নতুন করে রোহিঙ্গাদের হাতে দেখা গেছে বিদেশি ভারী অস্ত্র। ফলে রাখাইনে চলছে অস্ত্রের ঝনঝনানি। এর মধ্যে আছে হাঙ্গেরির তৈরি এফইজি-এএমডি-৬৫ রাইফেল। এটি রাশিয়ান একে সিরিজের কপি বলে ধারণা করা হচ্ছে। অস্ত্রটি দেখা গেছে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) এক সদস্যের কাছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) বহরেও দেখা গেছে বিদেশি ভারী অস্ত্র।
আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হাতে এসব ভারী অস্ত্র থাকায় বাংলাদেশের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইতোমধ্যে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির ওপর হামলা চালানো শুরু করেছে এবং সীমান্তসংলগ্ন মায়ানমারের অভ্যন্তরের ক্যাম্পগুলোতে যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বিদ্রোহ আরও তীব্র হলে তা সাধারণ রোহিঙ্গা, আরাকান আর্মি, বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য গভীর ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এতে রাখাইন রাজ্যের বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ ও রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে আরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার শঙ্কাও বেড়ে যাবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সীমান্ত-লাগোয়া মায়ানমারের অভ্যন্তরে সীমান্ত পিলার ৫২-৫৩-এর বিপরীতে পাহাড় চান্দা এলাকায় ‘রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও)’ একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প দেখতে পান এই প্রতিবেদক। সেখানে রোহিঙ্গা তরুণদের দেওয়া হচ্ছে অস্ত্র প্রশিক্ষণ। ডামি অস্ত্র হাতে শত শত রোহিঙ্গা তরুণ প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন পাহাড় চান্দা প্যারেডে, যা অনেকটা সামরিক প্রশিক্ষণের মতোই।
প্রশিক্ষণরত কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, ‘আমাদের মা-বোনরা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। বহু দিন ধরে তারা এসবের শিকার হয়ে আসছেন। আমরা এর একটা অবসান এবং সুষ্ঠু সমাধান চাই। যতদিন তা না হবে, ততদিন আমরা প্রতিরোধের ময়দান ছেড়ে যাব না।’
কেউ জোর করে যুদ্ধে নামিয়েছে কি না জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘স্বেচ্ছায় এসেছি। পরিবারকে বলেও এসেছি, যদি শহিদ হয়ে যাই, তারা যেন বলতে পারেন, নিজের জাতির অধিকারের জন্য লড়াই করতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে।’
এ সময় নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরএসওর এক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার খবরের কাগজকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতারণা করেছে আরাকান আর্মি। রাখাইনে নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে আমাদের জাতির সব সদস্য ভিটেমাটি ফিরে পাবে বলে আমরা তাদের পক্ষেও ছিলাম, সহযোগিতাও করেছি। কিন্তু যখন রাখাইনে তারা এল, তখন ভোল পাল্টে তারাও জান্তার মতো রোহিঙ্গা জাতির ওপর নির্যাতন শুরু করল। তাই এখন আমাদের লড়াই তাদের সঙ্গে। যতদিন রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী তাদের অধিকার-মর্যাদা নিয়ে আরাকানে ফিরতে না পারবে, ততদিন আরএসওর লড়াই অব্যাহত থাকবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরসার মুজাহিদ ফোর্সের কমান্ডার খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের যোদ্ধা সমগ্র আরাকানে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি নিজেও আছি আরাকানের পাহাড় চান্দা এলাকায়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ৫০-৫২-এর কাছে। যেখানে আরাকান আর্মির সঙ্গে কিছুদিন আগেও লড়াই হয়েছে। এখনো আমাদের সম্মুখযোদ্ধারা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। কৌশলগত নানা দিক বিবেচনা করে আরাকানে আমরা রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে তাদের ভিটেমাটিতে ফেরানোর লড়াই করছি। অধিকার আর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই করছি। জীবন বাজি রেখেই আরসার প্রত্যেক যোদ্ধা জিহাদ করেছে। এ লড়াই অধিকার ও মর্যাদার। যতদিন মিলবে না, ততদিন চলবে।’
যেসব অস্ত্রে সজ্জিত আরসা-আরএসও
বর্তমানে মায়ানমারের অভ্যন্তরে বিদ্রোহ করা রোহিঙ্গাদের হাতে হাতে রয়েছে জার্মানির তৈরি জি-৩, জি-৪ রাইফেল, যা মূলত মায়ানমার সেনাবাহিনী ব্যবহার করত। পরবর্তী সময়ে রাখাইনের দখল হারানোর পর লুট করা এসব অস্ত্র পায় রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা। জাপানের তৈরি অটোমেটিক মেশিনগান, যা ইন্দোনেশিয়া ও জাপানের সেনারা ব্যবহার করে থাকে। বিশ্বের সবচেয়ে সফল আধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল একে-৪৭ ও এম-১৬-এর মতো অস্ত্রও দেখা গেছে। এ ছাড়া মর্টার শেল, রকেটচালিত গ্রেনেডসহ হরেক রকম বিদেশি পিস্তলও রয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বহরে। নতুন করে আরসার বহরে যুক্ত হয়েছে হাঙ্গেরির তৈরি এফইজি-এএমডি-৬৫ রাইফেল। রাইফেলটি রাশিয়ান একে সিরিজের কপি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রথম জি-৩ রাইফেল আলোচনায় আসে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে। সে সময় মায়ানমার সেনাদের ব্যবহৃত জিথ্রি রাইফেলসহ আরসার গান কমান্ডার জাকারিয়াকে গ্রেপ্তার করে র্যাব, যা ব্যবহার করার উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্থিরতা তৈরির।
যে কারণে কারাগারে আরসাপ্রধান জুনুনী
২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর বিকেল ৬টায় নাইক্ষ্যংছড়ি তমব্রু মধ্যমপাড়া এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানকালে আরসাপ্রধান জুনুনীর নির্দেশে যৌথ বাহিনীর সদস্যদের হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ছোড়া হয়। যৌথ বাহিনীর সদস্যরাও আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোড়েন। প্রায় ৪৫ মিনিট গোলাগুলির একপর্যায়ে জুনুনীর ছোড়া গুলিতে নিহত হন স্কোয়াড্রন লিডার রিজওয়ান রুশাদী। এ সময় আরও কয়েকজন আহত হন।
এ ঘটনায় ২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর (এএসআই) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় ৫২ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন অভিযানে আটক আরসাপ্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনীসহ ১০ জনকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এ ছাড়া জুনুনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরের হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে অন্তত ডজন মামলা রয়েছে।
সীমান্তে আতঙ্কের নাম স্থলমাইন
সীমান্তে আতঙ্কের নাম ‘স্থলমাইন’। এই কথাটি বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের স্থলমাইন বিস্ফোরণের ভয়াবহতা তুলে ধরে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িসহ এই সীমান্ত এলাকায় মায়ানমারের অভ্যন্তরে চলা সংঘাতের কারণে মাইন বিস্ফোরণ একটি নিয়মিত ঘটনা, যার ফলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বাদ যাননি টহলরত বিজিবি সদস্যও।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুমের বাইশফাঁড়ি সীমান্তে ২০ দিন আগে মাইন বিস্ফোরণে গুরুতর আহত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর নায়েক আক্তার হোসেন শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছেন। গত শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে স্থলে মাইন পুঁতে রাখার জন্য আরাকান আর্মিকে দুষছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিমত
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, গোটা পরিস্থিতি এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক শক্তির মদদে আরাকান আর্মি সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রভাব বিস্তার করছে। অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে গেছে বিদ্রোহীদের অনেকে। সীমান্ত সুরক্ষায় সব বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘সব বিদ্রোহীরাই আমাদের জন্য হুমকি। তাদের বহরে নতুন নতুন অস্ত্র যোগ হচ্ছে। এসব অস্ত্রই একদিন বাংলাদেশের দিকে তাক করতে পারে। তবে সেটা বেশি দূর যেতে পারবে না। কৌশলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে বাংলাদেশকে।’
রাখাইনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন জানিয়ে এই বিশ্লেষক বলেন, রাখাইনে আরাকান আর্মির সঙ্গে জান্তা বাহিনীর সংঘর্ষ বাড়বে। এতে সেখানকার পরিস্থিতি ঘোলাটে হবে। সীমান্ত নিরাপত্তায় সতর্ক থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার পরামর্শ তার।
বিজিবি রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মো. মহিউদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে, তবে সীমান্তে সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে। আরাকান আর্মির অনুপ্রবেশের ঘটনা প্রতিরোধ করা হয়েছে।’
রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হাতে ভারী অস্ত্র পৌঁছেছে, তা বাংলাদেশের জন্য হুমকি কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যদি গিয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই হুমকি। তবে এ ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তথ্য জেনে বিস্তারিত বলতে পারব।’