চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানার বটতলী মৌজার রিয়াজুদ্দিন বাজার তামাকুমণ্ডি লেনের ৩২নং ‘বাণিজ্য ভবন’ নামের একটি ছয়তলা অনুমোদনহীন ভবনটি ভেঙে ফেলার জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর চিঠি দেয়। ভবন মালিক নিজে না ভাঙলে চউকের পক্ষ থেকে তা ভেঙে ক্ষতিপূরণ আদায়ের কথাও বলা হয়। কিন্তু দুই বছর পার হলেও ভবনটি ভাঙা হয়নি।
কেবল এটি নয়, নগরের এমন অসংখ্য অনুমোদনহীন বা নকশাবহির্ভূত ভবনের মালিককে ভবন ভেঙে ফেলার জন্য চিঠি দেওয়া হলেও তা মানা হয়নি। চউকও এ ব্যাপারে আর কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। অথচ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী, নগরে ভবন নির্মাণ করার আগে নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক।
জানতে চাইলে বাণিজ্য ভবনের মালিক মো. হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভবনটি তিনি কিনে নিয়েছেন। তবে কেনার আগে তার জানা ছিল না সেটিতে চউকের অনুমোদন নেই। তবে একথা সত্য যে, ৪০ থেকে ৫০ বছর আগে ভবনটি যখন নির্মাণ করা হয়, তখন নিয়ম কানুন সম্পর্কে অনেকের তেমন ধারণা ছিল না। তাই সে সময় ভবন নির্মাণে অনেকেই চউক থেকে অনুমোদন নিত না। আসলে সে সময় মিস্ত্রি দিয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে আমার ধারণা। তাই এটি যে পরিকল্পিত ভবন নয়, তা আমরা এখন বুঝতে পারছি। বর্তমানে সিডিএ ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ঘোষণা করেছে। ভবনের কয়েকটি পিলার এবং বিমে ফাটল ধরেছে। ভবন মালিক হিসেবে আমরাও চাই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ করে সিডিএ থেকে নতুন করে অনুমোদন নিয়ে একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক ভবন নির্মাণ করতে। এখানে বাদ সেধেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী ভাড়াটিয়া। তারা সাময়িক সময়ের জন্যও তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে চান না। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ করে নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করা পর্যন্ত তাদেরকে দোকান ছাড়তে হবে। ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলে তারা যে যেই পজিশনে ব্যবসা করছেন তাদেরকে সে পজিশনে দোকান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এ বিষয়ে প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে লিখিত চুক্তি করতেও রাজি আছি। আমার ভবনের প্রায় সব ভাড়াটিয়া তাতে রাজি হলেও দুই-তিনজন রাজি হচ্ছেন না। এদের নিয়ে আমি বিপাকে পড়েছি। অথচ ভূমিকম্প কিংবা অন্য কোনোভাবে আমার ভবনে দুর্ঘটনা ঘটলে তখন প্রশাসন এবং জনগণ আমাকেই দায়ী করবে।
জানা যায়, বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবন আছে। কিন্তু চউকের অনুমোদনহীন ভবন কয়টি আছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে চউক ভুক্তভোগীদের অভিযোগ এবং নিজস্ব পরিদর্শনের ভিত্তিতে অনুমোদনহীন ভবন ভাঙার জন্য সংশ্লিষ্ট মালিককে চিঠি দিয়ে থাকে।
অভিযোগ আছে, চউক চিঠি দিলেও তা গুরুত্ব দেন না ভবন মালিকরা। ফলে মালিকদের উদ্যোগে অনুমোদনহীন ভবন ভাঙার দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। আবার ভবনমালিককে নোটিশ দিয়ে চউকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে তাদের সঙ্গে দেখা করে উৎকোচ আদায়েরও অভিযোগ আছে।
সিডিএর অথরাইজড অফিসার প্রকৌশলী তানজীব হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রাম নগরে অনেক পুরোনো ভবন আছে, যা নির্মাণের সময় অনুমোদন নেওয়া হয়নি। অননুমোদিত ভবনগুলোর বেশির ভাগই অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত। মূলত মিস্ত্রি দ্বারা এসব ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। তাই এসব ভবনের পিলার, বিম এবং ছাদে ফাটল ধরতে বেশি সময় লাগে না। ঝুঁকি এড়াতে এসব ভবন অপসারণ করার জন্য ভবনমালিককে চিঠি দিয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়।
জানা যায়, বর্তমানে নগরে যেসব ভবন রয়েছে তার মধ্যে অনুমোদনহীন, নকশাবহির্ভূত বহু ভবন রয়েছে। এ ছাড়া অনুমোদিত নকশা ভঙ্গ করে, ৮ তলার অনুমোদন নিয়ে ১০ তলা ও ১০ তলার অনুমোদন নিয়ে ১২ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে খাল-নালা ড্রেন দখল ও পাহাড় কেটে ইচ্ছামতো ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এসবের কোনো সংখ্যা চউকের কাছে নেই। দিনের পর দিন এসব গুরুতর অনিয়ম করেই চলেছে ভবন নির্মাণ। অনুমোদনহীন ভবন নিরাপত্তার জন্য হুমকি, সঙ্গে ভূমিকম্প ও দুর্যোগ পরিস্থিতিতে বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে সিডিএ অনিয়ম করে নির্মিত ও নকশাবহির্ভূত অংশ ভাঙার জন্য ৫০টি ভবন চিহ্নিত করে ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনার উদ্যোগ নেয়। ইতোমধ্যে দুই অভিযানে ২২টি ভবনের নকশাবহির্ভূত অংশ ভাঙা, জরিমানা ও মালিক পালিয়ে যাওয়ায় দুটি ভবন সিলগালা করা হয়। এ ধরনের আরও ভবনের তালিকা তৈরি করবে বলে চউক জানিয়েছে।
জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, চট্টগ্রাম শহরের তিন লক্ষাধিক ভবনের মধ্যে বহুতল ভবন রয়েছে ৬ থেকে ৭ হাজার। গত পাঁচ বছরে যেসব ভবন নির্মিত হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্নিনিরাপত্তা আইন মানা হয়েছে। কিন্তু ১০ থেকে ১২ বছর আগে যেসব বহুতল ভবন বানানো হয়েছে, সেগুলো অগ্নি নিরাপত্তার কোনো তোয়াক্কা করেনি। ফলে চট্টগ্রামে বিশাল এক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই ঝুঁকি এড়াতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স চট্টগ্রামের উপপরিচালক জসিম উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামের অসংখ্য ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। তবে রিয়াজুদ্দিন বাজার, তামাকুমণ্ডি লেনের ঘিঞ্জি মার্কেটগুলো মারাত্মক অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এই এলাকায় ছোট-বড় ১১০টি মার্কেট রয়েছে। তামাকুমণ্ডি লেনের ভেতরে রয়েছে অসংখ্য সরু গলি, যেখানে দুজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটাই দায়। এই লেনের পাশে রয়েছে রিয়াজুদ্দিন বাজার, হকার্স মার্কেটসহ বেশ কয়েকটি মার্কেট; যেখানে রয়েছে কয়েক হাজার দোকান। এসব মার্কেটে নেই পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা। অগ্নিকাণ্ড ঘটলে বের হওয়ার বিকল্প পথ নেই। তার ওপর রয়েছে খোলা বৈদ্যুতিক তারের জঞ্জাল।