‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা থেকে বহুল পঠিত লাইনটি স্মরণ করলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ’ জারির পরিপ্রেক্ষিতে মন্তব্য জানতে চাইলে গতকাল সোমবার এভাবে মনোভাব প্রকাশ করেন তিনি।
এই অধ্যাদেশের মূল অংশীজন (স্টেকহোল্ডার) বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বস্তি লক্ষ করা গেলেও পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন হওয়ার আনন্দ দেখা যায়নি। এ ছাড়া ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপিপন্থি আইনজীবীদের মধ্যেও দেখা গেছে এই নিয়ে সতর্কতা।
১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের (মাসদার হোসেন মামলা) আলোকে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক হয়। কিন্তু আইনাঙ্গনে বরাবরই অনুযোগ ছিল, রায়ের সব নির্দেশ বাস্তবায়ন হয়নি। সুনির্দিষ্ট করে চাওয়া ছিল সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন। ওই রায়ের ২৬ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর)। বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত মামলায় দীর্ঘ আইনি লড়াই করেছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। এর মধ্যে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ’ জারি হয়েছে গত রবিবার।
এসবের পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাইলে বিষয়টিকে ‘একধরনের অগ্রগতি’ হিসেবে উল্লেখ করেন মনজিল মোরসেদ। একই সঙ্গে তিনি বলেন, মাত্র ৫০ কোটি টাকার মধ্যে ব্যয়ের প্রকল্প প্রধান বিচারপতি অনুমোদন করতে পারবেন। এর বেশি হলে সরকারের ওপর নির্ভর করতে হবে। তাহলে আর বিচার বিভাগ স্বাধীন হলো কোথায়! অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পূর্ণতা পাবে না।
তিনি বলেন, “অধ্যাদেশে একটা কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে, যেখানে সরকারের তিনজন সচিবকে রাখা হবে। কমিটিতে অ্যাটর্নি জেনারেলও থাকবেন। অ্যাটর্নি জেনারেল নিরপেক্ষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। আমরা দেখে আসছি যে, অ্যাটর্নি জেনারেলরা সাধারণত সরকারের পক্ষে কথা বলেন। তাহলে অ্যাটর্নি জেনারেল ও তিন সচিবসহ চারজন একপক্ষের হয়ে যান, অর্থাৎ এই কমিটির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগ থাকবে সংখ্যাগুরু। এটি তো ‘স্বাধীনতা দিয়ে আবার নিয়ন্ত্রণ’ করা হলো!”
এদিকে জরুরি ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় স্থাপন, সচিবালয়ের কার্যক্রম চালুর জন্য গেজেট প্রজ্ঞাপনসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। গতকাল অ্যাসোসিয়েশনের এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
অ্যাসোসিয়েশন বিবৃতিতে বলেছে, জারি করা অধ্যাদেশের ধারা ১ (২)-এ উল্লেখ রয়েছে, ‘(২) সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন সম্পন্ন ও ইহার কার্যক্রম পূর্ণরূপে চালু হওয়া সাপেক্ষে সরকার, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে, ধারা ৭-এর বিধানাবলি সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা কার্যকর করিবে।’ অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইন হলেও তা বাস্তবায়ন হওয়ার আগ পর্যন্ত বিচারকদের বদলি, পদায়ন, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধানসংক্রান্ত বিষয় সরকারের অধীনই রয়ে গেছে। তাই অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে তার মেয়াদের মধ্যেই জরুরি ভিত্তিতে পৃথক সচিবালয় স্থাপন ও এর কার্যক্রম চালুর জন্য গেজেট প্রজ্ঞাপনসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছে।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আমিরুল ইসলাম ও মহাসচিব মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম বিবৃতিতে বলেছেন, এই অধ্যাদেশ জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অন্যতম বন্দোবস্ত এবং ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে। বিবৃতিতে অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, এই অধ্যাদেশ দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মাইলফলক হয়ে থাকবে।
এনসিপির আইনজীবী নেতা নাজমুস সাকিব বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করায় সাধুবাদ জানাচ্ছে এনসিপির আইনজীবী সংগঠন ন্যাশনাল ল ইয়ার্স অ্যালায়েন্স। একই সঙ্গে এই আইনে কিছু গলদ রয়েছে, যার মাধ্যমে সরকারের একটা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ জারি রাখার ঝুঁকি রয়ে গিয়েছে।
বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেন ও তার সহকর্মীরা বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথককরণে ১৯৯৫ সালে মামলা করেন। ওই মামলায় ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক রায় দেন। সেই রায়ের আট বছর পর ২০০৭ সালে মূল নির্দেশ বাস্তবায়ন করে বিচার বিভাগকে পৃথক করা হয়। গত রবিবার অধ্যাদেশ জারির পরিপ্রেক্ষিতে মাসদার হোসেন বলেন, বিচার বিভাগ পৃথককরণ মামলার বাদী ও সাবেক বিচারক মাসদার হোসেন বলেন, ‘এটা শুধু জুডিশিয়ারির’ই নয়, সারা দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল। এই অধ্যাদেশ জারি করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান বিচারপতিকে ধন্যবাদ জানাই।’
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্যে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে আমাদের নিম্ন আদালত প্রশাসনিক কর্তৃত্ব থেকে মুক্তি পেল। আর অধস্তন বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও ছুটিবিষয়ক সব সিদ্ধান্ত উচ্চ আদালতের নিয়ন্ত্রণে এল।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, এই অধ্যাদেশের ফলে সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটবে। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচার বিভাগের ক্ষমতায়ন করা হয়েছে। তবে সঠিক বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে এর কার্যকারিতা।’