প্রাণোচ্ছল তরুণী রেহনুমা আক্তার হঠাৎ কেমন চুপসে গেছেন। বন্ধুমহল যাকে ‘মুখরা রমণী’ বলে টিপ্পনি কাটত সবাই। সেই রেহনুমা নিজেকে হঠাৎ গুটিয়ে নিয়েছেন। ক্লাসরুমে চুপ করে লেকচার শোনেন। হলে ফিরে উদাস চোখে তাকিয়ে থাকেন আকাশের দিকে। প্রায়ই ঘুম ভেঙে যায় অজানা আতঙ্কে।
ঢাকার একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ছাত্রী রেহনুমা আক্তারের মনোজগতে এ পরিবর্তন ২১ নভেম্বরের পরে। শুক্রবার ক্লাস, পরীক্ষা সব বন্ধ বলে ‘ঘুমকাতুরে’ রেহমুনা ঠিক করে নিয়েছিলেন একটু বেলা করে উঠবেন। কিন্তু সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে হলভবন যখন ভূমিকম্পে প্রবলভাবে কেঁপে উঠল, তখন রেহনুমা প্রবল আতঙ্কে জ্ঞান হারান। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে সেবা শেষে তার জ্ঞান ফেরে ঘণ্টাখানেক পর।
গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ওই মাঝারিমাত্রার ভূমিকম্পে প্রবলভাবে কেঁপে ওঠে সারা দেশ। ওই ভূমিকম্পের পরে ছোটমাত্রার বেশ কয়েকটি ভূমিকম্পন দেশজুড়ে অনুভূত হয়েছে।
ঢাকা ও নরসিংদীর বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হতাহতদের মধ্যে অনেকে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে (প্যানিক অ্যাটাক) ছোটাছুটি করতে গিয়ে আহত হয়েছেন। ভূমিকম্পে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক হলের পলেস্তারা খসে পড়ে। এ ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে হল ভবন থেকে অনেক শিক্ষার্থী লাফিয়ে নিচে পড়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন।
ভূমিকম্প-আতঙ্ক এখনো থেমে নেই। শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, কর্মজীবী অনেক মানুষও এখন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে অনেকেরই। তাদের কেউ কেউ কর্মক্ষেত্রে তেমনিভাবে ছন্দ খুঁজে পাচ্ছেন না। এই আতঙ্কে অনেকে এখন শহরের বাসাবাড়ি ছেড়ে গ্রামে গিয়ে বসবাসের কথা চিন্তা করছেন।
শহর ছাড়ছেন অনেকেই, যাচ্ছেন গ্রামে
৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের ঘটনায় ফাটল ধরে পূর্ব বাড্ডার পাঁচতলা এলাকার বেশ কয়েকটি ভবনে। ওই ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে এলাকা ছেড়ে গেছেন রফিকুল ইসলাম, মো. স্বপনের পরিবার। রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভবনে ফাটলের পরে ওই ভবনে থাকার কোনো মানে হয় না। আমার স্ত্রী এই ঘটনার পর কয়েক দিন রাতে ঘুমাতে পারেননি। আতঙ্কে সারা রাত জেগে থাকতেন। তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত। আমার ছোট মেয়েও ভয় পেত ভীষণ। আমি বাধ্য হয়ে মাদারীপুরের বাড়িতে ফিরে এসেছি।’
ব্যাংকার রিফাত তাসনুভা অন্তরা থাকেন রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায়। ভূমিকম্প-আতঙ্কে তার বৃদ্ধা মা আনোয়ারা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। চাকরির সুবাদে নিজে ঢাকা শহর ছেড়ে যেতে পারেননি তিনি। তবে মাকে রেখে আসতে হয়েছে কুমিল্লার ময়নামতির বাড়িতে। অন্তরা বলেন, ‘সারাক্ষণ মাকে নিয়ে টেনশনে থাকতে হয়। কাজে মন বসাতে পারছি না।’
পপুলার হাসপাতালে ধানমন্ডি শাখার মনোরোগ বিশেষজ্ঞের দ্বারস্থ হয়েছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অন্তরা সরকার। পুরান ঢাকার এই বাসিন্দা বলেন, ‘কসাইটুলী এলাকার খুব কাছে আমার বাসা। ভূমিকম্পে যেভাবে দেওয়াল ধসে মানুষ মারা গেল, এটা আমি ভুলতে পারছি না। প্রতিদিন বাসা থেকে বের হয়ে যখন ক্যাম্পাসে যাই, তখন মনে হয় দালান ভেঙে এসে রিকশার ওপর পড়ল। আমি এই আতঙ্ক ভুলতে পারছি না। সামনে আমার সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। আমি পড়াশোনায় মন বসাতে পারছি না। আমি বাধ্য হয়ে মনোবিদের কাছে এসেছি।’
কর্মসংস্থান ও আয়ের স্তর আতঙ্কের বড় নিয়ামক
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপত্র প্রকাশক প্রতিষ্ঠান টেইলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস গ্রুপ গত ১৭ নভেম্বর ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি ইন ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস’ এ ভূমিকম্প আতঙ্ক নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। চারজন বিশেষজ্ঞের এই প্রতিবেদনে ভূমিকম্পে ভুক্তভোগীদের মানসিক চাপ ও মৃত্যুভয়ের মাত্রা নিরীক্ষণ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে ২৪ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। চার গবেষক ওই ঘটনাকে কেস স্টাডি হিসেবে নিয়ে তাদের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
গবেষক দল তুরস্কের দুর্যোগপীড়িত মানুষের কাছে তিনটি প্রশ্ন করেন। এ তিনটি প্রশ্ন হলো- মৃত্যু নিয়ে বিভ্রান্তি বা অস্পষ্টতা মৃত্যু কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা এবং মৃত্যু সময়ের যন্ত্রণা নিয়ে ভয়। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় ০ থেকে ৪ এর মধ্যে। ‘কখনো না’ এর মূল্যমান- ০, ‘কদাচিৎ’ এর মান- ১; ‘মাঝে মাঝে’ এর মান- ২; ‘প্রায়ই’– এর মান ৩; ‘সব সময়’ এর মান-৪। উত্তরদাতাদের স্কোর ০ থেকে ২৯ এর মধ্যে হলে মৃত্যু-উদ্বেগ কম বলে ধরা নেওয়া হয়। স্কোর ৩০-৫৯ হলে মৃত্যু-উদ্বেগ মাঝারি, স্কোর ৬০-৮০ হলে মৃত্যু-উদ্বেগ খুব বেশি বলে ধরা নেওয়া হয়।
গবেষণায় উঠে এসেছে, মৃত্যুভীতির স্কোর ২০ দশমিক ৫৬ থেকে ৩৮ দশমিক ৭৮। যারা মৃত্যুভীতিতে ভোগেন, তাদের মধ্যে আচরণগত সমস্যার পাশাপাশি অনুভূতির সীমাবদ্ধতা, অতিরিক্ত আবেগ, চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন, ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে মৃত্যুঝুঁকির স্কোর ১৫ দশমিক ৮৯ থেকে শুরু করে ৬১ দশমিক ৮৬-এ উন্নীত হয়েছে। গবেষণার ফল এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, অংশগ্রহণকারীরা মধ্যমমাত্রার মৃত্যু-উদ্বেগ এবং উচ্চমাত্রার ভীতি অনুভব করেছেন। এ ছাড়াও দেখা গেছে, মৃত্যু-উদ্বেগ বাড়লে ভীতির মাত্রাও বাড়ে। গষেবকরা বলছেন, উচ্চমাত্রার মৃত্যু-ভীতি কারও কারও জীবনমানকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
মৃত্যু-উদ্বেগ নিয়ে নানা প্রশ্ন করে গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, বয়স, লিঙ্গভেদে এই উদ্বেগের মাত্রা পরিবর্তিত হয়। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক দুর্যোগ-পরিকল্পনাও এই ভীতিতে একটি নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ভূমিকম্প-উত্তর আতঙ্ক নিয়ে নানা জিজ্ঞাসায় গবেষকরা দেখেছেন- কর্মসংস্থান, আয়ের স্তর এই আতঙ্কের বড় নিয়ামক। ভূমিকম্পে আত্মীয়-স্বজনের হতাহতের ঘটনাও মনোজগতে বড় প্রভাব ফেলে।
১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ভূমিকম্পে মৃত্যুভীতি বেশি। এদের অধিকাংশই নারী। গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক করণীয় সমন্ধে তরুণদের কোনো পরিকল্পনা তো দূরে থাক, তাদের কোনো ধারণাই থাকে না। বেকার তরুণ, নারী, স্বল্প-আয়ের মানুষের পাশাপাশি যারা ভূমিকম্পে আত্মীয় হারিয়েছেন বা নিজে শারীরিকভাবে আহত হয়েছেন; এমন মানুষের মধ্যে ভূমিকম্প-উত্তর ভীতি সর্বাপেক্ষা বেশি। এই গবেষণায় বলা হয়েছে, ভূমিকম্প নারীদের ওপর আরও গভীর মানসিক প্রভাব ফেলে। ভূমিকম্পের পর নারীরা দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ ও বিষণ্নতায় ভোগেন। তাদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
স্বাভাবিক কার্যক্রমেই গতি ফিরবে জীবনে
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ভূমিকম্পের পর আমার কাছে বেশ কয়েকজন রোগী এসেছেন। তারা সবাই প্রবল আতঙ্কে ভুগছেন। তাদের ঘুম হচ্ছে না। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করছেন। এমন বড় একটা দুর্ঘটনার পর এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এই আতঙ্ক যেন দীর্ঘমেয়াদি না হয় সে জন্য আমি সবাইকে পরামর্শ দিয়েছি, তারা যেন নিজেদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যায়। দৈনন্দিন কার্যকলাপই মানুষকে আবার তার স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেবে।
ভূমিকম্প-আতঙ্কে ভুগে মানসিক বৈকল্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনার আগে ঢাকাবাসীকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মালেকা পারভীন বলেন, ‘আমাদের মৃত্যু তো যেকোনো সময় যেকোনোভাবে হতে পারে। মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত হয়ে সব কাজ ফেলে রাখলে চলবে না। পরে দেখা যাবে, কাজের বোঝা আরও বেড়ে গেল। তখন আরও চাপ বাড়বে। তাই এখন কাজগুলো ছোট ছোট পর্বে ভাগ করে সেরে নেওয়াই ভালো হবে।’ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ বলে পড়াশোনা সব বন্ধ করে বসে থাকলে চলবে না। পড়াশোনা নিয়মিত চালিয়ে যেতে হবে। তাহলে পরীক্ষার আগে চাপ পড়বে না।’