মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ফের বৈধ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু দেশটিতে কর্মী পাঠাতে রিক্রুটিং এজেন্সিকে মালয়েশিয়া সরকারের দেওয়া ১০টি কঠিন শর্ত পূরণ করতে হবে, যা প্রায় ৯৫ শতাংশ অ্যাজেন্সির পক্ষে সম্ভব নয়। অথচ যোগ্যতা প্রমাণে ১০টি শর্ত পূরণ বিষয়ে তদন্ত ছাড়াই শুধু মৌখিক শুনানি বা ভুয়া কাগজপত্রের ওপর ভিত্তি করে অ্যাজেন্সি বাঁছাইয়ের কাজ চলছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে।
এদিকে মালয়েশিয়া সরকার বৈধ প্রক্রিয়ায় দেশটির বিভিন্ন সেক্টরে কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যে বাংলাদেশি যোগ্য রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির তালিকা চেয়ে তাগাদা দিয়েছে। আগামীকাল ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশি যোগ্য রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির তালিকা চেয়ে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়েছে। দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাগিদও দিয়েছে। এসব তালিকা পাওয়া গেলে রিক্রুটিং অ্যাজেন্সি যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কর্মী নিয়োগের ব্যাপারে চূড়ান্ত কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র খবরের কাগজকে জানায়, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে রিক্রুটিং অ্যাজেন্সিকে সে দেশের দেওয়া ১০টি কঠিন শর্ত পূরণ করতে হবে। এসব শর্ত পূরণে সক্ষম রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির কাছ থেকে আবেদন চাওয়া হয়েছে। অনেক অ্যাজেন্সি মালয়েশিয়ার দেওয়া শর্ত পূরণে তাদের সক্ষমতা জানিয়ে আবেদন করেছে। কিন্তু সময় কম ও লোকবল কম থাকায় সরেজমিনে তাদের সক্ষমতা যাচাই করা সম্ভব নয়। আমরা আবেদনকারীদের শুনানি নিয়ে তাদের তালিকা তৈরি করছি। মালয়েশিয়া সরকার এসব অ্যাজেন্সির যোগ্যতা পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবে।
সূত্র আরও জানায়, গত বছর গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে অনেক রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মামলা হয়েছে এবং মালিক বিদেশে পলাতক আছেন, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে তারাও আবেদন করেছেন। এ ধরনের ৬৬টি রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির শুনানি নেওয়া হয়েছে। এতে ৫১টি মামলাধীন অ্যাজেন্সির মালিক শুনানিতে অংশ নিয়েছেন। বাকি ১৫টি অ্যাজেন্সি শুনানিতে আসেনি। তবে যেসব অ্যাজেন্সি মামলার তদন্তে অভিযুক্ত প্রমাণিত হয়নি, তারা মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে পারবে।
বেসরকারি রিক্রুটিং অ্যাজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রার নেতা মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম খবরের কাগজকে জানান, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে মালয়েশিয়া সরকারের দেওয়া ১০টি কঠিন শর্ত পূরণ করতে সক্ষম, এমন অ্যাজেন্সির সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকটি। এসব শর্ত আগের সিন্ডিকেটের তৈরি। সবাই যাতে সে দেশে কর্মী পাঠাতে না পারে, এ জন্য এসব শর্ত সিন্ডিকেটের প্ররোচনায় করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মাধ্যমে শর্ত শিথিল করার আবেদন করেছি। মালয়েশিয়া সরকার শিথিল করবে এমন আশ্বাস দিয়েছে বলে উপদেষ্টা আমাদের জানিয়েছেন। আমরা সে পর্যন্ত অপেক্ষা করব। আর এখন যারা আবেদন করছেন, তাদের অনেকের শর্ত পূরণের সক্ষমতা নেই। এভাবে তালিকা পাঠালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আবারও জটিলতা সৃষ্টি হবে। তাতে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণে আগের সিন্ডিকেটই সুবিধা নেবে।’
তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়ার দেওয়া এই ১০টি শর্ত নেপাল সরকার মানেনি। তারা এসব শর্ত মেনে রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির তালিকা দিতেও রাজি হয়নি। বাংলাদেশ সরকারেরও উচিত, এসব শর্ত শিথিল না হওয়া পর্যন্ত তালিকা না পাঠানো।
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে রিক্রুটিং অ্যাজেন্সিকে যোগ্যতা প্রমাণে যে ১০ শর্ত পূরনের কথা বলা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে ন্যূনতম পাঁচ বছর ধরে কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা আছে এবং এই সময়ে অন্তত তিনটি দেশে তিন হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা থাকবে হবে। কর্মী পাঠাতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের লাইসেন্স থাকতে হবে এবং গন্তব্য দেশের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভালো কাজের স্বীকৃতি থাকতে হবে। জোরপূর্বক শ্রম, মানবপাচার, শ্রম আইন লঙ্ঘন, জোরপূবক অর্থ আদায়, মানি লন্ডারিংসহ অন্যান্য আর্থিক অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা যাবে না।
এ ছাড়া রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির সব ধরনের সুবিধাসহ নিজস্ব প্রশিক্ষণ সুবিধা, পাঁচটি আন্তর্জাতিক নিয়োগকর্তার কাছ থেকে প্রশংসাপত্র, অন্তত ১০ হাজার স্কয়ার ফিটের নিজস্ব অফিস থাকতে হবে। মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশে বৈধভাবে এবং সঠিক প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রমাণপত্র থাকতে হবে। শর্ত পূরণ না করলে কর্মী নিয়োগের জন্য তাদের বিবেচনা করা হবে না। এসব শর্ত অনুযায়ী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে রিক্রুটিং অ্যাজেন্সির তালিকা সে দেশের মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠাতে চিঠিতে অনুরোধ করা হয়েছে।