চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্পের ব্যবসায়ী শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৮ হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন ও অর্থ পাচারের অভিযোগের অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের উপপরিচালক মো. মুস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের দল অনুসন্ধান পরিচালনা করছে। দলের অন্য দুই সদস্য হলেন সহকারী পরিচালক আজগর হোসেন ও ইব্রাহিম খলিল। গতকাল শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের সব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য, প্রত্যেকের জাতীয় পরিচয়পত্র, টিআইএনের তথ্য ও পাসপোর্টের কপি তলব করেছেন অনুসন্ধান টিমের প্রধান মুস্তাফিজুর রহমান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, বিষয়টির অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা অনুসন্ধান শেষে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবে কমিশন।
দুদক সূত্র জানায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরী, তার স্ত্রী তাসমিয়া আম্বারীন, মেয়ে জারা নামরীন, ছেলে জারান আলী চৌধুরী এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে অন্তত ২৮টি ব্যাংকে ১৮৭টি অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শওকত আলীর নামে ১৪টি, তাসমিয়া আম্বারীনের নামে ১৫টি, জারা নামরীনের ৯টি, জারান আলীর ৩টি এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ১৪৬টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। গত ১৫ জুলাই পর্যন্ত এসব অ্যাকাউন্টে ৮ হাজার ৪০৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা জমা এবং ৮ হাজার ২৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে অ্যাকাউন্টগুলোতে মোট স্থিতি রয়েছে ১৭৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অ্যাকাউন্টগুলোর কেওয়াইসি, লেনদেন বিবরণী ও সহায়ক দলিলাদি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ওপেন সোর্স, বিএসইসি, সরকারি বন্ড ও জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিভাগ থেকে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা হচ্ছে। শওকত আলী চৌধুরী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অর্থ পাচার, পাচারের টাকায় বিদেশে বিনিয়োগ ও সম্পদ কেনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে তৎপরতা চলছে। শওকত আলী চৌধুরী সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্যে কয়েকটি ফ্ল্যাট কিনেছেন এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেছেন বলে ইতোমধ্যে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি এসব ফ্ল্যাট কেনা ও বিনিয়োগের জন্য ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে নিবন্ধিত একাধিক শেল কোম্পানিকে ব্যবহার করেছেন, যেগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করা হয়েছে।
ভুয়া কোম্পানির নামে এলসি খুলে অর্থ পাচার
ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে তিনটি কোম্পানি থেকে জাহাজ কিনেছে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এসএন করপোরেশন। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের চট্টগ্রাম শাখা ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এসএন করপোরেশনের পক্ষে তিনটি ঋণপত্র (এলসি) স্থাপন করে, যার বেনিফিশিয়ারি (সুবিধাভোগী) ছিল রেড রুবি গ্রুপ লিমিটেড, ট্যালেন্ট মাইল লিমিটেড ও কলাম্বিয়া সিস লিমিটেড। এই তিন কোম্পানিই ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে একই ঠিকানা ব্যবহার করে নিবন্ধিত। অথচ কোম্পানিগুলোর কোনোটিরই অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোম্পানিগুলোর নিবন্ধনের পর শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যরা তাদের কোম্পানি ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ৮ হাজার ৪০৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন।
ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে নিবন্ধিত ওই তিনটি কোম্পানির সঙ্গে তিনটি ঋণপত্রের মধ্যে ২০১৫ সালের এলসি নম্বর ২৪৯৪১৫০২০০৩৯-এর মূল্য ছিল ৭৪ দশমিক ৯৬ লাখ ডলার। ২০২০ সালের এলসি নম্বর ২৪৯৪২০০১০০২৫-এর মূল্য ৪ দশমিক ৬৪ লাখ ডলার। ২০২৩ সালের এলসি নম্বর ২৪৯৪২৩০১০০১৩-এর মূল্য ২১ দশমিক ৪১ লাখ ডলার। সব এলসিতেই আমদানিকারক ছিল এসএন করপোরেশন। এসবের সুবিধাভোগী কোম্পানিগুলো ছিল ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে নিবন্ধিত অস্তিত্বহীন ওই তিন কোম্পানি।
শওকত আলী চৌধুরীর মালিকানাধীন এসএন করপোরেশন ২০১২ সাল থেকে পুরোনো জাহাজ আমদানিসংক্রান্ত ১৪১টি এলসি করেছে। এর অধিকাংশ ভুয়া বলে প্রতীয়মান হয়েছে। শওকত আলী ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোতে লেনদেন সন্দেহজনক। এর মধ্যে চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখার ঢাকা ব্যাংক পিএলসিতে ২০০৪ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত শওকত আলীর একটি প্লাটিনাম অ্যাকাউন্ট ছিল। এই অ্যাকাউন্টে মোট জমা ৩৯৮ কোটি টাকা, উত্তোলনও করা হয় ৩৯৮ কোটি টাকা। অ্যাকাউন্টটি তার ব্যক্তিগত হলেও কর ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে এসএন করপোরেশনের ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যাংকটির আগ্রাবাদ শাখায় শওকত আলীর ব্যক্তিগত প্রিমিয়াম সেভিংস হিসাব রয়েছে। এই অ্যাকাউন্ট থেকে ১২৫ বার নগদ টাকা উত্তোলন করেছেন কোম্পানির সেক্রেটারি আব্দুল্লাহ আল মামুন। এ ছাড়া ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির আগ্রাবাদ শাখায় শওকত আলীর মেয়ে জারা নামরীনের ব্যক্তিগত সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টে ২০১৫ সাল থেকে গত সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ৩১ কোটি টাকা জমা হয়েছে। একই শাখায় জারা নামরীনের প্রিমিয়াম সেভিংস অ্যাকাউন্ট থেকে ৯৮ বার নগদ উত্তোলন করেছেন ব্যাংকটির সেক্রেটারি আব্দুল্লাহ আল মামুন। মিডল্যান্ড ব্যাংক পিএলসির আগ্রাবাদ শাখায় শওকত আলীর ছেলে জারান আলী চৌধুরীর সুপার সেভার অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এসএন করপোরেশনের বিপুল পরিমাণ টাকা জমা ও শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির জুবিলি রোড শাখায় এসএন করপোরেশনের সিসি (হাইপো) অ্যাকাউন্ট থেকে নামরীন এন্টারপ্রাইজ ও শিপ ব্রেকিং খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে। নিড ড্রেসেস প্রাইভেট লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে ৫০ কোটি ৪০ লাখ টাকা জমা হয়েছে। সিটি ব্যাংক পিএলসির আগ্রাবাদ শাখায় শওকত আলী চৌধুরীর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ৩ কোটি টাকা জমা ও তা মিডওয়ে সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ, ১০৬ কোটি টাকা জমা ও পরবর্তী সময়ে এসএন করপোরেশনে পাঠানো হয়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডের আগ্রাবাদ শাখায় অনুমোদন ছাড়াই এসএন করপোরেশনকে ২৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার এলটিআর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদনের আগে শাখা কার্যালয় এ ঋণ সুবিধা দেওয়ায় ব্যাংকিং নীতি ও রীতি লঙ্ঘন হয়েছে।
দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের অর্থ পাচার, সন্দেহজনক লেনদেন, আর্থিক নানাবিধ দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু তথ্য-উপাত্ত এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশে ফ্ল্যাট ও সম্পদ কেনার বিষয়ে তথ্য সহায়তা চেয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।